জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী সমঝোতা হলো এবং এ বিষয়টি কেন্দ্র করে একে একে জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে শীর্ষ নারী নেতৃত্ব পদত্যাগ করছেন, আরো করবেন। ইনফ্যাক্ট বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে ৩০ আসন ভাগাভাগির যে মেলোড্রামা হলো সেটির সাথে একাত্মতা প্রকাশ না করে এনসিপিতে জামায়াতবিরোধী অংশের নেতা হিসেবে পরিচিত মীর আরশাদুল হকের মতো অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। বড় কথা নারীর রাজনৈতিক সম্ভাবনা এবং রাজনীতির মধ্য দিয়ে নারীর ক্ষমতায়নকে গলাটিপে হত্যা করল এনসিপি। এবং এই কাণ্ডটি মানুষের সমানাধিকারের যে নৈতিকতা অনুশীলন নিয়ে আমরা কথা বলি -সম্পূর্ণ এর বিরুদ্ধে গেল। বস্তুত এনসিপি জামায়াতের সাথে রাজনৈতিক জোট করবার পর আর কখনোই আলাদা সত্ত্বা হিসেবে নিজেদেরকে দাঁড় করাতে পারবে এমন সম্ভাবনা প্রায় রহিত হয়ে গেল।
এনসিপির সম্ভাবনা ছিল পরিবারতন্ত্র কিংবা সেনাছাউনির বাইরে এসে তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করবার। কিন্তু সামনের পার্লামেন্টে মাত্র ৩০ জন সদস্যের এমপি হওয়ার খায়েশ দলটির আত্মমর্যাদা এবং স্বয়ম্ভরতা ধূলিসাৎ করে দিল।
সদস্যদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, 'পদত্যাগ কিংবা যোগদান নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এতে দলে কোনো প্রভাব পড়বে না।' তবে আমরা বলব যারা তাদের নিবেদিতপ্রাণ সদস্যদের দলে ধরে রাখতে পারে না, তাদেরকে তরুণ প্রজন্ম আগের মতো নিরঙ্কুশভাবে আর বিশ্বাস করবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতায় আপত্তি জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য।
ওই চিঠিতে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ তুলেছেন তারা। 'বিভাজনমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অন্যান্য দলের ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তি ও স্যাবোটেজ, এনসিপির ওপর বিভিন্ন অপকর্মের দায় চাপানোর অপচেষ্টা'র কথা বলা হয়েছে ওই চিঠিতে।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট কিংবা আসন সমঝোতা নিয়ে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তিনি বলেছেন, এটা করলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে। জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা নিয়ে এনসিপির মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব এবং পদত্যাগের ঘটনা ঘটছে, তখন আজ রোববার সকালে নিজের সোশ্যাল হ্যান্ডেলে এক পোস্টে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন সামান্তা।
সামান্তা শারমিন লিখেছেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সমস্যা তুলে ধরা মানেই বিএনপির পক্ষে অবস্থান বোঝায় না। বরং বিভিন্ন বিষয়ে এত দিন ধরে প্রকাশিত ও নানা মহলে প্রশংসিত এনসিপির অবস্থান আমি সঠিক মনে করি ও নিজেকে এই আদর্শের সৈনিক মনে করি। বিএনপি-জামায়াতের যে কোনোটির সঙ্গে জোট এনসিপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পলিসি থেকে সরে গিয়ে তৈরি হচ্ছে।’
আজ বিকেলে এনসিপি ও জামায়াতের যূথবদ্ধ হওয়ার ঘোষণার পর সামন্তা শারমিন লিখেছেন, 'জাতীয় নাগরিক পার্টির কিছু মানুষ কতিপয় আসনের বিনিময়ে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ বিকাল ৫.৩০ এ দলের মূল আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্যুত হলো।'
অপরদিকে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবিন যাকে ঢাকা-১৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল -তাসনিম জারার মতো তিনিও দল থেকে পদত্যাগ করেছেন।
