ক্যাম্পাস-প্রেম,পর্ব১২
হুমায়ূন কবীর
রাশসমিন বলল - এই শোনেন, শোনেন, আমার জন্য কিছু আনতে হবে না। আমি নাস্তা করে এসেছি। এখন আর কিছু খেতে পারব না।
" আরে না তাই কি হয়? আমার হলে প্রথম আসলে। খালি মুখে চলে যাবে? তাই হয় নাকি?"আমি ব্যাস্তভাবে প্রশ্ন করলাম।
রাশমিন তার চোখে একটু হাসলো- কে চলে যাচ্ছে? আপনি তো আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। আরে আপনার হাতে ওটা কি?
আমি আতঙ্কগ্রস্থের মতো উত্তর দিলাম -
লোক সমাজ।
- দেন দেখি।
আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও লোকসমাজ পত্রিকা তার হাতে দিলাম। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। কেন রাশমিন একদিন আগে,অথবা পিছে আসতে পারতো না? কিংবা লোক সমাজে আমার খবরটা আজকে না প্রকাশিত হয়ে অন্য একদিন তো হতে পারতো।তাহলে রাশমিন দেখতে পারত না। রাসমিন যদি খবরটা পড়ে কি ভাববে আমাকে? আমি আতঙ্কে আছি। রাসমিন কিছু খাচ্ছে না।
"এ কিরকম কথা। তুমি কিছু খাবে না? না খেলে কিন্তু আমি কষ্ট পাবো। " আমি কষ্ট এবং আতঙ্ক মিশ্রিত কণ্ঠে বললাম।
- কেন, কষ্ট পাবেন কেন?
- বা, তুমি প্রথম আমার রুমে আসলে, তুমি তো আমার অতিথি।
- দেখেন আমি কিছুক্ষণ আগে অনেক কিছু খেয়ে এসেছি। আপনি খামখাই কষ্ট পাচ্ছেন।
- আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে এগুলো প্যাকিং করে ব্যাগের ভিতর দিয়ে দিই। বাসায় যেয়ে খাবে।
- আপনি তো আচ্ছা মানুষ।
রাশমিনের হাসি মুখ দেখে আশ্বস্ত হলাম। খাবার কিছু প্যাকিং করে দিলাম বাদ বাকি রুমমেটরা মহানন্দে ভাগ বটোরা করে খেয়ে নিল। বিদায় বেলায় রুমমেটরা রাশমিনকে মাঝে মাঝে আসতে বলল। অতিথি এলেই তো ওরা খুশি। ফ্রি ফ্রি খাওয়া জমে ওঠে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে রাশমিন বলল,মুন্সি মেহেরুল্লাহ ময়দানে নাকি বাণিজ্য মেলা হচ্ছে?
আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম,হচ্ছে। জানো মেলায় দারুন একটা খেলা হচ্ছে। শুন্যে মোটর সাইকেল চালনা।
রাসমিন বিস্মিত হয়ে বলল, শুন্যে? সেটা কিভাবে সম্ভব?
আমি দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বললাম, হ্যাঁ শুন্যে।দারুন দুঃসাহসিক ব্যাপার। দেখবে? কত স্পিডে যে চালায় তার কোন হিসেব নেই।
যশোর টাউন হল ময়দানে দারুন বাণিজ্য মেলা বসেছে। কত দেশ-বিদেশের জিনিস যে বিক্রি হচ্ছে। ইরানি কার্পেট, দেশি-বিদেশি খাবার। রাতে গান বাজনা। কত কিছু। মাঠের চারিদিকে স্টল। খাবারের দোকান। আমরা মাঠের মাঝে একটা স্টলে বসলাম। কয়েকটা টেবিল। চারপাশে চেয়ার। সামনের টেবিলে একটা পানির বোতল। আগেই পিপাসা লেগেছিল। পানির বোতল দেখে পিপাসা টা আরো বেড়ে গেল। বোতলের মুটকি খোলাই ছিল। সেটি সরিয়ে ঢক ঢক করে সবটুকু পানি খেয়ে নিলাম।
রাশমিন বিরক্ত হয়ে বলল, চলেন, এখানে খুব গরম। ভালো লাগছে না।
- এত সুন্দর পরিবেশ আর তোমার ভালো লাগছেনা?
- এখানে সুন্দরের কি দেখলেন? পণ্য বিক্রির জন্য চাকচিক্য করে রেখেছে। ওগুলো সৌন্দর্য নয়, বাণিজ্যিক ফাঁদ।
- বাহ তুমি তো খুব সুন্দর কথা বলো।
- যা সত্যি তাই বললাম।
কথা বলতে বলতেই একটি বাচ্চা ছেলে এসে, খালি বোতলটি হাতে নিয়ে বলল, আপনার বিল দশ টাকা।
- কিসের বিল ১০ টাকা?
