Post

নীরব নাগরিক, বিপন্ন রাষ্ট্র

December 24, 2025

Original Author অধ্যক্ষ এমএ আউয়াল

282
View

রাজনীতির থেকে দূরে থাকা নাকি দেশ থেকে দূরে থাকা—এই প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে একটি ব্যক্তিগত অবস্থানের মতো মনে হলেও, গভীরে গেলে এটি নাগরিক সত্তা, দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার এক গভীর সংকটকে সামনে আনে। আজকের সমাজে ‘আমি রাজনীতি করি না’—এই বাক্যটি যেন এক ধরনের গর্বের উচ্চারণ হয়ে উঠেছে। অনেকে মনে করেন, রাজনীতি মানেই কাদা, দুর্নীতি, হিংসা ও প্রতারণা; তাই সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখাই নাকি সবচেয়ে নিরাপদ ও সম্মানজনক পথ। কিন্তু সত্যিই কি রাজনীতির থেকে দূরে থাকা মানে কেবল রাজনীতির বাইরেই থাকা? নাকি অজান্তেই দেশ থেকেই দূরে সরে যাওয়া?
রাজনীতি কোনো বিচ্ছিন্ন, আলাদা জগত নয়। এটি কেবল দল, মিছিল, নির্বাচন বা ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতি আসলে রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে জড়িত এক অনিবার্য বাস্তবতা। একজন মানুষের শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, বাকস্বাধীনতা—সবকিছুই কোনো না কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। ফলে রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মানে এসব সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় নিজের উপস্থিতি ও মতামতকে স্বেচ্ছায় অদৃশ্য করে দেওয়া।
অনেকে বলেন, ‘আমি রাজনীতি বুঝি না’, ‘আমি সাধারণ মানুষ’, ‘আমার দ্বারা কিছু হবে না’। এই আত্মপ্রবঞ্চনামূলক যুক্তিগুলো আসলে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা গোষ্ঠীগুলোকেই সুবিধা দেয়। কারণ যখন সচেতন নাগরিকেরা রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ায়, তখন সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় স্বার্থান্বেষী, অদক্ষ কিংবা নৈতিকতাবিবর্জিত শক্তি। রাজনীতি তখন আর জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং জনগণের ওপর আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই অবস্থায় যারা রাজনীতি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, তারা হয়তো সরাসরি কোনো অন্যায় করছে না, কিন্তু অন্যায়ের পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে—নীরবতার মাধ্যমে।
দেশ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; দেশ মানে মানুষ, মানুষের অধিকার, মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। দেশকে ভালোবাসা মানে কেবল জাতীয় সংগীত গাওয়া বা পতাকা উড়ানো নয়; দেশকে ভালোবাসা মানে তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করা। আর এই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ক্ষেত্রই হলো রাজনীতি। আপনি যদি বলেন, ‘আমি রাজনীতির বাইরে’, তাহলে প্রশ্ন আসে—দেশের শিক্ষা নীতি, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, পরিবেশ, সংখ্যালঘু অধিকার—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত কে নেবে? যদি আপনি সেখানে না থাকেন, আপনার অনুপস্থিতিতে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে, সেগুলোর দায় থেকেও কি আপনি মুক্ত থাকতে পারবেন?
রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি হওয়ার পেছনে বাস্তব কারণ অবশ্যই আছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতা, আদর্শহীনতা—এসব রাজনীতিকে কলুষিত করেছে। কিন্তু এই কলুষতার সমাধান রাজনীতি বর্জন নয়; বরং রাজনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। ইতিহাস বলে, যখনই সচেতন মানুষ রাজনীতি থেকে সরে গেছে, তখনই অন্ধকার শক্তি আরও বেপরোয়া হয়েছে। বিপরীতে, যখন সাধারণ মানুষ রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে—ভোটের মাধ্যমে, প্রতিবাদের মাধ্যমে, মত প্রকাশের মাধ্যমে—তখনই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।
