
'সিনেমা' এই শব্দটিকে অনেকেই অনেক ভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চায়। কারো কাছে সিনেমা মানে শুধুই অভিনয়, কারো কারো কাছে সিনেমার পিছনে পয়সা ব্যয় করার জন্য; আবার কারো কারো কাছে সিনেমা মানেই নিজের পছন্দের অভিনেতাকে সিনেমায় ভালো করে ব্যবহার করা।এর মাঝেও কিছু পরিচালক আছে যারা দেখে না কোন নামীদামী নায়ককে অভিনয় করালে সিনেমা চলবে আবার কোন ভিলেনকে নিলে সিনেমাটা সবার কাছে জনপ্রিয় হবে। কারণ সেসব পরিচালকের কাছে গল্পেই আসল। গল্প অনুযায়ী তিনি সবকিছু সেটআপ করেন।
ঠিক তেমনি ভারতীয় সিনেমার মূলধারা দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক গল্প, গান, নাচ আর গ্ল্যামারের ভেতরে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু সেই সীমারেখা ভেঙে যখন এক নতুন বাস্তবধর্মী ধারার সূচনা ঘটে, তখন তার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন অনুরাগ কাশ্যপ। তাকে বলা হয় “ভারতের এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমার পরিচালক”— শুধু তার চলচ্চিত্র নয়, তার চিন্তাভাবনা, বর্ণনাশৈলী ও চরিত্রচিত্রণই তাকে করে তুলেছে এক অনন্য নির্মাতা।অনুরাগ কাশ্যপের চলচ্চিত্রে গল্প কখনো সরলরেখায় চলে না। বরং, তার প্রতিটি দৃশ্য, সংলাপ এবং নান্দনিকতার পেছনে লুকিয়ে থাকে সমাজ, রাজনীতি, ক্ষমতা ও মানবমনের জটিল দ্বন্দ্ব।যে কিনা বলিউড পাড়ায় নিজের জায়গাটা করে নিয়েছে মানুষের ভিতরকার সমস্যাগুলো নিয়ে। ভিতরকার সমস্যা বলতে আমরা কি বুঝি মানসিক অশান্তি ভোগা , কোনো বিষয়ের উপর বিরক্ত। সেই বিরক্ত থেকে একটা মানুষ কি করতে পারে! এবং কোনো সমস্যা দেখে সেই মানুষটির মাথার মধ্যে কি চলছে সে সব বিষয়গুলো নিয়ে সূক্ষ্মভাবে রিসার্চ করে একটা সিনেমা বানানো চারটে খানে কথা নয়।তার সিনেমার চরিত্রগুলো নিখুঁত বা নিঃস্বার্থ নয়; কখনো তারা নির্মম, কখনো করুণ, আবার কখনো বিদ্রোহী। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই তারা জীবন্ত- দর্শক যেন তাদের ভালোবাসে, আবার ঘৃণাও করে। অনুরাগ কাশ্যপের ক্যামেরায় মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা গুলো তুলে নিয়ে আসে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উঠে আসে। আর তার গল্প দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার জন্য সিনেমা নির্মাণ করেন না, বরং দর্শকের হৃদয়কে আঘাত করেন, তীব্র অস্বস্তিতে ভোগান।
কিন্তু অনুরাগ কাশ্যপ, তা বক্স অফিসের তথাকথিত সাফল্যের কথা না ভেবে ঝুঁকি নিয়ে করে দেখিয়েছেন।তার ক্যারিয়ার হয়তো বাকি সব পরিচালক অভিনেতার মতন অতটা সমাদৃত না বা সবার মাঝে দেখা যায় না।কিন্তু এখনো সাইকোলজিক্যাল ড্রামা বা গ্যাংস্টার ড্রামা বলতে মাথায় আসবে অনুরাগ কাশ্যপের নাম।তিনি গ্যাংস্টার সিনেমাকে শুধু বন্দুক আর প্রতিশোধের গল্পে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তার মাধ্যমে বলেছেন শ্রেণি, রাজনীতি ও সমাজের জটিল সংঘাতের কথা। একইভাবে, ‘Dev D’-এর মতো এক্সপেরিমেন্টাল রোমান্টিক ড্রামা বা ‘No Smoking’-এর মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা দেখিয়েছে, গল্প কেবল বলা নয়, অনুভব করানোর মাধ্যমও হতে পারে।
আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন নতুন গল্প বলার ভাষা খুঁজছে, তখন অনুরাগ কাশ্যপ এক জীবন্ত প্রেরণা। তার সিনেমা শেখায়- বাস্তবতাকে বিকৃত না করে, সেটাকেই শিল্পে রূপ দেওয়া যায়। তিনি দেখিয়েছেন, সিনেমা শুধু বিনোদন নয়; এটা হতে পারে প্রতিবাদ, আত্মসমালোচনা, এমনকি সমাজের বিবেকের আয়নাও।যাকে ঘিরে আজকের প্রতিবেদন, তাকে জানতে হলে তার পিছনের গল্পটা একটু জেনে আসা যাক। তখন মুম্বাই শহরটি বোম্বে নামে বেশ পরিচিত। কারো কারো কাছে বোম্বে শহর ছিলো স্বপ্নের শহর। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে শত শত মানুষের প্রবেশ হয় এই শহরে। ভাগ্যের চাকার সহায়তায় আর পরিশ্রমের ফসলে কেউ কেউ এগিয়ে যায় সামনের দিকে আর কেউ কেউ স্বপ্ন বুকে চাপা দিয়ে লড়ে যায় টিকে থাকার সংগ্রামে।
