সে অনেক দিন আগের কথা। ছোট একটা গ্রামে মেঘা নামের একটি মেয়ে তার বাবা আর দাদিমার সঙ্গে বাস করত। তার একটি কঠিন রোগ ছিল। তার জন্মের পরপরই তার মা মারা যায়। তার বাবা সারাক্ষণ কাজে ব্যস্ত থাকত। সে তার দাদি-মায়ের সঙ্গে সময় কাটাত।
একদিন রাতে সে তার দাদি-মাকে গল্প শোনানোর জন্য বায়না করে। তার দাদিমা তাকে একটি রাজকন্যার গল্প শোনায়। রাজকন্যা নাকি একটি চিঠি লিখে সেই চিঠিটি বোতলের ভেতরে ভরে রাজপ্রাসাদের পাশের একটি পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে দিত। পরে সেই চিঠিটি রাজপুত্র খুঁজে পায় আর রাজকন্যাকে তার প্রাসাদে নিয়ে যায়।
সে গল্প শুনে মেঘার খুবই ভালো লাগে এবং তারও চিঠি লিখে বোতলে ভরে পানিতে ভাসানোর ইচ্ছা জাগে মনে। তাই পরের দিন সকালে মেঘাও একটি চিঠি লিখে তার ওষুধের বোতলে ভরে স্কুল ব্যাগে রেখে দেয়। তারপর স্কুলে যাওয়ার সময় সেই বোতলটি একটি পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে দেয়। পরের দিন আবারও একটি চিঠি লিখে তার ওষুধের বোতলে ভরে পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে দেয়। সে প্রতিদিন এভাবেই চিঠি লিখত আর বোতলে ভরে পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে দিত।
এভাবেই কেটে যায় কয়েক মাস। কিন্তু সে কোনো রাজপুত্রের দেখা পেল না।
মেঘাও আস্তে আস্তে বড় হয়, তার রোগটাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একদিন সে মনমরা হয়ে বাগানে বসে ছিল। তার দাদিমা বিষয়টা লক্ষ্য করলেন আর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হলো, মন খারাপ করে বসে আছিস কেন?”
তারপর সে দাদি-মায়ের কাছে সবকিছু খুলে বলল। তার দাদিমা শুনে মুচকি হেসে বললেন,
“ওহ, এই ব্যাপার! চিন্তা করিস না, একদিন ঠিকই আসবে রাজপুত্র।”
একদিন শুভ নামের একটি ছেলে তার বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। ঘুরতে ঘুরতে তারা একটি পুকুরের পাশে দাঁড়ায়। তারা পুকুরের পাশে বসে গল্প–আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ তার বন্ধুর চোখ পড়ল পুকুরের পানিতে। তার বন্ধু বলল,
“শুভ, দেখ পুকুরের পানিতে কী যেন ভাসছে।”
তারপর তারা ভালো করে লক্ষ্য করে দেখল, অনেকগুলো ওষুধের বোতল ভাসছে। বোতলগুলো দেখে শুভর মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। তারপর শুভ একটি লম্বা লাঠি খুঁজে আনে। লাঠিটি দিয়ে শুভ পুকুরে ভাসতে থাকা বোতলগুলো তোলার চেষ্টা করে। অবশেষে শুভ চারটি বোতল পুকুরের পারে তুলে আনে।
শুভ লক্ষ্য করে, বোতলের ভেতরে কাগজের মতো কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। তাই সে বোতলগুলো খুলে দেখে। সে দেখতে পায়, বোতলের ভেতরে কয়েকটি চিঠি। চিঠি দেখে তার মনে পড়ার আগ্রহ জাগে। শুভ আগ্রহী হলেও তার বন্ধু এসব বিষয়ে মোটেও আগ্রহী ছিল না। তাই সে তাকে বারবার নিষেধ করতে থাকে। সে বলে,
