Posts

গল্প

নীরবতার মুখোমুখি

December 31, 2025

Fahima Akter

40
View

সে অনেক দিন আগের কথা। আনন্দপুর নামের এক শহরে মিনু আর মিতা নামের দুই বোন থাকত। তাদের বাবা ছিলেন কলেজের শিক্ষক, আর মা ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা। মিনু পড়ালেখা করত, আর মিতা খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। মিনু ছিল একটু কল্পনাবিলাসী, সারাক্ষণ নিজের মতো করে ভাবত,এটা হবে, ওটা হবে, এটা করবে, ওটা করবে।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করতে মিনু ছাদে যায়। হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে সে এক অদ্ভুত জিনিস দেখে খুব অবাক হয়। তারপর ছাদ থেকে নেমে সবাইকে বলতে থাকে, কিন্তু কেউ মিনুর কথা বিশ্বাস করে না। কারণ মিনু এরকম কথা প্রায়ই বলত। কিন্তু সে যেটা দেখেছিল, সেটা কিছুতেই সে মানতে পারছিল না, আর কাউকে বোঝাতেও পারছিল না। পরে সে অনলাইনে সার্চ করে জানতে চায় এটা আসলে কী, আর আকাশেই বা কেন দেখা গেল। শেষ পর্যন্ত সে জানতে পারে, মহাকাশের মধ্যে একটি দ্বিতীয় পৃথিবী আছে, যেখানে এই পৃথিবীর মানুষের মতো দেখতে মানুষই বসবাস করে।
এইভাবেই কেটে যায় কয়েক মাস। মিনু দ্বিতীয় পৃথিবী নিয়ে অনেক গবেষণা করতে থাকে। নতুন করে জানতে পারে, অনলাইনে একটি লটারি দেওয়া হয়েছে যে লটারিতে জিতবে, সে দ্বিতীয় পৃথিবীতে ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এটা জেনে মিনু খুব খুশি হয়। ঘুরতে যাওয়ার আগ্রহে সে অনলাইন থেকে একটি লটারির টিকিট কিনে নেয়।
এদিকে তার বোন মিতা ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছিল। পরে সে একটি খুব ভালো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। তাই সে খুব খুশি হয়। তার পরিবারও সবাই খুব আনন্দিত হয়। এই খুশিতে মিতা তার আগের কলেজে একটি পার্টি দেয়। পার্টি শেষ হতে হতে অনেক রাত হয়ে যায়। মিতা একাই গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিল, কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে আসছিল। সে কল্পনা করতে থাকে মহাকাশের সেই দ্বিতীয় পৃথিবী নিয়ে। হঠাৎ তার গাড়িটি ওপর থেকে আসা একটি গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগে, আর মিতা আতঙ্কে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
পরের দিন পুলিশ তাকে খুঁজে বের করে থানায় নিয়ে যায়, আর শাস্তি হিসেবে দেয় ১২ বছরের জেল। ১২ বছর পর যখন মিতা জেল থেকে বাড়ি ফেরে, মা–বাবা, ছোট বোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী,সবাই তার সঙ্গে অন্যরকম ব্যবহার করতে থাকে। তার নিজের কাছেও নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতে থাকে। তাই সে সেই জায়গায় যায়, যেখানে দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। সেখানে গিয়ে সে অনেকগুলো খেলনা রাখা দেখে। এটা দেখে সে খুব অবাক হয়, আর একটু ভয়ও পায়।
পরে পাশে থাকা মানুষদের জিজ্ঞেস করে সে জানতে পারে, আজ থেকে ১২ বছর আগে যে গাড়িটির সঙ্গে দুর্ঘটনা হয়েছিল, সেই গাড়িতে নিরব নামের একজন লোক ছিল। তার সঙ্গে তার স্ত্রী আর সন্তানও ছিল। গাড়ি দুর্ঘটনায় নিরবের স্ত্রী ও সন্তান মারা যায়, আর নিরব গুরুতর আহত হয়ে কোমায় চলে যায়। জ্ঞান ফিরে এলে সে নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পায়। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর সে তার স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর খবর জানতে পারে। এই খবর শুনে নিরব প্রায় পাগলের মতো হয়ে যায়। তারপর থেকে তার সন্তানের প্রতি জন্মদিনে সে একটি করে খেলনা এই জায়গাটিতে রেখে আসত।