ঠিক তেমনি এক তরুণ কিছু জামাকাপড় আর বই ভর্তি ব্যাগ নিয়ে এসে হাজির হলেন বোম্বেতে। বোম্বেতে আসার আগে ইচ্ছে ছিল বিজ্ঞানী হওয়ার। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে পিতাও একই স্বপ্ন দেখেছিলেন। দিল্লির বিখ্যাত হ্যান্স রাজ কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে প্রাণিবিদ্যায় গ্র্যাজুয়েশনও সম্পন্ন করেন তিনি। কিন্তু গ্র্যাজুয়েশনের পর যে কী হলো! বছরখানেক বিভিন্ন থিয়েটার গ্রুপের সাথে ঘুরে, মাথায় ভূত চাপলো সিনেমা বানাতে হবে। তিনি বুঝতে পারলেন, আসলে বিজ্ঞানী নন, তিনি একজন সিনেমা নির্মাতা হতে চান।এ স্বপ্নই তাকে টেনে এনেছে পৃথ্বী থিয়েটারে।যেকোনো মূল্যে এ স্বপ্নের পেছনে ছুটতে রাজি তিনি। সোজা চলে গেলেন থিয়েটারের ক্যাফেতে।থিয়েটারে সুযোগ পাওয়ার আশায় প্রথমে তিনি ফ্রিতে ওয়েটারের কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
অনুরাগ কাশ্যপের উঠে আসার গল্পটা তো জানা হলো; এইবার তার সৃষ্ট কাজ সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক।
১. নো স্মোকিং: তখন সবে মাত্র জন আব্রাহামের ক্যারিয়ার শুরু। হাতে গোনা কয়েকটি ফিল্মে কাজ করেছে। তখন 'ধুম' ছাড়া জন আব্রাহামের ক্যারিয়ারে তেমন কোনো আহামরি হিট ফিল্ম ছিল না। কিন্তু প্রতিভা আর কাজের প্রতি ঝোঁক থাকলে তাকে আর আটকায় কে! আর তখনি অনুরাগ কাশ্যপ তাকে নিয়ে নির্মিত করেন 'নো স্মোকিং'। যেহেতু অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমা মানেই সাইকোলজিক্যাল সমস্যা নিয়ে গল্প, এখানে তার ব্যতিক্রম হয়নি।স্টিফেন কিং এর উপন্যাস Quitters, Inc. (1978) (কুইটটারস. ইন্চ ১৯৭৮)অবলম্বনে নির্মিত এই সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মুভিটি রিলিজের পর তেমন সাড়া পায়নি কিন্তু সিনেমা বোদ্ধাদের ব্যাপক প্রশংসা পায়... বলিউডে অনেক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মুভি আছে কিন্তু এই মুভির মতো কমপ্লিকেটেড কাহিনী নিয়ে নির্মিত মুভির সংখ্যা খুব-ই কম ।এই সিনেমা বিশেষ করে জন আব্রাহামের ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা সিনেমার একটি এমনকি বলিউডের সিনেমার জন্য। কারণ সেই সময় দাঁড়িয়ে দর্শকদের সাইকোলজিক্যাল ইস্যুর সাথে পরিচয় করানো মোটেও সহজ ছিল না। সিনেমার কাহিনী আবর্তিত হয় "কে"("k")(জন আব্রাহাম) নামে মোর দ্যান আ চেইন স্মোকারকে নিয়ে, "কে" ব্যক্তি জীবনে মোটামুটি সুখি একজন মানুষ, স্ত্রী(আয়শা টাকিয়া)কে নিয়ে ভালো মত-ই কাটছিলো তাদের দাম্পত্য জীবন কিন্তু অতিরিক্ত ধুমপানের নেশা-ই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়, তার স্ত্রী সিদ্ধান্ত নেয় যদি সে স্মোকিং না ছাড়ে তাহলে সে তাকে ছেড়ে চলে যাবে... তাই আর কোনো কিনারা করতে না পেরে "কে" সিদ্ধান্ত নেয় স্মোকিং ছেড়ে দিবে, এর আগে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে একটি ঠিকানা দেয় এবং এটাও বলে যে এই ঠিকানায় যে ব্যক্তি "জাস্ট ভিজিট" করেছে সে আর কোনোদিন কোনো রকম বাজে নেশা করেনি...!!এরপর "কে" তার বন্ধুর দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী সেই জায়গায় যায়... ঐ ঠিকানায় যাওয়ার পর থেকে-ই ঘটতে থাকে একের পর এক বিপত্তি...কাশ্যপ আসলে এই সিনেমার মাধ্যমে বলতে চেয়েছিলেন-স্বাধীনতা, পছন্দের অধিকার, এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস নিয়ে।তবে বর্তমান সময়ে এসে এটি আলোচনায় আসে মূলত কারণ—এটি বলিউডের প্রচলিত সিনেমার ধাঁচ থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। যদিও এমন ভিন্নধর্মী, সাহসী সিনেমা তখন ধীরে ধীরে প্রশংসা পাচ্ছিল, তবে অনেকেই নো স্মোকিং বুঝে উঠতে পারেননি। তাই ছবিটি শুধুমাত্র এক ধূমপায়ীর গল্প নয়; বরং স্বাধীনতা, নিয়ন্ত্রণ ও আত্মপরিচয়ের সংকট নিয়ে এক প্রতীকী যাত্রা।
২. ব্ল্যাক ফ্রাইডে: শুধু যে সাইকোলজিক্যাল সিনেমা বানাতে ওস্তাদ অনুরাগ কাশ্যপ তা নয়। গ্যাংস্টার ড্রামা বানাতেও যে একটা শিল্প থাকা দরকার তা সত্যিকার অর্থে প্রমাণ করেছিলেন এই পরিচালক। রাম গোপাল ভার্মার মাধ্যমে বলিউডে আসে গ্যাংস্টার ড্রামা। আর তার সহযোগী ছিলেন অনুরাগ কাশ্যপ। ১৯৯৮ সালে রাম গোপাল ভার্মা পরিচালিত ক্লাট ক্ল্যাসিক গ্যাংস্টার সিনেমা 'সত্য' সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার ছিলেন অনুরাগ কাশ্যপ।
