Posts

উপন্যাস

ভালোবাসার আবদার ৩

December 28, 2025

সামিরা আক্তার ইন্নি

54
View

আমার উপর দিয়ে যাচ্ছে বিরাট ঝড়। সেই ঝড় পাল্টে যেতে বেশি দিন লাগলো না। তনু আপুরা সহ সবাই মেনে নিল। আমার দাদু ভাঙ্গালো বাবার কান আর বাবা মাকে মানিয়ে নিল। আমার দিকটা একবারের জন্যও ভাবলো না। অনু আপুর স্বামী ইকবাল শেখ আমাদের বাসায় যখন বিয়ের ডেট ঠিক করতে আসে তখন আমি এ সম্পর্কে অবগত হয়। আমার মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আমি জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফিরতে শুনতে পাই বিয়ের ডেইট ফিক্সড হয়ে গেছে। সবার সব পাল্টে গেল। ব্যবহার,সম্পর্ক সব বদলে গেল। আমার ফুফাতো বোন নাকি আমার শাশুড়ি। ছিহ.! নোহান আমার সাথে অনেকবার দেখা করতে চাইলেও আমি দেখা করলাম না। কল রিসিভ করিনি। আমাকে কলে না পেয়ে বেশ কিছু মেসেজ দেয়। মেসেজ নয় ছবি! তার গালে কালো ছাপ পড়ে আছে, গলায় আঙ্গুলের ছাপ আরো বিভিন্ন রকমের ছবি। দেখেই বুঝলাম এগুলো ইকবাল ভাইয়ের কাজ। আমাকে ভালোবাসার শাস্তি! হয়তো শাস্তি দিতে দিতে এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে মেনে নিয়েছে সব। আমি তো মানবো না!

 আমার গায়ে হলুদ হয় খুব সিম্পলি। গায়ে হলুদের রাতে আমি একা বসে আছি জানালার পাশে। হঠাৎ দরজা কড়া নাড়তে ঘুরে দেখি তোহান এসেছে । তোহান ভিতরে এসে গলা খাকড়ি দিয়ে ভনিতা ছাড়াই আমাকে জিজ্ঞেস করে।

~ খালাম্মা, তুমি কি এ বিয়ে করতে চাও?

 তার মুখে খালাম্মা শুনে একটু আশ্বাস পেয়ে ঠোট ভেঙ্গে কেঁদে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বলি। ছেলেটার চোখে আমি আমার জন্য মায়া খুঁজে পেলাম। সে উপর-নিচ মাথা নেড়ে ঝাকরা চুলগুলো পিছনে ঠেলে দিয়ে কথা পাল্টে খাটে বিছিয়ে রাখা গহনার থেকে ইশারা করে বলে :

~ এগুলো সোনার?

 আমি এবারও মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' জানালাম।

~ তবে তোমার পালিয়ে যেতে সমস্যা হবে না। এগুলো বিক্রি করে চলে যাবে কিছুদিন তারপর যখন সব ঠান্ডা হয়ে যাবে তখন না হয় বাড়ির মেয়ে বাড়ি ফিরে আসবে!

তোহানের কথায় আমি চমকানো দৃষ্টিতে তাকাই। ছেলেটার মুখ গম্ভীর। তারমানে সে মজা করছে না। আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে  তোহান মুচকি হেসে আমার পাশে চেয়ার টেনে বসে বলে :

~ এভাবে তাকাচ্ছ যে বড়! পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করোনি? নাকি বোকার মত এখানেই দম বন্ধ হয়ে মরতে চাইছিলে? তোমাকে ছোট থেকে এই মুখে খালাম্মা ডেকে এসেছি, তবে কি করে এই মুখেই ভাবি বলে ডাকবো? সেটা কখনো হয় বলো?

 তোহান আমার পালিয়ে যাওয়া সব ব্যবস্থা করে। যখন ওরা বিয়ের জন্য আসবে তখন যেন সুযোগ বুঝে পালিয়ে যায়। সকাল থেকে সবার সাথেই ভালো ব্যবহার করলাম। অনেকদিন পর হাসলাম! বিয়ের জন্য আমাকে বেনারসি দিয়ে সাজানো হয়েছে। সোনার গহনা! যখন সবাই রুহানদের কাছে চলে গেছে তখন মিনু আপু আমার সাথে থাকে। মিনু আপুর জন্য আমি পালানোর সুযোগই পাচ্ছি না। আবার ওই দিকে নাকি কাজি চলে এসেছে। তখনই তোহান এসে মিনু আপুর কে বলে:

~ খালাম্মা তুমি এখানে বসে আছো কেন? ও তো কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে না! তুমি বরং যাও। খালুজান তোমাকে হয়তো খুঁজছে!

