নদীর ধারে ছোট্ট গ্রামটা সন্ধ্যায় যেন আরও নরম হয়ে আসে। বাতাসে কাশফুলের গন্ধ, দূরে আজানের ধ্বনি, আর কাছেই চায়ের দোকানে টিনের কাপে চা নড়ার শব্দ। এই গ্রামেই থাকে অনিরুদ্ধ—সবাই ডাকে অনি। শহরে চাকরি করে, কিন্তু সপ্তাহান্তে গ্রামে আসে মায়ের কাছে। অনিরুদ্ধ বিশ্বাস করে, শহরের কোলাহল ভালোবাসাকে ক্লান্ত করে; গ্রাম তাকে আবার জোড়া লাগায়।
গ্রামে এলে সে প্রায়ই নদীর ধারে বসে। একদিন বসে থাকতে দেখল—একটা মেয়ে নদীর জলে পা ডুবিয়ে বই পড়ছে। খোলা চুল, নীল শাড়ি, চোখে শান্তি। অনি কিছুক্ষণ চুপ করে দেখল, তারপর সাহস করে বলল,
“এখানে বসে পড়লে বইয়ের শব্দগুলো নদীতে ভেসে যায় না?”
মেয়েটা হেসে উঠল। “ভেসে গেলে ভালোই। নদী যদি শব্দ নিতে পারে, দুঃখও নিতে পারে।”
এইভাবেই পরিচয়। নাম তার মৃণাল। কলেজে পড়ায়, কবিতা লেখে, আর নদীর কাছে এসে পড়ে—কারণ এখানে নাকি শব্দগুলো নিজের মতো হয়। অনি বলল, সে শহরে থাকে, সংখ্যার কাজ করে। মৃণাল হাসল, “সংখ্যাও তো কবিতা—ঠিকঠাক জায়গায় বসালে।”
দিনের পর দিন তারা নদীর ধারে দেখা করতে লাগল। কখনো চুপচাপ, কখনো কথা। কথা বলতে বলতে বোঝা গেল—দুজনের ভেতরেই একটা অদ্ভুত ভয় আছে। অনির ভয়, সে ভালোবাসলে শহর আবার তাকে টেনে নেবে, সময় কেটে যাবে, মানুষটা হাতছাড়া হবে। মৃণালের ভয়, সে শব্দে বিশ্বাস করে, কিন্তু মানুষ বদলায়—শব্দ থাকে না।
একদিন বৃষ্টি নামল। নদী ফুলে উঠল। তারা ছাউনির নিচে দাঁড়াল। বৃষ্টির শব্দে কথা চাপা পড়ছিল। অনি বলল, “মৃণাল, আমি ভয় পাই।”
“কীসের?”
“ভালোবাসা হারানোর।”
মৃণাল একটু থেমে বলল, “আমি ভয় পাই ভালোবাসা পেয়ে বদলে যাওয়ার।”
বৃষ্টি থামল। নদী শান্ত। সেদিন তারা কোনো প্রতিশ্রুতি করল না। শুধু হাঁটল। হাঁটার ফাঁকে মৃণাল একটা ছোট কাগজ দিল—তার লেখা চার লাইন কবিতা। অনি পকেটে রাখল। সে জানত না, এই কাগজটাই একদিন তাকে বাঁচাবে।
সময় গড়াল। শহরে কাজের চাপ বাড়ল। অনির ফোন ধরার সময় কমে গেল। মৃণাল বুঝল, কিন্তু মন মানল না। একদিন সে ফোন করল, অনি ধরতে পারল না। পরদিন অনি ফোন করল, মৃণাল ধরল না। নীরবতা জমতে লাগল—নদীর মতো নয়, এই নীরবতা ছিল পাথরের।
এক রাতে অনি অফিস থেকে ফিরে পকেট থেকে সেই কবিতার কাগজটা পেল। পড়ল—
“ভালোবাসা নদীর মতো নয়,
যে শুধু বয়ে যায়।
ভালোবাসা নৌকার মতো,
হাল ধরলে তবেই পৌঁছায়।”
অনির বুকটা কেঁপে উঠল। সে বুঝল—ভালোবাসা সময় চায়, উপস্থিতি চায়। শুধু অনুভূতি থাকলেই হয় না। পরদিনই সে ছুটি নিল।
গ্রামে এসে নদীর ধারে গেল। মৃণাল সেখানে ছিল না। সন্ধ্যা নামল। অনি অপেক্ষা করল। শেষে মৃণাল এল—চোখে ক্লান্তি, মুখে চুপ।
অনির কণ্ঠ কাঁপল, “আমি ভুল করেছি। আমি ভেবেছিলাম, ভালোবাসা বুঝে নেবে। কিন্তু ভালোবাসা বুঝে নেওয়ার আগে ধরে রাখতে হয়।”
মৃণাল তাকাল নদীর দিকে। বলল, “আমি ভেবেছিলাম, শব্দ থাকলেই মানুষ থাকবে। কিন্তু মানুষ থাকতে চাইলে শব্দ বলতে হয়।”
অনির হাত বাড়াল। “আমি থাকতে চাই। হাল ধরতে চাই।”
মৃণাল ধীরে হাত দিল। “তাহলে কথা বলো। নীরবতা দিয়ে নয়।”
সেদিন তারা প্রতিজ্ঞা করল—বড় বড় কথা নয়। ছোট ছোট উপস্থিতি। সপ্তাহে দু’দিন ফোন, মাসে একবার দেখা, আর নদীর ধারে বসে থাকা—যখনই সম্ভব। ভালোবাসাকে তারা নিয়মে বেঁধে ফেলল না, কিন্তু যত্নে রাখল।
বছর দুয়েক পর। নদীর ধারে নতুন বেঞ্চ বসানো হয়েছে। অনি এখন গ্রামের কাছেই কাজ নেয়। মৃণাল মাস্টার্স শেষ করেছে। সন্ধ্যায় তারা বেঞ্চে বসে। মৃণাল পড়ে, অনি শোনে। কখনো উল্টোটা।
অনির মনে হয়—ভালোবাসা আসলে কোনো ঝড় নয়, যে এলে সব বদলে দেয়। ভালোবাসা একটা নদী—তুমি যদি নৌকা নিয়ে নামো, হাল ধরো, আর একসঙ্গে বসে থাকো, তবে পথ নিজেই খুলে যায়।
মৃণাল বই বন্ধ করে বলে, “শোনো, আজ একটা নতুন কবিতা লিখেছি।”
অনির হাসি আসে। “নদীকে শোনাবে?”
“না,” মৃণাল বলে, “মানুষকে।”
আর নদী চুপচাপ বয়ে যায়—সব শব্দ, সব ভয়, সব ভালোবাসা নিজের মধ্যে নিয়ে।
13
View