তাই গ্যাংস্টার ড্রামা বানানোর হাতেখড়ি ভালো করে হয়েছিল তার। এই সিনেমায় ফুটে উঠে এসেছে ১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ে ঘটে যাওয়া বোমা বিস্ফোরণের পিছনে দোষীদের সম্পর্কে কঠোর কাহিনী বর্ণনা করেছে। আর এই বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পিছনের দাউদ ইব্রাহিম আর টাইগার মেননের যে নৃশংসতা ছিল তাও দেখা যায়।বর্তমানে যারা গ্যাংস্টার ড্রামা বানায় বা তৈরি করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য এই সিনেমাটি হতে পারে এক ধরণের শিক্ষার পাঠদান।
৩. গ্যাংস অভ ওয়াসিপুর : এই সিনেমা নিয়ে আলাদা করে হয়তো ভূমিকা দিতে হবে না। মনোজ বাজপেয়ী, নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিককে নিয়ে এই পরিচালক যে গ্যাংস্টার ড্রামা বানিয়েছেন তা কোনোদিন ভুলবার মতো নয়। এই সিনেমাকে প্রশংসার জোয়ারে ভাসানোর জন্য এই সিনেমায় অনেক উপাদান আছে, যার একেকটা জিনিস নিয়ে লিখে ফেলা যাবে রচনা। তার প্রধান কারণ হলো ছবির স্টোরি টেলিংয়ের ব্যাপারটা। তিনটি পরিবারের মধ্যে চলমান সংঘাত একসময় রূপ নেয় পুরো ওয়াসিপুরের অরাজকতায়। বলিউডের ইতিহাসে গ্যাংস্টার বা ক্রাইম থ্রিলার জঁনরায় গ্যাংস অভ ওয়াসিপুর নিঃসন্দেহে এক মাইলস্টোন, গতানুগতিকতার খোলস ভেঙে সম্পূর্ণ নয়া ধাঁচের সিনেমা উপহার দিয়েছিলেন অনুরাগ কাশ্যপ।
আর এই পরিচালক এমন এক মাইলস্টোন সাজিয়ে গেছে এই সিনেমার আদলে অনেক সিরিজ গড়ে উঠছে। উদাহরণ হিসেবে হালের জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ মির্জাপুর এর কথা বলা যায়।
৪. দেব ডি: এরপরই আসে তার সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত মুভি ‘দেব ডি’। ২০০২ সালে শাহরুখের দেবদাসের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই!! যেটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে নির্মিত ছিলো।শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে সঞ্জয় লীলা বানসালি অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি বানিয়েছিলেন কিন্তু উপন্যাসের দেবদাস বাস্তব জীবনেও যে প্রভাব ফেলতে পারে তারই যেনো একটি প্রতিবিম্ব দেখালেন অনুরাগ কাশ্যপ। সেই প্রতিবিম্ব হলো 'দেব ডি'। এক কথায় অনুরাগ কাশ্যপ এই সিনেমাতে শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ বিংশ শতাব্দীতে জন্মালে কেমন হত তা দেখিয়েছেন। এই সিনেমাতে দেবদাসের ভূমিকায় ছিলেন অভয় দেওল, পার্বতীর ভূমিকায় ছিলেন মাহী গিল এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় ছিলেন কাল্কি কোয়েচলিন। সিনেমাখানা বক্সঅফিসে দারুণ সাড়া ফেলে। সমালোচকেরাও পরিচালক অনুরাগের প্রশংসায় মেতে উঠেন।গল্পে দেখা যায় কিশোর দেব কে লন্ডনে পড়াশুনা করতে পাঠানো হয়। দেব তার বাল্যকালের বান্ধবি পারু কে ছেড়ে লন্ডনে পারি জমায়। কিন্তু তাদের মধ্যে ফোনে কথা হতে থাকে। পড়াশুনা শেষ করে দেব ফিরে আসে ভারতে। দেশে ফিরে পারু এর সাথে ভুল বুঝাবুঝি হয়, ফলাফল পারুর আরেকজনের সাথে বিয়ে।
অন্যদিকে দিল্লীতে একটি উচ্চবিত্ত পরিবারের আদরের কন্যা লেনি। ভালোয় কাটছিল তার দিনকাল কিন্তু লেনির বয়ফ্রন্ড তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ভিডিউ করেন। বয়ফ্রেন্ড এই স্কেন্ডেল ছেড়ে দেয় ইন্টারনেটে। পরিবার থেকে বিতারিত হয়ে অসহায় অবস্থায় রাতে প্রস্টিটিউড এর কাজ ও দিনে পড়াশুনা চালিয়ে যান। নতুন পেশায় লেনি নাম পরিবর্তন করে “চান্দা” রাখেন। সেখানেই দেখা হয় নেশা করা,ফ্রাস্ট্রেটেড দেবের সাথে।এখান থেকেই গল্পের কাহিনী ঘুরে কোথায় মোড় নেয়, তার জন্য আপনাকে সিনেমাটি দেখতে হবে।এই সিনেমাটি যে স্পেশাল জিনিসটি ফুটে এসেছে সিনেমার কালার । অনুরাগ কাশ্যপকে বাকিদের থেকে আলাদা এজন্যই বলা হয় তার কারণ, তার সিনেমায় শুধু যে ক্যারেক্টার প্লে হয় তা না , সেই সিনেমার গান থেকে শুরু করে সিনেমার গান , সিনেমা ব্যাকগ্ৰাউন্ড মিউজিক, সিনেমার কালার; এই বিষয়কেও সিনেমার ক্যারেক্টার বানিয়ে ফেলেন । এই সিনেমার যে বিষয়বস্তু অনুরাগ আলাদা করে দেখিয়েছিলো তা হলো দেবের নেশা করার দৃশ্যটা। কথায় আছে একজন মানুষ যখন সম্পূর্ণ মাদকাসক্ত হয়ে যায় তখন তার চারপাশে সবকিছু রঙ্গিন মনে করে। এই সময় দেব কিরকম ট্রমার মধ্যে দিয়ে যায় সেইসব মুহূর্তগুলো বিভিন্ন কালারের মাধ্যমে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছে ;যেনো বোঝার উপায় নেই এটি কোনো পর্দায় ছবি , মনে করাবে বাস্তব কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিত্র।যেহেতু গল্পটি তরুণ প্রজন্মের অবস্থাকে নিয়ে নির্মিত আর বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশ প্রেমে লুকিয়ে থাকে অন্তরঙ্গ দৃশ্য এবং এমএমএস স্ক্যান্ডাল। তাই সেই সময়ের বাস্তবতাকে ঠিক সেইভাবে সিনেমায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