 বলেই দুষ্টু হাসি দেয়। মিনু আপু হেসে তোহানের বাহুতে চাপড় দিয়ে চলে যায়। আপু যেন এরই অপেক্ষায় ছিল! সবাই নোহানের সাথে। কেউ যারা এসেছে তারা আগে খাবার খাচ্ছে। কাজী ও বাবার চেনা তাই তিনি খেয়ে তারপর নাকি বিয়ে পড়াবেন। এই সুযোগটাই নিলাম আমি আর তোহান। বাড়ির পিছনের রাস্তা দিয়ে বের করে দিল সাথে হাতে কিছু টাকা দিল। এটা আমার সুবিধাই হল! একটা সিমকার্ড দিয়ে বললাম :

~ সুযোগ বুঝে কল দেব। এটা মোবাইলে ঢুকিয়ে নিও! দেরি না করে যাও খালাম্মা। কেউ দেখে ফেললে বিপদ। আর আই মিস মাই বেস্ট ফ্রেন্ড খালাম্মা!

~ আই মিস ইউ টু মাই ভাগিনা ফ্রেন্ড ফর এভার!

 বলে বিদায় জানিয়ে দৌড়াতে লাগলাম আর একবারও পিছনে ফিরে তাকালাম না। দৌড়াতে লাগলাম আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। সন্ধ্যা নেমে গেছে সেই কখন তবুও আমি ভয়ে দৌড়াচ্ছি। গ্রাম এলাকায় হালকা রাতে রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে যায়। তো খুব দূর থেকে মাইকের আওয়াজ আসছে। কোথাও মেলা হচ্ছে! হঠাৎ পায়ে শাড়ি কুচি বেঁধে ধপ করে পড়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারি আমি এখানে আমার সাথে অন্য কাউকে নিয়ে পড়ছে। আমি তার বুকের উপর পড়ে আছি। বুক থেকে মুখ তুলে চেহারা দেখার চেষ্টা করলাম। তেমন দেখা যাচ্ছে না কিন্তু এইটুকু বুঝলাম একজন পুরুষ আর আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। উনার হাতের ফোনের ফ্ল্যাশ আমার দিকে তাক করল। আমরা কিছু বুঝতে পারার আগে কোথা থেকে প্রায় ১০-১২ জন গ্রামবাসী এলো। আমাদের সামনে আসতে কিছু লোক ছি ছি করছে। আমরা জলদি উঠে দাঁড়াতেই আমাদের মুখে টর্চ লাইট টিপে একজন বয়স্ক লোক বলে :

~ এসব কি হইতাছে আমগো গ্রামে? আপনারা কারা? আগে তো এই গ্রামে দেখিনি? আর দেখে তো মনে হচ্ছে মেয়েটা বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছে। এখানে কি করছিলেন?

 লোকটির তীক্ষ্ণ কথা শেষ হতে না হতে আরেকজন বলে :

~ বুঝেন না চেয়ারম্যান সাব, রঙ্গলীলা করছিল। আমরা চলে আসায় বড় অসুবিধা হইছে। তাইনা?

 লোকটা বলেই বিচ্ছিরি হাসি দেয়। নোংরা ইঙ্গিতের শরীরে রি রি করে উঠে। আমার পাশের লোকটা রাগে গর্জে ওঠে।

~ যাস্ট শাট আপ! আমি এই মিস কে চিনি না। এসব কি আবোল তাবোল বকছেন?

~ আমিও ওনাকে চিনি না। দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গিয়েছি..

 বয়স্ক লোকটার গ্রামের চেয়ারম্যান বুঝতে পারলাম। চেয়ারম্যান তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলে :

~ ওহ! তারমানে তুমি একা পালাচ্ছিলে আর আমরা যা দেখলাম সব মিথ্যে! আমাদের বোকা পেয়েছ? আমাদের গ্রামে এসে বদনাম রটানোর চেষ্টা করছিলে। জবা মেয়েটাকে ধর গিয়ে। আর কুদ্দুস তুই ধর ব্যাটাকে!

 দুজন মহিলা এসে আমাকে ধরে আর দুজন লোক ওনাকে। তারপর অনেক কান্ড করে শেষে আমাদের দুই অচেনা মানুষকে এক করে দেয় এই গ্রামের মানুষেরা। বিয়ে হলো যে লোকটার নাম পর্যন্ত জানতে পারেনি! তারপর চেয়ারম্যান সাহেব রাতটা এই গ্রামে উনার বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দিলেন। আমার অচেনার স্বামী রেগে বলে :

~ নো থ্যাংকস! গুরু মেরে জুতা দান করতে হবে না। এই গ্রামে কয়েক ঘন্টা থেকেই বিয়ে হয়ে গেছে আর রাত থাকলে যে আরো কত নাটক হবে কে জানে!

 তারপর আমার হাত ধরে বেরিয়ে আসে চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে।

Comments

    Please login to post comment. Login