Posts

প্রবন্ধ

“বলিউডের রাফ অ্যান্ড টাফ হিরো, কিন্তু গল্পের প্রতি অনড়: জন আব্রাহাম”

December 29, 2025

সুমন বৈদ্য

33
View
John Abraham makes a return to YRF’s Dhoom franchise
অ্যাকশন হিরো থেকে চিন্তাশীল অভিনেতা-জন আব্রাহামের যাত্রা বরাবরই ব্যতিক্রমী।

জন আব্রাহাম-বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা, প্রযোজক ও লেখক। তবে বলিউডে জন আব্রাহামকে অনেকেই ‘অ্যাকশন হিরো’ হিসেবেই চেনেন। তাঁর শক্তিশালী শারীরিক গঠন, নিখুঁত স্টান্ট এবং রাফ অ্যান্ড টাফ পর্দার উপস্থিতি তাকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। তবে শুধু অ্যাকশন নয়—জন সবসময় গল্প এবং চরিত্রকেও প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি বাণিজ্যিক ছাঁচে; বরং একের পর এক এক্সপেরিমেন্টাল চরিত্রে অভিনয় করে প্রমাণ করেছেন নিজের অভিনয়-দক্ষতা ও বৈচিত্র্য। এমন সাহসী পছন্দ তাকে শুধু একজন তারকা নয়, একজন চিন্তাশীল অভিনেতা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। জন আব্রাহাম ১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭২ সালে ভারতের মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে) শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন এবং চারবার ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে মনোনীত হয়েছেন। পাশাপাশি এখন পর্যন্ত স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডসে ২টি, জী সিনে অ্যাওয়ার্ডসে ১টি, স্টারডাস্ট অ্যাওয়ার্ডসে ১টি, এবং আইআইএফএ অ্যাওয়ার্ডসে ২টি পুরস্কার অর্জন করেছেন।২০১৭ সাল থেকে জন আব্রাহাম নিয়মিতভাবে Forbes India Celebrity 100 তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

জন আব্রাহাম তার ক্যারিয়ার শুরু করেন মডেলিং দিয়ে। তিনি প্রথমে হাজির হন হান্স রাজ হান্সের ‘ঝাঁঝর’ ও জ্যাজি বি’র ‘সুরমা’ গানের মিউজিক ভিডিওতে। এরপর তিনি Time & Space Media Entertainment Promotions Ltd. নামের একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যা আর্থিক কারণে বন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনি Enterprises-Nexus-এ মিডিয়া প্ল্যানার হিসেবে কাজ করেন।১৯৯৯ সালে তিনি Gladrags Manhunt Contest-এ প্রথম হন এবং ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত Manhunt International প্রতিযোগিতায় রানার-আপ হন। এরপর তিনি হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে মডেলিং করেন এবং পানকজ উদাস, বাবুল সুপ্রিয়সহ বহু গায়কের মিউজিক ভিডিওতেও কাজ করেন। অভিনয় দক্ষতা উন্নত করার জন্য তিনি কিশোর নামিত কাপুর অ্যাক্টিং ইনস্টিটিউট-এ অভিনয় প্রশিক্ষণ নেন।ভারতের “শীর্ষ মডেল” হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার পর জন ২০০৩ সালে জিসম ছবির মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক করেন। তবে তার আসল খ্যাতি এনে দেয় ২০০৪ সালে ধুম ছবিতে কবির চরিত্রে অভিনয় করার মাধ্যমে, যেখানে তিনি ছিলেন মূল খলনায়ক।ছবিটি বছরটির তৃতীয় সর্বাধিক আয়কারী সিনেমা হয়। এই লেখায় থাকল জন আব্রাহাম অভিনীত সেরা ৭টি সিনেমা।

১. মাদ্রাস ক্যাফ- Madras Cafe (IMDb RATING- 7.6/10)

মাদ্রাস ক্যাফে ২০১৩ সালের ২৩ আগস্ট মুক্তি পেয়েছিল। মেজর বিক্রম সিং (জন আব্রাহাম) ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের একজন কর্মকর্তা, যাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ (RAW) গোপন মিশনের নেতৃত্ব দিতে জাফনায় পাঠায় — তখনই যখন ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনীকে শ্রীলঙ্কা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।বিক্রম সিংয়ের লক্ষ্য ছিল এলটিটিই (LTTE-Liberation Tigers of Tamil Eelam,লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলম) নামের বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলা সংগঠনকে দুর্বল করা। কিন্তু মিশনে গিয়ে সে জড়িয়ে পড়ে সামরিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে। সেখানে তার দেখা হয় ব্রিটিশ সাংবাদিক জয়া সাহনির (নার্গিস ফাখরি) সঙ্গে, যিনি শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সত্যটা বিশ্ববাসীর সামনে আনতে চান। তাদের অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে বিক্রম আবিষ্কার করে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র— ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধিকে প্লাস্টিক বিস্ফোরক ব্যবহার করে হত্যা করার পরিকল্পনা। বিক্রম প্রাণপণ চেষ্টা করলেও, রাত ১০টা ১০ মিনিটে এক এলটিটিই আত্মঘাতী হামলাকারী রাজীব গান্ধিকে হত্যা করে, যখন তিনি তার গলায় মালা পরাতে ঝুঁকে পড়েছিলেন।জন আব্রাহাম একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার মতে এই সিনেমাটি  “দর্শকরা দেখার সুযোগ পাবে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসকে পাল্টে দেওয়া এক বিষ্ময়কর ঘটনা,যা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছিলো।কারণ এখানে সিনেমাটি যে বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরি, তা বোঝানো হয়েছে (রাজীব গান্ধি হত্যাকাণ্ড)।ভারত ও শ্রীলঙ্কা ভিত্তিক এই চলচ্চিত্রটি একটি রাজনৈতিক গুপ্তচর থ্রিলার, যার পটভূমি শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ।তার ভাষায়, পরিচালক সুজিত সরকার তাকে মাদ্রাস ক্যাফের গল্পটি প্রথম শোনান ২০০৬ সালে, তবে তখন তা নির্মাণ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন,“আমাদের আগের ছবির পর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যেখানে শুরু করেছিলাম সেখান থেকেই আবার শুরু করব। মাদ্রাস ক্যাফে–এর পেছনের গল্প এটিই।”

