Posts

গল্প

সাপলুডু

December 31, 2025

সোলায়মান হোসেন তুষার

51
View

শুনলাম জাহানারা কাল পালিয়ে বিয়ে করেছে কাসেদের বন্ধু রকিবকে। রকিব দেখতে সুদর্শন। শহরে লেখাপড়া করেছে প্রাইভেট ভার্সিটিতে। চলাফেরায় অভিজাত ভাব। চোরাইপথে এসেছে লক্ষ লক্ষ টাকা। বাবার অবর্তমানে তার মালিক রকিবই। রকিব ছোট থাকতেই তার বাবা মারা যায়। বাবার শাসন তাই তাকে ছুঁয়ে দেখেনি। বিদ্যালয় থেকে পালিয়ে বখাটে ছেলেদের সাথে মার্বেল থেকে শুরু করে হালের মাদকাসক্তি—তার কাছে ছেলেখেলা।
কাসেদের মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে জাহানারা এসেছিলো। অসম্ভব রূপবতী হওয়া সত্ত্বেও তার ভেতর কোনো অহংকার নেই। স্নিগ্ধ, শান্ত মুখশ্রী তাকে করেছিলো অনন্য। সেখান থেকেই রকিব-জাহানারার আলাপ। আলাপ কবে প্রেমে রূপ নিয়েছে তা শুধু তারাই বলতে পারবে। সুন্দরী মেয়েরা বেছে বেছে বখাটে ছেলেদেরই প্রেমে পড়ে। কারণ তারা নতুনত্ব, গভীর প্রেম ভালোবাসে। এ ধরনের ছেলেরা বাহ্যিকভাবে হলেও তা দিতে পারে। রূপা বললো কাসেদ দুদিন লাপাত্তা। রূপা কাসেদের একমাত্র বোন। কাসেদের জাহানারার প্রতি দুর্বলতা সে খুব করেই জানতো। তাই সে চিন্তিত। “কাসেদ একরোখা প্রকৃতির ছেলে কিনা!” কম্পিত কণ্ঠে বলছিলো রূপা।
গত সপ্তাহেও কাসেদের সাথে দেখা হয়েছিলো। রফিক চাচার চায়ের আসরে। কাসেদ থাকলে বিলটা ও-ই দেয়। আমার তো আর প্রেমিকা নেই। রাত জেগে ‘চা’ খাওয়া বাদে কোনো বাজে খরচও নেই। একটু নাহয় খরচ করলামই। কাসেদের যুক্তির কাছে আমার যুক্তি খাটে না। ছেলেটা উকিল হলে বেশ হতো। কিন্তু ও বড্ড লাজুক। জাহানারার কলেজের সামনের চায়ের দোকানের পাশে রোজ দাঁড়িয়ে থাকে। কথাও হয় দেখেছি মাঝে মাঝে। কী এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়তার সম্পর্ক! একটু কথা বলতে পারলেই দেখেছি ওর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি ফুটে ওঠে। রাতভর জেগে জেগে কবিতা লেখে। নীল কাগজের ওপর কালো বলপয়েন্ট দিয়ে। প্রতিদিন ‘ছোটকু’কে দিয়ে তা জাহানারার বাড়িতেও পাঠাতো। কিন্তু নিজের নামটা লেখার সাহস করে উঠতে পারেনি। জাহানারা কি কিছু বুঝতে পারে না? জিজ্ঞেস করলে কাসেদের দীর্ঘশ্বাস শোনা যেত। কাসেদের বাবা সৎ স্কুলশিক্ষক হিসেবে রূপপুরে পরিচিত মুখ। কাসেদও রূপপুর থেকে একমাত্র যে কি না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স করেছে। তবে চাকরিটা জুটিয়ে নিতে পারেনি এখনো। রকিবকে রেখে এমন ছেলেকে কেন জাহানারা ভেবে দেখবে? প্রতিউত্তরে ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস সবেগে ছুটে আসে।

রূপার প্রতিটি আচরণে আমি বিষম খাই! এতোটা গভীর জীবনবোধ অতটুকু মেয়ের ভেতরে কীভাবে আসলো ভেবে পাই না। হয়তোবা বাবা আতহার গাজীর থেকেই। বাবাই মেয়েটার একমাত্র দুর্বলতা। ইদানীং রূপাই আমার দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে। কাসেদের বড্ড অসুখ করেছে। ধাক্কাটা সামলে নিতে পারেনি ঠিকভাবে। প্রচণ্ড জ্বরে মাথা তুলতে পারে না। ওর সেবাযত্নের জন্য ওর সাথেই থাকতে হচ্ছে। কদিনে সবাইকে দেখছি গভীরভাবে। আতহার গাজীর সামান্য বেতন হলেও কাসেদের কোনো ত্রুটি রাখে না। কাসেদকে নিয়ে তার বিশাল স্বপ্ন। রূপাকে কোনো আবদার করতে দেখিনি নিজের জন্য। বাবার চশমার ডাঁটটা বেঁকেছে। জামাটা পুরোনো হয়েছে। সেদিন তো জুতাটা ছেঁড়ার পরে তুলকালাম কাণ্ড! রূপা জিদ ধরেছে আজই একজোড়া নতুন জুতা কিনতে হবে। আতহার গাজীও নাছোড়বান্দা। জুতাটা আরো মাস ছয়েক চালিয়ে নেবে—এটাও তার শেষ কথা। এ নিয়ে তাদের অভিমান পর্বটা বেশ লাগে। আমার বাবা বেঁচে নেই। থাকলে হয়তো আমাদের দিনগুলো এভাবেই কেটে যেত। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে যে এটা চলে আসছে সেই আদিম থেকে।
মেয়েটার চোখদুটো প্রশান্ত, গভীর। কাসেদের মতো কবিতা লিখতে পারলে এ অনুভূতি ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে দিতাম সকলের হৃদয়ে। খোলা চুল, হাসিমুখ আমায় ভাবনার সাগরে ডুবিয়ে রাখে। ভাবনাগুলো মস্তিষ্ক থেকে হৃদয়টা দখল করেছে বহুদিন। যেটা হৃদয় ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেহে। এ বড্ড কঠিন অসুখ। একজনই যার ওষুধ রাখে। বিনা চিকিৎসায় আমার অন্তরের গভীরটা বিষিয়ে উঠেছে। ভেতর থেকে উপসর্গ প্রকাশ পাচ্ছে বাহিরেও। রাতে ভালো ঘুম হয় না। চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে। নিজের যত্ন যে ভুলতে বসেছি আজকাল ওই অসুখের কারণে। সব প্রতিকূলতা ভুলে সেদিন সব বললাম আমার দুর্বলতা। লজ্জায় চোখদুটো মাটি থেকে তুলতে পারিনি। ‘মা’ বলে, আমার হাসি নাকি অসম্ভব বিনয়ী। এতদিন এই হাসিতে শিক্ষকদের কাবু করেছি। আজ সেই অতলে পড়লো রূপা। এই অতলেই কাটুক রূপার জীবন—এতটুকুই চেয়েছিলাম সেদিন। আমার ভাগ্যটাই এমন। আমার ভালোবাসা কেউ ফেলতে পারে না।

