Posts

চিন্তা

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: আমরা কি সত্যিই জানি যা আমরা জানি?

December 25, 2025

ফারদিন ফেরদৌস

57
View

বাংলাদেশে ফেরার সময় বাংলাদেশ বিমান যখন সিলেটের আকাশ স্পর্শ করে সেসময় বিমানের জানালায় চোখ রেখে নিজের সোশ্যাল হ্যান্ডেলে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তারেক রহমান, 'দীর্ঘ ৬ হাজার ৩ শ ১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে।' সেসময় তাঁর লেফ্ট ডেস্কে একটি বই দেখা গেছে, “In the Light of What We Know!" ব্রিটিশ নভেলিস্ট জিয়া হায়দার রহমানের লেখা ২০১৪ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসটি পরের বছর ব্রিটেনের সবচেয়ে প্রাচীন সাহিত্য পুরস্কার 'জেমস টেইট ব্ল্যাক মেমোরিয়াল প্রাইজ' অর্জন করে। এই বইটি একটি শুদ্ধ মানবিক ও দার্শনিক উপন্যাস -যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মনস্তত্ত্ব, জ্ঞান, যুদ্ধ, আর্থিক সংকট ও ঐতিহাসিক ঘটনা মিলিত হয়ে একটি গভীর প্রশ্ন তোলে: আমরা কি সত্যিই আমাদের জীবন ও জ্ঞান সম্পর্কে যতটুকু মনে করি, ততটুকুই জানি?

ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রেম, শ্রেণীচেতনা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ আছে এই উপন্যাসে। প্রধান চরিত্রদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বহুসাংস্কৃতিক আনন্দ ও কষ্ট, উৎখাত জীবন, অভিবাসন ও স্বদেশবোধের মত বিষয় উঠে আসে।

এর কাহিনি শুধু লন্ডনে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নিউইয়র্ক, ইসলামাবাদ, কাবুল, অক্সফোর্ড, প্রিন্সটনসহ বিভিন্ন শহর ও দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে, যা ২১-শতকের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।

১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনে তারেক রহমান কি জীবনদর্শন বদলে নিয়েছেন? তিনি তৃতীয় বিশ্বের একটি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ টালমাটাল দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে প্রস্তুতি নিয়েছেন? তিনি কি জানেন বাংলাদেশে তার নতুন জীবনের প্রথম সেকেন্ড থেকেই Far Right তথা চরম ডানপন্থার সাথে টক্কর দিতে হবে? নিশ্চয়ই তিনি জানেন। তাই যুদ্ধের ময়দানে নেমে এখন আর এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের সময় নেই যে, সত্যি কি আমরা জানি, আসলে আমরা যা জানি?

রাজধানীর তিনশ ফিটের জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে আয়োজিত গণসংবর্ধনায় দেয়া তারেক রহমানের ভাষণে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলেছেন, যেকোনো মূল্যে দেশের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে, বিশৃঙ্খলা পরিত্যাগ করতে হবে এবং সবখানে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, এই দেশে একইভাবে সমতলের মানুষ আছে, এই দেশে মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা চাই সকলে মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, আমরা যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, একজন মা দেখেন, অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। তিনি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী এবং শিশু ও প্রতিবন্ধীদের অধিকারের পক্ষে তাঁর কন্ঠ উচ্চকিত করেছেন।

বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ৭১ এ দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল ২০২৪ সালে তেমন সর্বস্তরের মানুষ, সবাই মিলে এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল। আজ বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়। তারা তাদের গণতন্ত্রের অধিকার ফিরে পেতে চায়।

মার্টিন লুথার কিং–এর ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ উক্তির উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান।’ দেশকে গড়ে তুলতে পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রত্যেক মানুষের সহযোগিতা তাঁর প্রয়োজন। তাহলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলেন তিনি।

তরুণ প্রজন্মই আগামীতে দেশ গড়ে তুলবে বলেন তিনি। গণতান্ত্রিক, শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দেশকে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। তিনি পরপর তিনবার বলেন, 'আমরা দেশের শান্তি চাই।'

পরিকল্পনা, গণতন্ত্র ও শান্তি; এই তিনটি বিষয়কে একসুত্রে গেঁথে তিনি উপস্থাপন করেছেন। অনেকেই বলছেন, রাজনৈতিক নেতার পরিকল্পনার চেয়ে ভিশন থাকা আগে জরুরি। আমরা বলব না, পবিত্র ভিশনের জন্য শুদ্ধ পরিকল্পনা থাকাটা আগে জরুরি। নেতৃত্বের গুণাবলীতে poor planning বা absence of planning এর কোনোই জায়গা নেই।

অনেকে ভেবেছিলেন ১৭ বছর পর দেশে ফিরে সমর্থক ও দেশবাসীর সামনে কেঁদেকেটে আকুল হবেন তারেক রহমান। সেটি একদমই হয়নি। কেঁদে নিজের প্রতি সিমপ্যাথি জাগানো আত্মপ্রত্যয়ী নেতার কাজ নয়। বরং কাজ করে দেখানোর দৃঢ় প্রত্যয় ও অঙ্গীকার তারেক রহমানের বক্তব্যকে পোক্ত করেছে।

তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে একবারের জন্যও আ.লীগ কিংবা শেখ হাসিনা শব্দবন্ধ ব্যবহার করেননি। আমরা তারেক রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণগুলোতে শব্দচয়নে পরিমিতিবোধের তারিফ করি। তেমন আরেকটি নজির আজকেও দেখালেন তারেক রহমান। আপনি যদি কাউকে ইগনোর করতে চান, তার নিন্দা বা বিষোদগারে নয়, স্রেফ তাকে বা তাদেরকে মুখের বয়ান থেকে ছুঁড়ে ফেলবেন -প্রতিপক্ষের জন্য এরচেয়ে বড় শাস্তি আর কিছুতেই হয় না।

তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে সৃষ্টিকর্তার প্রশস্তির পরপরই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের পুণ্যস্মৃতিকে স্মরণ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশি জাতিরাষ্ট্রের ভিত হলো 'Spirit of the Liberation War.'

আমরা যারা রাজনীতি সচেতন, যারা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখি, যারা মুক্তচিন্তা সমুন্নত রাখাকে গণতন্ত্রের দায় ও দায়িত্ব মনে করি এবং দেশের শাসনভার শুদ্ধ রাজনীতিকদের হাতে থাকাটাকেই নৈতিকভাবে শ্রেয় মনে করি -তারা সবাই মিলে পরিবার ও স্বজনসহ তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসাকে স্বাগত জানাই। তাঁর ফিরে আসার পথে বাধাগুলো যারা দূর করেছেন তাদেরকেও অভিনন্দন জানাই। দেশের রাজনীতির মাঠ শূন্য থাকলে সুযোগ নেয় অপশক্তি। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিকে পূর্ণ করুক।

পাদটীকা: গণসংবর্ধনার মঞ্চে রাখা বিশেষ চেয়ার সরিয়ে সাধারণ চেয়ারে বসেছেন তারেক রহমান। নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে চিনিয়েছেন। এই সিম্বলিক অ্যাটিচ্যুডটাই গণমানুষের সাথে তাদের নেতাকে কানেক্টেড রাখতে সামনের দিনগুলোয় ভীষণভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাবে।

লেখক: সাংবাদিক 
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫

Comments

    Please login to post comment. Login