সম্পর্ক করার আগে নিজের মস্তিষ্ককে বুঝুন।
নিজেকে না জেনে কোনো সম্পর্কে জড়ানো সেলফ সুইসাইড। প্রতিটি মানুষের ভালোবাসার সার্কিট আলাদা আলাদা। আপনি কোন ক্যাটাগরিতে আছেন, সেটা যদি না জানেন, তাহলে আপনার সম্পর্ক ব্রেকআপ হবেই। মানুষের অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল চার প্রকার- Anxious attachment, Avoidant attachment, Secure Attachment এবং Anxious-Avoidant। আপনার মস্তিষ্কের সার্কিট কোন স্তরে অবস্থান করছে?
আপনি যদি মনে করেন, সে আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে, দূরে গেলে প্যানিক হয়ে যান, রিলেশশিপ নিয়ে বেশি ভাবেন, নিশ্চয়তা না পেলে পেইন ফিল করেন তবে আপনি একজন anxious। এসব মানুষ কানেকশনকে সার্ভাইভাল হিসেবে নেয়, আর রিজেকশনকে নার্ভাস সিস্টেম হাইজ্যাক হিসেবে নেয়। তাদের কাছে ভালোবাসা মানেই সেফটি ।
আপনি যদি কারও খুব কাছে আসলে আনকম্ফোর্টেবল ফিল করেন, ফিলিংস শেয়ার করতে বিরক্তিবোধ করেন, স্বাধীন রিলেশনশিপে বেশি গুরুত্ব দেন, পার্টনার দূরে সরে গেলে শান্তি লাগে, তাহলে আপনি একজন অ্যাভয়ড্যান্ট।
এরা কানেকশনকে স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক মনে করেন, অনুভূতিকে অবদমন করেন আর ডিপেন্ডেন্সিকে দুর্বলতা মনে করেন। আপনি যদি সঙ্গীকে ভালোবাসেন, তার সাথে থাকতে কম্ফোর্ট ফিল করেন, তার কাছ থেকে নিশ্চয়তা পেতে ও নিশ্চয়তা দিতে ভালোবাসেন, তবে আপনি সিকিউর্ড। এ ধরনের মানুষ নৈকট্য ও দূরত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারে। তারা কারও প্রতি ডিপেন্ড করে না আবার তারা পুরোপুরিভাবে ইন্ডিপেন্ডেডও না, তারা সম্পর্ককে ব্যালান্স করতে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে ডেঞ্জারাস ব্রেন সার্কিট কোনটি জানেন? কিছু মানুষ আছে যারা সম্পর্কের পর আপনাকে খুব তীব্রভাবে চায়, একসময় সে আপনার কাছে আসে। ক্লোজ হয়। তারপর তার মধ্যে আইডেন্টিটি হারানোর ভয় কাজ করে। সে ইমোশনালি শাটডাউন করে এবং ক্রিটিক্যাল হয়ে যায়।
আপনি তার আচরণ দেখে দূরে সরে আসেন। যখনই আপনি দূরে সরে যান, তার মধ্যে প্যানিক কাজ করে। আপনাকে হারানোর ভয় তীব্র হয়ে ওঠে। আপনার পেছনে সে অতিরিক্ত পরিমাণ ইনভেস্ট করে, অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে ও ছুটতে থাকে। যখন আপনি তার কাছে ফিরে আসেন, একই লুপ আবার রিপিট হয়। এটাকে বলে “Pull–Push dynamic”মানুষ এই লুপটাকে ভুল করে টক্সিক কেমেস্ট্রি অথবা সত্যিকার ভালোবাসা মনে করে। এই ধরনের মানুষকে বলা হয় “Anxious-Avoidant”।
এদের মধ্যে একইসাথে দুটি পারসোনালিটি কাজ করে। তারা একবার কাছে আসে আবার দূরে সরে যায়। তাদের মধ্যে দুটি বিকল্প সার্ভাইভাল সিস্টেম একসাথে কাজ করে। তাদের মস্তিষ্কের “Anxious system” কানেকশন না পেলেই ভেবে নেয়, আমি হুমকির মুখে আছি। আর তাদের মস্তিষ্কের “Avoidant system” কানেকশন পাওয়ার সাথে সাথেই হারানোর ভয় পায়। এতে করে যাকে তার সবচেয়ে দরকার, তাকেই তার সবচেয়ে ভয় লাগে। তারা সঙ্গীর কাছে আসলে ডোপামিন ও অক্সিটোসিন নিঃস্বরণ হয়, একইসাথে তাদের মস্তিষ্কের এমিগডালা ডেঞ্জার ফিল করে। প্রথমে তারা বুকে টেনে নেয়, তারপর তারা ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। আবার তারা প্যানিক হয়। আবার তারা টান ফিল করে। ইটারনাল লুপ। এটাকে বলে “unresolved attachment trauma oscillation”। তবে এটা তাদের কোনো চারিত্রিক ত্রুটি নয়, এটা nervous system contradiction।
এ ধরনের মানুষের জীবনে কেমেস্ট্রি আছে কিন্তু শান্তি নেই। কারণ কেমেস্ট্রি আসে অনিশ্চয়তা থেকে। এ ধরনের সম্পর্ক উচ্চমাত্রিকভাবে আনপ্রেডিক্টেবল হওয়ায় ডোপামিন স্পাইক বেশি হয়।