জাহানারা নাকি রকিবকে ছেড়ে চলে এসেছে। পল্লবী নামের কারো সাথে নাকি রকিবের সম্পর্ক তাদের সম্পর্কেরও আগে থেকে। এখন নাকি ওরা বিয়ে করেছে। জাহানারা অভিমানে রকিবকে ডিভোর্স দিয়ে একটা কিন্ডারগার্টেনে চাকরি নিয়েছে। আর নাকি বিয়ে করবে না। এসবে আকর্ষণ নেই। বছর চারেক ঘুরেও একটা চাকরি জুটাতে পারলাম না। টিউশনের টাকায় সংসার চলে। মায়ের শরীরটাও ভালো নেই। কিছু টাকা জমিয়েছিলাম ছাত্রজীবন থেকে। তা খরচ করে বোনের বিয়েটা দিলাম। বোনের একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। ছেলের জন্য চেইনটা না দিতে পারায় নাকি শাশুড়ি-ননদের খোঁটা শুনতে হয়। তবে বিকাশ ছেলেটা ভালো। আমাদের অবস্থাটা বোঝে।
তিন বছর আগেই কাসেদ চাকরিটা পেয়ে গিয়েছিলো। এখন সে একজন ব্যাংকার। চাকরি পেয়েই অনিলাকে বিয়ে করেছে। অনিলা জাহানারার কথা জানে। কাসেদের ভালোবাসার কাছে ওসব ছাই। কথায় উড়িয়ে দেয় ওসব। বেশ সুখেই চলছে তাদের সংসার। জাহানারাকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো নাকি সংকলন হিসেবে ছাপিয়েছে। কবিতাগুলোও খুব সুনাম কুড়িয়েছে। এখন তাদের সংসারের টানাপড়েন আর নেই। রূপার বিয়ে হয়েছে তাও বছর দুই হলো। ছেলে বিশাল ব্যবসায়ী। আমার মতো বেকার ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দেওয়ায় মত দেয়নি আতহার গাজী। কাসেদ বললো বন্ধুত্বের সম্পর্কের জেরে আমি বাড়াবাড়ি করেছি। রূপাকে বলেছিলাম, চলো পালিয়ে যাই। বাবার প্রতি দুর্বলতায় সে আর হয়ে ওঠেনি। সে কোনোভাবেই চায়নি বাবার মনে কষ্ট দিতে। কী করিনি আমি! হাত জোড় করে রূপাকে চেয়েছিলাম সেদিন। কাসেদ গায়ে হাত তুলতেও ছাড়েনি। গরিবের ওসব গায়ে মাখতে নেই। কাসেদ ক্ষমা চাইলে মাফ করে দিয়েছিলাম। গরিবরা ক্ষমা করতে খুব ভালো পারে।
টিউশন শেষে কেজি পাঁচেক মিষ্টি কিনে বাড়িতে রওনা হয়েছি। ‘রানার অটোমোবাইল লিঃ’ থেকে মেইল এসেছে সহকারী প্রকৌশলী পদে জয়েন কনফার্মেশন করতে। বেতনটাও বেশ লোভনীয়। শুরুতেই পঞ্চাশ হাজার দিতে চায়। মোবাইল কেঁপে ওঠায় মোবাইলটা হাতে নিলাম।
কাসেদের নাম্বার থেকে বার্তা এসেছে,
“অভি, রূপার ছেলে হয়েছে। আমরা সেখানে যাচ্ছি। দ্রুত চলে আয়। না আসলে ‘মা’ খুব রাগ করবে।”
খুশির খবরেও চোখ ভিজে উঠেছে। মিষ্টির প্যাকেটসহ কাসেদদের বাড়ির পথে হাঁটছি। সৃষ্টিকর্তা বোধহয় মধ্যবিত্তদের জীবনটাকে এক সাপ-লুডুর ছকে সাজিয়েছেন। উত্থান-পতনের এই অনিশ্চিত সাপলুডু খেলে চলেছি আমি। আমার মতো সকল মধ্যবিত্ত যুবকেরা। এ খেলা চলে আসছে প্রাচীন থেকে। চলছে, চলবে।
 

Comments

    Please login to post comment. Login