- পানির।
- পানির? এই এটা কি তোর ঢাকার শহর যে পানির বিল দিতে হবে ?
--জি। ওটা মিনারেল ওয়াটার।
" মিনারেল ওয়াটার তা এখানে মুখ খুলে রেখেছিস কেন? " আমি রেগে জিজ্ঞেস করলাম।
বাচ্চা ছেলেটি আমার রাগ গায়ে মাখল না। সে মাথা চুলকে বলল, দেন, টাকা দেন।
আমি পকেটে হাত ঢুকালাম। দরকার নেই।সাথে রাশমিন রয়েছে। কি ভাবতে কি ভাববে। মেয়ে মানুষ সাথে থাকলে সবাই তাকে অসহায় ভাবে। বাসের কন্ডাক্টার বেশি ভাড়া আদায় করে নেই। রিক্সাওয়ালা বেশি ভাড়া দাবি করে। দোকানে মালের দাম বেশি চায়। অগত্য সিদ্ধান্ত নিলাম একে টাকা দিয়ে বিদায় করি। কিন্তু পকেটে একটাকাও নেই। একটা কয়েনও না। তারমানে টাকা আনতে ভুলে গেছি। ব্যাপারটা রাশমিনকে বুঝতে না দিয়ে উঠে স্টল মালিকের কাছে গেলাম। বিনয়ের সাথে বললাম, ভাই, বিলটা বিকেলে নেন।
- আমি তো আপনাকে চিনি না।
- আপনাকে চিনতে হবে না। আমি তো আপনাকে চিনি। আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় মেলায় আসি। তখন দিয়ে যাব।
দোকানি রেগে উঠে বলল, রাখেন মিয়া। ধান্দা মারার জায়গা পাওনা। খালি পকেটে মেয়ে মানুষ নিয়ে ফুর্তি করতে বেরিয়েছে। গায়ের শার্ট খুলে দিয়ে যাও মিয়া।
সে দাঁত কেলিয়ে টিটকিরি করে কথাগুলো বলল। আমার গায়ে আগুন ধরে গেল। নিজের চেহারা দেখালাম।
- এই খানকির ছেলে। একটা চড়ে তোর ৩২ টা দাঁত ফেলে দেবো। শুয়োরের বাচ্চা।
আমার চাপা তীব্র আগ্রাসি হুংকারে সে ভয় পেয়ে গেল। পরক্ষণে সে একজনকে ব্যাকুল ভাবে ডাক দিল। যেন তার উদ্ধার কর্তা এসে গেছে। স্টল মালিক আবার যুদ্ধ করার জন্য গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে এবার আমাকে হাতে টিপে মেরে ফেলবে। অথচ তার উদ্ধার কর্তা এসে আমার সাথে হাত মিলালো।
বলল, কিরে তুষার, দুপুর বেলায় মেলায় কেন?
- না ভাই এমনি। সাথে একটা গেস্ট আছে তো। তাকে মেলা দেখাতে নিয়ে আসলাম।
- কই, কে?
আমি রাশমিনকে দেখালাম।
- কিছু খেতে দিয়েছিস? না এমনি এমনি বসিয়ে রেখেছিস?
- না, ও খেতে চায় না।
- কি বলছিস পাগল? তোর গেস্ট তো আমারও গেস্ট। চল তোর গেস্টের সাথে পরিচিত হই।
আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম।
"রাশমিন এই হচ্ছে মাসুম ভাই। ভাই,এ হচ্ছে আমার খালাতো বোন রাশমিন। "
রাশমিন মাসুম ভাইকে সালাম দিল।
মাসুম ভাই বলল, ভালো আছিস?
তারপর সে নিজেকে একজন প্রথম শ্রেণীর কন্ডাক্টর হিসেবে পরিচয় দিলো। শেষে বলল, - ঠিক আছে, তোরা বসে গল্প কর আমি একটু ব্যস্ত আছি।
মাসুম ভাই চলে গেল। স্টল মালিক আমাদের জন্য নিজের হাতে চা নাস্তা নিয়ে এলো।রাশমিন কিছু খেলো না। আমি চা এবং নাস্তা খেলাম। আসার সময় স্টল মালিক বলল,ভাই আবার আসবেন। আমাদের একটু দেখে শুনে রাখবেন। পানির দাম তো নিলই না আরো চা-নাস্তা খাওয়ালো। আমি মনে মনে হাসলাম। একেই বলে ঠেলার নাম বাবাজি।