Posts

গল্প

ভাগ্যের এক যমজ অধ্যায়

December 31, 2025

Fahima Akter

21
View

অনেক দিন আগের কথা। হরিপুর নামে এক গ্রামে বাদশা নামের এক রাজা থাকতেন। রাজা তাঁর রানি রাবেয়াকে নিয়ে ভালোই দিন কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ একদিন রানি রাজাকে ডেকে বললেন,
“শুনুন, একটা কথা। আজকাল আমার শরীরটা ভালো থাকে না। আমার মনে হয়, কোনো কঠিন রোগ হয়েছে। আমার যদি কোনো মেয়েসন্তান হয়, তাহলে তার নাম রাখবেন রুবাইয়া। আর যদি ছেলেসন্তান হয়, তাহলে আপনি যে নাম রাখতে চান, সেই নামই রাখবেন।”
এ কথা শুনে রাজা বললেন,
“এসব কথা বলো না। যত টাকাই লাগুক না কেন, আমি তোমাকে ভালো চিকিৎসা করাব। দরকার হলে সবকিছু বিক্রি করে দেব, তবু তোমাকে সুস্থ করে তুলব।”
রানি বললেন,
“আর কিছুতেই কোনো লাভ হবে না। আমার মনে হয়, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না।”
এর কয়েক মাস পর রানি দুটি যমজ মেয়ের জন্ম দেন। সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়ই রানি মারা যান। রাজ্যেও প্রায় ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়। রাজাও খুব ভেঙে পড়েন। কিন্তু রাজা জানতেন না যে তাঁর যমজ মেয়ে হয়েছে।
এদিকে মন্ত্রী কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করে রাজার ছোট মেয়েটিকে এক বুড়ির কাছে রেখে আসে এবং রাজার যমজ মেয়ে হওয়ার কথাটাও গোপন রাখে। রাজ্য চালানোর জন্য নতুন রানি আনা হয়। রাজা তাঁর মেয়ের নাম রাখেন রুবাইয়া। আর মন্ত্রী বড় মেয়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছোট মেয়েটির নাম রাখে রুকাইয়া।
রুবাইয়া থাকত রাজপ্রাসাদে, কিন্তু রুকাইয়া থাকত বুড়ির কুঁড়েঘরে। রাজ্যে যে নতুন রানি আনা হয়েছিল, সে ছিল প্রচণ্ড রাগী ও বদমেজাজি। সে রুবাইয়ার খেয়াল রাখত না, রাজাকেও গুরুত্ব দিত না, রাজার সেবা করত না। রাজ্যের সবার উপর অত্যাচার করত এবং অনেক পরিশ্রম করাত। একটু ভুল হলেই কঠিন শাস্তি দিত।
রুকাইয়া বুড়ির সঙ্গে বেশ আনন্দেই দিন কাটাচ্ছিল। দিন কাটতে থাকে। রুবাইয়া ও রুকাইয়া দুজনেই বড় হতে থাকে। রুকাইয়া ছিল একটু চঞ্চল, সাহসী ও রাগী প্রকৃতির মেয়ে। আর রুবাইয়া ছিল শান্ত, শিষ্ট ও ভীতু প্রকৃতির মেয়ে।
রানি আর রানির ভাইয়ের অত্যাচারে সবাই অনেক কষ্ট পেত। রুবাইয়াকেও তারা অনেক কষ্ট দিত। রুবাইয়া অনেক কান্নাকাটি করত। এসব দেখে রাজাও অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে যান, কিন্তু কিছুই করতে পারতেন না।
একদিন রানি রুবাইয়াকে নদী থেকে পানি আনতে বলে। তারপর রুবাইয়া হাঁটতে হাঁটতে নদীর পারে যায় এবং ভাবে,
“সৎমা সবাইকে কত কষ্ট দেয়! আমাকেও ঠিকমতো খেতে দেয় না।”
এসব আর ভালো লাগে না। সে ভাবে, এর থেকে ভালো এই নদীতেই ঝাঁপ দেওয়া। এসব ভেবে সে নদীতে ঝাঁপ দেয়। নদীর আশপাশের লোকজন তাকে নদীর পানি থেকে তুলে বুড়ির কাছে নিয়ে যায়।
ঠিক সেই দিন রুকাইয়াও বুড়ির নাতনির সঙ্গে ঘুরতে বের হয়। ঘুরতে ঘুরতে সে প্রাসাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। তার খুব ইচ্ছে করে প্রাসাদের ভেতরে ঢোকার। সে বুড়ির নাতনির কাছে বায়না ধরে প্রাসাদের ভেতরে ঢোকার জন্য। বুড়ির নাতনি অনেকবার বারণ করে, কিন্তু সে শোনে না। সে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
রাজপ্রাসাদের ভেতরে ঢুকতেই সে রানিকে দেখে। রানি রুকাইয়াকে দেখে রুবাইয়া মনে করে অনেক বকাঝকা করে। চিৎকার করে বলে,
“তোকে না সকালে পানি আনতে পাঠিয়েছিলাম! এতক্ষণে আসার সময় হয়েছে তোর? ছেলেদের পোশাক কোথায় পেলি? তোর পিঠে আজ চাবুক মারব!”
এসব শুনে রুকাইয়া বলে,
“কি বলছেন আপনি? আমি তো এই মাত্র এলাম। আর রুবাইয়া বলছেন কাকে? আমার নাম রুকাইয়া। আমি এই প্রাসাদটা দেখতে এসেছিলাম।”
