একাদশ
গুরুচনের ভাঙ্গা দেহ মুঙ্গেরের জলহাওয়াতেও আর জোরা লাগিল না। বৎসর খানেক পরেই তিনি দুঃখের বোঝা নামাইয়া দিয়া চলিয়া গেলেন। গিরিন যথার্থই তাহাকে অতিশয় ভালোবাসিয়া ছিল এবং শেষ দিন পর্যন্ত তাহার যথাসাধ্য করিয়াছিল।
মৃত্যুর পূর্বে তিনি সজল কণ্ঠে তাহার হাত ধরিয়া অনুরোধ করিয়াছিলেন , সে যেন কোনদিন পর না হইয়া যায় এবং এই গভীর বন্ধুত্ব যেন নিকট আত্মীয়তায় পরিণত হয়।
তিনি ইহা চোখে দেখিয়া যাইতে পারিবেন না ,অসুখ-বিসুখের সময় হইল না ,কিন্তু পরলোকে বসিয়া যেন দেখিতে পান গিরিন তখন সানন্দে এবং সর্বান্তকরণে প্রতিশ্রুত হইয়াছিল।
গুরু চরণের কলিকাতার বাড়িতে যে ভাড়াটিয়া ছিল তাহার মুখে ভুবনেশ্বরী মধ্যে মধ্যে সংবাদ পাইতেন গুরুচরণের মৃত্যুর সংবাদ তাহারাই দিয়েছিল।
তাহার পর এ বাড়িতে গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটিলো নবীন রাই হঠাৎ মারা গেলেন। ভুবনেশ্বরী শোকে দুঃখে পাগলের মত হইয়া বড়বধুর হাতে সংসার সোপিয়া দিয়া কাশি চলিয়া গেলেন। বলিয়া গেলেন আগামী বছর শেখরের বিয়ের সমস্ত ঠিক হইয়া গেলে তিনি আসিয়া বিবাহ দিয়া যাইবেন।
বিবাহের সম্বন্ধ নবীন যায় নিজেই স্থির করিয়াছিলেন, এবং পূর্বেই হইয়া যাইত শুধু তাহার মৃত্যু হওয়াতেই এক বৎসর স্থগিত ছিল । কন্যা পক্ষের আর বিলম্ব করা চলে না । তাই তাহারা কাল আসিয়া আশীর্বাদ করিয়া গিয়াছিল ।এই মাসেই বিবাহ । আজ শেখর জননীকে আনিতে যাইবার উদ্যোগ করিতেছিল, আলমারি হইতে জিনিসপত্র নামাইয়া তোরঙ্গ সাজাইতে গিয়া অনেকদিন পরে তাহার ললিতার কথা মনে পড়িল সব সেই করিত।
তিন বছরের অধিক হইল তাহারা চলিয়া গিয়েছে ইহার মধ্যে তাহাদের কোন সংবাদই সে জানে না। জানিবার চেষ্টাও করে নাই, বোধ করি ইচ্ছাও ছিল না। ললিতার উপরে ক্রমশ তাহার একটা ঘৃণার ভাব আসিয়াছিল, কিন্তু আজ সহসা ইচ্ছা করিল যদি কোন মতে একটা খবর পাওয়া যায় ,কে -কেমন আছে।
অবশ্য ভালো থাকিবারই কথা, কারণ গিরিনের সঙ্গতি আছে, তাহা সে জানিত তথাপি সে শুনিতে ইচ্ছা করে, কবে বিবাহ হইয়াছে, তাহার কাছে কেমন আছে এই -সব।
ও বাড়ির ভাড়াটিয়ারাও আর নাই, মাস দুই হইল বাড়ি খালি করিয়া চলিয়া গিয়াছে ।শেখর একবার ভাবিল চারুর বাপকে গিয়া জিজ্ঞাসা করিবে কারণ তাহারা গিরিনদের সংবাদ নিশ্চয়ই রাখেন। ক্ষণকালের জন্য তোরঙ্গ গোছানো স্থগিত রাখিয়া ,সে শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাহিরে চাহিয়া এইসব ভাবিতে লাগিল, এমন সময় দারের বাহিরে দাঁড়াইয়া পুরাতন দাসী কহিল , ছোট বাবু কালির মা একবার আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।
শেখর মুখ ফিরাইয়া অত্যন্ত আশ্চর্য হইয়া বলিল , কোন কালির মা?