পরিচালক সুজিত সরকার চলচ্চিত্র মুক্তির পর সংবাদমাধ্যমকে বলেন,“যদি আমি এই চিত্রনাট্য অন্য কারও কাছে নিয়ে যেতাম, তারা নিশ্চয়ই এটি ফিরিয়ে দিত, কারণ এর বিষয়বস্তু অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমি কারও নাম বলতে চাই না, কিন্তু অন্তত তিনজন পরিচালক ইতোমধ্যেই এই চিত্রনাট্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কেউই এই ছবিটি প্রযোজনা করতে রাজি হননি... জন আব্রাহাম ও ভায়াকম ১৮ মোশন পিকচার্সের পক্ষে এমন সাহসী একটি প্রকল্পের দায়িত্ব নেওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়।”সুজিত সরকার আরও বলেন,“এই চলচ্চিত্রটি মূলত কল্পকাহিনি, তবে এটি বাস্তব ঘটনার ওপর গবেষণার ভিত্তিতে নির্মিত। এর অনেকাংশ বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে মিল রয়েছে - বিশেষ করে গৃহযুদ্ধ এবং এক সশস্ত্র সংগঠনের মতাদর্শ নিয়ে।চলচ্চিত্রটির প্রাথমিক নাম ছিল ‘জাফনা’, যা শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের একটি শহরের নাম।পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘মাদ্রাস ক্যাফে’ রাখা হয়, কারণ গল্পে দেখানো হয়েছে-গান্ধী হত্যার ষড়যন্ত্রটি ঐ ক্যাফেতেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল।তবে চলচ্চিত্রে সেই ক্যাফেটির সঠিক অবস্থান কোথায়, তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি।

জন আব্রাহামকে এই সিনেমার জন্য অনেক ওজন কমাতে হয়েছিল, কারণ এসব অফিসার সাধারণ মানুষের মতোই দেখতে। তারা যখন ভিড়ের মধ্যে থাকে, তখন তাদের আলাদা করে চেনা যায় না।”জন আব্রাহামের এই সিনেমাতে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল ছবিটির জন্য লুক ঠিক করা।
বেশ অনেক চিন্তাভাবনার পর এই সিনেমার জন্য এই অগোছালো লুকটি নির্বাচিত করা হয়। অনেকেই মনে করেন এটি টম হ্যাঙ্কস থেকে অনুপ্রাণিত, কিন্তু আসলে তা নয়।”আমেরিকান মডেল থেকে অভিনেত্রী হওয়া নার্গিস ফাখরি অভিনয় করেছেন জয়া সাহনি চরিত্রে, যিনি জাফনায় অবস্থানরত একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক। পরিচালক এই ভূমিকায় এমন একজন অভিনেত্রী চেয়েছিলেন, যিনি দেখতে ভারতীয় হলেও ইংরেজি উচ্চারণে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। সেই কারণেই এই চরিত্রের জন্য ফাখরিকে বেছে নেওয়া হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই ছিল তার প্রথম চলচ্চিত্র যেখানে তার কণ্ঠ অন্য কেউ ডাব করেনি।প্রথমে এই চরিত্রে ফ্রিদা পিন্টোকে নির্বাচিত করা হয়েছিল, কিন্তু পূর্বনির্ধারিত কাজের কারণে তিনি প্রকল্পটি থেকে সরে দাঁড়ান।অন্যদিকে পরিচালক সুজিত সরকার প্রথমে মডেল শীতল মল্লার-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তবে বিষয়টি সফল না হওয়ায় নতুন মুখ রাশি খান্নাকে নেওয়া হয়, যার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটান।এছাড়াও ছবিটিতে আরও কয়েকজন অপ্রফেশনাল অভিনেতা ছিলেন—যেমন কুইজ মাস্টার সিদ্ধার্থ বসু, চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রকাশ বেলাওয়াড়ি, এবং সাংবাদিক দিবাং।

মাদ্রাস ক্যাফে চলচ্চিত্রটির শুটিং হয়েছে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, লন্ডন ও ভারতে। চলচ্চিত্রে দেখানো শ্রীলঙ্কার দৃশ্যগুলো আসলে ভারতে ধারণ করা হয়েছে, যেখানে জাফনা শহর এবং শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন এলাকা নতুনভাবে নির্মাণ করে সাজানো হয়েছিল। একটি মিডিয়া সাক্ষাৎকারে পরিচালক সুজিত সরকার তৎকালীন সময়ে চলচ্চিত্র মুক্তির পর  বলেন, “আমরা জানতাম, শ্রীলঙ্কায় গিয়ে শুটিং করা সম্ভব নয়। তাই আমরা বেশিরভাগ দৃশ্য ধারণ করেছি তামিলনাড়ু ও কেরালায়, যেগুলোকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের মতো করে সাজানো হয়েছে। ছবির দ্বিতীয় অংশটি ভারতের প্রেক্ষাপটে, যেখানে মূলত রাজনৈতিক গল্প দেখানো হয়েছে।” চলচ্চিত্রটির প্রথম ধাপের শুটিং হয় দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে।দ্বিতীয় ধাপের শুটিং অনুষ্ঠিত হয় মুম্বাই, ভারতের বাইরের কিছু স্থানে এবং দক্ষিণ ভারতের আশপাশে।তাছাড়াও একাধিক গৃহযুদ্ধের দৃশ্য ধারণ করা হয় ব্যাংককে। কারণ ভারতে হালকা মেশিনগান ব্যবহার করে গুলির দৃশ্য ধারণের অনুমতি ছিল না।এই দৃশ্যগুলোর জন্য আসল AK-47, 9mm বেরেটা এবং M60 বন্দুক ব্যবহার করা হয়েছিল, যার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নেওয়া হয়।মাদ্রাজ ক্যাফে সিনেমার ট্রেইলার মুক্তির পর থেকেই তামিলনাড়ুতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়।চলচ্চিত্রে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের বিদ্রোহীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে—এই অভিযোগে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় কয়েকটি রাজনৈতিক দল- নাম তামিলার পার্টি, পট্টালি মাক্কাল কাচ্চি (PMK-Pattali Makkal Katchi) ও MDMK(Marumalarchi Dravida Munnetra Kazhagam)- অভিযোগ তোলে যে ছবিটিতে লিবারেশন টাইগারস অব তামিল ইলম (LTTE-Liberation Tigers of Tamil Eelam)-কে সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তামিল জনগোষ্ঠীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।

তামিল রাজনীতিক সীমান ও ভাইকো ছবিটির নিষেধাজ্ঞা দাবি করেন, অন্যদিকে দ্রাবিড় মুনেত্র কড়গম (DMK-DMK- Dravida Munnetra Kazhagam) নেতা এম. করুণানিধি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান-  যদি শ্রীলঙ্কান তামিলদের অপমান করা হয়ে থাকে, তবে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।তামিলনাড়ুর কয়েকটি সংগঠন ছবিটিকে তামিল-বিরোধী আখ্যা দিয়ে নিষেধাজ্ঞার দাবি জানায়। তাদের মতে, ছবিটি প্রয়াত  লিবারেশন টাইগারস অব তামিল ইলম (LTTE-Liberation Tigers of Tamil Eelam) নেতা প্রভাকরণকে খলনায়ক হিসেবে দেখিয়েছে।

