Posts

চিন্তা

ছায়ানটকে কেন পুড়তে হলো!?

December 23, 2025

মোঃ আব্দুল আউয়াল

Original Author অধ্যক্ষ এমএ আউয়াল

62
View

একটি ভবন পুড়ে যাওয়া সংবাদ হতে পারে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর হলে তা প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।
কিন্তু একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যখন আক্রমণের শিকার হয়, তখন সেটি আর কোনো একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি জাতির স্মৃতি, বিবেক ও আত্মপরিচয়ের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত।
ছায়ানট পুড়েছে—এই বাক্যটি তাই কেবল আগুনের বিবরণ নয়। এই বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু দশকের জমে থাকা ক্ষোভ, ভয়, বিকৃতি ও সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতির দীর্ঘ ইতিহাস। এটি একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়, যে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আর নেই—
ছায়ানটকে কেন পুড়তে হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হয় অনেক পেছনে—একটি পরিবারের ভেতরে, একটি মানুষের জীবনের ভেতরে, একটি জাতির সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার ভেতরে। কারণ ছায়ানট কোনো হঠাৎ জন্ম নেওয়া সংগঠন নয়। এটি কোনো দলীয় প্রকল্প নয়। এটি ছিল একটি সময়ের অনিবার্য ফল—যখন বাঙালি বুঝে গিয়েছিল, তার অস্তিত্ব কেবল ভূগোল বা ধর্ম দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না; তাকে নিজের ভাষা, গান, স্মৃতি ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরতে হবে।
সনজিদা খাতুনের বাবা কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন সেই উপলব্ধির এক জীবন্ত প্রতীক। বাহ্যিকভাবে তিনি ছিলেন একজন ধর্মাচারী মুসলমান—টুপি, লম্বা দাঁড়ি, মওলানা-সদৃশ অবয়ব। কিন্তু মানসিকভাবে তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তার এক নির্ভীক সাধক। পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে তাঁর পেশাগত পরিচয় থাকলেও তাঁর আসল পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন মানবিক যুক্তিবাদের মানুষ। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল—এই দুই ভিন্ন ধারার দুই শিখর ব্যক্তিত্বের সঙ্গেই তাঁর ছিল গভীর বন্ধুত্ব।
এই সহাবস্থানই ছিল তাঁর জীবনদর্শন—বিরোধ নয়, সমন্বয়। ধর্ম ও মানবতা, বিজ্ঞান ও সাহিত্য, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা—সবকিছুকে একসঙ্গে ধারণ করার ক্ষমতা। তাঁর ঘরে গান ছিল, প্রশ্ন ছিল, তর্ক ছিল। নজরুল সেখানে এসে উঠতেন। রবীন্দ্রসংগীত সেখানে নিয়মিত ধ্বনিত হতো। এমন একটি পরিবারে বড় হয়ে ওঠা সনজিদা খাতুনের কাছে সংস্কৃতি কখনোই নিছক বিনোদন ছিল না—সংস্কৃতি ছিল অস্তিত্বের ভাষা।
যে পিতা মেয়েদের গানের খাতা টেনে নিয়ে পড়ে বলেন, “ছোকরাতো ভালোই লেখে!”, তিনি আসলে একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বীজ রোপণ করেছিলেন। সেই দৃষ্টিভঙ্গিই পরে ছায়ানটের আদর্শে রূপ নেয়।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সেই বীজের প্রথম প্রকাশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সনজিদা খাতুন সেদিন ক্লাস শেষে আজাদী পত্রিকার পাতায় সভার খবর দেখে সেখানে যান। চারদিকে সেনাদের টহল, ভয় আর আতঙ্ক। নামিদামি নারী নেত্রীরাও সভাপতিত্বে রাজি নন। শেষ পর্যন্ত তাঁর মা সেই দায়িত্ব নেন। সেই সভায় সনজিদা খাতুনের বক্তৃতা কোনো কৌশলী রাজনৈতিক ভাষণ ছিল না। সেটি ছিল ভাষার অধিকারের পক্ষে এক তরুণীর স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ।
এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সনজিদা খাতুন রাজনীতির বাইরে ছিলেন না, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতির অংশও ছিলেন না। এই পার্থক্যটি ছায়ানটের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ষাটের দশকে পাকিস্তানি রাষ্ট্র যখন রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে, তখন বিষয়টি কেবল সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতার উদাহরণ ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রকল্প—বাঙালিকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা। রবীন্দ্রনাথকে “ভারতীয়” ও “হিন্দু সংস্কৃতির প্রতীক” আখ্যা দিয়ে বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা হচ্ছিল।
এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সনজিদা খাতুন ও তাঁর সহযোদ্ধারা অস্ত্র ধরেননি, স্লোগান দেননি—তাঁরা গান গেয়েছেন। এই গান ছিল প্রতিবাদের ভাষা। নীরব, কিন্তু দৃঢ়। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে পিছু হটতে হয়। এই ঘটনাই প্রমাণ করে—সংস্কৃতি যখন সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, ক্ষমতা তখন ভীত হয়।
ততদিনে গান হয়ে উঠেছিল বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। ধান কাটতে কাটতে গান, পথ চলতে চলতে গান, ঘরের অন্দরমহলে রবীন্দ্রনাথ। শিক্ষিত মানুষের জীবনে রবীন্দ্রসংগীত ছিল আত্মিক আশ্রয়। এই বাস্তবতার ভেতরেই আসে ১৯৬১ সাল—রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ।
এই উপলক্ষে যারা একত্রিত হয়েছিলেন, তারা কেউ জানতেন না—এই মিলন একদিন একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে। প্রথমে ছিল অনানুষ্ঠানিক গানের আসর। ফিরোজা বেগম, ইলা মজুমদার, বারীণ মজুমদার, খাদেম হোসেন খান—এই নামগুলো প্রমাণ করে, ছায়ানট কোনো সংকীর্ণ গোষ্ঠীর সংগঠন ছিল না। এটি ছিল মিলনের জায়গা।
ওয়াহিদুল হকের প্রস্তাব—“আমরা একটা স্কুল করব”—ছিল এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঘোষণা। অর্থ নেই, পৃষ্ঠপোষক নেই—শুধু চাঁদা। এই চাঁদা ছিল দায়বদ্ধতার প্রতীক। মানুষ নিজের সংস্কৃতির দায়িত্ব নিজে নিচ্ছে—এই মনোভাব থেকেই ছায়ানটের জন্ম।
নজরুলের গান থেকে নেওয়া নাম ‘ছায়ানট’—এই নামেই লুকিয়ে ছিল দর্শন। শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাচীন রাগ এবং বিদ্রোহী কবির চঞ্চল আত্মা—এই দুইয়ের সহাবস্থান। ছায়ানট মানে শৃঙ্খলা ও বিদ্রোহের একসঙ্গে অবস্থান।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ছায়ানট কেবল সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল না—এটি হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর। শিল্পীরা কলকাতায় গিয়ে গানের দল গড়েন। ‘রূপান্তরের গান’ ছিল এক ঐতিহাসিক দলিল। রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান, বিভিন্ন স্থানে শো, সংগৃহীত অর্থ মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে প্রদান—এই সবকিছু প্রমাণ করে, ছায়ানট কখনো নিরপেক্ষ ছিল না। তবে তারা দলীয় ছিল না।
এই অদলীয় অবস্থানই পরবর্তীতে তাদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে—সব পক্ষের কাছেই।
রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখ উদযাপন ছিল পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব সাংস্কৃতিক ঘোষণাপত্র। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালির আবহমান সংস্কৃতিকে সামনে আনা—এটি ছিল আত্মপরিচয়ের পুনর্দখল। ২০০১ সালের বোমা হামলা সেই ঘোষণার ওপর সরাসরি আঘাত। কিন্তু তার পরের বছর আরও বৃহৎ পরিসরে উদযাপন প্রমাণ করে—সংস্কৃতিকে ভয় দেখিয়ে থামানো যায় না।
তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে এক ধরনের বিচ্যুতি শুরু হয়। সংস্কৃতি ধীরে ধীরে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে থাকে। গভীরতা হারাতে থাকে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই সনজিদা খাতুন ‘নালন্দা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। নালন্দা ছিল মানবিক শিক্ষার একটি বিকল্প প্রয়াস।
সেই নালন্দাই একদিন ভাঙচুরের শিকার হয়। মধ্যরাতে। কোনো প্রশ্ন ছাড়াই।
ভাঙা কাঁচের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে থাকা সনজিদা খাতুনের ছবিটি তাই কেবল একটি আবেগী মুহূর্ত নয়—এটি বাঙালির আত্মসমালোচনার আয়না। সেই চোখে বিস্ময় নেই, ক্ষোভ নেই—আছে নীরব উপলব্ধি।
এই দীর্ঘ যাত্রায় ছায়ানটকে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছে। কিন্তু সনজিদা খাতুন কখনো রাজি হননি। এমনকি বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবও তিনি বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—রাষ্ট্রের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা সংস্কৃতির স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে।
এই স্বাধীনতাই আজ সবচেয়ে বড় অপরাধ।
ছায়ানটকে পুড়তে হলো কারণ ছায়ানট প্রশ্ন করে।
ছায়ানটকে পুড়তে হলো কারণ ছায়ানট মনে করিয়ে দেয়—আমরা কেবল কোনো পরিচয়ের অনুসারী নই, আমরা একটি ইতিহাসের ধারক।
ছায়ানটকে পুড়তে হলো কারণ আমরা নিজেরাই ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হয়েছি, যারা নিজেদের সংস্কৃতিকে ভয় পায়।
ভবন পুড়ে যায়।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়।
এই দেশ কি তার নিজের সংস্কৃতিকে সহ্য করতে পারে?
 

Comments

    Please login to post comment. Login