
ক্লাস প্রজেক্টে আমার একটা ঝালাইকরা টানেলের দরকার ছিল। Savonious Rotor ধরনের উইন্ডমিল বানাবার চিন্তা করছি, টানেলের ভেতর বাতাস আটকে সেটার চাপ বাড়াবার নোয়াখাইল্লা বুদ্ধি আর কি।
ইতিউতি খুজে গেলাম ধোলাইখাল। মানুষজন যার সন্ধান দিলো, তাকে দেখলে আপনার মনে হতেই পারে আরেহ - এ তো দেখি সাক্ষাৎ ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজি ; যিনি সোজা দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে নাকি মাটি ছুঁতে পারতেন !
৫ ফুট ছুঁইছুঁই এক মানুষ, মুখ ভর্তি দাগ। গা ভর্তি কালো কালির আস্তরণ। আকাশের আশ্চর্য সাদা মেঘদল, পেজা তুলার মত তার মাথা ঢেকে রাখতো। অনাদরে, ধূসর রঙয়ে। ভদ্রলোকের স্বচ্ছ দীঘির মত টলটলা চোখ, তা থেকে চোখ ফেরানো দায়। কি অদ্ভুতভাবে সে জোড়া চোখ যেন ‘আয় আয়’ করে কাছে ডাকে। গা শিরিশিরে সেই আজব সম্মোহন এড়ানো যায় না। আমার কেন জানি মনে হত, সে দীঘির জলে আমার অন্য আমিকে দেখতে পেতাম …
ভদ্রলোকের নাম এনায়েত। লোকে ডাকতো পাগলা এনায়েত। রাত হলে তিনি খুব পুরাতন, জাহাজের টেলিস্কোপে চোখ রেখে হারিয়ে যেতেন অন্য কোন ভূবনে। আর আজব আজব ভাবের কথা বলতেন – লোকে তাই নাম দিয়েছিল পাগলা।
যা চেয়েছি তার চেয়েও যখন ১০০ গুন বেশি কাজ বুঝিয়ে দিলেন, মুখে হাসি ঝুলিয়ে নিজ থেকে আমাকে বলেছিলেন, ‘বাজান, আমার কাজে আমি বিশ্বসেরা !’ তার এই কথা শেষ হওয়া মাত্রই, সে সন্ধ্যায় জাদুর মত ধোলাইখালের সেই অস্থির চিপাগলি মুহুর্তেই কিভাবে যেন চুপসে গেল। মাগরিবের আজানের সাথে কই থেকে যেন একদল সাদা কবুতর মাথার উপর খেলা শুরু করলো । সাথে গা হিম করা এক পশলা লিলুয়া বাতাস। মারা যাবার আগে, আমি খোদার কাছে এই মুহুর্তে আরেকবার ফিরতে চাইবো।
পাগলা এনায়েত, আমাকে এই পৃথিবী অন্যভাবে দেখতে শিখিয়েছেন। তার সাথে পরিচয়ের আগে, ইন্না ইল্লাহ বলতে কিছুটা ভয় পেতাম। পাগলায় আমাকে শেখালো, রাতের অজস্র তারার ভিড়ে নিজেকে যেন সপে দেই সৃষ্টিকর্তার ডেরায়। খোলা আকাশের নিচের এই যাযাবর জীবনে, তারাদের যেন চিনতে শিখি। ঐটাই দুনিয়া। আমরা উপর থেকে আসছি, উপরেই তো ফিরে যাবো – আরবির বাংলা অর্থ তো এটাই তাই না?
ধোলাইখালের অশিক্ষিত পাগলা কি করে Carl Segan কে জানতো – ‘ we are all from stardust ’ ?