একটি সাক্ষাৎকারে এই অভিযোগের জবাবে জন আব্রাহাম বলেন, “আমি সবার মতামতকে শ্রদ্ধা করি, তবে সেন্সর বোর্ডের উপরে কেউ নয়। সৃজনশীলতাকে বন্দুকের মুখে আটকে রাখা যায় না।”বিতর্কের মধ্যেই মাদ্রাস হাইকোর্ট ছবিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে অস্বীকার করে, তবে নির্দেশ দেয় যে তামিল সংস্করণটি সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া মুক্তি পাবে না। পরবর্তীতে সেই অনুমোদন সংগ্রহ করা হয়।

অপরদিকে মাদ্রাস হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চ চলচ্চিত্রটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আবেদনটি খারিজ করে দেয়।তবে একই সঙ্গে, তামিলনাড়ুতে ছবিটি নিষিদ্ধ করার জন্য দায়ের করা অনুরূপ আরেকটি আবেদন গৃহীত হয়—যেখানে চলচ্চিত্রটির সেন্সর বোর্ডের (CBFC-Central Board of Film Certification) অনুমোদন বাতিল করা এবং পরিচালক, প্রযোজক, তামিলনাড়ুর পুলিশ মহাপরিদর্শক (DGP- Director General of Police) ও সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নোটিশ পাঠানোর নির্দেশ চাওয়া হয়। মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২১ আগস্ট।

আবেদনে আরও দাবি করা হয় যে, শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে গোপনে ছবিটির অর্থায়ন করেছেন, যাতে গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সংঘটিতমানবাধিকার লঙ্ঘনকে বৈধতা দেওয়া যায়।তবে ছবির প্রচারণাকালীন এক অনুষ্ঠানে জন আব্রাহাম রাজাপাকসে কর্তৃক চলচ্চিত্রে অর্থায়নের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন।যদিও ছবিটির বিরুদ্ধে তামিল প্রবাসী ও কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিবাদ চলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত মাদ্রাজ ক্যাফে মুক্তি পায় এবং সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে এর রাজনৈতিক বাস্তবতা, সংবেদনশীলতা ও নির্মাণগুণের জন্য।

মাদ্রাস ক্যাফে মুক্তির পর সমালোচকদের কাছ থেকে ভালো প্রশংসা পেয়েছিল। ছবিটি বক্স অফিসে গড়ের চেয়ে ভালো ব্যবসা করেছিল।
এছাড়াও এই ছবিটি ৬১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে নীহার রঞ্জন সামাল এবং বিষ্বদীপ চ্যাটার্জি সেরা সাউন্ড (অডিওগ্রাফি) বিভাগে পুরস্কার জিতেছিল।


২.  ধুম- Dhoom (IMDb RATING- 6.6/10)

২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ধুম বলিউডে একদম নতুন ধাঁচের স্টাইলিশ অ্যাকশন ফিল্ম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। মোটরবাইক স্টান্ট, হাই-স্পিড চেজ, আধুনিক অ্যাকশন সিকোয়েন্স- এগুলো সেই সময়ের দর্শকদের জন্য ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা।তার চেয়েও বড় কথা এই সিনেমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলো জন আব্রাহাম অভিনীত ক্যারিশমাটিক ভিলেন কবির চরিত্রটি, যা সিনেমার অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল।জন আব্রাহাম অভিনীত কবীর চরিত্রটি ছিলো “কুল” ভিলেন-যিনি খারাপ কাজ করেও দর্শকদের কাছে স্মার্ট ও আকর্ষণীয় লেগেছিলো। এর মাধ্যমেই বলিউডে “স্টাইলিশ ভিলেন” ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।এটা হিন্দি সিনেমার অন্যতম সেরা ভিলেন চরিত্রগুলোর একটি।


ধুম সিনেমা জন আব্রাহামের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বললেও ভুল হবে না। জিসম সিনেমা দিয়ে অভিষেক হলেও ধুম সিনেমার মাধ্যমে বলিউড পাড়ায় তার খ্যাতি এনে দেয়। এই সিনেমাটিতে জন আব্রাহামকে দ্বিতীয়বারের মতো খল চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়। প্রথমবার তাকে খল চরিত্রে দেখা গিয়েছিল (২০০৪ সালে )একই বছর মুক্তি পাওয়া এ্যাতবার সিনেমায়। নায়কের পাশাপাশি যে খল চরিত্রেও যে তিনি সমান পারদর্শী তা তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন ভিন্নভাবে। শুধু ধুমই নয়, এই সিনেমার পরবর্তীতে তিনি বেশ কিছু সিনেমাতেও খলনায়কের চরিত্রে দেখা গিয়েছিলো তাকে।তাছাড়াও সিনেমাটি মুক্তির পরপরই বাইকের বিক্রি হু হু করে বেড়ে যায়, জন আব্রাহামের চরিত্র কবিরের লম্বা চুলের হেয়ারস্টাইলও তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এছাড়াও এই সিনেমার মাধ্যমে সে বছর সেরা খলনায়কের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট পারফরম্যান্স ইন আ নেগেটিভ রোল-এ মনোনীত হন এবং অন্যদিকে আইআইএফএ অ্যাওয়ার্ডস জিতে নেয়।

উল্লেখ্য, ধুম সিনেমায় জন আব্রাহামের বেশকিছু আইকনিক সংলাপ ছিলো। তার মধ্যে Mere rules koi nahi todh sakta ... main bhi nahi (No one can break my rules ... not even me) এই সংলাপটি বেশ জনপ্রিয়।তবে আশ্চর্য্য বিষয় হলো, এই সিনেমায় জন আব্রাহাম ছিলেন না প্রথম পছন্দ‌।যশ চোপড়া এই চরিত্রে নিতে চেয়েছিলেন সঞ্জয় দত্তকে। তবে সঞ্জয় দত্তের হাতে তখন সময় ছিল না, ফলে তাকে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে আদিত্য চোপড়া সিদ্ধান্ত নেন, চরিত্রটিতে একজন তরুণ অভিনেতাকে নেওয়া হবে, আর সেইভাবেই জন আব্রাহামকে বেছে নেওয়া হয়।

