Posts

গল্প

সোনার চেইন

December 30, 2025

Robiyun Nahar Toma

18
View


১৯৯৭ সাল।

এপ্রিল মাসের কোনো এক দিন…

শীলাদের বাসার সাদা–কালো ন্যাশনাল টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা চলছে। ববি, দিনা আর শরিফকে নিয়ে ওদের মা–ও বসেছেন টিভি দেখতে। আরও কয়েকজন দর্শকও আছে। সুফিয়া ভাবি তাঁর ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছেন সিনেমা দেখতে। একটু পরই চারটার খবর শুরু হবে। আধা ঘণ্টা খবর। এর আগে পাঁচ মিনিট ধরে বিজ্ঞাপন দেয়। নাহিদা আর ববি গোনে যে প্রতি মিনিটে কয়টা করে বিজ্ঞাপন দেয়।

বাসার কর্তারা আবার এ দিনটার জন্যই অপেক্ষা করে থাকেন। দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে তাঁরা যান ক্লাবে। কোনো দিন চলে দাবা, আবার কোনো দিন ক্যারম। যেদিন বেশি জমে যায়, সেদিন আবার চলে টোয়েন্টি–নাইন খেলা। ওই দিন তাঁদের ফিরতে বেশ দেরি হয়। এই সুযোগে আটটার বাংলা সংবাদের পর সবাই আবার দল বেঁধে বসে আলিফ লায়লা দেখতে!

বকুলরা সব ভাই–বোন মিলে ওর মাসহ বাড়িওয়ালা আন্টির বাসায় টিভি দেখছিল। ওদের বাবা মধ্যম গোছের একজন সরকারি কর্মচারী। মা গৃহিণী। সে আন্দাজে ওদের বেশ বড় পরিবার। ভাইবোনেরাও পড়ালেখা করছে সবাই। সুতরাং বাড়তি রোজগারের কেউ নেই। তবু মা বেশ সম্মান বজায় রেখে চলেন। একটা নমুনা—মা বলেন, ‘কেউ কিছু দিলে কখনো হাতে নিবি না বা খাবি না। আমার দিকে তাকাবি। আমি যদি কখনো ইশারা করি, তবেই হাতে নিবি।’ এ কথাটা অবশ্য বকুলের জন্যই বেশি প্রযোজ্য। কারণ, ওর বয়স মাত্র ৯। সবে ক্লাস ফোরে উঠেছে। সালমা আপু, সোহাগ ভাইয়া আর নাহিদা আপু বড় হয়ে গেছে। তাই ওদের আর কিছু বলতে হয় না। ওরা সবই বোঝে এখন। খবরের সময়টায় যখন ববিরা মুড়ি-চানাচুর মাখা খায়, মা তখন কোনো একটা কাজের ছুতা দিয়ে চলে আসেন, আপু–ভাইয়ারাও চলে আসে। বকুলও খেলতে বেরিয়ে যায়।

সেদিন খবরের আগে টিভিতে একটা বিজ্ঞাপন দেয়। আঁতকে ওঠে বকুল। সত্যিই কি দেবে নাকি? মাঠে খেলতে যাওয়ার বদলে পা টিপে টিপে যায় মার কাছে…

‘মা, দশটা টাকা দিবে?’

মা মুখ ঝামটা দিতে গিয়েও সামলে নেন। এই বাচ্চা ছেলেটা দুই টাকার বেশি কখনো চায় না। আজ হঠাৎ দশ টাকা চাইছে কেন? দশ টাকা দিয়ে ও করবেই বা কী? যেখানে এক টাকা দিয়ে চারটা তিতাস চকলেট অথবা চারটা নোনতা বিস্কুট পাওয়া যায়!

‘কী করবি তুই দশ টাকা দিয়ে?’

‘একটা সানক্রেস্ট কোলা খাব।’

Advertisement
‘এটা আবার কোন কোলা? কোক আছে, পেপসি আছে, বাবল আপ আছে, এগুলা রেখে এটা কেন খাবি?’

‘দাও না মা…এটা নতুন আসছে। একটু আগেই টিভিতে দেখলাম। কমলা রঙের। দেখেই খুব খেতে মন চাচ্ছে।’

‘এই নে।’

শাড়ির আঁচলে বাঁধা দশ টাকার নোটটা বকুলের দিকে এগিয়ে দেন মা।

টাকা নিয়েই বকুল দে ছুট…

সাহার দোকানটাই সবার আগে পড়ে।

‘দাদা..! সানক্রেস্ট কোলা আছে?’

‘না তো! এটা আবার কোনটা?’

