যে কাজ কেউ দেখেনি
এক গ্রামে থাকত এক কিশোর ছেলে—আমিন।
সে ছিল খুবই ইবাদতপ্রিয়।
নিয়মিত নামাজ পড়ত, কুরআন তিলাওয়াত করত এবং সবাইকে বলত,
“আল্লাহ সব দেখেন।”
তবে আমিনের একটি দুর্বলতা ছিল।
সে ভালো কাজ করলেও মনে মনে ভাবত—মানুষ দেখছে কি না, মানুষ কী বলবে।
একদিন গ্রামের মসজিদে জুমার খুতবায় ইমাম সাহেব বললেন—
“যে ব্যক্তি গোপনে একটি সৎকাজ করে, আল্লাহ তার জন্য বিশেষ প্রতিদান রেখে দেন।”
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা নিজের সম্পদ দিনে বা রাতে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে আল্লাহর পথে খরচ করে-
তাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে। তাদের কোনো ভয় নেই। তাদের কোনো চিন্তা নেই।’
সূরা আল বাকারা: ২৭৪।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো ভালো।
আর যদি গোপনে দান করো এবং অভাবগ্রস্তকে দাও তা তোমাদের জন্য অধিক ভালো।’
সূরা আল বাকারা: ২৭১.
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলে, ‘ হে মুমনিগণ, দানের কথা প্রচার করো না এবং
কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান ঐ ব্যক্তির মত নষ্ট করো না, যে নিজের ধন সম্পদ কেবল লোক দেখানোর জন্যই ব্যয় কর’।
(সুরা আল বাকারা:২৬৪।
ঈমাম সাহেব আরো বলেন- কেয়ামতের দিন যখন আরশের ছায়া ছাড়া কোন ছায়া থাকবে না,
আল্লাহ তা’য়ালা সাত শ্রেণির মানুষকে তাঁর আরশের নিচে আশ্রয় দেবেন।
তাদের একজন হলো ঐ ব্যক্তি, যে এত গোপনে দান করতে যে, তার ডান হাতের দান বাম হাতও টের পেত না। (বুখারি:৬৬০, মুসলিম: ১০৩১)।
ঈমাম সাহেব কুরআন ও হাদিসের বক্তব্যের ভাবার্থ বোঝালেন—যারা আল্লাহর পথে প্রকাশ্যে ও গোপনে দান করে,
তাদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তা ও পুরস্কার।
আবার গোপনে অভাবগ্রস্তকে দান করা আল্লাহর কাছে আরও বেশি প্রিয়।
লোক দেখানোর জন্য দান করলে সেই দান নষ্ট হয়ে যায়।
এই কথাগুলো আমিনের হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দিল।
সে নিজের ভুল চিন্তার জন্য তওবা করল এবং মনে মনে বলল—
“আমি এমন ভালো কাজ করব, যা কেউ জানবে না—শুধু আল্লাহ জানবেন।”
সেদিন রাতেই আমিন দেখল, তাদের এক বৃদ্ধ প্রতিবেশী খুব অসুস্থ।
কেউ তার খোঁজ নিচ্ছে না। আমিন চুপিচুপি নিজের জমানো টাকায় ওষুধ কিনল।
রাতের অন্ধকারে বৃদ্ধের বাড়ির দরজার সামনে ওষুধ রেখে দিল এবং দরজার নিচ দিয়ে কিছু টাকা ভেতরে ঢুকিয়ে চলে গেল।
কাউকে কিছু বলল না।
পরদিন সকালে বিষয়টি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই বলাবলি করতে লাগল—
“কে এই কাজটি করেছে?”
আমিন চুপ করে রইল। তার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভূত হচ্ছিল—যা সে আগে কখনো পায়নি।
কয়েকদিন পর আমিন নিজেই বড় বিপদে পড়ল। সামনে তার ফাইনাল পরীক্ষা,
অথচ হঠাৎ সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে গেল। আমিনের বাবা-মা সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ল।
কিন্তু আশ্চর্যভাবে কয়েকদিনের মধ্যেই সে সুস্থ হতে লাগল।
আল্লাহর রহমতে আমিন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে পরীক্ষাতেও ভালো ফল করল।
যে বৃদ্ধ মানুষটিকে সে গোপনে সাহায্য করেছিল, সেই বৃদ্ধ নিয়মিত দোয়া করতেন—
“হে আল্লাহ, যে অজানা বান্দা আমাকে সাহায্য করেছিল, তুমি তাকেও সাহায্য করো, সুস্থ রাখো, ভালো রাখো।”
আল্লাহ সেই অসহায় বৃদ্ধের দোয়া কবুল করেছিলেন।
আমিন বুঝতে পারল—
মানুষ না দেখলেও আল্লাহ প্রতিটি ভালো কাজ দেখেন।
কোনো সৎকাজই তাঁর কাছে নীরব থাকে না।
যে মানুষকে সাহায্য করে, আল্লাহ নিজেই তার সাহায্যকারী হয়ে যান।
শিক্ষা
- ইখলাস—শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করাই সবচেয়ে বড় আমল
- গোপনে করা ভালো কাজ আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়
- আল্লাহর সাহায্য আসে এমন পথে, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না
- যে মানুষকে সাহায্য করে, আল্লাহও তাকে সাহায্য করেন।