৬. বোম্বে ভেলভেট: বোম্বে মানে 'মুম্বাই',। কম কি কাহিনী আছে এই শহরকে ঘিরে!! ইংরেজ শাসনের পর ভারতের এই শহরের উপর তান্ডব চালিয়েছে অসংখ্য গ্যাংস্টাররা। 'ছোটা রাজন', 'দাউদ ইব্রাহিম', 'মানিয়া সুরবে', ইত্যাদি। তাদের উপর নির্মিত অনেক বায়োপিকে তাদের নৃশংসতার সম্পর্কে পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু এই নৃশংসতাকে আরো তুখড় করে দেখানোর জন্য দায়িত্বটা যেনো নিজ কাঁধে নিয়ে ফেললেন অনুরাগ কাশ্যপ।
বলে রাখা ভালো এই সিনেমায় আবারো অনুরাগ কাশ্যপ কালারের সৌন্দর্যতা দেখিয়েছেন। আর এইবারের সিনেমায় তিনি হলিউডের ছোঁয়া আনতে চেয়েছিলেন। সিনেমার গল্প আবর্তিত হয় ছোটবেলা থেকে বলরাজ (রণবীর কপূর) একজন ধনী, পয়সাওয়ালা লোক হতে চায়। বন্ধু চিমন (সত্যদীপ) তার সব সময়ের সঙ্গী। বলরাজ জীবন শুরু করে স্ট্রিট ফাইটার (বক্সার) হিসেবে। এমন সময় বিখ্যাত মাফিয়া কাইজাদ খামবাট্টার (করণ জোহর) নজর পড়ে বলরাজের ওপর। সে তাকে নতুন বলরাজ হতে সাহায্য করে। বলরাজের নাম দেয় জনি বলরাজ। তার নামে একটা নাইটক্লাবও খোলে। ‘বম্বে ভেলভেট’। আসলে বম্বে ভেলভেটকে সামনে রেখে সেখানে নানা রকম অবৈধ কাজ চালায় খামবাট্টা।
কিন্তু বলরাজ চাই বোম্বেতে তার নতুন সাম্রাজ্য গড়ে উঠুক। যে কাইজাদ খামবাট্টা মাথা গোঁজার ঠাঁই দিলো তার সাথে জড়িয়ে পড়ে শত্রুতায় বলরাজ। শুরু হয় শক্তি মত্তার খেলা।কিন্তু মজার ব্যাপার হলো নরমাল এই গল্পকে সম্পূর্ণ রুপে হলিউড স্টাইলে উপস্থাপন করেছে এই পরিচালক। আগেই বলেছি অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমায় কালারের বৈশিষ্ট্য থাকেই। এই সিনেমায় তার ব্যতিক্রম হয় নি। কালচে বাদামী রঙের ব্যবহারে যেন পুরনো দিনের ছবিটাই ফুটে উঠেছে পর্দায়। একটা মুড তৈরি করেছে। তার সঙ্গে অমিত ত্রিবেদীর আবহসঙ্গীত এবং গান। ছবির প্রথম ফ্রেম থেকে দর্শকের মনকে টেনে নিয়ে যায় বম্বের অতীতের দিনগুলোতে। ছবির সেট-সেটিং, পরিবেশ, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাজপোশাক, মেক আপ-গেট আপ, হেয়ারস্টাইল সব কিছুর দিকে পরিচালকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ বরাবরই উপহার দিতে চাইতেন ভিন্ন কিছু। প্রত্যেকবারেই ক্যারেক্টার নিয়ে কাজ করাকেই মুখ্য মনে করেছে;যা তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সেই ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
পরিচালক তো অনেকে আছে কিন্তু পরিচালকের গবেষণাগার যদি বলা হয় তাহলে অনুরাগ কাশ্যপের নাম বললে কোনো অংশে ভুল হবে না।
অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমার বিষয়বস্তু ব্যবহৃত মেটাফোর:
ভারতীয় সিনেমা যখন দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকতা, গ্ল্যামার, রঙিন প্রেমকাহিনি আর অতিরঞ্জিত নাটকীয়তায় ডুবে ছিল, তখন এক মানুষ সাহস করে বললেন— “সিনেমা মানে শুধু বিনোদন নয়, সিনেমা মানে সত্যের অন্ধকার দিক দেখা।”
তিনি অনুরাগ কাশ্যপ — এক নির্মাতা, যিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রকে নতুন ভাষা, নতুন ব্যাকরণ এবং নতুন রাজনৈতিক চেতনা উপহার দিয়েছেন।
