ক্যাম্পাস-প্রেম,পর্ব১৪
হুমায়ূন কবীর
- 01750 916986

ছবি,লেখক - হুমায়ূন কবীর।
কতক্ষণ পরে জানি না, একসময় মনে হলো, আমার ডান হাতে কিছু একটা- ভারি কিছু আছে। আরে এ যে সেই গেঞ্জির প্যাকেট। রাসমিন ভুলে প্যাকেট আমার কাছে রেখেই চলে গেছে। এখন আমার কী করা উচিত? প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করলাম। ধরালাম। সিগারেট কিরকম পানসে পানসে লাগছে, স্বাদ নেই। সিগারেট টানছি না শুধু কাগজ পুড়িয়ে ধোঁয়া নিচ্ছি বোঝা যাচ্ছে না। কয়েক টানেই সিগারেট শেষ। রিকশায় উঠে আর একটি ধরালাম। রাসমিনকে ফোন দিলে কেমন হয়? হ্যাঁ তাই করা যাক।
মোবাইলের কি গুলো চেপে রাশমিনের মোবাইলে কল দিলাম।
- রাশমিন?
-হ্যাঁ কি মনে করে?
- তোমার গেঞ্জিটা তো ফেলে গেছো।
- কোথায়?
- এই যে আমার হাতে।
- আপনি কোথায়?
- গোরস্থানে।
- মানে?
- মানে রিক্সায় করে হলে যাচ্ছি,।
- কিন্তু গোরস্থানে কেন?
- আমি এখন কারবালা গোরস্থান পার হচ্ছি।
- ও, তাই বলেন, আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
ওপাশ থেকে মোবাইলে হাসির সুবাতাস বয়ে এলো।
- তোমার গেঞ্জিটা কি তৌফিক কে দিয়ে পাঠিয়ে দেবো?
- না।
- না কেন?
- কেন ওটা কি খুব ভারী? আপনার বয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে?
- না মানে।
- আপনার পছন্দ হয়নি?
- কিন্তু?
ওপাশের সেট টা অফ হয়ে গেল। অনেকবার চেষ্টা করেও আর রিং ঢোকানে গেল না।
ভালোবাসা ভালো নয় এ কথা জানে সবাই। তবু কেন বোঝে না হৃদয়?
আজকের এই রাত শুধু রাত নয় এক রহস্যময় অধ্যায়। আকাশে অনেক তারা চাঁদের কোন চিহ্ন নেই। আমি একা বসে আছি ডাইনিং এর বিশাল ছাদের উপর। এত ছাদ নয় যেন ঘোড়দৌড় মাঠ। আমার সামনে, উত্তরে ছাদের কোল ঘেষে বিশাল বিশাল সেগুন গাছ। মাথা ঝুঁকিয়ে নীরব হয়ে আছে তারা। এই ছাদ, এই গাছ, এই রাত ওই আকাশের তারা সবারই প্রাণ আছে। কিন্তু কী এক অজানা কারণে সবাই চুপচাপ হয়ে আছে। তারা যেন আজ আমাকে কিছু বলি বলি করেও,না বলে থেমে আছে।
আমার সমস্ত চাওয়া পাওয়া গুলো আজ এক দফাই পরিণত হয়েছে। হয় রাশমিন, না হয় মৃত্যু। সমস্ত পৃথিবী সুখের ঘুমে ডুবে গেছে। ঘুম নেই শুধু আমার চোখে। আজ সব ফয়সালা হয়ে যাবে।
- আল্লাহ, তুমি রাশমিনকে আমার করে দাও। ও আমার স্রষ্টা, তুমি কি আমার হৃদয়ের হাহাকার শুনতে পাচ্ছ?স্রষ্টা কিসে তুমি সন্তুষ্ট হও? আমি তা জানি না।কিন্তু তুমি তো জানো কিসে তোমার সৃষ্টি ব্যাথা পায়, বিনষ্ট হয়, ধ্বংস হয় তার জীবন? আমি আজ বড় কাঙ্গাল। এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আমার আর কোন সাহায্যকারী নাই। তুমি সবচেয়ে বড় দয়ালু, তুমি সবচেয়ে বড় বন্ধু। ও আমার স্রষ্টা রাসমিনের মন আমার প্রতি ভালবাসায় পূর্ণ করে দাও। সে যেন আমাকে ভালোবাসে, আমাকে আপন করে নেয়।আমার ব্যথা যেন অনুভব করতে পারে। স্রষ্টা তুমি সব পারো আমারে চাওয়া তুমি পূর্ণ করে দাও। রাশমিনকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।
মনের অজান্তে কখন যে কাঁদতে শুরু করেছি। সমস্ত শার্ট চোখের পানিতে ভিজে গেছে। পকেটে এক প্যাকেট সিগারেট ভিজে দলা পাকিয়ে গেছে। কান্না থামছে না। কিছুতেই কান্না থামানো যাচ্ছে না। দু চোখ দিয়ে শুধু পানি ঝরছে। অথচ বাড়ির সবাই বলে, আমি নাকি খুব নিষ্ঠুর।ছোটবেলায় আমার একটি বোন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলো।সে আমাকে খুব ভালোবাসতো। সব সময় কোলে পিঠে করে নিয়ে বেড়াত। অথচ তার মৃত্যুতে আমি এক ফোঁটাও চোখের পানি ফেলিনি। অথচ আজ আমি নির্লজ্জের মত, ফকিরের মত, পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় একজন ব্যক্তি হিসেবে স্রষ্টার কাছে চোখের পানির বিনিময়ে একটি মেয়ের ভালোবাসা ভিক্ষে চাচ্ছি।
হাই আমি একি করছি। আমি রাশমিনকে এত ভালবেসে ফেলেছি? শুধু ভালোবাসা নয় পাগলের মত অবস্থা দাঁড়িয়েছে আমার । তাকে না পেলে হয়তো আমি সত্যি সত্যিই রাস্তার পাগল হয়ে যাব।
তার সবকিছু বড় রহস্যময়। আমি কেন তাকে এত ভালোবাসলাম? আজো আমি তার মুখটাই তো দেখতে পারিনি। শুধু বোরকার ফাঁকে দুটো চোখ দেখেই এই অবস্থা। তার পুরো মুখটা দেখতে পেলে তখন না জানি আমার কি অবস্থা হবে। ভাবতে ভাবতে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে রাত শেষ হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। কখন যে ভোর হয়ে গেছে কিচ্ছু বুঝতে পারিনি। মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ফজরের আজান, আল্লাহু আকবার - ভেসে আসছে।সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখি, এই বিরান ছাদে একা একা সারাটি রাত বসে বসে কাটিয়ে দিয়েছি। শিশিরে মাথা টাথা ভিজে একাকার কাথা কাথা। ঠান্ডায় গলা বসে গেছে। শার্টটাট ভিজে একাকার অবস্থা।
তাড়াতাড়ি রুমে ফিরে মাথাটাথা মুছে সমস্ত ড্রেস চেঞ্জ করে ফেললাম। এখন কি রকম শীত শীত করছে, জ্বরের লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে। শুকনো কাপড় পরে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।