Posts

প্রবন্ধ

নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী: চরিত্রের প্রতি সুবিচারের প্রতীক

December 30, 2025

সুমন বৈদ্য

26
View
Nawazuddin Siddiqui Bengali News
নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী

আজ থেকে ২৫ বছর আগে ফিরে আসা যাক। আমির খান অভিনীত সিনেমা 'সারফারোস'। পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আমির খান। সেই ছবিতে একটা ছোট্ট চরিত্র, এলাকার ছোট এক গুন্ডার চরিত্রে দেখা যায় ভারতের উত্তর প্রদেশের বুধানা শহর থেকে আসা এক সবুজ ও তারণ্যের ভরপুর যুবককে। তখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে সিনেমায় নতুন কোনো মুখ আসা মানেই ছোট চরিত্রে অভিনয় করাটা একপ্রকার রীতিরেওয়াজ ছিল।কিন্তু সেই যুবকটি অনায়াসে মাত্র ২ মিনিটের চরিত্রটি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে অভিনয় করে গেলেন। এখানেই শেষ নয় , ‘শূল’ ছবিতে মনোজ বাজপেয়ী আর রাভিনা ট্যান্ডন কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। সেখানে ছোট্ট একটি চরিত্র পান এই যুবক, রেস্তোরাঁর ওয়েটার। সেই দৈর্ঘ্য ছিলো 'সারফারোস' সিনেমার থেকে অনেকাংশে কম। কিন্তু পোশাক আর চেহারার ধরণ নিয়ে ক্যামেরার সামনে এসেছিলেন , সামনাসামনি দেখেই সহজে বলে দিতে পারবেন কোনো রেস্টুরেন্টের ওয়েটার।বলিউড ইন্ডাস্ট্রি হয়তো চরিত্রের প্রতি সুবিচার করার অভিনেতাকে সেদিন হয়তো ভালো করে চিনে উঠতে পারেনি।

বলিউডের মূলধারার একজন অভিনেতা হতে হলে কী কী যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন? প্রশ্নটা হাস্যকর। কারণ, অভিনেতা হতে হলে ভালো অভিনয় জানতে হবে। এটা তো সহজ অঙ্ক। কিন্তু বলিউড সম্বন্ধে যদি আপনার ধারণা থেকে থাকে, তাহলে অবশ্যই জানেন বি টাউনের অঙ্কটা এত সহজ না। বি টাউনে নিজের নাম লেখাতে হলে আপনার অভিনয়ে এত পারদর্শী না হলেও চলবে। আপনার বাহ্যিক চেহারা আকর্ষণীয় হতে হবে, নাচ-গানে পারদর্শী হতে হবে, এর সাথে বর্তমান সময়ের সংযোজন ‘সিক্স প্যাক এবস’ থাকতে হবে। আর এগুলোর কোনোটায় কমতি থাকলে আরেকটা বাইপাস রাস্তা আছে বলিউডে ঢোকার। আপনাকে হতে হবে বলিউডের কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের সন্তান। এর বাইরে খুব কম অভিনেতাকে পাবেন, যারা শুধু অভিনয় দিয়েই বলিউড পাড়ায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এবং এদের মধ্যে গুটিকয়েঅ অভিনেতা আছেন যারা স্রেফ অভিনয় দিয়ে এই পাড়ায় নিজেকে বাদশাহির আসনে বসিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী।ভারতের উত্তরপ্রদেশের ছোট্ট একটা গ্ৰাম বুধানা। যে গ্ৰামে জন্ম এই অভিনেতা সেই গ্ৰামে শিক্ষা ব্যবস্থা ছিলো অতি নগন্য। সেই গ্ৰামের মানুষ চিনতো বলতে শুধু তিনটে বিষয়। আখ, গম, বন্দুক। কিন্তু এই প্রতিকূলতার মাঝেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী।