কেন অনুরাগ কাশ্যপ সবার থেকে আলাদা? তার কয়েকটি বিষয় মেটাফোর ভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। তার সিনেমাতে প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করা যায় তা হলো, বাস্তবতার নির্মম রূপ উন্মোচন।অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমা কোনো কল্পনার রঙে রঞ্জিত নয়। তিনি সমাজকে দেখান তার কুৎসিত, অসহায় এবং নির্মম বাস্তবতাসহ। “Black Friday”–এ তিনি তুলে ধরেছেন মুম্বাই বিস্ফোরণের রাজনৈতিক ও মানবিক দিক; সেখানে কোনো নায়ক নেই, বরং আছে অপরাধের জন্মদাতা এক সমাজব্যবস্থা।তিনি মানুষের ভেতরের ‘গোপন অন্ধকার’কেই সিনেমার কেন্দ্রে রাখেন। তার চলচ্চিত্রে ভালো-মন্দের সীমানা অস্পষ্ট। ঠিক যেমন বাস্তব জীবনে আমরা। এই সত্যকেই কাশ্যপ দর্শকের সামনে নির্মোহভাবে হাজির করেন-এজন্যই তিনি সবার থেকে আলাদা।দ্বিতীয়ত গল্পের নতুন ব্যাকরণ।তার চলচ্চিত্রের গল্প কখনোই সরলরেখায় চলে না। তিনি নন-লিনিয়ার ন্যারেশন ব্যবহার করেন- অর্থাৎ সময়, স্থান ও মানসিক অবস্থার মাঝে জটিল ক্রস-কাট। “Dev D” বা “No Smoking” দেখলে বোঝা যায়, তার সিনেমা যেনো দর্শককে গল্পে হারিয়ে যেতে নয়, বরং ভাবতে শেখায়।প্রতিটি চরিত্র যেনো এক একটি চিন্তার স্তর — এক একটি মানসিক অবস্থা।
তৃতীয়ত সংলাপ ও নীরবতার ভারসাম্য।অনুরাগ কাশ্যপ সংলাপকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করেন। তার সিনেমায় শব্দের চেয়ে নীরবতা বেশি গভীর। অনেক সময় একটি দীর্ঘ নীরব দৃশ্যই বলে দেয় সমাজের নিষ্ঠুরতা, মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব বা ভালোবাসার শূন্যতা। যেমনটা Gangs of Wasseypur” চলচ্চিত্রে স্পষ্ট দেখা যায়। এই সিনেমাটি ছিলো ভারতের রাজনীতি ও শ্রেণিসংগ্রামের প্রতীক। এই দুই পর্বের বিশাল গল্পটি শুধু গ্যাংস্টার কাহিনি নয়; এটি আসলে সমাজের ক্ষমতা ও প্রতিশোধের চক্রের রূপক। প্রতিটি চরিত্র এক একটি শ্রেণির প্রতীক — ধনীদের লোভ, গরিবদের বিদ্রোহ, এবং রাজনীতির নোংরা সংযোগ।ওয়াসেপুর শহর এখানে ভারতের সমাজব্যবস্থার এক ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। এটি প্রমাণ করে সভ্যতা যতই উন্নত হোক, মানুষের লোভ, ঈর্ষা আর আত্মকেন্দ্রিকতা তাকে কতটা পশুত্বের দিকে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কেনো অনুরাগ কাশ্যপের মতো পরিচালক তৈরি করতে পারছে না??:
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প এক নতুন উত্তরণের পথে—প্রযুক্তি, দর্শক এবং বাজার এখন বহুমাত্রিক। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেনো এখনও বাংলাদেশের বড় পর্দায় অনুরাগ কাশ্যপের মতো ভিন্ন ধারার, বাস্তবতানির্ভর, কাঁচা ও গভীর সামাজিক প্রতিচ্ছবি উঠে আসছে না?যেখানে ভারতীয় সিনেমার অনুরাগ কাশ্যপ ‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’, ‘নো স্মোকিং’, ‘দেব.ডি’, ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’–এর মতো ছবির মাধ্যমে সমাজ, রাজনীতি, শ্রেণি, এবং মানবিক ভেতরবোধের এক কাঁচা বাস্তব তুলে ধরেছেন, সেখানে বাংলাদেশের পরিচালকরা এখনো মূলত রোমান্টিক, থ্রিলারের মধ্যে নায়ক প্রাধান্য নির্ভর চক্রেই আটকে আছেন।
অনুরাগ কাশ্যপের মতো আরো অনেক তরুণ পরিচালক এক্সপেরিমেন্টাল ঝুঁকিপূর্ণ এবং কঠিন সত্যতা সম্পন্ন গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র বানানো পরিচালকরা পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের ইন্ডাস্ট্রিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে যেমন নূহাশ হুমায়ূন, ভিকি জাহেদ, অনম বিশ্বাস, আশিকুর রহমান কিছু অনন্য কাজ দিয়েছে, কিন্তু সেই ধারার স্বতন্ত্র ধারাবাহিকতা কেন গড়ে উঠছে না। এর পিছনে বাংলাদেশের প্রযোজক ও দর্শকদের দায়বদ্ধতা বেশি। এই যেমন:
১. প্রযোজকের বাণিজ্যিক মানসিকতা: “ঝুঁকি নয়, লাভ চাই”।বাংলাদেশের প্রযোজকরা এখনো বিশ্বাস করেন‘হিরো-হিরোইন, গান-নাচ, ও ফাইট’ মানেই সিনেমা বিক্রি হবে।ফলে তারা এমন পরিচালক বা গল্পে বিনিয়োগ করতে চান না যেখানে ব্যবসায়িক ঝুঁকি বেশি।অনুরাগ কাশ্যপ তার ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু ভারতের প্রযোজনা সংস্থাগুলো তাকে সুযোগ ও স্বাধীনতা দিয়েছে—এটাই পার্থক্য।বাংলাদেশে এই স্বাধীনতা এখনো বিরল। পরিচালক যত প্রতিভাবানই হোন, যদি তিনি মূলধারার ফর্মুলা না মানেন, তবে তার গল্প থেমে যায় স্ক্রিপ্ট টেবিলেই।
২. দর্শকদের মানসিক প্রস্তুতির অভাব: দর্শকেরও দায়ভার এখানে কম নয়।বাংলাদেশের অধিকাংশ দর্শক এখনো “এন্টারটেইনমেন্ট” মানেই হাসি, প্রেম, মারামারি—এই ধাঁচেই অভ্যস্ত।তারা চরিত্রের গভীরতা, মেটাফোর, বা সামাজিক প্রতীকবাদের দিকগুলোতে কম মনোযোগ দেন।ফলে পরিচালকরা ভাবেন,“লোকজন বুঝবে না, তাই সহজভাবে বানাই।”কিন্তু অনুরাগ কাশ্যপের সাফল্য এখানেই—তিনি দর্শককে বোকার মতো ভাবেননি। তিনি বিশ্বাস করেছেন, দর্শক যদি প্রশ্ন পায়, তারা উত্তর খুঁজে নেবে।
