গল্প: বড়লোক (ধনী)
এক সময়ের কথা, রাজু নামে একজন ব্যক্তি বড় শহরে থাকত। সে ধনী ছিল, কিন্তু তার ধন-সম্পদের মধ্যে সুখ খুঁজে পেত না। বিশাল বাড়ি, সোনার গাড়ি, দামি জামাকাপড়, বহুতল বাগান—সবই ছিল তার। শহরের মানুষ তাকে ‘বড়লোক’ বলে অভিহিত করত। কিন্তু রাজুর মন খালি ছিল। রাতের অন্ধকারে সে প্রায়ই একা বসে ভাবত, “আমার সব আছে, অথচ আমি সুখী নই। সত্যিকারের আনন্দ কোথায়?”
রাজু একদিন ঠিক করল, শহরের কোলাহল, ধোঁয়া আর অবসাদের জীবন তাকে আরও বিষন্ন করে তুলছে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল গ্রামের শান্তি ও সরল জীবনের দিকে যাত্রা করবে। রাজু গ্রামের পথ ধরে হেঁটে যেতে লাগল। চারপাশে দেখা হলো ছোট ছোট কুটির, সবুজ ধানক্ষেত, পাখির কোকিল কন্ঠ আর শিশুর কেচ্ছার আওয়াজ। মানুষের মুখে মিষ্টি হাসি, চোখে শান্তির ঝিলিক। রাজু প্রথমবার অনুভব করল, সত্যিকারের আনন্দ হয়তো এই সরল জীবনে লুকিয়ে আছে।
গ্রামের মানুষদের সঙ্গে আলাপের সময় রাজু দেখল, তারা দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও সুখী। কেউ দামী জিনিসের জন্য দুঃখ করে না। তারা পরস্পরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খায়, হাসি ভাগাভাগি করে, ছোট ছোট আনন্দকে বড় করে উপভোগ করে। রাজু মনে মনে ভাবল, “আমি সব ধন-সম্পদ পেলেও কি সত্যিই আনন্দ খুঁজে পাইনি?”
একদিন রাজু গ্রামের এক বৃদ্ধের সঙ্গে বসে গল্প করছিল। বৃদ্ধ বললেন, “বাপু, বড়লোক হওয়া মানে টাকা, ধন-সম্পদ নয়। প্রকৃত বড়লোক হতে হলে হৃদয় বড় হতে হবে। মানুষের সুখে আনন্দ খুঁজতে হবে, ভালোবাসা দিতে হবে, সম্পর্ককে মূল্য দিতে হবে।”
রাজু সেই মুহূর্তে হকচকিয়েই ভাবল। তার দামী জিনিসগুলো—সোনার ঘড়ি, ব্র্যান্ডেড গাড়ি, বহুতল বাড়ি—সবই তখন তুচ্ছ মনে হল। সে বুঝল, সমস্ত ধন-সম্পদ থাকলেও যদি হৃদয় খালি হয়, তাহলে জীবন ফাঁকা।
রাজু ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনল। সে নিজের ধন-সম্পদ দিয়ে গ্রামের দরিদ্রদের সাহায্য করতে শুরু করল। অনাথ শিশুদের জন্য বিদ্যালয় বানাল, অসহায় বৃদ্ধদের জন্য খাবার বিতরণ করল। প্রতিদিন গ্রামের মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে লাগল। ছোট ছোট আনন্দের মধ্যে সুখ খুঁজতে শিখল—প্রকৃতির সৌন্দর্য, শিশুরা খেলার সময় হাসি, গ্রামের মানুষদের আন্তরিক ভালোবাসা।
সময় চলতে লাগল, রাজু অভিজ্ঞ হল। সে দেখল যে, ধন-সম্পদ কেবল বাহ্যিক জিনিস। প্রকৃত ধন হলো সম্পর্ক, ভালোবাসা, খাঁটি আনন্দ। ধন-সম্পদ দিয়ে কেউ হৃদয় ভরা খুশি তৈরি করতে পারে না। ধীরে ধীরে রাজুর জীবনে সত্যিকারের শান্তি ফিরে এলো। সে আর নিঃসঙ্গ বোধ করল না।
একদিন শহরে ফিরে এসে রাজু নিজের বাড়িতে বসে ভাবল, “আমি সত্যিকারের বড়লোক। আমার হাতে থাকা ধন নয়, আমার হৃদয় ধনী।” সে হাসিমুখে তার বাগানের দিকে তাকাল, চারপাশের সবুজ দেখল, পাখিদের গান শুনল। রাজু বুঝল, জীবনের আসল সম্পদ হলো ভালোবাসা, সম্পর্ক, আনন্দ আর শান্তি। ধন-সম্পদ মানুষকে বড়লোক বানায় না, হৃদয়কে বড়লোক বানায়।
রাজু তারপর থেকে শুধু ধনী নয়, সত্যিকারের বড়লোক হয়ে উঠল—কারণ তার জীবন ভরা খুশি, মানবিকতা, ও শান্তিতে। আর সে শিখল সবচেয়ে বড় শিক্ষা: সুখ হয় বাহ্যিক ধন থেকে নয়, অন্তরের শান্তি ও সম্পর্কের সৌন্দর্য থেকে।
38
View