এই সিনেমাটিতে রিমি সেন অভিনয় করেছিলেন সুইটি দীক্ষিত চরিত্রে, যিনি অভিষেক বচ্চনের চরিত্র জয়ের স্ত্রী। সিনেমাটি বিশ বছর বর্ষপূর্তি 
উপলক্ষে একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “এটাই ছিল প্রথম সিনেমা যেখানে বাইকে করে ডাকাতির গল্প দেখানো হয়েছিল। এর আগে এমন কনসেপ্ট শুধু হলিউডেই দেখা যেত। এটা ছিল যশরাজ ফিল্মসের প্রথম অ্যাকশন সিনেমা।”সিনেমাটি বিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে ধুম–এর অ্যাকশন ডিরেক্টর অ্যালান আমিন স্মরণ করেন ছবির কিছু রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। তিনি জানান, ধুম ও ধুম ২–দুটিরই অ্যাকশন পরিচালনা করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে জটিল ও বিপজ্জনক ছিল চলন্ত ট্রেনের বগির মাঝখানে সুপারবাইক লাফানোর দৃশ্যটি। এই দৃশ্যটি সম্পূর্ণ বাস্তবভাবে শ্যুট করা হয়েছিল, কোনো ভিএফএক্স ব্যবহার করা হয়নি। ট্রেনের গতি ও বাইকের সময় মিলিয়ে এই দৃশ্য ধারণ করতে অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা হয়েছিল দুইজন পেশাদার স্টান্ট রাইডার।অ্যালান আমিন জানান, পরিচালক সঞ্জয় গাধভী নিজে একজন বাইকপ্রেমী ছিলেন এবং চেয়েছিলেন ছবির প্রতিটি স্টান্ট বাস্তবধর্মী হোক। জন আব্রাহাম ও অভিষেক বচ্চনের জন্য বিশেষ হেলমেট ও ক্যামেরা সেটআপ তৈরি করা হয়েছিল যাতে তাদের মুখ ক্লোজআপে স্পষ্ট দেখা যায়।প্রথমে ধুম-এ গাড়ি ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু প্রযোজক আদিত্য চোপড়া ও পরিচালক মনে করেন বাইক চেজ দৃশ্য দর্শকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হবে। পরবর্তীতে তারা বেছে নেন তিনটি বাইক—সুজুকি হায়াবুসা (১৩০০ সিসি), সুজুকি জিএসএক্স-আর৬০০ এবং সুজুকি ব্যান্ডিট (১২০০ সিসি)। এই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ধুম–কে ভারতীয় সিনেমায় বাইক স্টান্ট কালচারের প্রতীক করে তোলে।

অভিনেতা অভিষেক বচ্চনের জন্যও এই সিনেমাটি ছিল ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। একাধিক ব্যর্থতার পর ধুম তাকে এনে দেয় তার প্রথম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য।সিনেমার টাইটেল গান ধুম মাচালে–এর দুটি ভার্সন ছিল-একটিতে ছিলেন ঈশা দেওল, আরেকটি গেয়েছিলেন বিদেশি গায়িকা টাটা ইয়াং। শোনা যায়, টাটা ইয়াং “ধুম” শব্দটি ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারতেন না, তিনি বারবার “ডুম” বলতেন। শেষ পর্যন্ত সংগীত পরিচালক প্রীতম তার ভার্সনে “ডুম” শব্দটিই রেখে দেন। গানটি ছিল বিশাল হিট।


৩.  নো স্মোকিং- No Smoking (IMDb RATING- 7.3/10)

এই সিনেমাটি জনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরীক্ষামূলক কাজগুলোর একটি।এটি বাণিজ্যিকভাবে সফল না হলেও সমালোচকদের চোখে এটি ছিলো জন আব্রাহামের “অভিনয় পরিণতি”র প্রতীক। ২০০৭ সালে পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ বানিয়েছিলেন এক অনন্য সিনেমা-‘নো স্মোকিং’, যা প্রখ্যাত লেখক স্টিফেন কিং-এর ছোটগল্প ‘Quitters Inc.’ অবলম্বনে নির্মিত। সিনেমাটি ছিল সাধারণ বলিউড ছবির চেয়ে একেবারেই আলাদা, সিনেমায় স্বপ্নময় দৃশ্য, বিভ্রান্তিকর কাহিনি ও রহস্যময় আবহ তৈরি করে একটি অন্ধকার ও প্রতীকী জগত। এই অনন্য শৈলী আন্তর্জাতিক দর্শকদের মুগ্ধ করলেও, ভারতীয় দর্শকদের কাছে এটি ছিল অত্যন্ত ভিন্নধর্মী — তাই দেশীয় বক্স অফিসে ছবিটি সফল হয়নি।


নো স্মোকিং-এর গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘কে’ — জন আব্রাহাম অভিনীত এক আত্মকেন্দ্রিক, অহংকারী চেইন স্মোকার। নিজের স্ত্রী অঞ্জলি (আয়েশা তাকিয়া), বন্ধু কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শেও তার কোনো আগ্রহ নেই। সিনেমার প্রায় প্রতিটি দৃশ্যে দেখা যায়—সে সিগারেট ধরাচ্ছে, টানছে, অথবা আয়নায় নিজের চেহারা দেখছে। এমনকি একবার যখন এক বৃদ্ধা মহিলার সামনে ধোঁয়া ছেড়ে দেন, তিনি নির্লজ্জভাবে বলেন-“আপনি সিঁড়ি ব্যবহার করুন।”স্ত্রীর বিচ্ছেদের হুমকি ও বন্ধুদের পরামর্শে সে যায় ‘প্রয়োগশালা’ নামের এক রহস্যময় রিহ্যাব সেন্টারে, যার নেতৃত্বে আছেন বাবা বেঙ্গালি (পরেশ রাওয়াল)। বাহ্যিকভাবে আধ্যাত্মিক হলেও, তিনি মূলত কঠোর এক নিয়ন্ত্রণবাদী, যিনি শাস্তি ও ভয়ের মাধ্যমে ধূমপায়ীদের “সংশোধন” করেন। ধীরে ধীরে “কে” বুঝতে পারে, এই রিহ্যাব কেবল অভ্যাস ছাড়ানোর কেন্দ্র নয়—এটি এক মানসিক কারাগার, যেখানে ভয়, অপরাধবোধ ও শাস্তির ভেতর মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।বাবা বেঙ্গালির চরিত্রে অনুরাগ কাশ্যপ যেন তুলে ধরেছেন কর্তৃত্বের মুখোশধারী এক সিস্টেমকে—যা মানুষকে স্বাধীন চিন্তা থেকে বিরত রাখে। অনেকে মনে করেন, এটি কাশ্যপের নিজের সেন্সরবোর্ডের সঙ্গে সংঘাতের প্রতীকী প্রতিফলন। কারণ, নো স্মোকিং তৈরির আগে তাঁর দুটি চলচ্চিত্র—পাঁচ ও ব্ল্যাক ফ্রাইডে—সেন্সর কর্তৃপক্ষের বাধার মুখে পড়েছিল।