নিজের গ্রাম এবং আশেপাশের সাত গ্রামের প্রথম গ্রাজুয়েট হিসেবে কেমিস্ট্রিতে অনার্স করেন নওয়াজ। গ্রাজুয়েশন শেষ করে বারোদার একটি পেট্রো-কেমিক্যাল কোম্পানিতে কেমিস্ট হিসেবে চাকরিও নিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে মন টিকলো না। চলে এলেন দিল্লী। চাকরির খোঁজে যখন দিল্লী ঘুরছেন, তখন একজনের কথায় একদিন থিয়েটারে গিয়ে একটি মঞ্চনাটক দেখলেন।কে জানতো ভাগ্যের চাকা‌ পরিবর্তনের জন্য নতুন চাকরি সন্ধানে এসে মঞ্চনাটকেরই প্রেমে পরে যাবে। মঞ্চনাটক দেখে এতটাই মুগ্ধ হলেন যে তার কাছে মনে হল, এই অভিনয় করার জন্যই তার জন্ম হয়েছিল। মঞ্চে কাজ করা শুরু করলেন। মঞ্চে কাজ করে থাকা-খাওয়ার খরচ মিলত না। অপারগ হয়ে নওয়াজুদ্দিন সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নিলেন। সারাদিন গার্ডের দায়িত্ব পালন করতেন। রাতে চলে যেতেন থিয়েটারে। এক-দেড় বছর এভাবে চলার পর মঞ্চনাটকের প্রেমে মুগ্ধ হয়ে অভিনয়ের তালিম নিতে যান নওয়াজ অ্যাডমিশন পেলেন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতে (এনএসডি)।১৯৯৬ সালে এনএসডির গ্রাজুয়েশন শেষে পাড়ি জমালেন বোম্বেতে। প্রথমে নাটকের জন্য ধরনা দিলেন। ভাগ্য খুললো না। চেহারা দেখেই তাকে বাদ দিয়ে দেয়া হল। ধরনা দিলেন সিনেমার রোলের জন্য। সেখানেও প্রায় একই অবস্থা। অভিনয় না দেখে চেহারা আর শরীরের অবয়ব দেখেই সবাই নাকচ করে দিতে লাগলো। তবে কিছুদিন ঘোরাঘুরির পর ছোটখাটো কিছু রোল পাওয়া শুরু করলেন। পকেটমার, ভিক্ষুক, দারোয়ান, মালীর মতো ছোটখাটো চরিত্রে কাজ করতে লাগলেন।


'শূল', 'সারফারোস', 'মুন্নাভাই এমবিবিএস',  'পিপলি লাইভ’ এইসব ছবিতে নামীদামী অভিনেতাদের মাঝে ছোটখাটো ক্যারেক্টার করতে দেখা যেতো নওয়াজকে।এই ছোটখাটোর অভিনয়ের মাঝেও যখনেই পর্দায় এসেছেন তখনেই নিজের নামস্বত্তার বাইরে গিয়ে চরিত্রের সাথে মিলিয়ে যেতেন এই অভিনেতা। চোখের চাহনি এবং শারীরিক ভাষা প্রকাশ পেতো চরিত্রের গভীরতা।কিন্তু সেই অভিনয় সবার অগোচরে থেকে যেতো নামীদামী তারকাদের মাঝে।একসময় নওয়াজের অবস্থা এমন হলো যে বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না। এনএসডির এক সিনিয়রের কাছে গেলেন। ওই সিনিয়র তাকে থাকার জায়গা দিতে রাজি হলেন। তবে এক শর্তে; বাসার সব রান্না-বান্না নওয়াজের করতে হবে, খুশি মনে রাজি হলেন নওয়াজ।এমন দিনও গেছে, যখন তাঁকে ধনেপাতা বিক্রি করতে হয়েছে। চাইলেও সেই দিন আর ফিরবে না। একবার ২০০ রুপির ধনেপাতা কিনেছিলেন নওয়াজুদ্দিন। সেগুলো খুচরা বিক্রি করেন কিছু লাভ করার জন্য। পাতাগুলো ক্রমেই বাদামি রং ধারণ করতে শুরু করলে তিনি দৌড়ে পাতাওয়ালাকে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার পাতা তো মরে যাচ্ছে।’ পাতাওয়ালা তাঁকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘বারবার পানি ছিটাতে হবে, তাহলেই পাতা সতেজ থাকবে।’ নওয়াজের পকেটে সেদিন তেমন টাকা ছিল না। টিকিট ছাড়া রেলগাড়িতে চড়েছিলেন তিনি। কিন্তু নির্দিষ্ট স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ধনেপাতা ঠিকই বাদামি হয়ে গিয়েছিল। তাঁর ২০০ রুপিই জলে গিয়েছিল সেদিন।