“এগুলো রেখে চল তাড়াতাড়ি।”
তারপর তারা চলে যেতে থাকে। কিন্তু শুভ চিঠিগুলো পকেটে পুরে নেয় এবং সেখান থেকে একটি বোতল সঙ্গে করে নিয়ে যায়।শুভ সারাক্ষণ ভাবতে থাকে, কে এতগুলো চিঠি লিখেছে আর কেনই বা চিঠিগুলো বোতলে ভরে পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে? আর বোতলগুলোই বা কেন একই রকম? এসব ভাবতে ভাবতে সে কোনো কাজেই মন দিতে পারছিল না।সে চিঠি গুল আবার ভাল করে পরে ও বুঝতে পারে এগুলো কোন এক মেয়ের লেখা।তখন তার মনে মেয়েটিকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খায় ও তার মনে মেয়েটিকে দেখার ইচ্ছা জাগে। সারাক্ষণই মেয়েটার কথা ভাবত আর আনমনা হয়ে থাকত। তার বন্ধু তার এই অবস্থা দেখে প্রায়ই বিরক্ত বোধ করত ও বলত,
“এসব বাদ দে, কাজে মন দে।”
কিন্তু শুভ কোনো কথাই কানে নিত না। শুভ দিনের পর দিন সেই বোতল নিয়ে ভাবতেই থাকত।তার বন্ধু তার এসব পাগলামি দেখে একদিন বলে,
“তুই এই বোতলগুলো কোনো এক ফার্মেসিতে নিয়ে গিয়ে দেখা। আমার মনে হয় এই বোতলটা কোনো ওষুধের বোতল। ফার্মেসিতে নিয়ে দেখালেই তুই এই বোতল সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানতে পারবি।”
তারপর শুভ বলে,
“কথাটা বিরক্ত হয়ে বললেও ঠিক বলেছিস।”
তারপর শুভ বোতলটি নিয়ে একটি ফার্মেসিতে যায়। পরের দিন বিকেলে শুভর সঙ্গে তার বন্ধুর দেখা হয়। তার বন্ধু বলে,
“রাগ করেছিস আমার ওপর? বোতলগুলোর সম্পর্কে কিছু জানতে পারলি?”
শুভ বলে,
“না রে, কিছুই জানতে পারিনি।”
তার বন্ধু বলে,
“কাল সকালে তুই অন্য আরেকটি ফার্মেসিতে নিয়ে গিয়ে দেখা। হয়তো কিছু জানতে পারবি। আমি তোর পাশে আছি। যদিও তোর পাগলামি দেখে একটু রাগ হয়েছিল আমার, কিন্তু এখন আর রাগ নেই। তোর পাশেই আছি আর থাকব।”
এসব শুনে শুভ অনেক খুশি হয়। তার পরের দিন দুই বন্ধু বোতলটা সঙ্গে নিয়ে অন্য আরেকটি ফার্মেসিতে যায়—বোতলটা কিসের ও কেউ কিনেছে কি না তা জানার জন্য। কিন্তু তারা কিছুই জানতে পারল না।
তার পরের দিন আবারও দুই বন্ধু বের হয় বোতল সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে। তারা ফার্মেসির খোঁজ করতে থাকে। অনেক খুঁজতে খুঁজতে তারা ছোট্ট একটি ফার্মেসি খুঁজে পায়, আর সেখানে গিয়ে বোতলটা ফার্মেসির মালিককে দেখায় ও জিজ্ঞেস করে,
“এটা কিসের বোতল?”
তারপর ফার্মেসির মালিক তাদের বলেন,
“এটা একটা ওষুধের বোতল। কিন্তু এটা আপনারা কোথায় পেলেন? এই ওষুধ তো সব জায়গায় পাওয়া যায় না।”
তখন শুভ বলে,
“তাহলে কোথায় পাব, আপনি কি বলতে পারেন?”
তারপর ফার্মেসির মালিক বলেন,
“একটু সামনে গেলেই আপনারা দেখতে পাবেন বড় একটা ওষুধের দোকান। সেখানে পেলে পেতে পারেন।”
তারপর শুভ আর তার বন্ধু ফার্মেসির মালিককে ধন্যবাদ দিয়ে ওই বড় ওষুধের দোকানের দিকে যায়। তারা সেই দোকানে গিয়ে দোকানদারকে এই বোতলের কথা জিজ্ঞেস করে। শুভ বলে,
“এই বোতলটা কিসের, আর কে এই বোতলটা কিনেছে?”
