Posts

গল্প

নিষিদ্ধ পল্লীর পরিশুদ্ধ প্রেম

December 21, 2025

Chameli Akter

22
View

ইকবাল একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। তার লেন্সের নিচে এই শহরের হাজারো রূপ ধরা পড়েছে—কখনো উৎসবের ঝলকানি, কখনো রাজপথের প্রতিবাদ। কিন্তু এবারের অ্যাসাইনমেন্টটা একটু আলাদা। শহরের এক কোণে পড়ে থাকা সেই নিষিদ্ধ পল্লীর মানুষের জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো তাকে ফ্রেমবন্দি করতে হবে।

যে শহরের অলিগলি আর মানুষের জীবনের অপ্রকাশিত গল্প ফ্রেমবন্দি করতে ভালোবাসে। একদিন এক প্রামাণ্যচিত্রের কাজে সে শহরের নিষিদ্ধ পল্লীতে যায়। সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। সরু গলির দুপাশে জরাজীর্ণ দালান, পান-সিগারেটের ধোঁয়া আর উৎকট পারফিউমের গন্ধ। ইকবাল তার ক্যামেরাটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটছিল। প্রতিটি দরজায় ছোপ ছোপ অন্ধকার। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটি দোতলা বাড়ির ভাঙা বারান্দায়।

সেখানে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, চুলে কোনো আলগা সাজ নেই। মেয়েটি সামনের দিকে না তাকিয়ে আকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ধূসর মেঘের ঘনঘটা যেন তার চোখের মনিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই নরককুণ্ডের মাঝে এমন শান্ত আর বিষণ্ণ মুখ ইকবাল আগে দেখেনি। মেয়েটির নাম মিতু।

ইকবাল অবচেতনভাবেই ক্যামেরাটা তুলল, কিন্তু ক্লিক করল না। মিতুর চোখের সেই গভীর শূন্যতা আর হাহাকার তার লেন্সের কাঁচ ভেদ করে সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে বিঁধল। মনে হলো, এই মেয়েটি এখানে শরীর বিক্রি করতে নয়, বরং নিজের আত্মাকে হারিয়ে খুঁজতে এসেছে।

"কী দেখছেন?" হুট করে মিতুর কণ্ঠস্বরে ইকবালের ঘোর কাটল।  মিতু এখন সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে।

ইকবাল একটু ইতস্তত করে বলল, “আপনার চোখের চাহনিটা খুব সুন্দর, মানে... খুব গভীর।”

মিতু একটা ম্লান হাসি হাসল। “গভীরতা মেপে কী করবেন? এখানে সবাই শুধু ওপরের টুকু দেখে চলে যায়।”

সেই শুরু। এরপর থেকে ইকবাল প্রতিদিন কোনো না কোনো উছিলায় সেখানে যেত। মিতুর সাথে তার কথা হতো। মিতু জানাল, সে এখানে স্বেচ্ছায় আসেনি। দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় তাকে এখানে বিক্রি করে দিয়েছিল। প্রথম প্রথম সে অনেক লড়াই করেছিল, কিন্তু এই চার দেয়াল আর সমাজের ঘৃণা তাকে তিলে তিলে মেরে ফেলেছে। এখন সে শুধু বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে আছে।

ইকবাল প্রতিদিন মিতুর জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসত। কখনো নীল অপরাজিতা ফুল, কখনো রবীন্দ্রনাথের কবিতার বই, আবার কখনো কেবল এক ঠোঙা গরম জিলাপি। মিতু অবাক হয়ে দেখত, ইকবাল তার কাছে অন্য পুরুষদের মতো কিছু দাবি করে না। সে শুধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে মিতুর জীবনের টুকরো টুকরো কথা শোনে। মিতু কি পছন্দ করে,না পছন্দ করে। অথচ মিতুর নিজস্ব পছন্দ বলতে কোন কিছুই ছিল না আর। মিতুর সব বিষয়ে জানার গভীর আগ্রহ ইকবালের।

এক সন্ধ্যায় মিতু বলল, “ইকবাল সাহেব, আপনি এখানে আর আসবেন না। আপনার সম্মান আছে, ভবিষ্যৎ আছে। আমার মতো কলঙ্কিত মেয়ের সাথে আপনার নাম জড়ালে লোকে থুতু দেবে।”

ইকবাল মিতুর হাতটা আলতো করে ধরে বলল, “মানুষের মন যদি পরিষ্কার থাকে, তবে বাইরের কোনো কাদা তাকে স্পর্শ করতে পারে না মিতু। আমি এখানে একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে আসি না, আমি আসি তোমার বন্ধু হিসেবে।”

পরদিন সে আবার যায়, মিতুর সাথে কথা বলার সুযোগ খোঁজে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরব বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়। মিতু অবাক হয় যে, এই নরকের মতো জায়গায় কেউ তাকে শরীরের ঊর্ধ্বে একজন মানুষ হিসেবে সম্মান দিচ্ছে।ইকবাল প্রায়ই আসত, মিতুর জন্য প্রিয় ফুল আর বই নিয়ে। মিতু তাকে বলত, "এখানকার বাতাস বিষাক্ত ইকবাল, আপনি চলে যান।" ইকবাল মৃদু হেসে জবাব দিত, “যেখানে ফুল ফোটে না, সেখানে সুবাস পৌঁছে দেওয়াটাই তো নেশা।”

দিন যত যাচ্ছিল, ইকবালের মনে মিতুর প্রতি এক গভীর মমতা আর ভালোবাসা জন্ম নিচ্ছিল। সে অনুভব করল, মিতুকে এই পঙ্কিল জগত থেকে বের করে আনা তার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। এই পল্লীর সর্দারনি আর দালালদের চোখ এড়িয়ে মিতুকে মুক্ত করা প্রায় অসম্ভব।একদিন প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির মিতু কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে সে ইকবালের প্রেমে পড়েছে, কিন্তু এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। 

হঠাৎ কে যেন দরজায় কড়া নাড়লো!

