ভুলের দায়
ওমর ফারুক আশরাফী
অনিক আহমাদ আমার শৈশবের বন্ধু।
একই পাড়া, একই স্কুল, একই স্মৃতি—আমরা যেন একে অপরের জীবনের অংশ ছিলাম। এমন কোনো কথা ছিল না, যা আমরা একে অপরকে বলিনি। আমার ব্যক্তিগত সব কথা ও জানত, আর ওর জীবনের গোপন দিকগুলোর নীরব সাক্ষী ছিলাম আমি।
অনিক স্বভাবে একটু উচ্ছৃঙ্খল ছিল। মানুষ যাকে বলে বখাটে টাইপ। কিন্তু বন্ধুত্বে ও ছিল অকৃত্রিম। সেই বিশ্বাস থেকেই হয়তো একদিন ও আমার কাছে এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল, যা আজও আমাকে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে।
ও বলেছিল, সে একটি মেয়েকে পছন্দ করে। মেয়েটি নাকি খুব সুন্দর, ভদ্র, আলাদা। তারপর ধীরে ধীরে ও তার পরিকল্পনার কথা খুলে বলল। পরিকল্পনাটি শুনেই আমি আঁতকে উঠেছিলাম। আমি স্পষ্টভাবে না বলেছিলাম। বিষয়টি শুধু ভুল নয়, অপরাধ—সেটা আমি বুঝেছিলাম।
কিন্তু বন্ধুত্বের দুর্বলতা, আর “একবারই তো” এই আত্মপ্রবঞ্চনা আমাকে নীরবে রাজি করিয়ে নেয়।
পরিকল্পনাটি কাজ করেছিল—এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য।
ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে একটি বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। মেয়েটি অনিককে নায়ক ভেবে ভরসা করেছিল। সেই ভরসা থেকেই শুরু হয় তাদের সম্পর্ক। পাঁচ বছর—দীর্ঘ পাঁচ বছর তারা একসাথে ছিল। ভালোবাসা, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ—সবই ছিল।
কিন্তু সমাজ ভুল দিয়ে শুরু হওয়া গল্পকে কখনো পূর্ণতা দিতে চায় না।
মেয়েটির বাবা এই সম্পর্ক মেনে নেননি। একদিন কোনো আলোচনা ছাড়াই মেয়েটির অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেন। সেই সিদ্ধান্তের সামনে অনিক ছিল সম্পূর্ণ অসহায়।
খবরটা শোনার পর অনিক কাঁদেনি।
চিৎকার করেনি।
শুধু চুপ করে গিয়েছিল।
সেই চুপ থাকা ছিল ভয়ংকর।
মানুষটা যেন এক মুহূর্তে ভেতর থেকে শক্ত পাথর হয়ে গেল। হাসি হারিয়ে গেল, কথা কমে গেল। সময়ের সাথে সবাই এগিয়ে গেল, কিন্তু অনিক থেমে রইল সেই জায়গায়, যেখানে ভালোবাসা শেষ হয়েছিল।আজও অনিক বিয়ে করেনি।