চরিত্রের সুবিচার করলেও সিনেমায় অভিনীত চরিত্রগুণে নিজের পরিবার থেকেও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে ক্যারিয়ারের এক কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে নওয়াজুদ্দিন বলেন, ‘একদিন বাবা আমাকে ডেকে বললেন, “তুমি এসব সিনেমায় কী করছ?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কী বোঝাচ্ছেন। তিনি বললেন, “সবাই বলছে, তোমার ছেলে এই সিনেমায় মার খাচ্ছে। কেন এসব চরিত্র নাও?” আমি বললাম, আমার আর কোনো সুযোগ নেই, আমি চেষ্টা করছি। তখন তিনি বললেন, “তাহলে মার খেয়ে এখানে এসো না।” শুনে আমি খুব কষ্ট পেলাম, তিন বছর আমার গ্রামে যাইনি।’

এভাবেই ছোটখাটো ক্যারেক্টারকে নিজের পুঁজি বানাতে থাকলেন এই অভিনেতা। আর অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন, কখন আসে সেই সুযোগ। অভিনয়ে নিজেকে ঢেলে দেবেন উজাড় করে।এরই মধ্যে ২০০৮-০৯ সালের দিকে বলিউডে কিছু নতুন ধারার পরিচালকের উত্থান ঘটলো। প্রথমবারের মতো বলিউডে ইন্ডি ফিল্ম একটি আলাদা জায়গা করে নিতে সক্ষম হল। নন্দিতা দাস, হ্যানসল মেহতা, আনুরাগ কাশ্যপের মত পরিচালকরা লাইমলাইটে আসা শুরু করলো। কোনো এক নাটকে নওয়াজের অভিনয় দেখে অনুরাগ কাশ্যপ ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’-তে তাঁকে মোটামুটি একটা বড় রোল দিয়েছিলেন। সেখানে দুর্দান্ত অভিনয় করলেও অন্য কোনো পরিচালকের নজরে পড়লেন না।


অবশেষে অপেক্ষার প্রহরের সমাপ্তি হয় ২০১১ সালে। প্রথমবারের মতো মূল ধারার চরিত্রে‌ সুযোগ পান। আর প্রথমবারেরই প্রমাণ করলেন তিনি নিজের নিজের মৌলিকত্ব ছেঁটে ফেলে সিনেমার চরিত্রকে আপন করা কতোটা জরুরি। ‘দেখ ইন্ডিয়ান সার্কাস’ ছবিতে ভালো একটি চরিত্রে অভিনয় করে পরিচালকদের নড়চড়ে বসতে বাধ্য করেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী।ভারতের প্যারালাল ঘরানার এই সিনেমা প্রদর্শিত হয় বুসান চলচ্চিত্র উৎসবে। জিতে নেয় অডিয়েন্স চয়েস অ্যাওয়ার্ডস। শুধু তাই নয়, ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বিশেষ জুরি অ্যাওয়ার্ড জেতেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী। এরপরে তাঁকে প্রশংসা এনে দেয় ইরফান খানের সঙ্গে জুটি হয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যে অভিনয়। তাঁরা অভিনয় করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য বাইপাস’-এ। বিএফআই লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে মনোনয়ন পায়।১৯৯৬ সালে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকিকে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করায় আবার এই অনুরাগ কাশ্যপ ২০১২ সালে। 'সাব কা বাদলা ল্যাগা তেরা ফাইজাল ' এই সংলাপের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই! নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীকে নিয়ে অনুরাগ কাশ্যপ নির্মাণ করলেন বলিউডের প্রথা ভাঙার নয়া এক ইতিহাস। গ্যাংস অব ওয়াসিপুরে নওয়াজ নিজেকে আবিষ্কার করেন অন্যরূপে।যে কি না শরীরের রং এর জন্য পরিচালকের নজরে বাইরে থাকতো সে কি না আজ প্রধান চরিত্রে‌ , এই বিষয়টি হজম করতে খুব কষ্ট হয়েছিল বলিউডের তা বলা যেতেই পারে।  নব্বই দশকের নায়কদের বেশভূষায় গ্যাংস্টার রোলে ফয়জাল খানের চরিত্রটিকে কাল্ট-ক্লাসিকে।এই এক সিনেমায় তাকে বদলে দেয় তার পরিবারের মধ্যেও। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন সিনেমা মুক্তির পর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে গ্রামে ফিরে যান। ‘আমি বাবার কাছে গিয়ে বললাম, আপনি কী মনে করেন? তিনি বললেন,“হ্যাঁ, এবার তুমি ভালো কাজ করেছ।”’