তাজনূভা তাঁর সোশ্যাল হ্যান্ডেলে গতকাল লিখেছেন, আপনারা অনেকে ভাবছেন, হয়তো জামায়াতের সাথে জোটে ঐতিহাসিক কারণ বা নারী বিষয়ের কারণে আমার আপত্তি। এর চেয়েও ভয়ঙ্কর যে কারণ, সেটা হল যে প্রক্রিয়ায় এটা হয়েছে। এটাকে রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনী জোট ইত্যাদি লেভেল দেয়া হচ্ছে। আমি বলব এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে। এটা আদর্শের চেয়েও অনেক বড়, সেটা হল বিশ্বাস। মাত্র কিছুদিন আগে সমারোহে সারাদেশ থেকে মনোনয়ন সংগ্রহের ডাক দিয়ে ১২৫ জনকে মনোনয়ন দিয়ে ৩০ জনের জন্য সীট সমঝোতা করে বাকিদের নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। এই সিদ্ধান্তে সীল মোহর বসানো হয়েছে। বিষয়টা ঠেলতে ঠেলতে একদম শেষ অবধি এনেছে যাতে কেউ স্বতন্ত্র নির্বাচনও করতে না পারে। আগামীকাল মনোনয়ন জমা দেয়ার শেষ তারিখ। আমার অবশ্য এই মুহূর্তে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ইচ্ছা নাই। পুরো আগোছালো করে চোখের পলকে ডিসওউন করে দিয়েছে।
তাজনূভা লিখেন, 'এই লেখার পরে আমার উপর অনেক আক্রমণ আসবে। আমার অনেক ব্যর্থতার ঢালি সাজানো হবে। চরিত্রহননের চেষ্টা হবে। কিন্তু নিজের কাছে নিশ্চিত। আমি এদের সাথে রাজনীতি করতে এসেছিলাম, এদের বিরুদ্ধে না। আমার আজকে মনোনয়ন জমা দেয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করার কথা, আর আমি এখানে বসে এসব লিখছি। জোট নাকি হবে দেড় মাসের, তারপর তারা মধ্যপন্থায় ব্যাক বাউন্স করবে। ট্রু। ব্যাক করে আবার দ্বিচারিতা, ভন্ডামি শুরু করবে। যে জবাবদিহিতার কথা বলে এরা মুখে ফেনা তুলে, সেটা নিজেদের কেউ করলে তাকেই মাইনাস করে।'
তাসনিম জারা বা অন্যরা যেটি মুখ ফুটে বলতে সাহস করেননি সেই কথাগুলো অকপটে বলে দিয়েছেন তাজনূভা। তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্টভাবে ধরে নেয়া যায় জামায়াতের আসন ভাগাভাগির ৩০ জন বাকি সবাইকে চরমভাবে প্রতারিত করেছেন। এমন একটা লেজেগোবরে জায়গায় থেকে আসলে রাজনীতি চলে না। আর অমন কর্মপরিবেশ নারীর জন্য অতি অবশ্যই সহায়কও না।
দেখা যাচ্ছে এনসিপির Far-right extremismকে অনাস্থা দিয়ে প্রগতিশীল ও আধুনিক চিন্তার রাজনীতিকরা দল থেকে একে একে বের হয়ে আসছে। বস্তুত তারা বের হতে বাধ্য। তেল আর জলে কখনোই মেশে না। মেশানো সম্ভবও না। এনসিপি তাদের দলীয় অর্গানোগ্রামে মধ্যপন্থার যে বয়ান দিয়েছিল ওটা কথার কথা। দলটির অনেক নেতাই একসময় ছাত্রলীগ করতেন। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ডিবেট মঞ্চে ঝড় তুলতেন -সেই তারাই এখন Radical right-wing ideologyতে নিজেদের মুক্তির দিশা খুঁজছেন। এমনতর দ্বিচারিতা যারা মন ও মগজে লালন করেন -তাদের আর যাই হোক কোমল মনের তাসনিম জারা-তাজনূভারা মানিয়ে চলতে পারবেন না।
তবে জুলাই গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা এনসিপির কাছ থেকে সবচেয়ে বাজেভাবে প্রতারিত হলো তারা -বহুত্ববাদ, গণতন্ত্র, ধর্মীয় উদারতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রোগ্রেসিভ যারা বিএনপি, আ.লীগের বাইরে তৃতীয় একটি শক্তিকে নিজেদের মন দিয়ে বসেছিল এবং তাদের পক্ষে নিজেদের জানমাল দিয়ে লড়বার অঙ্গীকার করেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপির এমন বাঁকবদল ভবিতব্যই ছিল। জামায়াতের মতাদর্শ থেকে এনসিপির দূরত্ব খুব বেশি নয়। তারপরও যেভাবে দলটি তার নারী সদস্যদেরকে ধোকা দিল এবং বিপুলসংখ্যক অনুসারীদের বিপক্ষে অবস্থান নিল তাতে ভবিষ্যতে এমন রাজনৈতিক দল বা নেতৃবৃন্দকে আস্থা ও বিশ্বাসে রাখতে আমজনতা দুইবার ভাববে।
লেখক: সাংবাদিক
২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
21
View