ভূমিকা
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের একটি অন্যতম সমৃদ্ধ ও বৃহৎ উপজেলা হলো নাগেশ্বরী। ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদের অববাহিকায় অবস্থিত এই জনপদটি তার দীর্ঘ ইতিহাস, কৃষি ঐতিহ্য এবং বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির জন্য সুপরিচিত।
ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিচিতি
নাগেশ্বরী উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর উত্তরে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, দক্ষিণে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা, পূর্বে উলিপুর উপজেলা ও ভারতের আসাম রাজ্য এবং পশ্চিমে ফুলবাড়ী উপজেলা অবস্থিত। এই উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে দুধকুমার, গঙ্গাধর, সংঙ্কোশ এবং ব্রহ্মপুত্র নদ-নদী।
নামকরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
নাগেশ্বরী নামের উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও মূলত দুটি মতবাদ সবচেয়ে বেশি প্রচলিত:
- প্রাকৃতিক উৎস: এক সময় এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে 'নাগেশ্বর' নামক ফুলের গাছ জন্মানো হতো। এই গাছের আধিক্য ও ফুলের সৌন্দর্যের কারণেই এলাকাটির নাম 'নাগেশ্বরী' হিসেবে পরিচিতি পায়। অধিকাংশ গবেষক এই মতটিকেই সমর্থন করেন।
- রাজবংশীয় ইতিহাস: ধারণা করা হয়, এই অঞ্চলটি প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী সামন্ত রাজা বা 'নাগ' বংশীয় কোনো শাসক থেকে 'নাগেশ্বরী' নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।
প্রশাসনিক ইতিহাস
নাগেশ্বরী অঞ্চলের প্রশাসনিক যাত্রা শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে।
- থানা প্রতিষ্ঠা: ১৭৯৩ সালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে নাগেশ্বরী থানা গঠিত হয়।

- উপজেলা রূপান্তর: ১৯৮৩ সালের ১৫ এপ্রিল নাগেশ্বরীকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় উন্নীত করা হয়।
- পৌরসভা: বর্তমানে এখানে একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে নাগেশ্বরীর অবদান
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নাগেশ্বরী ছিল রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। এই উপজেলার মানুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে নাগেশ্বরী শত্রু মুক্ত হয়। প্রতি বছর এই দিনটিকে স্থানীয়ভাবে 'নাগেশ্বরী মুক্ত দিবস' হিসেবে পালন করা হয়।
কৃষি ও অর্থনীতি
নাগেশ্বরী মূলত একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখানকার উর্বর পলি মাটিতে প্রচুর পরিমাণে ধান, পাট, গম এবং রবি শস্য উৎপাদিত হয়।
- প্রধান ফসল: ধান, পাট, ভুট্টা এবং তামাক।
- নদীভিত্তিক অর্থনীতি: ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদের মাছ এবং নৌ-পথ এখানকার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি
নাগেশ্বরীর মানুষ লোকজ সংস্কৃতিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভাওয়াইয়া গান এখানকার মানুষের প্রাণের সুর। এছাড়া এখানে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান। শিক্ষা প্রসারের জন্য এখানে বেশ কিছু প্রাচীন ও নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে (যেমন: নাগেশ্বরী দয়াময়ী পাইলট একাডেমি)।
দর্শনীয় স্থান
- মাদারগঞ্জ ঘাট: ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের একটি মনোরম জায়গা।

- ভিতরবন্দ জমিদার বাড়ি: প্রাচীন স্থাপত্যের একটি নিদর্শন (যদিও এখন জীর্ণ দশা)।
- নুনখাওয়া ঘাট: ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এটি পরিচিত।
উপসংহার
নাগেশ্বরী উপজেলা তার সোনালী অতীত এবং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। নদী ভাঙন ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও এখানকার মানুষ কঠোর পরিশ্রমী এবং সাহসী। সরকারি ও বেসরকারি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই উপজেলাটি উত্তরবঙ্গের একটি মডেল উপজেলায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।