কাল্ট-ক্লাসিকের কথা যদি বলতেই হয় তাহলে আবারও অনুরাগ কাশ্যপের নাম সবার আগেই আসবে। ফের অনুরাগ-নওয়াজ নিয়ে আসলেন নতুন গল্প।তবে রুপালি পর্দায় নয়, ওটিটি প্লাটফর্মে। ওটিটিতে ‘সেক্রেড গেমস’-এর গণেশ গাইতোন্ডের চরিত্রে নতুন এক নওয়াজকে দেখতে পায় দর্শক। চোখ , শারীরিক ভাষা, সাদাসিধে বেশভূষায় লোমহর্ষক কন্ঠে ডায়লগ ডেলিভারি যে ভয় সৃষ্টি করেছিলেন তা এখনো সবার কাছে অনন্য চরিত্র।সেক্রেড গেমসকে নওয়াজের ক্যারিয়ারে অন্যতম সংযোজন বলা যেতেই পারে। সেই সিরিজে এক সাধারণ শিশু থেকে বোম্বের অপরাধ জগতের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে গাইতোন্ডে যখন বলে উঠে 'কাভি কাভি লাগতা হ্যায় আপুন হি ভগবান হ্যায়', এই কথাটার দিকে যদি গভীরভাবে খেয়াল করা যায়, তাহলে এই সংলাপটি বলিউডের সেইসব পরিচালকের উপর দৃষ্টিপাত করা হয়েছে, যারা তার অভিনয় না বুঝে শরীরের রং দিয়ে তাকে বিবেচনা করেছিল। কিন্তু দিনশেষে এই নওয়াজেই চরিত্রগুণে সবার থেকে আলাদা হয়ে আছেন।ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই এখন পর্যন্ত সিনেমার পরিমাণের তুলনায় চরিত্রকে সবসময় প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন।এই যে শুরু হলো নওয়াজের জয়যাত্রা ,আর থেমে থাকতে হয় নি।বিভিন্ন রেঞ্জের বহুমাত্রিক সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন নওয়াজুদ্দিন। চরিত্র ছোট হোক বা বড় , প্রতিটি চরিত্রকে নিজের আপন মনে করেছেন। চরিত্রের বুঝে একে একে সামনের দিকে আগাতে থাকলেন নওয়াজ। কখনো সাইকো সিরিয়াল কিলার হয়ে ধরা দিয়েছেন 'রামান রাঘব ২.০'তে, কখনো ধূর্ত পুলিশ অফিসার হয়ে এসেছেন 'রইস'এ আবার কখনো খাস-দিল সাংবাদিক হয়ে এসেছেন 'বাজরাঙ্গি ভাইজান' এ। তাই অনেক সময় সিনেমার চরিত্র ও ব্যক্তি নওয়াজের মাঝে ট্রানজিশনটা তাই তার জন্য অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।


নওয়াজের অভিনয়ের প্রেমে মজেছিলেন বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান। বলিউড বাদশাহ নওয়াজের অভিনয়ের প্রেমে মজেছিলেন তাও 
এইরকম একজন অভিনেতার জন্য যিনি কিনা শুধুমাত্র চরিত্রকেই ভালোবেসে গেলেন; সিনেমা কেমন ব্যবসা হবে না হবে এবং নিজেকে আহামরি তথাকথিত নায়ক ভাবতেই হবে এমন চিন্তাই করে না। অবাক হচ্ছেন নিশ্চয়ই? ২০১৭ সালে একটি সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে খোদ বলিউডের বাদশা এই গুণী অভিনেতা সম্বন্ধে কী বলেছেন, শুনলে আরও অবাক হবেন।

“সত্যি কথা বলতে নওয়াজ ভাই যত বড় অভিনেতা, আমি নিজেও এত বড় অভিনেতা না। তিনি নিজেও হয়তো জানেন না তিনি কত বড় অভিনেতা। অনেক ফিল্মে কাজ করেছেন, থিয়েটার থেকে এসেছেন। নওয়াজ ভাই আসলেই অনেক বড় ও আলাদা মাপের অভিনেতা। ২৫ বছর ধরে আমি ফিল্মে কাজ করছি। এই দিক দিয়ে আমি সিনিয়র হতে পারি, কিন্তু অভিনয়ের দিক থেকে আমি মোটেও তার চেয়ে সিনিয়র না। যেকোনো অভিনয়ের কাজই তিনি অনেক আলাদা তরিকায় করেন। এবং আমরা যারা সামনে থাকি, তারা ইন্সপায়ার্ড হয়ে যাই। অভিনয়ে তার যে দ্যুতি, তা আমাদের গায়েও এসে পড়ে, যার ফলে আমাদেরকেও ভালো দেখায়।”