দরজা খুলে দেখে ইকবাল ভিজে একাকার।

এ ঝড় বৃষ্টির রাতে ইকবাল দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এসেছে কিছু কথা বলতে।

ইকবাল সেদিন মিতুর হাত ধরে বলেছিল, “আমি তোমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যেতে চাই। আমার সাথে নতুন করে জীবন শুরু করবে?”

 মিতু, আজ রাতে তোমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে," ইকবাল ফিসফিস করে বলল।

মিতু আঁতকে উঠল, “কী বলছেন! ওরা জানতে পারলে আপনাকে মেরে ফেলবে। তাছাড়া আমি কোথায় যাব? এই সমাজ কি আমাকে গ্রহণ করবে?”

“সমাজ কী বলল তাতে আমার কিছু যায় আসে না মিতু। আমি তোমাকে সম্মান দিয়ে আমার ঘরে নিয়ে যেতে চাই। মরতে হলে মরব, কিন্তু তোমাকে এই নরকে আর এক মুহূর্ত থাকতে দেব না।”

ইকবাল মিতুর জন্য একটি সাধারণ বোরকা আর কিছু টাকা নিয়ে এসেছিল। বৃষ্টির শব্দ আর অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে তারা পেছনের গলি দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সর্দারনির লোকগুলো তখন নেশায় মত্ত। মিতুর বুক ধড়ফড় করছিল। প্রতিটি কদম যেন এক একটি মাইল। কিন্তু ইকবালের হাতের শক্ত বাঁধন তাকে সাহস দিচ্ছিল। সে প্রথমবার অনুভব করল, অন্ধকার গলিটা শেষ হয়ে এক বিশাল রাস্তা তাদের সামনে খোলা।

সে জানত না সামনে কী আছে, কিন্তু ইকবালের হাতের শক্ত বাঁধন তাকে সাহস দিচ্ছিল।

শহরের একপ্রান্তে একটি ছোট বাড়িতে মিতুকে নিয়ে এল ইকবাল।

ভোরের প্রথম আলো যখন আকাশের কোণে উঁকি দিচ্ছিল, তখন মিতু প্রথমবারের মতো প্রাণভরে দীর্ঘশ্বাস নিল।  সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে সে এখন মুক্ত। 

কয়েক মাস কেটে গেছে। মিতু এখন একটি এনজিওতে সেলাইয়ের কাজ শিখছে। সে আর সেই পুরনো মিতু নেই। তার চোখে এখন আর শূন্যতা নেই, আছে আগামীর স্বপ্ন। ইকবাল আজও তার পাশে আছে, তবে বন্ধু হিসেবে নয়, তার জীবনের ধ্রুবতারা হিসেবে।সে আর সেই পুরনো মিতু নেই, যার চোখে শূন্যতা ছিল। এখন তার চোখে স্বপ্নের ঝিলিক। ইকবাল আজও তার পাশে আছে। তারা বিয়ে করেছে ঘরোয়াভাবে।সমাজ হয়তো এখনও কিছু কানাঘুষা করে, কিন্তু ইকবালের ভালোবাসার বর্ম মিতুকে সব আঘাত থেকে রক্ষা করে। 

একদিন গোধূলি বেলায় ইকবালের স্টুডিওতে মিতু তার নিজের একটি বড় ছবি দেখল। সেই প্রথম দিনের ছবি—যেখানে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

ইকবাল পেছন থেকে এসে বলল, "এই ছবিটার নাম দিয়েছি 'অপেক্ষা'। কারণ তুমি সেদিন আলোর জন্য অপেক্ষা করছিলে।

মিতু হাসল, এবার তার হাসিটা ম্লান নয়, বরং ভোরের সূর্যের মতো উজ্জ্বল। সে বলল, “আর আমার কাছে এই ছবিটার নাম 'মুক্তি'।”ইকবাল বুঝতে পারল, তার ক্যামেরার লেন্স হয়তো অনেক সুন্দর ছবি তুলেছে, কিন্তু মিতুর জীবনের এই পরিবর্তনই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। ইকবাল মনে মনে ভাবল, ক্যামেরার লেন্স হয়তো অনেক কিছু ধরতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার লেন্স দিয়ে যা দেখা যায়, তার কোনো তুলনা হয় না।

ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, ভালোবাসা হলো একজনকে অন্ধকার থেকে আলোতে টেনে আনার এক অদম্য শক্তি। 

নিষিদ্ধ পল্লীর সেই বিষণ্ণ মিতু আজ ইকবালের ঘর আলোকিত করা এক পূর্ণিমা।

শহরের নিষিদ্ধ পল্লীর সেই ভাঙা বারান্দার স্মৃতি এখন অনেক দূরে। অন্ধকার থেকে আলোতে আসার এই গল্পটি কেবল ইকবালের ক্যামেরায় নয়, তাদের জীবনের প্রতিটি পাতায় অমর হয়ে রইল। মিতু এখন আর কোনো পণ্যের নাম নয়, সে ইকবালের হৃদয়ের রানী। ভালোবাসা সত্যিই পারে অন্ধকার থেকে মানুষকে টেনে আনতে, যদি সেখানে ইকবালের মতো দৃঢ়তা আর মিতুর মতো বিশ্বাসের সমন্বয় ঘটে।

Comments

    Please login to post comment. Login