৩. সৃজনশীলতার সীমা: সেন্সর, সংস্কৃতি ও সাহসের অভাব বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ড ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এখনো তুলনামূলক রক্ষণশীল।
কাশ্যপের সিনেমা যেভাবে ধর্ম, রাজনীতি, বা সহিংসতার বাস্তবতা তুলে ধরে, সে ধরনের বাস্তবচিত্র বাংলাদেশে এখনো অনেক সময় “অগ্রহণযোগ্য” বলে গণ্য হয়।একজন নির্মাতা যখন জানেন যে তার সৃজনশীল স্বাধীনতা সীমিত, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গিও ছোট হয়ে যায়।ফলে অনেকেই ছোট পরিসরে ওটিটিতে- তাদের ভাবনাগুলো তুলে ধরছেন, যেমন নুহাশ হুমায়ূন, ভিকি জাহেদ, অনম বিশ্বাস এবং আশিকুর রহমান ইত্যাদি। কিন্তু বড় পর্দায় তাদের সেই সাহসিকতা স্থান পাচ্ছে না।
৪. গল্প বলার ঘাটতি: লোকাল রিয়েলিজমের অভাব অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমায় যে ‘লোকাল রিয়েলিজম’—স্থানীয় সংস্কৃতি, আঞ্চলিক ভাষা, পারিবারিক শত্রুতা, রাজনৈতিক পটভূমি—সেটা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক করে তুলেছে।‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’ কেবল গ্যাংস্টার গল্প নয়, এটি ভারতের ছোট শহরের শ্রেণি-সংগ্রামের দলিল।বাংলাদেশে ‘তান্ডব’ বা ‘তুফান’ গ্যাংস্টার সিনেমা কিংবা সমাজনির্ভর নির্ভর সিনেমা হলেও সেগুলোর কেন্দ্রবিন্দু থাকে নায়কের ক্ষমতা, সমাজের শিকড় নয়। আমরা এখনো “নায়ক সবকিছু ঠিক করে দেবে”-এই কল্পনায় বন্দী।ফলে গল্পের মানুষগুলো বাস্তব না থেকে ‘হিরোইক ইমেজ’-এর বন্দী হয়ে যায়।
বাংলাদেশে কেনো অনুরাগ কাশ্যপের মতো গ্যাংস্টার সিনেমা প্রোপারভাবে তৈরি হয় না?? :
বাংলাদেশে নেই মাত্রাতিরিক্ত অভিনব গল্প? বরং আছে— গ্রামের কোণে, শহরের নীচু বাজারে, নদীর ধারে, কল-কারখানার আশেপাশে সঞ্চিত গল্পগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মে বংশধর হয়ে চলছে। ‘তান্ডব’, ‘তুফান’— কিছু গ্যাংস্টার-ধাঁচের কাজ এসেছে, কিছু লোকাল কাহিনি টিভি বা ওটিটিতে দেখা গেছে। তাই প্রশ্ন আসে: এত জীবন্ত লোকাল কাহিনি থাকা সত্ত্বেও কেউ কেনো বড় পর্দায় ওয়ার্ল্ড-স্ট্যান্ডার্ডে ফুটিয়ে তুলতে পারছে না? উত্তর একক নয়; এটা বহুস্তরীয় সীমাবদ্ধতার সমষ্টি — প্রযোজনা, বিতরণ, আর্থিক ঝুঁকি, সেন্সর ও সামাজিক চাপ, স্টার-সিস্টেম, দর্শকের স্বাদ -সব মিলে একটা জটিল বাধা তৈরি করে।বাংলাদেশে সিনেমা-উৎপাদন সম্প্রতি কিছু ভালো অবস্থান পেয়েছে—রোম্যান্স, থ্রিলার, ও OTT-শোগুলোতে। অথচ লোকাল সোশ্যাল কনফ্লিক্ট, প্রজন্মভেদে চলমান বদলে যাওয়া শত্রুতা বা গ্রামের রাজনৈতিক মাইক্রোড্রামা—এসব জটিল লোকাল গল্প বড় পর্দায় খুব কমই ভাসে। যেখানে ভারতের অনুরাগ কাশ্যপের মতো নির্মাতারা তাঁদের অঞ্চলের কাঁচা ইতিহাস, গ্যাংওয়ার ও শ্রেণিসংগ্রামের কাহিনীকে বিস্তৃত, ভঙ্গিভঙ্গি ও মেটাফরিক ভাষায় রূপ দিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আনে, কিন্তু বাংলাদেশে সেটি সম্ভব হচ্ছে না এর বেশকিছু কারণ রয়েছে।
১. অর্থায়ন ও ঝুঁকি: প্রযোজকের ব্যবসায়িক বিবেচনা
বড় পর্দায় তৈরি মানে বড় বাজেট, বড় প্রচার, আর ভালো রকম ইনকাম করার জায়গা। প্রযোজকরা টিকেট-আয় দেখে সিদ্ধান্ত নেন — যে গল্প সহজে টিকিট বিক্রি করবে না, সেটি ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। গ্যাংস্টার-এপিক বানাতে হলে টেকনিক্যাল-ভিত্তি, এক্সটেনসিভ কাস্ট ও লোকেশন দরকার-কিন্তু বিক্রির নিশ্চয়তা নেই।
২. বিতরণ ও থিয়েটার ইকোনমি: বাংলাদেশে থিয়েটারগুলো মূলধারার বড় ছবি দেখাতে পছন্দ করে — কারণ কমার্শিয়াল আসন বিক্রি করে। লোকাল, বরং কাঁচা কাহিনি হলে থিয়েটার মালিকরা ঝুঁকি নিতে অনীহা দেখান। OTTতে সেটাও বড়-স্কেল আর্ট-এপিককে অবিলম্বে সমর্থন করে না যতক্ষণ না প্রযোজক-নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।