যখন ভালোবাসা বা মনোযোগ নিয়মিত না দিয়ে মাঝে মাঝে দেওয়া হয়, তখন মস্তিষ্ক এটাকে সবচেয়ে শক্তিশালী রিওয়ার্ড হিসেবে ধরে নেয়। আচরণ বিজ্ঞানী স্কিনার দেখিয়েছিলেন—র্যান্ডম রিওয়ার্ড সবচেয়ে বেশি আসক্তিকর।
রিলেশনশিপে র্যান্ডম রিওয়ার্ডের মানে হলো: আজ যত্ন → কাল শীতল আচরণ → আবার হঠাৎ ভালোবাসা। এই অনিশ্চয়তা ডোপামিনকে স্পাইক করায়। মস্তিষ্ক ভাবে—“আরেকবার হলে?” এটা প্রেম নয়, এটা “variable-ratio reinforcement loop”। ঠিক জুয়ার মতো।
তাই মানুষ অসম্মান, উপেক্ষা ও যন্ত্রণা সহ্য করেও ছাড়তে পারে না। অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পর্কে আমাদের নার্ভাস সিস্টেম শান্ত হয় না, এটি উচ্চমাত্রিকভাবে সক্রিয় থাকে, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক শরীরে ব্যাপক কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন তৈরি করে, নার্ভাস সিস্টেমের এই উত্তেজনাকে আমরা গভীর আবেগ বলে ভুল ব্যাখ্যা করি।
কিন্তু বায়োলজিক্যাল সত্য হলো, এটা যদি নিরাপদ প্রেম হতো নার্ভাস সিস্টেম উত্তেজিত হতো না, শান্ত থাকতো। শান্তি আসে প্রেডিক্টিবিলিটি, ইমোশনাল সেফটি ও অ্যাভেল্যাবিলিটি থেকে। অনেক মানুষ বিশৃঙ্খলাকে কেমেস্ট্রি ভাবে, কারণ তাদের মস্তিষ্ক শান্তিকে বোরিং মনে করে। high spark, low peace।
আপনি যাকে “ভালোবাসা ছাড়া থাকতে পারছি না” বলছেন, অনেক সময় সেটা প্রেম নয়— সেটা আপনার নার্ভাস সিস্টেমের “Addiction to unpredictability”।
এই প্যাটার্ন কোনো নৈতিক ব্যর্থতা না। এটা টিকে থাকার অভিযোজন। Wrong environment আপনাকে anxious বা avoidant বানাতে পারে। Right environment আবার secure বানাতে পারে।
বিজ্ঞানীরা ৯-১৮ মাস বয়সী শিশুদের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন। তারা দেখতে চেয়েছিলেন, শিশুকে স্ট্রেস দিলে এবং তার কেয়ার গিভার চলে গেলে সে কেমন আচরণ করে, আর ফিরে এলে কীভাবে respond করে? অ্যাংকশাস ব্যাবি মা বেরিয়ে গেলে এক্সট্রিম কষ্ট পায়, মা ফিরে এলে একইসাথে রাগ ও খুশি হয়। একবার কোলে যায় আবার ধাক্কা দেয়। একবার শান্ত হয় আবার কান্না করে। শিশুর nervous system বলে— “তুমি আসো, কিন্তু আমি নিশ্চিত না তুমি থাকবে।” এটা "inconsistent caregiving" থেকে আসে।
এই শিশুরা যখন বড় হয় তারা অন্তরঙ্গতা চায়, নিশ্চয়তা চায়, বিশ্বাস করতে পারে না এবং ভালোবাসা পেয়েও শান্ত হয় না। সিকিউর্ড ব্যাবি মা চলে গেলে কষ্ট পায়, মা ফিরে এলে শান্ত হয় আবার খেলায় মগ্ন থাকে। শিশুটির ব্রেইন জানে, আমি কষ্ট অনুভব করলেও সে ফিরে আসবে।
অ্যাভড্যান্ট ব্যাবি মা চলে গেলে কোনো রিয়্যাক্টই করে না। মা এলে তাকে ইগনোর করে। তারা সবসময় খেলায় মগ্ন থাকে। এদেরকে সাধারণত ভুলক্রমে স্ট্রং ব্যাবি বলা হয় কিন্তু বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। এ শিশুটির হৃদস্পন্দন বেশি, কর্টিসল বেশি, নার্ভাস সিস্টেম হাইপার অ্যাকটিভ।
সে ডিস্ট্রেস বা কষ্ট অনুভব করে কিন্তু সেটা প্রকাশ করে না। কারণ তার ব্রেইন শিখেছে— “কাঁদলে কেউ আসে না, তাই শাটডাউন করাই নিরাপদ।” এ শিশুটির অ্যাডাল্ট ভার্সন অনুভূতি অবদমন করে, অন্তরঙ্গতাকে অস্বস্তিকর মনে করে এবং মানসিক দূরত্ব মেনে চলে। অ্যাভড্যান্ট মানুষ অনুভব করে না এমন না— তারা অনুভব করতে দেয় না।
এটাই সিকিউর বেস। এ শিশুটি যখন বড় হয় তখন ভালোবাসায় শান্তি পায়, দ্বন্ধ হলেই সম্পর্ক ভেঙে যাবে এমন কোনো ভয় কাজ করে না এবং এরা অন্তরঙ্গতাকে দুর্বলতা ভাবে না। সিকিউরড মানুষ প্যানিক দিয়ে ভালোবাসে না, প্রেজেন্স দিয়ে ভালোবাসে।