Posts

গল্প

প্রতিজ্ঞা

December 31, 2025

Fahima Akter

12
View

সে অনেক দিন আগের কথা।
কোনো এক গ্রামে শিউলি নামের একটি মেয়ে থাকত। তার বাবা ব্যাংকে নিম্ন আয়ের একটি চাকরি করতেন, আর তার মা ছিলেন গৃহিণী। তাদের পরিবারে ছিল তিন ভাই ও এক বোন শিউলি। শিউলি দেখতে কালো ছিল, তাই তার বাবা ও বড় দুই ভাই তাকে তেমন পছন্দ করত না। তবে তার মেজো ভাই শিউলিকে খুব ভালোবাসত।
শিউলির মা বাবার ভয়ে কিছু বলতে পারতেন না, কিন্তু মেজো ভাই সবসময় প্রতিবাদ করত। সে সব দিক থেকে শিউলিকে আগলে রাখত।
একদিন শিউলির বাবা কাজ থেকে ফিরে দেখল, শিউলি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এটা দেখে সে খুব রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলল,
“শিউলির মা, তোমাকে না কত দিন বলেছি,ও যেন আমার সামনে না আসে!”
আরও অনেক কটু কথা সে শিউলির মাকে বলল। এসব শুনে শিউলির মা খুব কষ্ট পেল।
এর আগেও শিউলি স্কুলে গেলে বা বাড়ির বাইরে বের হলে নানা কথা শুনতে হতো। কিন্তু আজ বাবার কথাগুলো সে কিছুতেই সহ্য করতে পারল না। বাবার কথা শুনে সে খুব কষ্ট পেয়ে একা একা বসে কাঁদছিল।
হঠাৎ তার মেজো ভাইয়ের চোখে পড়ে বিষয়টি। সে কাছে এসে পাশে বসে শিউলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“এভাবে কাঁদিস না, এতে আমার খুব কষ্ট হয়। আজ রাতেই তোকে নিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। সবাইকে দেখিয়ে দেব,কালো হলে কী হয়েছে, আমার বোন সব পারে।”
এই কথা শুনে শিউলি হালকা হেসে বলল,
“তুমি যে কী বলো না! আমার জন্য এত কষ্ট করছো বলেই এসব বলছো। কিন্তু আমার তো কিছু করার মতো যোগ্যতাই নেই। আমি কিছুই পারি না, আর পারবও না।”
মেজো ভাই বলল,
“সেটা আমরাই প্রমাণ করব।”
মধ্যরাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন মেজো ভাই শিউলিকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তারা মায়ের ঘরে একটি চিঠি রেখে যায়। চিঠিতে লেখা ছিল,
“মা, আমি আমার বোনকে নিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। জানি না কোথায় যাব, কিন্তু একদিন আমি আমার বোনকে অনেক বড় ডাক্তার বানাব। এটা আমার প্রতিজ্ঞা। সবাইকে বুঝিয়ে দেব,কালোরাও অনেক কিছু করতে পারে। মা, আমাদের জন্য শুধু দোয়া করবেন।”
এরপর তারা অনেক দূরের একটি শহরে চলে যায়। মেজো ভাইয়ের কাছে সামান্য কিছু টাকা ছিল, তা দিয়ে তারা একটি ছোট ঘর ভাড়া নেয়। সেখানেই তারা থাকতে শুরু করে।
মেজো ভাই কাজের খোঁজে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় যা টাকা রোজগার করত, তা দিয়ে খাবার আনত। রাতে সে শিউলিকে পড়াত। প্রতিদিন সকালে সে কাজের জন্য বের হতো, সারাদিন খেটে সন্ধ্যায় ফিরে এসে বোনকে পড়াত।
নিজে পড়াশোনায় ভালো হলেও, বোনের জন্য সে জীবনের সব শখ, ভালো-মন্দ সবকিছু ত্যাগ করেছিল। শিউলি এসব দেখে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হয়ে ওঠে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে,
“যেভাবেই হোক, আমাকে পড়তেই হবে। নিজের জন্য না হলেও ভাইয়ের জন্য আমাকে সফল হতেই হবে। আমার ভাই আমার জন্য সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে,তার জন্য কি আমি এতটুকু করতে পারব না?”
মেজো ভাইয়ের স্বপ্ন আর শিউলির কঠোর পরিশ্রমের ফলে একদিন শিউলি অনেক বড় ডাক্তার হয়। চারদিকে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। মেজো ভাই খুব খুশি হয়। গর্বভরা মুখে সে শিউলিকে বাড়িতে নিয়ে যায়।
সবার সামনে দাঁড়িয়ে সে বলে,
“আমি খুব খুশি। আমি পেরেছি প্রমাণ করতে,কালোরাও অনেক কিছু করতে পারে।”
এরপর শিউলি পরিবারের সবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। তার বাবাও নিজের ভুল বুঝতে পারে। শিউলি মেজো ভাইকে আবার পড়াশোনা শুরু করতে বলে।
কিন্তু মেজো ভাই হেসে বলে,
“আমার স্বপ্ন তো পূরণ হয়ে গেছে। এখন আর পড়াশোনা করে কী হবে?”
এ কথা শুনে শিউলি হেসে বলে,
“তোমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার স্বপ্নটা কে পূরণ করবে?”
এই কথা নিয়ে ভাই-বোন হাসাহাসি করছিল। এমন সময় বাকি দুই ভাই এসে বলে,
“তোমাদের মাঝখানে একটু জায়গা হবে?”
কিছুক্ষণ পর বাবা-মাও এসে বলে,
“আমরা দু’জন কি তোমাদের পাশে বসতে পারি?”
শিউলি তখন বলল,
“এভাবে কেন কথা বলছো? তোমরা তো আমার নিজের মানুষ।”
তখন বাবা ও দুই ভাই শিউলির কাছে ক্ষমা চায়। এরপর সবাই একসাথে গল্প করতে থাকে। পরিবার এক হওয়ার আনন্দে তারা একটি ছোট পার্টি করে।আর এখানেই গল্পটি শেষ হয়। 🌸

Comments

    Please login to post comment. Login