ক্যাম্পাস প্রেম,পর্ব১১
হুমায়ূন কবীর
রিপনকে খুঁজে পেল না। আসলে পুকুরটা এত গভীর যে অতো তলে কারো পক্ষে যাওয়া সম্ভব না। শেষে জাল এলো,তাতেও কাজ হলো না। পরে দমকল বাহিনী খবর দেওয়া হল, ডুবুরি এলো। সন্ধ্যার একটু আগে রিপন উদ্ধার হল মৃত অবস্থায়। তখনো তার বুকের কাছে বল ধরা। আশ্চর্য ব্যাপার। মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে হাসছে। আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলছে।
শেষমেষ চোখ লাল করে উঠে আসলাম। নাস্তা খেলাম। নাস্তা টাস্তা শেষ করে টিভি রুমে বসে পেপার পড়ছি। দেখি লোক সমাজ পত্রিকায় আমার নাম। ডিপজলের সাথে গ্যাঞ্জামের কাহিনী রংচং করে পেপারে দিয়ে দিয়েছে। সেখানে আমাকে দেখানো হয়েছে সন্ত্রাসী হিসেবে,ডিপজল কে দেখানো হয়েছে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। পেপার পড়ছি, শাহানুর এসে জানালো আমার গেস্ট এসেছে। অনুমান করার চেষ্টা করলাম কে আসতে পারে আমার কাছে? ভাবতে ভাবতে গেস্ট রুমে ঢুকলাম।
আরে এযে রাশমিন। আমি ভিতরে ভিতরে চিৎকার করে উঠলাম।
সেই চোখ হাজার কথার ছুটোছুটি। দুটি চোখ দুটি জল পদ্ম। সদ্য ফুটে পানির উপরে ভেসে আছে। আমি কি বলি কি না বলি। শত কথা মনের দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, কিন্তু বাক্যের দরজা অতি সংকীর্ণ। সব আটকে যাচ্ছে। আমি নির্বাক। কি বলবো? একটি কথাই শুধু ভাষারূপ পেল,রাশমিন, কেমন আছো?
এ শুধু প্রশ্ন নয় এ আমার হৃদয় নিংড়ানো আবেগের টুকরো। সে যেন সবই বুঝলো। আমার আবেগের তীব্রতা সে অনুভব করল। তারপর হাসিতে দুলে দুলে উঠতে লাগলো। তার চটুল হাসির তোড়ে আমার জমাট ঘন আবেগ তরল হয়ে গেল। আমি ধাতস্ত হলাম। লজ্জা পেলাম। মনের গোপনে কত তীব্রভাবে তাকে কামনা করেছি, একটিমাত্র কথার পিঠে চড়ে সেই আবেগ প্রকাশ হয়ে গেছে। আমি যেন ফাঁকা হালকা হয়ে গেছি। মানুষ মনে মনে কত কিছু সম্ভব অসম্ভব ভাবে। তাই বলে কি তার সবকিছু নির্লজ্জের মত, কাঙালের মত প্রকাশ করে ফেলতে হবে? জানিনা রাশমিন আমাকে কি ভাবছে? সে হয়তো আমাকে একেবারে ব্যক্তিত্বহীন পাঠা ভেবে বসে আছে। বললাম-- কখন এসেছ?
- এইতো এসেই আপনাকে খবর দিলাম। আপনি দাঁড়িয়ে কেন? বসেন।
আরে তাইতো আমি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছি।
বললাম, রুমে চলো।
রুমে এসে আমি আমার বেডে বসলাম। রাশমিন আমার টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে আছে। টেবিল ফ্যানের বাতাস তার চোখে মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। হায় জীবন,যদি বাতাস হতে পারতাম। কি অপদার্থ মানুষ আমি।
ফ্যানটা বেশ কিছুদিন মোছা হয় না। সে যদি খেয়াল করে, কি ভাববে আমাকে? টেবিলের তাক থেকে সে খুঁজে খুঁজে আমার বাঁশের বাঁশিটা বের করে আনলো। হাতের বাঁশিটা নাড়তে নাড়তে জানতে চাইল - এই বাঁশিটা কার? আপনার, বাজাতে পারেন?
আমি লজ্জিত ভাবে বললাম, না মানে কোন রকম চেষ্টা করি আর কি।
- তাই, আপনার তো অনেক গুণ? এতদিন জানতাম আপনি একজন ভালো স্টুডেন্ট। এখন তো দেখছি বংশীবাদকও।আর কি কি পারেন?
আমার যেন চোখ ফেটে পানি বের হয়ে আসলো। কত কথা মনে পড়ে গেল। আমি যে একজন ভালো স্টুডেন্ট এ কথা প্রায় ভুলতেই বসে ছিলাম। এসএসসিতে স্কুলের ভিতর ফার্স্ট হয়েছিলাম। সবাই কি খুশি। আমি তখন রাশমিনদের গ্রামে লজিং থাকতাম। তখন কত নাটক লিখেছি। নাটকের দল গঠন করেছি। সবাই মিলে অভিনয় করেছি। প্রতি ঈদে আমরা সেখানে নাটক মঞ্চস্থ করতাম। কত সুন্দর আনন্দের খুশির ছিলো সেই দিনগুলি। ওদের গ্রামের মানুষ আমাকে কত ভালবাসত। কত ভক্ত ছিল আমার। রাশমিন জানতে চাইলো আমি এখনো নাটক করি কিনা।
বললাম- না।এখন আর সময় হয়ে ওঠেনা। মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ হলে বাশিটা নিয়ে বসি।
শাহানুর হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে বলল- আরে মামা, খালি পেটে গল্প জমে?
তাইতো, রাইসমিন কতদূর থেকে এসেছে। তাকে খালি পেটে বসিয়ে রেখে শুধু বকবক করছি। শাহানুর কে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললাম
- একটা এক লিটারের কোক, কয়েকটা কেক, চানাচুর, কলা, বিস্কুট নিয়ে আসো।
শাহানুর সানন্দে নাচতে নাচতে চলে গেল।