বকুলের কথা শোনার সময় নেই। আবার ছুট…

রতনের দোকানে গিয়ে…

‘আঙ্কেল, আঙ্কেল, সানক্রেস্ট কোলা আছে?’

‘নারে বাবা। বাবল আপ আছে, নিয়ে যাও।’

‘উহু!’

এদিকটায় আর দোকান নেই। সেই বাঁধের ওদিকে আবার যেতে হবে। একা একা দৌড়ানোও যায় না বেশিক্ষণ। বাবু, দীপু বা আশিক কাউকেই বলেনি বকুল গোপন কথাটা। পাছে ওরা যদি জেনে যায়! আর তখন ও যদি না পায়!

নাহ! বাঁধের ওখানের দোকানগুলোতেও পাওয়া যায় না সানক্রেস্ট কোলা। শেষ ভরসা এখন বড় রাস্তার দোকানটা। ওদিকে যেতে অবশ্য বারণ আছে। ও নিজেও অবশ্য ভয় পায়। কারণ, বড়রা বলে ওদিকে গেলে নাকি ছেলেধরা নিয়ে যাবে। ছেলেধরাদের ও খুব ভয় পায়। আজকে কোনো পরোয়া করে না ও। দৌড় লাগায় বড় রাস্তার দিকে। স্বর্ণের চেইন পাওয়ার জন্য এটুকু কষ্ট যে করতেই হবে।

বাঁধের ওখান থেকে জোরে দৌড়ালে মিনিট দশেকের মতো লাগবে বড় রাস্তায় পৌঁছাতে। সময় নষ্ট করে না বকুল।

‘ভাইয়া, ভাইয়া, এখানে কি সানক্রেস্ট কোলা পাওয়া যায়?’

‘না।’


অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল
‘কেন ভাইয়া?’

কাঁদো কাঁদো হয়ে যায় বকুলের মুখটা।

‘ভাইয়া, আপনার দোকানটাতো অন্য দোকানগুলোর চেয়ে অনেক বড়। তা–ও সানক্রেস্ট কোলা পাওয়া যায় না?’

ওর মুখটা দেখে দোকানের ছেলেটার খুব মায়া লাগে। আদর করে বলে, ‘বাবু তুমি কী করবে সানক্রেস্ট কোলা দিয়ে?’

এবার কেঁদে ফেলে বকুল…

‘আ. .আজকে টিভিতে দেখলাম সানক্রেস্টের মুখ খুলে ছিপির গায়ে সোনার চেইন লেখা থাকলে সোনার চেইন পাওয়া যায়।’

‘তুমি তো ছোট মানুষ...কী করবে তুমি সোনার চেইন দিয়ে?’

‘আ.. আমার লাগবে। মাকে দিব।’ অঝোরে পানি পড়তে থাকে বাচ্চাটার।

কোম্পানিগুলোর ওপর খুব রাগ হয় দোকানের ছেলেটার। এরা মানুষের আবেগ নিয়ে আর কতকাল খেলবে?

একজনকে এক হাজার টাকার পুরস্কার দিয়ে এক হাজার জনের কাছ থেকে এক লাখ টাকার মুনাফা লুটবে!

রাগ চেপে রাখে ছেলেটা। হুডটা খুলে সামনের দিকে আসে।

বকুলের হাতটা ধরে বলে, ‘বাবু, এগুলো সব মিথ্যে কথা। ওরা কিছুই দিবে না। আর এগুলো খেলে তো শরীর খারাপ করবে। আর শরীর যদি খারাপ হয়, তাহলে তো তুমি মরেই যাবে। তখন স্বর্ণের চেইন দিয়ে কী হবে!’

‘মিথ্যে কথা এগুলো। যাও। বাড়ি যাও। সন্ধ্যা হয়ে গেছে প্রায়। ছেলেধরা নিয়ে যাবে কিন্তু।’

মাথা নিচু করে ছলছল চোখে চলে যায় বকুল…

দোকানের ছেলেটা একদৃষ্টে চেয়ে থাকে ওর যাওয়ার দিকে…

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা কীভাবে যেন নিজেদের অভাবের কথা টের পায়…

অদ্ভুত! সবই অদ্ভুত…

পরিশিষ্ট: স্বর্ণের ভরি আজ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। ২৫ বছর পরও বকুলের তাই মাকে চেইন কিনে দেওয়া হয়নি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের জীবনের অনেক স্বপ্নই অধরা থেকে যায়, তবু তারা শেষনিশ্বাস পর্যন্ত স্বপ্ন পূরণের আশায় বুক বাঁধে।

Comments

    Please login to post comment. Login