প্রেমের আদর
হুমায়ূন কবীর
আদূরীর বাপ রাজু মাস্টার এই ষড়যন্ত্রের মূল।অথচ আদূরী নাকি তাকে ভালোবাসে। ভালোবাসার এই নমুনা? আদূরী কিছু জানে না?
শত প্রশ্ন এখন অনিকের মনে।
তাকে অজস্র লোকের সামনে চোর সাজিয়ে স্কুলমাঠে বসিয়ে রাখা হয়েছে।
অনিকের কোন অপরাধ নেই। তবু তার সবচেয়ে দরকারী আঙুল দুটো এরা জোর করে কেটে ফেলবে।
অনিকের আঙুল দুটো এখনো আছে। তর্জনী এবং মধ্যমা। ও দুটো কেটে ফেললে সে পরীক্ষা দেবে কী করে? ৩ মাস পর তার এসএসসি পরীক্ষা। সে তার ক্লাসের ফার্স্ট বয়।
অনিক চোখ ফেরাতে পারছে না।এক আকাশ কষ্ট নিয়ে সে আঙুল দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে।
অনিকের মায়ের নাম, আমেনা।তিনি পাশেই বসে আছেন।
অনিক- মা,তুমি পান খাচ্ছো?আমার একটু দিবা?
মা রেগে বললনে, না। পান খেলে লেখা পড়া হয় না। জিভে ভারি হয়ে যায়।
অনিক একটু হেসে বললো,আঙুল কেটে ফেললে আর পড়ে কী হবে? আমি পরীক্ষাই তো দিতে পারবো না।
কিছুটা দূরে টাক বিজু দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে গাছিদা আর হাতুড়ি।সে আদূরীর বাপের পোষা কুকুর।
পঞ্চাশোর্ধ জীর্ণশীর্ণ রফি জিজ্ঞেস করলো,কি রে বিজু,এই হাতুড়ি আর গাছিদা দিয়ে কী করবি?
বিজু- কী করবো বুঝতে পারছো না? ঐ গরু চোর অনিকের আঙুল কাটবো।ঐ যে ইট দেখছো? ওর উপর আঙুল রেখে, আঙুলের উপর গাছিদা রেখে হাতুড়ি দিয়ে এক ঘা। বেশ, আঙুল আর নেই। কাজ শেষ। কি ভালো হবে না, বলো?কষ্ট কম হবে।ঠিক না?আমিও তো মানুষ। আমার মনেও দয়া আছে। বেশি কষ্ট দিতে চাই না।
কথাটা বলে সে রফির দিকে তাকিয়ে শান্তির হাসি হাসলো।
রফি বিষন্ন মুখে বললো,ঠিক। কিন্তু জংধরা গাছিদা, এ দা দিয়ে কাটলে টিটেনাস হয়ে যাবে।ছেলেটা মারা যাবে।বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে।কত ভালো ছাত্র। ওর মতো ভালো ছাত্র এই এলাকায় জন্মগ্রহণ আজপর্যন্ত করেনি, আর করবেও না।গাছিদা একটু বালি দিয়ে নে।
বিজু- তাহলে তুমি নিয়ে যাও। বালি দিয়ে ভালোকরে চকচকে করে আনো।
বিজুর নরম কণ্ঠ শুনে রফি সাহস করে বললো,একটা কথা বলবো বিজু ভাই? হাজার হলেও তুমি আমার থেকে ১০ বছরের ছোটো। তবু তোমাকে আমি ভাই ভাই করি।সম্মান করি।
বিজু অধৈর্য হয়ে বললো, অত ঢং করে না।কী বলবি বল।
রফি- বলছি,অনিক তো অপরাধী না।ওর মতো এতো মেধাবী একজন ছাত্র, পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ পড়ে - সে গরু চুরি করতে পারে না।
বিজু - তা আমি কী করবো? ও যে চোর না, তাতো আমিও জানি।
রফি- তাহলে ছেড়ে দাও।
বিজু - ছেড়ে দেয়ার ক্ষমতা আমার আছে? তুমি ছেড়ে দাও।যাও।
রফি অসহায়ের মতো বললো, আমি? আমি ছেড়ে দিলে তো মাতুব্বাররা আমাকে ভিটা ছাড়া করে দেবে।তুমি মাতুব্বারদের সাথে চলাচল করো।এলাকায় সবাই তোমার ভয় পায়।তুমি ইচ্ছে করলে ছেড়ে দিতে পারো।
বিজু- এই রফি, বেশি বকিস নে।দে- দা দে।আমিই বালি দিয়ে আনছি।তোর কাছে দিলে তুই যদি আর না আসিস?
রফি একটু রহস্যের হাসি হেসে বললো, তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছো কেনো ভাই? আমি ধার দিয়ে আনছি। দাও।আমার বাড়ি মোটা শুকনা বালি আছে। শুকনা বালিতে ভালো ধার ওঠে।ভিজে বালিতে হয় না।
বিজু - তাড়াতাড়ি আসবা কিন্তু। রাজু স্যার আসলেই কাজ শুরু করতে হবে।শুধু তো আঙুল কাটা না। আরও সাতজন আছে। ওদের চোখ তুলতে হবে।তাড়াতাড়ি আসবা রফি ভাই।