আজ পর্যন্ত কিং খানের এরকম প্রশংসা অন্য কেউ পেয়েছেন কিনা, বলা যাবে না। বলিউড-বাদশা শাহরুখ খানের এমন প্রশংসা শুনেই বোঝা যায়, আজ বলিউডে নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী কতটা সমাদৃত। আজকের এই সমাদরের পেছনে রয়েছে অনেক বছরের সাধনা, কঠোর পরিশ্রম এবং অভিনয়ের প্রতি নিজের ভালোবাসা।

নওয়াজউদ্দিনের চরিত্রের প্রতি গর্ববোধ করতেন তার মা। এক সাক্ষাৎকারে মায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি স্মৃতির কথা তুলে ধরতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নওয়াজউদ্দিন।সালমান খানের সুপারহিট সিনেমা ‘কিক’-যেখানে নওয়াজউদ্দিন অভিনয় করেছিলেন ভয়ংকর অথচ বুদ্ধিদীপ্ত খলনায়কের চরিত্রে। সিনেমাটি মুক্তির পর মায়ের প্রতিক্রিয়া জানতে আগ্রহী ছিলেন তিনি। নওয়াজউদ্দিন জানান, ছবির একটি দৃশ্যে তাঁকে দেখা যায় হাজার হাজার টাকার নোটের ওপর বসে থাকতে। মায়ের সঙ্গে সিনেমাটি দেখার পর তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন-কেমন লেগেছে?মা  উত্তর দিয়েছিলেন,
“ভালো সিনেমা, তোমার চরিত্রও ভালো লেগেছে।”কিন্তু অভিনেতার কৌতূহল থামেনি। তিনি আবার জানতে চান-সবচেয়ে ভালো কোন অংশটি লেগেছে? তখন মায়ের উত্তরেই লুকিয়ে ছিল একজন সংগ্রামী মায়ের স্বপ্নপূরণের আনন্দ। তিনি বলেন,“যখন তুমি এতগুলো টাকার নোটের ওপর বসে ছিলে, সেই দৃশ্যটাই সবচেয়ে ভালো লেগেছে।”এই সহজ উত্তরেই ধরা পড়ে এক মায়ের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, দারিদ্র্য আর লড়াইয়ের স্মৃতি। বাস্তব জীবনে যিনি ছেলের সংগ্রামের দিনগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর কাছে সেই দৃশ্য শুধুই সিনেমার অংশ ছিল না—ছিল সাফল্যের প্রতীক।

২০১০ সালে ‘ব্যান্ড বাজা বারাত’ সিনেমা দিয়ে বলিউডে অভিষেক হয় রণবীর সিংয়ের। ছবিটি বক্স অফিসে সুবিধা না করতে পারলেও পরিচালকদের নজরে আসেন এই অভিনেতা। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি, আজ তিনি বলিউডের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক নেওয়া তারকাদের একজন। তবে জানেন কী, এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে বলিউডের একজন অভিনেতার হাত? অভিষেকের আগে রণবীর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীর কাছে।

বলা হয় থাকে স্টারকিড না থাকলে বা বড়সড় কোনো অভিনেতা না থাকলে সিনেমা নাকি শুরুতেই ফ্লপ। তবে যে কথাটা পুরোপুরি যে মিথ্যে, তা কিন্তু নয়। কিন্তু কথাটা যে সবসময় সবার উপরে খাটে না তার উজ্জ্বল দৃষ্টি ছিলেন 'উদয় চোপড়া'। বাবা ইয়াস চোপড়ার হাত ধরে বলিউডে যাত্রা শুভ করলেও শেষ পর্যন্ত ধপে টিকে নি। অন্যদিকে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রতিভা থাকলে যেকোনো কিছু করা সম্ভব তার বড় প্রমাণ হয়ে থাকবে 'নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী'।

Comments

    Please login to post comment. Login