খাদিজা
সভাকবি
খাদিজা ছিল আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী। পরীক্ষায় প্রথম হওয়া যেন তার জন্মগত অধিকার। সবার খাতায় যখন ভুলের লাল দাগ পড়ে, তার খাতায় পড়ে শিক্ষকের মুগ্ধতার সবুজ টিক চিহ্ন। শান্ত, ভদ্র আর দায়িত্বশীল—বন্ধুদের কাছে সে ছিল ভরসার নাম।
কিন্তু খাদিজার জীবনে একটাই ‘ঝড়’ ছিল, আর তার নাম হানিফ।
হানিফ আর খাদিজার সম্পর্ক ছিল ঠিক টম এন্ড জেরির মতো। দুজন দেখা হলেই শুরু হতো কথা-কাটাকাটি—
“তুমি আবারও ফার্স্ট হয়েছ? নিশ্চয়ই ম্যাজিক জানো!”
“আর তুমি নিশ্চয়ই ম্যাজিক করে ফেলও যাতে ফার্স্ট না হও!”
ক্লাসে হাসির রোল পড়ে যেত। স্যার বিরক্ত হলেও বন্ধুদের কাছে ওদের ঝগরাও ছিল বিনোদন।
তারা একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারতো না, আবার আশ্চর্য ব্যাপার—একজন অনুপস্থিত থাকলে অন্যজন পুরো ক্লাস জুড়ে চুপচাপ হয়ে যেত। টিফিনের সময়ও একসাথে না বসলে যেন খাবার গলায় নামতো না।একদিন ক্লাসে গ্রুপ প্রেজেন্টেশন ছিল। সেদিন প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। খাদিজা প্রস্তুতি নিয়ে এলেও হানিফ আসে নি। ক্লাস শুরু হতেই খাদিজা ব্যাগের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বন্ধু অনিক বলল, “কি ব্যাপার? তোমার টম কোথায়?”
খাদিজা বিরক্ত কণ্ঠে বলল, “জানি না! কোথাও গিয়ে জেরির মতো লুকিয়ে আছে!”
কিন্তু তার চোখে ছিল চিন্তার ছায়া।
কিছুক্ষণ পর হানিফ হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লাসে ঢুকল। হাতে একটা নোটবুক, ভিজে গেছে বৃষ্টিতে। ক্লাসের সবাই অবাক। খাদিজা চোখ বড় করে তাকাল।
“এতো দেরি কেন?”—খাদিজা জিজ্ঞেস করল।
“তোমার জন্য নোট আনতে গিয়েছিলাম… জানি তো তুমি প্রিন্ট ভুলে যাবে!”—হানিফ হেসে বলল।
খাদিজা নোটবুকটা হাতে নিল। পাতাগুলো ভিজে গেলেও লেখা গুলো অক্ষত ছিল, যত্নে মোড়ানো। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি খেলে গেল। ঝগরাটে ছেলেটা তাকে সাহায্য করার জন্য বৃষ্টিতে ভিজে নোট আনতে গেছে—এটা সে কখনো ভাবতেই পারে নি।
সেদিন প্রেজেন্টেশন শেষে শিক্ষক বললেন,
“তোমাদের বোঝাপড়া অসাধারণ। বন্ধুত্ব মানে শুধু মিল নয়, প্রয়োজনে পাশে থাকা।”
খাদিজা আর হানিফ একে অপরের দিকে তাকাল। হাসল, কিন্তু কিছু বলল না। কারণ ওদের ভাষা শব্দে নয়—বোঝাপড়ায়, ঝগরায়, আর নির্ভরতায় লেখা।
তারপর থেকে ঝগরা কমে নি, কিন্তু বদলে গেছে ঝগরার সুর। এখন সেটা আর রাগ নয়, ছিল অধিকার আর বন্ধুত্বের মধুর টান।