৩. কাস্টিং ও স্টার-ড্রাইভের অনিশ্চয়তা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিগ-স্কেল গ্যাংস্টার ইপিক বানাতে চাইলে কিংবা দর্শককে টেনে আনতে হলে নামকরা তথাকথিত তারকা বা নায়ককে প্রাধান্য দিয়ে এমন স্টোরিলাইন তৈরি করে যা মিডিয়া-হালচাল তৈরি করে।কিন্তু অনেক প্রতিভাবান নির্মাতা স্টার সিস্টেমের বাইরে কাজ করতে চান; বেশিরভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শকদের স্টার-ফোকাসড কনটেন্টে অভ্যস্ত। ফলে প্রযোজকেরা ‘নন-স্টার’ কাস্টে বড় বাজেট লাগাতে নারাজ।
৪.সেন্সরশিপ, সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ ও আত্ম-সেন্সরশিপ: গ্যাংস্টার গল্প অনেক সময় সংবেদনশীল। স্থানীয় শত্রু, রাজনৈতিক যোগসূত্র, স্থানীয় সংস্কৃতি- এগুলো তুলে ধরলে বিতর্ক বাড়ে। নির্মাতা ও প্রযোজক উভয়েই বিতর্ক এড়াতে আত্ম-সেন্সরশিপ করে বা নিছক নিরাপদ উপায়ে কাহিনি বানায়।
৫. ফিল্ম-স্কিলস, রিসার্চ ও স্টোরিটেলিং ট্রেড: Wasseypur-র মতো মাল্টি-জেনারেশানাল ইপিক তৈরিতে গভীর রিসার্চ, লোকাল ইতিহাস, ভাষা, এবং কাস্ট-রিপ্রেজেন্টেশন দরকার- যা সঠিকভাবে করতে হলে সময়, খরচ ও অভিজ্ঞ টিম লাগে। বাংলাদেশে অধিকাংশ স্ক্রিপ্ট কাল্পনিক বা পশ্চিমা গ্যাং মডেল কপি করে। ফলে বাংলাদেশের লোকাল গ্যাং কালচার, রাজনীতি, বস্তি লাইফ, কিংবা ছোট শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ড—এসব বাস্তবভাবে ফুটে ওঠে না।আমাদের অনেক মেকার টেকনিক্যাল, স্ক্রিপ্টরাইটিং ও বড়-স্কেলে পরিচালনায় অভিজ্ঞতা সীমিত। তাছাড়া গ্যাংস্টার/লোকাল ইপিক বলার জন্য দরকার বড় ফ্রেম, বড় কাস্ট, বড় লোকেশন—এগুলোতে বিনিয়োগ এবং থিয়েটার-চেইন দরকার।বাংলাদেশে থিয়েটার মালিকগোষ্ঠী আর কনজার্ভেটিভ প্রোগ্রামিং বেশ শক্ত- এরা ঝুঁকিপূর্ণ, “আর্টি” বা কন্ট্রোভার্সিয়াল কাজ খুব কম নেয়। ফলে পরিচালকরা থিয়েটারে মুক্তি নিয়ে ভাবতেই অনুপ্রাণিত হন না।
৬. দর্শকের স্বাদ ও অডিয়েন্স ডেভেলপমেন্ট: দর্শকরা যদি বড় লভ্যাংশ-পটভূমি যেমন (নামকরা তারকাদের দিয়ে নরমাল রোমান্স, ক্রাইম-থ্রিলার)তাতে অভ্যস্ত হন, তাহলে নতুন জটিল ন্যারেশন ও ‘অন্ধকার-বাস্তবতার’ গল্প ছাড়া অন্য কিছুর দিকে আসতে পারেনা। তাই সোজাসাপ্টা পপুলার গল্পই বেশি দেখা যায়।
“বাংলাদেশে অনুরাগ কাশ্যপের মতো পরিচালক ও প্রোপার গ্যাংস্টার সিনেমা তৈরির পথে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও করণীয়”:
১. লোকাল রিসার্চ ও স্টোরি ডেভেলপমেন্ট টিম তৈরি: শহর কিংবা গ্ৰামের অপরাধচক্র, রাজনীতি, সিন্ডিকেট, গ্যাং কালচার—এসব নিয়ে রিসার্চ করে স্টোরি বানানো।সাংবাদিকতা বা ক্রাইম রিপোর্টিং ডেটা থেকে ইনসাইট নেওয়া যেতে পারে।সৃষ্টিশীল সাহস ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা
অনুরাগ কাশ্যপ শুধু সিনেমা বানাননি, তিনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন।বাংলাদেশে অনেক তরুণ নির্মাতা টেকনিক্যালি ভালো, কিন্তু গল্পে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুপস্থিত।তাই নির্মাতাদের মধ্যে “questioning attitude” তৈরি করতে হবে।সিনেমাকে শুধু বিনোদন নয়, সমাজের আয়না হিসেবে দেখতে শেখানো দরকার।
২. ফিল্ম এডুকেশন, প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং জোরদার করা এবং নতুন প্রজন্মের ডিরেক্টরদের সুযোগ দেওয়া: অনেক তরুণ নির্মাতা গল্প বলতে জানেন, কিন্তু সিনেমাটিকভাবে ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজে প্রকাশ করতে পারেন না। তাই ফিল্ম স্কুল ও ওয়ার্কশপে "ক্রাইম ন্যারেটিভ রাইটিং", "রিয়ালিস্ট সিনেমাটোগ্রাফি" শেখানো দরকার।নূহাশ হুমায়ূন, ভিকি জাহেদ এদের মতো নতুন নির্মাতারা এই ঘরানায় বড় পর্দায় এক্সপেরিমেন্ট করলে পরিসর বাড়বে।বাংলাদেশে ফিল্ম স্কুলগুলো (যেমন:জাহাঙ্গীরনগর, Stamford, Dhaka University, Pathshala, ULAB ইত্যাদি)–তে প্র্যাকটিক্যাল ওয়ার্কশপ, স্ক্রিপ্ট ল্যাব, ডিরেকশন ট্রেনিং বাড়াতে হবে। ফিল্মে আগ্রহী শিক্ষার্থী এবং তরুণ প্রজন্মের পরিচালকদের “রিয়েল লোকেশন শুট”, “ইন্ডিপেন্ডেন্ট শর্ট ফিল্ম”, “ওটিটি প্রজেক্ট” বানানোর সুযোগ দেওয়া দরকার।
৩. ফিল্ম কালচারকে শক্তিশালী করা: বড় বাজেটের প্রযোজক না পেলে, স্বাধীন প্রযোজক, OTT (Chorki, Binge, iScreen, Hoichoi BD) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এক্সপেরিমেন্টাল প্রজেক্ট শুরু করা।