যেদিন বলল, ‘বাজান, জমিনে নরম পায়ে হাইটেন’ – তারপর আর কোনদিন তাকে খুজে পাইনি। সে স্বচ্ছ টলটলা চোখ আর কোনদিন দেখলাম না।
একটা বড় সময়, প্রথমআলো'ই ছিল আমার কাছে এই দুনিয়া দেখার খোলা জানালা। ২০০৪ এর এক শুক্রবারে, তারা মাথাভর্তি সাদা চুলের এক ভদ্রলোককে নিয়ে আর্টিকেল লিখলো। চশমায় আটা, বুদ্ধিমান চোখের, গালে হাত দেয়া বৈশিষ্ট্যহীন চেহারা। লম্বা লিকলিকে শরীর। পাশে MQ-8’র মত কিছু একটার ছবি। ভদ্রলোক কল্পনা চাওলা নামের এক মার্কিন-ভারতীয় এস্ট্রোনাটের বন্ধু - পৃথিবীতে ফেরার পথে, রকেটের ত্রুটিতে যিনি কিছুদিন আগেই মহাকাশের নিকষ রহস্যে ভরা তারার জগতে ‘আহারে জীবন’ মিলিয়ে ফেললেন।
এই লোক নাকি বাংলাদেশেরই এক অজপাড়ায় বড় হওয়া মানুষ। ছোটকালে গ্রামের স্কুলে পড়েছেন। বেঞ্চি নাই। ছোট থেকে বড় ক্লাসে প্রমোশান পেলে টুলে বসার সুযোগ পেতেন। স্লেটে-কলাপাতায় অংক কষতেন। বৃষ্টিতে নাকি তার সে স্কুল থইথই পানিতে ভেসে যেত। তার বন্ধুরা ব্যাঙ ধরতে বের হত। কেউ'বা নারিকেল দিয়ে ফুটবল খেলায়। পানিতে ভেসে যাওয়া স্কুলের কারনে বালক বিবমিষায় ভুগতেন। একদিকে খুশি, অন্যদিকে মন খারাপ। পচা পানিতে জন্মানো এই পদ্মকে চিনতে পেরেছিলেন সে স্কুলের এসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার।
আমার এখনো মনে আছে সেই আর্টিকেলের শিরোনাম – ‘মানুষবিহীন হেলিকপ্টারের জনক’। আমার জন্মেরও আগে, ১৯৮৪-৭ সালে ভদ্রলোক নাকি রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে উড়ানো যাবে এমন আস্ত এক সত্যি সত্যি হেলিকপ্টার বানিয়ে বসেছিলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যে ! কি বলে এইসব ? বাংলাদেশে আজকাল ৩০০ টাকায় খেলনা হেলিকপ্টার পাওয়া যায়। ২০০৪ সালে আমি যে জগতে বাস করতাম, আমরা ঘুড়ি ছাড়া আকাশে উড়বে এমন খেলনার কথা কল্পনাও করতে পারিনি।
কেন জানি অনেক বছর আমার মস্তিষ্ক সেই মস্ত বড় বিজ্ঞানীর নাম মনে রেখেছিল ডঃ আনোয়ার হিসেবে ! গুগলে সার্চ দেই, তারে খুজে পাই না। দুনিয়া নিয়ে কিচ্ছু ধারনা না থাকা এক উদ্ভ্রান্ত বালকের কাছে, ভদ্রলোককে নিয়ে লেখা সে আর্টিকেল ছিল জীবনানন্দের কবিতা – ‘ অদ্ভুত এক আধার ধেয়ে আসছে আজ, যারা অন্ধ তারা আজ বেশি দেখে … … ... তবুও আমাদের শহরে একটি বাতিঘর আছে !’
আধপাগলা বালক বুঝেছিল সে কোনপথে হাটতে চায়। ২১ বছর পরে সে আশেপাশের গলিতেই পিএইচডি করে। ২০ বছর পরের একদিনে, বালক তার স্বপ্নপুরুষের সাথে বুক মিলিয়েছিল বাস্তবে। আমার নানী যদি আমার জীবনের মেরুদন্ড হন, তিনি হলেন অন্ধকার আকাশের সবচেয়ে জ্বলজ্বলা তারা – লুব্ধক, যিনি আমাকে পথ বাতলে দিয়েছিলেন।
ফেসবুকের দুইমাত্র ভালো দিক, আমি স্যারকে খুজে পেয়েছি এখানে। আমি যে আকাশে তারা দেখে পথ হাটতে শিখেছি, তার কারন তিনি। আমি যে জানতাম আমি জীবনে কি হতে চাই, তার কারন তিনি। আমি যে বুকভরে আমার সাদা চামড়ার ছাত্রদের বলেছি আমি বাংলাদেশের মানুষ – তার এক কারন Dr Humayun Kabir, The father of Unmanned Aerial Vehicle – UAV.
কি সৌভাগ্য, আমরা দুজন একই ভাষায় রাতের আকাশের গল্প আওড়াই। একই তারাদের দল আমাদের অসীম গুনতে শেখায় …
- রাকীবামানিবাস
১৮ই ফেব্রুয়ারী,২০২৫