এ কথা শুনে রানি আরও রেগে যায়। চাবুক এনে মারতে যাবে, এমন সময় রুকাইয়া চাবুকটা ধরে ফেলে এবং বলে,
“প্রাসাদ দেখতে এসেছিলাম, তার জন্য এমন ব্যবহার করবেন তা বুঝতে পারিনি।”
রানি রুকাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমার মুখের উপর কথা! এত সাহস পেলি কোথা থেকে?”
রুকাইয়া আবার বলে,
“এখানে এসেছিলাম প্রাসাদ দেখতে, কিন্তু আপনি যা দেখালেন তা ভোলার মতো না।”
এই বলে রুকাইয়া চলে যায়। রানি পেছন থেকে ডেকে বলে,
“কোথায় আর যাবি? শেষে আমার কাছেই তো ফিরতে হবে তোকে!”
এদিকে রুবাইয়া বুড়ির কাছে থাকতে লাগল এবং বুড়ির সব কাজ করে দিতে লাগল। বুড়ি অবাক হয়ে বলল,
“রুকাইয়া, এত কিছু কিভাবে পারছিস? তুই তো কোনো দিনই কাজ করিসনি, শুধু সারাদিন ঘুরে বেড়াতি। কিন্তু এখন এত শান্ত হলি কিভাবে? কী হয়েছে তোর? আর এরকম জামা পেলি কোথায়?”
তখন রুবাইয়া বলল,
“বুড়ি মা, আমি হরিপুর গ্রামের বাদশা নামের এক রাজার রাজকন্যা। আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি, না হলে আমার সৎমা আমার জন্য আপনার ক্ষতি করবে।”
বুড়ি বলল,
“কি বলছিস? হরিপুরের বাদশা রাজার কন্যা তুই? কয়েক বছর আগে তো মন্ত্রীরা এমন এক রাজার কথাই বলেছিল।”
রুবাইয়া প্রাসাদে ফিরে যায়। রানি তাকে দেখে রাগে লাল হয়ে বলে,
“এই তো, আমার কাছেই আসতে বলেছিলাম। তাহলে এত কাহিনি করলি কেন? তোর অনেক সাহস বেড়েছে, সেটাই এখন চাটাই করব।”
এই বলে রুবাইয়াকে মারধর করতে লাগল। রুবাইয়া কাঁদতে কাঁদতে ভয়ে ভয়ে রানিকে বলে,
“আপনি কী বলছেন আর কেনই বা আমার সঙ্গে এমন করছেন, কিছুই বুঝতে পারছি না।”
রুকাইয়া বুড়ির কাছে যায় এবং বলে,
“তোমাকে দুদিন দেখিনি, মনে হচ্ছে যেন দুই বছর দেখিনি।”
বুড়ি কোনো জবাব না দিয়ে বলে,
“তোর সঙ্গে একটা কথা আছে আমার।”
রুকাইয়াও বুড়িকে বলে,
“আমারও কথা আছে তোমার সঙ্গে।”
পরের দিন বুড়ি রুকাইয়াকে বলে,
“তুই যখন বাড়ির বাইরে ছিলি, তখন একটা মেয়ে এসেছিল, পুরো তোর মতো দেখতে। তবে তার আচরণ তোর মতো নয়। সে শান্ত আর ভীতু প্রকৃতির। কিন্তু জানিস, সে বাদশা রাজার মেয়ে। যে রাজার নাম বলে তোকে আমার কাছে দিয়ে গিয়েছিল, তার মেয়েই এই রুবাইয়া।”
এসব শুনে রুকাইয়া বলে,
“কি বলছ? তাহলে কি আমার একটা যমজ বোন আছে?”
রুকাইয়া মুখটা কালো করে বুড়িকে বলে,
“আমি একবার প্রাসাদ দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু জানো, সেই রাজপ্রাসাদের রানি খুবই দুষ্ট প্রকৃতির ও বদমেজাজি। সে আমাকে রুবাইয়া বলে ডাকছিল আর আজেবাজে কথা বলে আমাকে চাবুক দিয়ে মারতে আসছিল।”
বুড়ি বলে,
“বলিস কি! কেন জানি মনে হচ্ছে, তোর একটা যমজ বোন আছে এবং সে অনেক কষ্টে আছে। তুইই পারবি তোর বোনকে ভালো রাখতে।”
এরপর রুকাইয়া প্রাসাদে যায়, রাজাকে উদ্ধার করে এবং সব ঘটনা রাজাকে খুলে বলে। রাজা তাঁর হারানো মেয়েকে পেয়ে খুব খুশি হন। রানিকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়। নির্দোষ ব্যক্তিদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং রানির লোকদের কারাগারে বন্দি করা হয়।
দুই রাজকন্যার বিয়ে বুড়ির নাতি ও মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে দেওয়া হয়। রাজ্যে আবার হাসি-আনন্দ ফিরে আসে। রাজাও খুশি হন।
এসব দেখে মন্ত্রী বলে,
“মহারাজ, আপনি একদিন আমাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে এই প্রাসাদে জায়গা দিয়েছিলেন। তারই প্রতিদান দিলাম আজ। ছোট মেয়েটিকে দেখেই বুঝেছিলাম, সে রাজ্যে সুখ আনতে পারবে।”

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Sokal Roy 14 hours ago

    বাহ! বেশ পড়লাম, ভালো লাগলো