দাসী হাত দিয়া গুরু চরণের বাড়িটা দেখাইয়া বলিল, আমাদের কালীর মা ছোট বাবু,, তারা কাল রাত্তিরে ফিরে এসেছেন যে।
চলো যাত্রী বলিয়া সে তৎক্ষণাৎ নামিয়ে গেল।
তখন বেলা পড়িয়ে আসিতেছিল, সে বাড়িতে পা দিতেই বুকভাঙ্গা কান্নার রোল উঠিল। বিধবা বেশধারিনী গুরু চরণের স্ত্রীর কাছে গিয়ে আসে মাটিতে বসিয়া পরিল এবং কোচার খুট দিয়া নিঃশব্দে চোখ মুচিতে লাগিল, শুধু গুরু চরণের জন্য নহে সে নিজের পিতার শোকেও আর একবার অভিভূত হইয়া পড়িল।
সন্ধ্যা হইলে ললিতা আলো জালিয়া দিয়া গেল। দূর হইতে গলায় আঁচল দিয়া তাহাকে প্রণাম করিল, এবং খনকাল অপেক্ষা করিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া গেল ,শেখর সপ্তদশ বর্ষিয়া পর স্ত্রীর পানে চোখ তুলিয়া চাহিতে বা ডাকিয়া কথা কহিতে পারিল না। তথাপি আড় চোখে যতটা সে দেখিতে পাইয়াছিল মনে হইল ললিতা যেন আরো বড় হইয়াছে এবং অত্যন্ত কৃশ হইয়া গিয়াছে।
অনেক কান্নাকাটির পরে গুরুচরনের বিধবা যাহা বলিলেন ,তাহার মর্ম এই যে এই বাড়িটা তিনি বিক্রয় করিয়া মঙ্গরে জামাইয়ের আশ্রয়ে থাকিবেন, এই তার ইচ্ছা।
বাড়িটা বহুদিন হইতে শেখরের পিতার ক্রয় করিবার ইচ্ছা ছিল, এখন উপযুক্ত মূল্যে তাহারাই ক্রয় করিলে ইহা একরকম নিজেদেরই থাকিবে ,তাহার নিজেরও কোনো রূপ ক্লেশবোধ হইবেনা এবং ভবিষ্যতে কখন তিনি এদেশে আসিলে দুই একদিন বাস করিয়া যাইতেও পারিবেন,
এইসব শেখর মাকে জিজ্ঞাসা করিয়া তাহার যথাসাধ্য করিবে বলায় তিনি চোখ মুছিয়া বলিলেন এর মধ্যে আসবেন না শেখর?
শেখর জানাইলো আজ রাত্রেই তাকে সে আনিতে যাইবে। অতপর তিনি একটি একটি করিয়া অন্যান্য সংবাদ জানিয়া লইলেন, শেখরের কবে বিবাহ ,কোথায়, কত হাজার কত অলংকার , কি করিয়া মারা গেলেন ,দিদি কি করিলেন ইত্যাদি অনেক কথা বলিলেন এবং শুনিলেন।
শেখর যখন ছুটি পাইল তখন জ্যোৎস্না উঠিয়াছে। এই সময় গিরীন্দ্র ওপর হইতে নামিয়া বোধ করি তাহার দিদির বাড়িতে গেল। গুরু চরণের বিধবা দেখিতে পাইয়া প্রশ্ন করিলেন আমার জামাইয়ের সঙ্গে তোমার আলাপ নেই শেখর নাথ? এমন ছেলে সংসারে আর হয় না।
শেখরে তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই, তাহা সে জানাইল এবং আলাপ আছে বলিয়া দ্রুতপথে বাহির হইয়া গেল, কিন্তু বাহিরের বসিবার ঘরের সম্মুখে আসিয়া তাহাকে সহসা থামিতে হইল।
অন্ধকার দরজার আড়ালে ললিতা দাঁড়াইয়া ছিল বলিল শোনো মাকে কি আজাই আনতে যাবে?
শেখর বলিল হা।
তিনি কি বড় বেশি কাতর হয়ে পড়েছেন?
হ্যাঁ প্রায় পাগলের মত হয়েছিলেন।
তোমার শরীর কেমন আছে?
ভালো আছে বলি আসে খুব তাড়াতাড়ি চলিয়া গেল।
রাস্তায় আসিয়া তাহার আপাদমস্তক লজ্জায় ঘৃণায় শিহরিয়া উঠিল। ললিতার কাছাকাছি দাঁড়াইতে হইয়াছিল বলিয়া তাহার নিজের দেহটাও যেন অপবিত্র হইয়া গিয়াছে, এমনই মনে হইতে লাগিল। ঘরে ফিরিয়া আসিয়া যেমন তেমন করিয়া তোরঙ্গ বন্ধ করিয়া ফেলিল এবং তখনও গাড়ির বিলম্ব আছে জানিয়া, আর একবার শয্যাশ্রয় করিয়া ললিতার বিষাক্ত স্মৃতিটাকে পুড়াইয়া নিঃশেষ করিয়া দিবে শপথ করিয়া , সে হৃদয়ের রন্ধে রন্ধে ঘৃণার দাবানল জ্বালিয়া দিল। দাহনের যাতনায় সে তাহাকে মনে মনে অকথ্য ভাষায় তিরস্কার করিল, এমনকি কুলটা পর্যন্ত গলিতে সংকোচ করিল না। তখন কথায় কথায় গুরুচরণের স্ত্রী বলিয়াছিলেন, এত সুখের বিয়ে নয় তাই শেষ পর্যন্ত কারো মনে ছিল না, নইলে ললিতা তখন তোমাদের সকলকেই সংবাদ দিতে বলেছিল ললিতার এই স্পর্ধাটা যেন সমস্ত আগুনের উপরেও শিখা বিস্তার করিয়া প্রজ্বলিত হইতে লাগিল।