রাজনীতির থেকে দূরে থাকা অনেক সময় এক ধরনের সুবিধাবাদী অবস্থানও। এতে ব্যক্তিগত স্বার্থ আপাতত সুরক্ষিত থাকে, ঝামেলা কমে, কোনো পক্ষ নিতে হয় না। কিন্তু এই নিরপেক্ষতা আসলে নিরপেক্ষ থাকে না। অন্যায় ও ন্যায়ের সংঘাতে চুপ থাকা মানে কার্যত অন্যায়ের পক্ষেই দাঁড়ানো। যখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কোনো গোষ্ঠী বঞ্চিত হয়, যখন মতপ্রকাশ দমন হয়, যখন দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়—তখন ‘আমি রাজনীতি করি না’ বলা এক ধরনের দায় এড়ানোর কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।
দেশ থেকে দূরে থাকা মানে কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব নয়; মানসিক ও নৈতিক বিচ্ছিন্নতাও দেশত্যাগেরই আরেক রূপ। আপনি দেশে থেকেও যদি দেশের সমস্যার প্রতি উদাসীন থাকেন, দেশের সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ না করেন, তাহলে বাস্তবে আপনি দেশ থেকে দূরেই অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, কেউ বিদেশে থেকেও দেশের রাজনীতি, সমাজ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে পারেন, মতামত দিতে পারেন, দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই প্রশ্নটি আসলে অবস্থানের নয়, অংশগ্রহণের।
রাজনীতি থেকে দূরে থাকার প্রবণতা নতুন প্রজন্মের মধ্যেও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তারা রাজনীতিকে ‘নোংরা খেলা’ বলে এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু এই প্রজন্মই যদি রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার দায়িত্ব না নেয়, তাহলে কারা নেবে? রাজনীতি শূন্যতায় থাকে না; আপনি সরে গেলে সেখানে অন্য কেউ প্রবেশ করবে—হয়তো এমন কেউ, যার কাছে নৈতিকতা, মানবিকতা বা জবাবদিহির কোনো মূল্য নেই। তখন রাজনীতির কদর্যতার দায়ও আংশিকভাবে বর্তাবে সেইসব মানুষের ওপর, যারা সচেতন হয়েও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
রাজনীতি মানেই যে দলীয় রাজনীতি করতে হবে, এমন নয়। রাজনীতিতে থাকা মানে সচেতন নাগরিক হওয়া—প্রশ্ন করা, তথ্য জানা, ভোট দেওয়া, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। এই ন্যূনতম অংশগ্রহণটুকুও যদি আমরা না করি, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর আমাদের কোনো নৈতিক দাবি থাকে না। তখন আমরা কেবল সুবিধাভোগী বা ভুক্তভোগী—নাগরিক নই।
অতএব, রাজনীতির থেকে দূরে থাকা আর দেশ থেকে দূরে থাকা—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম। বাস্তবে অনেক সময় তা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। দেশকে ভালোবাসলে রাজনীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজনীতি খারাপ বলেই তাকে ভালো মানুষের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। দায়িত্বশীল, বিবেকবান মানুষের অনুপস্থিতিতেই রাজনীতি কলুষিত হয়।

অতএব, রাজনীতির থেকে দূরে থাকা আর দেশ থেকে দূরে থাকা—এই দুটির মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে। একসময় তা আলাদা করে চেনাই কঠিন হয়ে যায়। কারণ দেশ কেবল ভৌগোলিক সীমানা নয়; দেশ হলো সিদ্ধান্ত, দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্বের সম্মিলিত নাম। রাজনীতিকে এড়িয়ে চলা শেষ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব থেকেই সরে যাওয়ার নামান্তর। আর যে সমাজে অধিকাংশ মানুষ দায়িত্ব এড়িয়ে চলে, সেখানে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে অল্প কয়েকজনের ইচ্ছা আর স্বার্থের ছাঁচে। সেই ভবিষ্যৎ তখন আর সবার হয় না—কেবল ক্ষমতাবানদের হয়ে ওঠে।

Comments

    Please login to post comment. Login