ফলে, ছবিটি শুধু এক ধূমপায়ীর গল্প নয়; বরং স্বাধীনতা, নিয়ন্ত্রণ ও আত্মপরিচয়ের সংকট নিয়ে এক প্রতীকী যাত্রা।

আজ ‘নো স্মোকিং’কে ভারতীয় সিনেমার এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলকারী ছবি হিসেবে দেখা হয়। এটি দেখিয়েছে, বলিউডেও ভিন্নধর্মী গল্প ও পরীক্ষামূলক উপস্থাপনার জায়গা রয়েছে।সত্যি বলতে, অনুরাগ কাশ্যপের ২০০৭ সালের নো স্মোকিং সিনেমাটি নিয়ে খুব বেশি লোক কথা বলে না, এমনকি সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যেও না।তার আগের দুটি সিনেমা পাঁচ (২০০৩) ও ব্ল্যাক ফ্রাইডে (২০০৪) নানা বাধার কারণে মুক্তি পায়নি বা বিলম্বিত হয়েছিল, কিন্তু নো স্মোকিং কোনো ঝামেলা ছাড়াই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল।এখন অনেকেই বুঝতে শুরু করেছেন কাশ্যপ আসলে কী বলতে চেয়েছিলেন-স্বাধীনতা, পছন্দের অধিকার, এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস নিয়ে।তবে বর্তমান সময়ে এসে এটি আলোচনায় আসে মূলত কারণ-এটি বলিউডের প্রচলিত সিনেমার ধাঁচ থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। যদিও এমন ভিন্নধর্মী, সাহসী সিনেমা তখন ধীরে ধীরে প্রশংসা পাচ্ছিল, তবে অনেকেই নো স্মোকিং বুঝে উঠতে পারেননি।সিনেমাটি প্রমাণ করে, অনেক সময় সবচেয়ে অর্থবহ গল্পগুলো বলা হয় অস্বাভাবিক উপায়ে, যদিও প্রথম দর্শনে সেগুলো বোঝা সহজ নয়।


২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া নো স্মোকিং অনুরাগ কাশ্যপের ক্যারিয়ারে অন্যতম বিতর্কিত হলেও এটি প্রমাণ করেছিল যে, অ্যাকশন ও রোমান্টিক চরিত্রের বাইরে জন আব্রাহাম এক্সপেরিমেন্টাল চরিত্রেও সমান পারদর্শী।এক সাক্ষাৎকারে অনুরাগ জানান, তিনি রিকশায় বসেই ছবির গল্পটি ভেবেছিলেন-এক আত্মকেন্দ্রিক, নরসিসিস্টিক ধূমপায়ীর গল্প, যে নিজের বিয়ে টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে যায় এক রহস্যময় রিহ্যাব সেন্টারে। কাশ্যপের ভাষায়, “এটি ছিল আমার নিজের জীবনের প্রতিফলন।”তখন তাঁর প্রথম ছবি পাঁচ মুক্তি পায়নি, আর ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেন্সর বোর্ডে আটকে ছিল। সেই মানসিক চাপের মধ্যেই তিনি ‘নো স্মোকিং’-এর ধারণা পান।তিনি জানান, “রিকশায় জন আব্রাহামের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, আর ভাবছিলাম-সবাই যখন বলে জন ভালো অভিনেতা নয়, তখন যদি তাঁকেই নিয়ে একটা ভিন্নধর্মী গল্প লিখি!”জনের সঙ্গে দেখা হলে অনুরাগ তাঁকে গল্পটি শোনান। প্রথমে অবাক হলেও জন ঝুঁকি নিয়ে রাজি হন। তখনও চিত্রনাট্য লেখা হয়নি-সবটাই ছিল কাশ্যপের মাথায়।জন তাঁকে উৎসাহ দেন, কিছু অর্থও দেন লেখার জন্য। পরে কাশ্যপ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নো স্মোকিং ও রিটার্ন অব হনুমান–এর চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন।


৪.  গারাম মাসালা- Garam Masala (IMDb RATING- 6.8/10)

অ্যাকশন ও সিরিয়াস চরিত্রের বাইরে জন এইবার ধরা দেন নিজেকে কমেডি অবতারে।২০০৫ সালে প্রিয়দর্শন পরিচালিত 'গারাম মাসালা' চলচ্চিত্র দিয়ে জন আব্রাহাম তাঁর ক্যারিয়ারে‌র প্রথম কমেডি সিনেমায় অভিনয় করেন।সাম অরোরা চরিত্রে তার নিখুঁত টাইমিং ও কমেডিক এক্সপ্রেশন দর্শকদের মন জয় করে।অক্ষয় কুমারের সঙ্গে জন আব্রাহামের অনস্ক্রিন রসায়ন ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ। তাঁদের কেমিস্ট্রি সিনেমাটিকে বক্স অফিসে সুপারহিট করে তোলে। এটি প্রমাণ করে জন শুধু সিরিয়াস রোলেই নয়, কমেডিতেও সমান দক্ষ, তাই এটিও তার এক্সপেরিমেন্টাল অভিনয়ের তালিকায় আরও একটি সংযোজন।গল্পে যুক্তি কম, তবে উপস্থাপনায় প্রাণবন্ততা রয়েছে। ছবির মূল চরিত্র ম্যাক (অক্ষয় কুমার), এক অলস ফটোগ্রাফার, যার হাতে এসে যায় এক খালি ফ্ল্যাট এবং তিন সুন্দরী এয়ার হোস্টেস — প্রীতি, সুইটি ও পূজা। তিনজনের সঙ্গেই সে প্রেমের ভান করে, অথচ সে নিজেই বাগদত্তা অঞ্জলির (রিমি সেন) সঙ্গে।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে ম্যাকের পুরোনো বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী স্যাম (জন আব্রাহাম)।আর তাদের জীবনে বিশাল গোলমাল তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পাগলাটে রাঁধুনি (প্যারেশ রাওয়াল), যে হাসির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।নীরজ ভোরার সংলাপ এই ছবির প্রাণ। তাঁর রসিকতা ও ওয়ান-লাইনার অনেক সাধারণ দৃশ্যকেও উজ্জ্বল করে তুলেছে।তবে প্রীতমের সঙ্গীত তেমন ছাপ ফেলতে পারেনি, যদিও ‘আদা’ ও ‘কিস মি বেবি’ গান দু’টি ভিজ্যুয়ালভাবে আকর্ষণীয়।তাছাড়াও এই সিনেমায় ব্যবহৃত গান “Ada” নেওয়া হয়েছে আমর দিয়াব-এর গান “Ana”থেকে, অন্যদিকে আরেকটি গান“Dil Samundar”নেওয়া হয়েছে তারকান-এর জনপ্রিয় গান “Kuzu Kuzu” থেকে।