তখন দোকানদার বলে,
“এটা একটা কঠিন রোগের ওষুধের বোতল। আর এই ওষুধটা একটা মেয়ে নিয়েছিল। মেয়েটা নাকি ছোটবেলা থেকেই এই ওষুধ খেয়ে আসছে।”
এসব শুনে শুভর বন্ধু বলে,
“যদি একটু কষ্ট করে মেয়েটার ঠিকানা দিতেন, তাহলে আমাদের খুবই উপকার হতো।”
দোকানদার তাদের মেয়েটার ঠিকানা দেয়, আর তারাও ধন্যবাদ দিয়ে চলে আসে। পরের দিন শুভ তার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে, সে কি মেয়েটার বাড়ি যাবে কি না।
তার বন্ধু বলে,
“হ্যাঁ, যাবি। এত কষ্ট করে মেয়েটাকে খুঁজেছিস, এখন যাবি না কেন?”
তখন শুভ একটা হাসি দেয়, আর বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে মেয়েটির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
দোকানদারের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী শুভ মেয়েটির বাড়ি খুঁজে পায়। মেয়েটির বাড়ির সামনে যেতেই শুনতে পায়, মেয়েটির বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলে, “তুই কোনো চিন্তা করিস না, তোকে বিদেশে নিয়ে যাব। আমার যত কষ্টই হোক না কেন, তোকে ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাব।” তার দাদিমাও অনেক কান্নাকাটি করছিল। হঠাৎ তাদের চোখ পড়ল ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শুভর ওপর। তাদের চোখ পড়তেই শুভ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল আর তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে?” শুভকে দেখে মেয়েটির বাবা ও দাদিমা অনেক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। শুভ বলে, “আমি কে সেটাই জিজ্ঞেস করবেন তো? আমি হলাম শুভ, দুই গ্রাম পরেই আমার বাড়ি। একদিন আমি আর আমার বন্ধু এদিকে ঘুরতে এসেছিলাম। তার পর পাশের পুকুরের পানিতে অনেকগুলো বোতল দেখতে পাই, বোতলগুলো একই রকম ছিল। কৌতূহলবশত আমি ও আমার বন্ধু কয়েকটি বোতল পানি থেকে উঠিয়ে আনি। পরে দেখতে পেলাম প্রত্যেকটিতেই একটি করে চিঠি লেখা। তখন সেগুলো থেকে ৪টি বোতল খুলি এবং চিঠিগুলো পড়ি। যেদিন চিঠিগুলো পড়ি, সেদিন থেকেই মনের ভেতরে অদ্ভুত একটা অনুভূতি জাগে, সেদিন থেকেই খুঁজছি, আর অবশেষে তাকে খুঁজে পেয়েছি আজ।” এসব শুনে মেয়েটির দাদিমা বলে, “তুমিই কি সেই রাজপুত্র, কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে।” তারপর শুভ বলে, “এত কষ্ট করে খুঁজে পেয়েছি, আর হারাতে পারব না। আমি তাকে বিদেশে নিয়ে যেতে চাই, আপনারা যদি অনুমতি দেন।” শুভ মেঘার কাছে গিয়ে বলে, “একবার চোখ খুলে দেখো, তোমার রাজপুত্র এসেছে, যার জন্য তুমি অপেক্ষা করতে, সে আজ এসেছে।” মেঘা কোনো সাড়া দিল না। শুভ মেঘার পরিবারের সদস্যদের অনুমতি নিয়ে মেঘাকে বিদেশে নিয়ে যায়। সবাই প্রায় মেঘার আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু শুভ ১০ বছর পর মেঘাকে নিয়ে বিদেশ থেকে বাড়িতে নিয়ে আসে। সবাই অনেক খুশি হয়। তারপর মেঘা আর শুভর বিয়ে হয়ে যায়।