৪. ডার্ক জঁরার প্রতি দর্শককে শিক্ষিত করা: অনুরাগ কাশ্যপ তার গল্পগুলো গভীরভাবে লোকাল কালচার, ভাষা, আর সমাজের বাস্তবতা থেকে তৈরি করেন। তাই ফিল্মকে আর্ট হিসেবে দেখতে হবে, অপরাধ প্রচার হিসেবে নয়। ১৮+ ক্যাটাগরি সিস্টেম চালু হলে নির্মাতারা সাহসী হতে পারবেন।দর্শক যেন বোঝে, গ্যাংস্টার ফিল্ম মানে শুধু গুলি-বোমা নয়; এটা সমাজ, পরিবার, রাজনীতি, আর নৈতিকতার গল্প।দর্শককে বোঝাতে হবে গ্যাংস্টার সিনেমা মানেই কেবল রক্তপাত নয়; বরং এটি সমাজ, পলিটিক্স ও মানবিক দিকের প্রতিফলন।
৫. অভিনেতা ও ক্রুদের ওয়ার্কশপ: রিয়ালিস্টিক অভিনয়, ভাষা, লোকাল টোন বোঝাতে ওয়ার্কশপ আয়োজন।যেমন:প্রতিটি স্ক্রিপ্ট তৈরির আগে সামাজিক, ঐতিহাসিক কোনো বইয়ে লেখা আন্ডারওয়ার্ল্ডের গল্প নিয়ে চরিত্র ও মানবিক রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা। তাছাড়াও বাংলাদেশে সিনেমা নির্মাণ মানে এখনো “বড় বাজেট+তারকা নির্ভরতা”।কিন্তু অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমাগুলো ছোট বাজেটেও প্রভাব ফেলেছে, কারণ গল্পই ছিল তার শক্তি।তাই প্রযোজকদের content-first চিন্তা শেখানো- অর্থাৎ গল্প ও পরিচালককে কেন্দ্র করে ফান্ড দেওয়া।“Film Fund” বা “Screenwriter Grant” চালু করা, যাতে তরুণ নির্মাতারা ছোট প্রজেক্ট বানাতে পারেন।
৬. 'র’ সিনেমাটোগ্রাফি ও মিউজিকের গুরুত্ব : হাতে ধরা ক্যামেরা, লোকাল মিউজিক, ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড — এগুলো দিয়ে বাস্তব পরিবেশ তৈরি করা যায়।বড় বাজেট না থাকলেও “রিয়াল লোকেশন” ব্যবহার করলে র’ ইমপ্যাক্ট আসে।
৭. সেন্সর বোর্ডে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি: অনুরাগ কাশ্যপ সমাজ, রাজনীতি, অপরাধ, ধর্মীয় ভণ্ডামি—সব কিছু নিয়ে খোলাখুলি কাজ করেন।বাংলাদেশে এই স্বাধীনতা এখনো সীমিত; সেন্সর বোর্ড ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক গল্পই “সেফ জোনে” আটকে যায়।তাই “ক্লাসিফিকেশন” ব্যবস্থায় আনতে হবে।যেমন- 18+, 16+, Parental Guidance— এভাবে রেটিং দেওয়া যেতে পারে, যাতে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্টও উপযুক্ত দর্শকের কাছে পৌঁছায়। এতে সিনেমা নির্মাতারা বাস্তবধর্মী গল্প বলতে পারবেন সেন্সর ভয়ের বাইরে গিয়ে।
৮. ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে বিকল্প মুক্তির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার: বর্তমানে Netflix, Hoichoi, Chorki, Binge, iScreen, Bioscope— এইসব প্ল্যাটফর্মে সেন্সরের কড়াকড়ি কম।ফলে নির্মাতা এখানে স্বাধীনভাবে ডার্ক, গ্যাংস্টার, রাজনৈতিক বা সামাজিক বাস্তবতার গল্প বলতে পারেন। এই প্ল্যাটফর্মগুলো সেন্সর বোর্ডের পরিবর্তে “কনটেন্ট রেটিং” অনুসারে কনটেন্ট অনুমোদন দেয়।
৯. নিজস্ব কনটেন্ট কোড অফ কন্ডাক্ট তৈরি: নির্মাতা ও প্রযোজকরা নিজেরাই নৈতিক সীমারেখা ঠিক করে নিতে পারেন— যাতে স্বাধীনতা বজায় থাকে, আবার অপ্রয়োজনীয় বিতর্কও না হয়। যেমন:একজন পরিচালক একটা “গ্যাংস্টার সিনেমা” বানাচ্ছেন।এখন গল্পে হয়তো সহিংসতা, গালাগাল বা অপরাধের বিষয় আছে — কিন্তু তিনি যদি আগে থেকেই নিজের দলের জন্য কিছু নীতি ঠিক করে রাখেন, যেমন:
• অপ্রয়োজনীয় অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা হবে না।
(গালাগাল থাকলেও তা গল্পের প্রয়োজনে সীমিত থাকবে)।
• ধর্ম, জাতি বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে আঘাত করা হবে না।(যেন বিতর্ক না হয়, গল্পটা সমাজ বাস্তবতায় থাকে)।
• অপরাধ glorify করা হবে না(অর্থাৎ, অপরাধী চরিত্র দেখানো যাবে, কিন্তু তাকে হিরো বানানো হবে না)।
• গল্পের বার্তা যেন সামাজিকভাবে অর্থবহ হয়
(যেন দর্শক শুধু সহিংসতা না দেখে, বরং সমাজের বাস্তবতা বোঝে)।
১০. ফিল্ম ক্রিটিসিজম ও একাডেমিক আলোচনা বাড়ানো: অনুরাগ কাশ্যপের মতো নির্মাতা উঠে আসেন এমন পরিবেশে, যেখানে সমালোচনা, বিতর্ক ও আলোচনা হয়।বাংলাদেশে ভালো সিনেমা রিভিউ বা একাডেমিক সমালোচনা এখনো সীমিত।তাই বিশ্ববিদ্যালয়, ফিল্ম ক্লাব, মিডিয়া বিভাগে নিয়মিত “Film Appreciation” সেশন আয়োজন।নির্মাতাদের কাজ নিয়ে আলোচনা, রিভিউ, জার্নাল বা ইউটিউব বিশ্লেষণ তৈরি করা।