ছবিটি আসলে প্রিয়দর্শনের মালয়ালম চলচ্চিত্র ‘বোয়িং বোয়িং’–এর রিমেক, যা আবার ১৯৬৫ সালের হলিউড ছবি ‘Boeing Boeing’ থেকে অনুপ্রাণিত।‘গরম মসলা’-র প্রায় সব দৃশ্যই সেই ১৯৬৫ সালের ছবিটির মতোই দেখতে। প্রথমে স্যাম চরিত্রের জন্য সাইফ আলি খানকে নেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল।এর পাশাপাশি অক্ষয় খন্নাকেও একই চরিত্রের জন্য বিবেচনা করা হয়েছিল।অক্ষয় কুমারের চরিত্রটি তৈরি করা হয়েছে Boeing Boeing (1965) সিনেমায় টনি কার্টিসের চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে।ঠিক তেমনই, জন আব্রাহামের চরিত্রটি তৈরি হয়েছে সেই সিনেমার জেরি লুইসের চরিত্র থেকে।আর প্যারেশ রাওয়ালের চরিত্রটি এসেছে সেই সিনেমার থেলমা রিটার অভিনীত চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে।

৫.  ওয়াটার- Water (IMDb RATING- 7.6/10)

আমরা সাধারণত জন আব্রাহামকে চিনি একজন স্টাইলিশ বাইক রাইডার ও অ্যাকশন হিরো হিসেবে, যাকে ভারতীয় তরুণরা আদর্শ মনে করে। কিন্তু ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া দীপা মেহতার পরিচালনায় Water সিনেমায় জনকে দেখা যায় একেবারে অন্যরকম এক চরিত্রে-নাম নারায়ণ,একজন গম্ভীর, চিন্তাশীল তরুণ, যে বারাণসীর ঘাটে বসে বিধবাদের নিঃসঙ্গ জীবনের কষ্ট ও সমাজের নিষ্ঠুরতা নিয়ে ভাবছে।এ সিনেমায় তার অভিনয় ছিল সংযত, মানবিক ও গভীর অনুভূতিপূর্ণ। ‘Water’ একটি আন্তর্জাতিক প্রশংসিত সিনেমা, যা ভারতের সমাজে বিধবা নারীর অবস্থান ও ধর্মীয় কুসংস্কার তুলে ধরে। এটি তাকে শুধু বলিউড নয়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমহলেও পরিচিত করে তোলে।যা তাঁকে একজন নতুন অভিনেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে।

জন আব্রাহাম Water সিনেমা দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, তিনি নিজের অভিনয়জীবনে “টাইপকাস্ট” ইমেজে স্থায়ী থাকার জন্য আসেননি। তিনি এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যা তাঁকে একজন “চিন্তাশীল অভিনেতা” হিসেবে তুলে ধরেছিলো-যা শুধু বাণিজ্যিক সিনেমা নয়, বরং তার অভিনয় অর্থবহ গল্পের অংশ হয়ে থাকবে।


Water সিনেমায় জন আব্রাহাম তাঁর চেহারা ও স্টাইল ভুলে গিয়ে এক গভীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।জন একবার সাংবাদিক প্রিন্সি জৈনের সাক্ষাৎকারে বলেন, পরিচালক দীপা মেহতা তাঁকে সিনেমার শুটিং চলাকালীন স্পষ্টভাবে বলেছিলেন-“তুমি জন আব্রাহামকে ভুলে যাও, এখন শুধু তোমার চরিত্রের মানুষটিকে বাঁচাও"।তাই জন তাঁর পোশাক, উচ্চারণ, চলাফেরা, ও আচরণ—সবকিছু বদলে ফেলেছিলেন।তিনি এমনকি সংস্কৃত শ্লোক শেখেন এবং বাঁশি বাজানোও রপ্ত করেন, যাতে চরিত্রটি বাস্তব মনে হয়।সিনেমাটি আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তি পাওয়ার পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়, যেমন ২০০৫ সালের টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভাল-এ।তিনি চান তাঁর প্রতিটি সিনেমা যেন শুধু বিনোদন নয়, কিছু অর্থবহ বার্তাও বহন করে। ওয়াটার সিনেমাকে ঘিরে জন একটি বিশেষ স্মৃতি শেয়ার করেন-২০০৬ সালের অস্কার অনুষ্ঠানের একটি ঘটনা।সেই অনুষ্ঠানে তাঁর দেখা হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ এবং অস্কারজয়ী অভিনেত্রী শার্লিজ থেরন-এর সঙ্গে।তারা উভয়েই, জনের অভিনীত দীপা মেহতার সিনেমা “Water” দেখে খুব প্রশংসা করেছিলেন।অথচ, আফসোসের বিষয় আমার নিজের দেশে কেউ সেই সিনেমাটা একদিনও দেখেনি।”তবে জন বলেন, যদিও তিনি ভারতে ফিরে আবার গ্ল্যামারাস ও অ্যাকশনধর্মী সিনেমা করেন। কিন্তু “আমি চাই মানুষ আমাকে এমন একজন অভিনেতা হিসেবে চিনুক, যে প্রতিটি ছবিতে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে সাহস করেছে। আমি এটা করেছি অনুরাগ কাশ্যপের জন্য। আমি এইটা ইমতিয়াজ আলির জন্য, এবং দীপা মেহতার পরবর্তী সিনেমার জন্যও করব।”

দীপা মেহতা প্রথমে Water সিনেমায় শাবানা আজমি, নন্দিতা দাস, আর অক্ষয় কুমারকে নিয়ে কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন।ছবির শুটিং হওয়ার কথা ছিল বারাণসীতে, কিন্তু তাঁর আগের সিনেমা Fire নিয়ে ধর্মীয় বিতর্ক ও প্রতিবাদের কারণে শুটিং বন্ধ হয়ে যায়।পরে তিনি আবার সিনেমাটি নতুন করে শুরু করেন, এবার নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে শ্রীলঙ্কায় শুটিং করেন। Water সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল এবং অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনীত হয়েছিল।