এইসব শুনে মিনু খুব কষ্ট পায়। নিজেকে আরও বেশি অপরাধী মনে হতে থাকে তার। তারপর সে ঠিক করে লোকটার কাছে গিয়ে সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাইবে। পরে মিনু লোকটার ঠিকানা জোগাড় করে। সে কাজের মেয়ে সেজে লোকটার বাসায় যায়, আর ভাবে যদি একবার কাজ করার সুযোগ পায়, তাহলে ধীরে ধীরে সব কথা বলে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করবে। এইভাবেই কেটে যায় কয়েক মাস। কিন্তু মিনু ভয়ে কিছুই বলতে পারে না।
একদিন ফোনের মাধ্যমে সে জানতে পারে, সেই লটারিতে সে জিতে গেছে, আর কয়েক দিনের মধ্যেই দ্বিতীয় পৃথিবীতে যাওয়ার টিকিট হাতে পাবে। এটা জেনে একটু খুশি হলেও মিনু নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। একদিন সে ঠিক করে যা-ই হোক না কেন সে ক্ষমা চাইবেই। নিজেকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করবে।
পরের দিন সকালে এক কাপ চা নিয়ে সে লোকটার কাছে যায়। লোকটি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে,
“তুমি তো খুব ভালো চা বানাও, জানো? আগে এমন ছিলাম না। একটা দুর্ঘটনা আমার জীবন শেষ করে দিয়েছে। একটা মেয়ে আমাদের গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে আমার স্ত্রী আর সন্তানকে মেরে ফেলেছে। আমিও অনেক দিন হাসপাতালে ছিলাম। তারপর থেকেই আমার এই অবস্থা।”
লোকটা আরও বলে,
“যদি ওই মেয়েটাকে একবার কাছে পেতাম, তাহলে নিজের হাতে গুলি করে হত্যা করতাম।”
এই কথা শুনে মিতা ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পরের দিন আবার লোকটার কাছে এসে ভয়ে ভয়ে বলে,
“এই যে শুনুন, যে গাড়িটা আপনার স্ত্রী আর সন্তানের মৃত্যুর কারণ, সেই গাড়িটা আসলে আমি চালাচ্ছিলাম। যে মেয়েটির জন্য এই অবস্থা, সেই মেয়েটাই আমি।”
এটা শুনে লোকটা রেগে বলে,
“এত বড় সাহস! আমার সর্বনাশ করে আবার আমারই বাসায় ঢুকেছিস! আজ তোকে গুলি করে মারব।”
এরপর মিনু কোনোরকমে পালিয়ে বাঁচে। কয়েক দিন পর আবার সেই বাসায় জানালা দিয়ে ঢোকে। লোকটা আবার তাকে দেখে গলা চেপে ধরে। অনেক কষ্টে তার হাত সরিয়ে মিনু বলে,
“আমি জানি আমার ওপর আপনার অনেক রাগ, আমাকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আমি ইচ্ছা করে গাড়িতে ধাক্কা দিইনি। আমি দ্বিতীয় পৃথিবীতে ঘুরতে যাওয়ার জন্য অনলাইনে টিকিট নিয়েছিলাম, আর সেই লটারিতে জিতেছি। শুনেছি ওই পৃথিবীতেও এই পৃথিবীর মতো দেখতে মানুষ আছে। আপনি এই টিকিট নিয়ে সেখানে যান। হয়তো আপনার স্ত্রী আর সন্তানকে দেখতে পারবেন। এই টিকিটের আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি নিয়ে যান।”
মিনু লোকটার হাতে টিকিট দিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। লোকটা অবাক হয়ে ভাবে,সে যদি সেখানে যায় আর তাদের মতো কাউকে দেখে, তাহলে হয়তো তার কষ্ট আরও বেড়ে যাবে, কারণ তারা তো আর এই পৃথিবীতে তার স্ত্রী আর সন্তান নয়। এর চেয়ে ভালো, সে যাবে না। সারা জীবন তাদের স্মৃতি বুকে নিয়েই বাঁচবে।
এদিকে মিনু সবার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে একা হয়ে যায়। কয়েক দিন পর মহাকাশের দ্বিতীয় পৃথিবী থেকে কিছু মানুষ এই পৃথিবীতে ঘুরতে আসে। তাদের মধ্যে একজন দেখতে একদম মিনুর মতো। তাকে দেখে মিনু খুব অবাক হয়ে চিৎকার করে বলে,
“তুমি কেন আমার কাছে এসেছ? তুমিও কি আমার মতো কল্পনাবিলাসী? তুমিও কি অতিরিক্ত কল্পনা করে নিজের সবকিছু হারিয়েছ?”
কিন্তু সেই মানুষটি কিছুই বলে না। তাদের দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করে।

Comments

    Please login to post comment. Login