সে অনেক দিন আগের কথা, এক গ্রামে থাকতো ফাহিমা নামের একটি মেয়ে। সে ছিল শান্ত আর একটু চাপা স্বভাবের। কথাও বেশি বলত না আর হাসতো ও কম। তার জন্মের পরপরই তার বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজন বুঝতে পারেন, সে দশটা স্বাভাবিক বাচ্চার মতো নয়,একটু আলাদা। তাকে ডাক্তারের কাছে দেখানো হলে ডাক্তার পরীক্ষা করে জানান, তার একটি সমস্যা রয়েছে, যা অপারেশন ছাড়া সমাধান করা সম্ভব নয়।
জন্মের চল্লিশ দিন পরই তার অপারেশন করা হয়। আত্মীয়স্বজন প্রায় সবাই তার বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিল। তার মা সারাক্ষণ তার পাশে বসে কান্নাকাটি করতেন। হাসপাতালে বেশি লোক ঢুকতে দেওয়া হতো না বলে তার বাবা হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন , একটুখানি দেখার জন্য।
এভাবেই কেটে যায় কয়েক মাস। একটু সুস্থ হলে তাকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আবার সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবার তাকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়। ডাক্তার ভালো করে দেখে বলে আগের যে অপারেশনটি করা হয়েছিল, সেটি ভুল ছিল। এত ছোট বাচ্চাকে অপারেশন করানো ঠিক হয়নি। ডাক্তারের মুখে এমন কথা শুনে সবাই ভয়ে পেয়ে যায়। এরপর এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়,শুধু তাকে একটু সুস্থ করার আশায়। যখন তার আড়াই বছর বয়স হয়, তখন আবার তাকে অপারেশন করানো হয়। অপারেশনের পাশাপাশি ওষুধ, ইনজেকশন, স্যালাইন,এমনকি রক্তও দেওয়া হয় তার শরীরে।
এই অপারেশনের পর থেকেই সে সবকিছুতে ভয় পেতো, সবার থেকে দূরে দূরে থাকতো। শরীরে অতিরিক্ত ইনজেকশন দেওয়ার কারণে তার মস্তিষ্ক কম কাজ করত। চোখের পাওয়ার ধীরে কমে যায়। হাত-পা ফুলে যেত। শরীরে বাইরের রক্ত দেওয়ার ফলে চুলকানি, হাত-পায়ে ঘা সহ নানা ছোট ছোট সমস্যাও দেখা দিত।
সে কোনো ফল-মূল খেতো না। তার হাত-পা মিলিয়ে মোট চব্বিশটি আঙুল ছিল। বই পড়া ও লেখালেখি করা তার পছন্দ ছিল।
সে যেদিন থেকে অক্ষর শিখেছে, সেদিন থেকেই কোনো দেয়ালে বা কাগজে লেখার চেষ্টা করত। আর কোনো পত্রিকা বা শপিং ব্যাগের ওপর কোনো লেখা দেখলেই সেটি পড়ার চেষ্টা করত। এসব দেখে তার বাবা তাকে একটি স্কুলে ভর্তি করে দেয়।কিন্তু সে অন্য সব বাচ্চাদের মতো পড়া মনে রাখতে পারত না, স্কুলের কোনো খেলাধুলাও তেমন পারত না। শরীর ভালো থাকত না বলে ঠিকমতো স্কুলেও যেতে পারত না। তাই তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর তার মা তাকে আরেকটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। সেখানেও সে বেশিদিন থাকতে পারেনি। তারপর আরেকটি স্কুল থেকে সে প্রাইমারি পাস করে।
প্রাইমারি পাস করে যখন হাইস্কুলে ভর্তি হয়, তখন সে খুব আনন্দে ছিল। বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা দিত, অনেক হাসি-আনন্দ করত। ভালোই কাটছিল তার দিন। হঠাৎ তার ফলাফল খারাপ হয়, আর বন্ধু-বান্ধব, হাসি-আনন্দ,সবকিছুই তার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। তার কারণে তার বাবা-মাকেও কথা শুনতে হয়। সেও নিজেকে ঘরবন্দি করে নেয়।সে আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে যায়। তারপর তার মা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তার অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন,
“আপনার মেয়ের চোখের পাওয়ার কম, হার্টের অবস্থাও তেমন ভালো না। জন্ম থেকেই জরায়ু ব্লক করা। ছোটবেলায় যে সমস্যাটা ছিল, সেটারও ঠিকভাবে সমাধান করা হয়নি। তবে এখন সেটা নিয়ে তেমন একটা সমস্যা হবে না।”
এসব শুনে তার মা মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল, কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। শুধু অসহায়ের মতো চেয়ে দেখছিল। পরে আস্তে আস্তে সে সবকিছু বুঝতে পারে, বুঝতে পারে,মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে বড় জিনিসটাই তার কাছে নেই। এরপর সে মানসিকভাবে অনেক ভেঙে পড়ে।এরপর তার জীবনে আসে ফারিহা নামের একটি মেয়ে। সে তাকে বুঝাতো, জোর করে হাসাতো, নিজের মতো করে সময় কাটাতো তার সথে।
কিছুদিন পর তার ভাই তাকে আরেকটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। সে মনে মনে ভাবতো, আগে যা হয়েছে সব ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, অনেক পড়াশোনা করবে, সামনে এগিয়ে যাবে। কিন্তু তার রেজাল্ট আবার খারাপ হয়, আর মনের সব ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়।তারপর একটা ছোট ভুলের কারণে একটা ছেলের সথে আলাপ হয় রঙ নম্বরে। ছেলেটি অনেক ভালো ছিল, চেয়েছিলো তার জীবনের সব সমস্যাগুল মেনে নিয়ে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে।
কিন্তু ফাহিমা চায়নি কারো জীবনে বোঝা হয়ে থাকতে, বা কোনো ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে। তাই সে ওই নম্বরটা ব্লক করে দেয়। তার জীবনের সব কষ্ট, শুন্যতা ও সবকিছু থেকে হেরে যওয়ার যন্ত্রনাগুলো ভুলে যাওয়ার জন্য সে নিজেকে প্রচুর ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতো।কারণ সে মনে করতো, নিজেকে ব্যস্ত না রাখলে এইসব ঘারে চেপে বসবে, তার বাচাঁর আশা হারিয়ে যাবে। তাই সে নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য ঘরের বাইরে কাজ করতো, কখনো বই পড়তো, কখনো লেখালিখি করতো, কখনো আবার রেডিও FM শুনে সময় কাটাতো। সবশেষে সে অন্য একটি স্কুলে ভর্তি হলো। কিন্তু সে জানে না পারবে কি না।
সামনে কি হবে, ভাগ্যেই বা কি আছে, তার জীবনের কঠিন দিনগুলো কিভাবে কাটাবে, তা সে জানে না। তার স্বপ্ন ছিল লেখিকা হওয়ার। কেউ তাকে চিনুক বা না চিনুক, জানুক বা না জানুক, তবুও সে কিছুটা লেখালিখি করবে। কিন্তু সে সেটিও ঠিকভাবে করতে পারলো না। কারণ তার লেখা তেমন ভালো নয়, চোখেরও পাওয়ার কম, তাই তার স্বপ্নও সত্যি হলো না।