৬.  কাবুল এক্সপ্রেস- Kabul Express (IMDb RATING- 6.8/10)

সিনেমাটি মুক্তি পায় ২০০৬ সালে।সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে, যেখানে দুই ভারতীয় সাংবাদিক- সোহেল খান(জন আব্রাহাম) এবং জয় কাপুর(আর্শাদ ওয়ারসি)-আফগানিস্তানে গিয়ে তালেবান শাসনের পতনের পর বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে আসে। সেখানে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় একজন আমেরিকান সাংবাদিক (লিন্ডা) এবং স্থানীয় আফগান গাইড (খান আফগান)।
কিন্তু হঠাৎই তাদেরকে অপহরণ করে এক পাকিস্তানি সেনা, যিনি আসলে তালেবানের এক সদস্য এবং নিজের দেশে ফিরে যেতে চান।

এরপর শুরু হয় তাদের ৪৮ ঘণ্টার এক বিপজ্জনক যাত্রা-কাবুলের ধ্বংসস্তূপ, যুদ্ধের স্মৃতি আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে।এই যাত্রায় তারা বুঝতে শেখে যুদ্ধের মানবিক দিক, শত্রু-মিত্রের সীমারেখা কতটা জটিল, আর কিভাবে সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হয়ে ওঠে।জনের সংযত ও বাস্তবধর্মী অভিনয় দর্শকদের সহানুভূতি অর্জন করে।

২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কাবুল এক্সপ্রেস ছিল পরিচালক কবির খানের প্রথম গল্পভিত্তিক চলচ্চিত্র।আফগানিস্তানে দীর্ঘদিন তথ্যচিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এই সিনেমার গল্প গড়ে তোলেন। কাবুলে এই সিনেমার শুটিং চলাকালে পরিচালক কবির খান ও তার পুরো ইউনিটকে তালেবান একটি “পাঁচজনের মৃত্যুদল” পাঠিয়েছিল ছবির শুটিং থামাতে।জন আব্রাহাম এক সাক্ষাৎকারে স্মরণ করেন, আফগানিস্তানে কাজের সময় তাঁরা একদিকে যেমন বিপদের মুখোমুখি হয়েছিলেন, অন্যদিকে দেখেছিলেন দেশটির মানুষের অসাধারণ আতিথেয়তা ও মানবিকতা। তাঁর ভাষায়, “আফগানরা পৃথিবীর সবচেয়ে দয়ালু ও ভালোবাসাপূর্ণ মানুষ।” তিনি বলেন, এই সিনেমাটি ভারতের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিনিধিত্ব করেছে—এটি ছিল সত্যিকারের গর্বের মুহূর্ত। কারণ এটি তালেবান শাসনের পতনের পর আফগানিস্তানে সম্পূর্ণভাবে শুট করা একমাত্র সিনেমা। এর আগে কোনো সিনেমা সেখানে শুট হয়নি।তাছাড়াও সবচেয়ে ভালো লেগেছিল এই দেখে যে, আমরা যখন কাবুল এক্সপ্রেস নিয়ে টরোন্টোতে গেলাম, তখনও মানুষ আমাকে Water-এর জন্য চিনতে পেরেছে।

বিতর্ক সত্ত্বেও কাবুল এক্সপ্রেস আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা কুড়ায়। টরোন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর সমালোচকরা একে যুদ্ধ-পরবর্তী আফগানিস্তানের বাস্তবতার সাহসী প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি জন আব্রাহামের ওয়াটারের পর কাবুল এক্সপ্রেস  ছিলো দ্বিতীয় সিনেমা, যা টরোন্টো ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধনী সিনেমা হিসেবে দেখানো হয়েছিল।শুটিং চলাকালে একাধিকবার তাঁরা বিপদের সম্মুখীন হন,তখন আফগানিস্তানে মানুষের স্বাভাবিকভাবে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। একবার রকেট হামলার ঘটনাও ঘটে তাদের কাছাকাছি এলাকায়। আফগান বিদ্রোহীদের কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকি পাওয়া সত্ত্বেও মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে পুরো সিনেমার শুটিং সম্পন্ন হয়।

কাবুল এক্সপ্রেস শুটিং সেটে সেই সময় কর্মীদের তুলনায় নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা ছিল বেশি।তবে আফগানিস্তানে ছবিটি পরে নিষিদ্ধ হয়, কারণ হাজারা সম্প্রদায়কে ঘিরে কিছু সংলাপকে দেশটির সংখ্যালঘু গোষ্ঠী অপমানজনক বলে মনে করে। আফগান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, এই কারণেই সিনেমাটি প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

৭.  ট্যাক্সি নং ৯২১১- Taxi No 9211 (IMDb RATING-7.3/10)

কমেডি থ্রিলারধর্মী চলচ্চিত্র Taxi No. 9211 এই সিনেমাটি ২০০৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল। জন আব্রাহাম, নানা পাটেকর, সমীরা রেড্ডি এবং সোনালি কুলকার্নি অভিনীত এই ছবিতে দেখা যায়। সিনেমাটির গল্প ঘুরে বেড়ায় দুই ভিন্ন জগতের মানুষকে ঘিরে— একজন রঘু (নানা পাটেকর), পেশায় ট্যাক্সিচালক, রাগী, আত্মসম্মানবোধে তীব্র এবং মধ্যবিত্ত জীবনের হতাশা বুকে চেপে থাকা এক মানুষ।অন্যজন জয় মিত্তল (জন আব্রাহাম), ধনী পরিবারের এক দাম্ভিক যুবক, যার বেপরোয়া জীবন শুধু গাড়ি, টাকা আর ক্ষমতার চারপাশে ঘোরে।একদিন ভাগ্য তাদের মুখোমুখি করে দেয়। জয় তাড়াহুড়ো করে রঘুর ট্যাক্সি ধরে এবং এই যাত্রাই তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এক দুর্ঘটনা, এক ভুল বোঝাবুঝি, আর এক ‘হারানো ডকুমেন্ট’ ঘিরে শুরু হয় শহরের রাস্তায় তীব্র ধাওয়া ও প্রতিশোধের খেলা।শেষ পর্যন্ত দুজনেই বুঝতে শেখে—জীবন কেবল প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহানুভূতি ও ক্ষমারও এক পরীক্ষা।

নানা পাটেকর বরাবরের মতোই তীক্ষ্ণ, গম্ভীর এবং আবেগে পূর্ণ এক চরিত্রে নিজেকে আবার প্রমাণ করেছেন। তার সংলাপ, দৃষ্টি, এমনকি নীরবতাতেও একটা ‘নাটকীয় ভার’ তৈরি হয় যা দর্শককে গল্পের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়।অন্যদিকে, জন আব্রাহামকে এখানে দেখা যায় এক স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক ধনী যুবকের চরিত্রে। শুরুতে তার অভিনয় খানিকটা সংযত মনে হলেও, গল্প যত এগোয়, জন ধীরে ধীরে তার চরিত্রে গভীরতা আনেন। নানা পাটেকরের মতো শক্তিশালী অভিনেতার সামনে দাঁড়িয়েও তিনি নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন—যা জনের ক্যারিয়ারে একটি বড় অগ্রগতি বলা যায়।জন আব্রাহামও তার উপস্থিতি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি কেবল “গ্ল্যামার হিরো” নন—বরং চরিত্রের গভীরতা ধরতে পারেন দক্ষতার সঙ্গেই। তাদের দুজনের মধ্যকার “ইগো ক্ল্যাশ” সিনেমার মূল চালিকাশক্তি; এবং সেই সংঘাতই ছবিটিকে এক ধরনের ‘সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার’-এ রূপ দেয়।ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন মিলন লুথরিয়া।এই সিনেমাটি হলিউডের Changing Lanes (2002) ছবির রিমেক। এখানে জন আব্রাহাম অভিনয় করেছেন বেন অ্যাফ্লেকের ভূমিকায় এবং নানা পাটেকর অভিনয় করেছেন স্যামুয়েল এল. জ্যাকসনের চরিত্রে-এর ভারতীয় সংস্করণে।

এই সিনেমাটি একই বছরে এটি তেলেগু ভাষায় Game নামে রিমেক করা হয়, এবং ২০০৯ সালে তামিল ভাষায় TN-07 AL 4777 নামে পুনর্নির্মাণ করা হয়। তাছাড়াও প্রিয়াঙ্কা চোপড়া Taxi No. 9211 সিনেমায় অতিথি চরিত্রে (cameo appearance) দেখা গিয়েছিলো।

এই সিনেমার একটি অ্যাকশন দৃশ্যে জন আব্রাহামকে নিয়ে কিছু গাড়ির ধাওয়া করার শট নেওয়ার কথা ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, শুটিং চলাকালীন জন আব্রাহামের মা রাস্তা পার হচ্ছিলেন এবং তিনি ভেবে বসেন যে তার ছেলেকে সত্যিই কেউ আক্রমণ করছে। এতে তিনি ভয় পেয়ে যান। এরপর শুটিং বন্ধ রাখা হয়, যতক্ষণ না জন তার মাকে শান্ত করেন এবং বোঝান যে এটি শুধুমাত্র একটি সিনেমার দৃশ্যের শুটিং।

অন্যদিকে নানা পাটেকর এবং সঞ্জয় দত্তের মধ্যে গভীর শত্রুতা ছিল, Taxi No. 9211 হলো একমাত্র সিনেমা যেখানে নানা পাটেকর অভিনয় করেছেন এবং সঞ্জয় দত্ত এতে বর্ণনাকারী (narrator) হিসেবে কাজ করেছেন। নানা পাটেকর একসময় শপথ করেছিলেন যে তিনি আর কখনো সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে কোনো সিনেমায় অভিনয় করবেন না, কারণ সঞ্জয়ের নাম বোম্বে বোমা বিস্ফোরণ মামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।

২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত Taxi No. 9211 ১৮তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মিলান লুথরিয়া এক সাক্ষাৎকারে কিছু অজানা তথ্য শেয়ার করেন। তিনি বলেন, এই ছবির মাধ্যমে নানা পাটেকরের অভিনয়ে প্রত্যাবর্তন ঘটে। পরিচালক মিলন লুথরিয়া জানান, Ab Tak Chhappan (২০০৪)-এর পর প্রায় দেড় বছর নানা পাটেকর কোনো সিনেমায় কাজ করেননি। তখন তিনিই প্রথম নানা পাটেকরকে এই গল্প শোনান, আর শুনেই নানা রাজি হয়ে যান কাজ করতে।

নানার পর মিলনের পছন্দ ছিলেন জন আব্রাহাম। গল্প শোনার সময় পাশে ছিলেন বিপাশা বসুও। তিনিই জনকে অনুপ্রাণিত করেন এই ছবিটি করতে। অবশেষে জন রাজি হন, এবং তাদের দুজনের বিপরীতমুখী চরিত্রের সংঘর্ষই ছবিটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।Taxi No. 9211 মুক্তির পর ভালো ব্যবসা করেছিল এবং দর্শক, প্রযোজক, বিনিয়োগকারী-সবাই সন্তুষ্ট ছিলেন। তবে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। ছবির এক দৃশ্যে সোনালি কুলকার্নি চরিত্র তার স্বামী রঘবের (নানা পাটেকর) মোবাইল নম্বর শেয়ার করে। কাকতালীয়ভাবে সেটি ছিল বাস্তব এক কলেজছাত্রী নেসি জনের নম্বর।

ছবির মুক্তির পর তার ফোনে অসংখ্য কল আসে। সিনেমায় রঘব যখন জয় মিত্তলের (জন আব্রাহাম) চাবি চুরি করে, অনেকে নেসিকে ফোন করে বলত,“রঘব শাস্ত্রী, চাবি ফেরত দে!”

অন্যদিকে জন আব্রাহাম তৎকালীন সময়ে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার এই সিনেমার প্রিয় গান হলো “এক নজর”। এটি সিনেমায় তার চরিত্রের সাথে পরিচয় দৃশ্যের গান। তিনি গানটিকে খুব সুরেলা মনে করেছেন। এছাড়াও “মুম্বাই নাগরিয়া” গানটিও তার পছন্দ।এছাড়াও তিনি বলেন, নানা পাটেকরের সাথে কাজ করার স্মৃতি ছিলো অসাধারণ। তিনি চমৎকার একজন অভিনেতা, তিনি নিজেই আমাকে বলেছেন যে তিনি তার নিজের অভিনীত Bluffmaster এবং  Apaharan সিনেমাগুলো দেখেননি, কিন্তু Taxi No. 9211 হলো সেই সিনেমা যেটি তিনি সত্যিই দেখতে চান। সাধারণত তিনি সিনেমার শুটিং শেষ করে পরের প্রজেক্টে চলে যান। কিন্তু এই সিনেমাটি নিয়ে তিনি সত্যিই কৌতূহলী যে এটি কেমন হয়েছে। এমনকি যখন তিনি পোস্টারে আমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখেন, তখন তিনিও অবাক হন—এই দুই ভিন্ন ধরণের চরিত্র একসঙ্গে এই সিনেমায় কী করছে!

Comments

    Please login to post comment. Login