খালেদা জিয়ার পরিবারের নারী সদস্যরা জানাজার আনুষ্ঠানিকতায় ছিলেন এবং একসাথে গ্রেভইয়ার্ডে গিয়ে প্রার্থনা করেছেন। কবরে মাটিও দিয়েছেন। সেই ছবিটি মুসলিম বিশ্বের পার্সপেক্টিভে খুবই সিগনিফিক্যান্ট।
বাংলাদেশে সাধারণত নারীদেরকে জানাজা কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করা হয়। কবরের ধারেকাছে নারীরা প্রায় যেতেই পারেন না।
আজকের জানাজা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সারাদেশ থেকে যাওয়া বেশিরভাগ মানুষের পোশাক ও অবয়ব খেয়াল করলে দেখবেন -গ্রামের চাষাভূষা বহুমানুষ প্যান্ট শার্ট পরা। ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে যারা শ্মশ্রুমণ্ডিতও না। টুপি পরার অনভ্যস্ততাও লক্ষণীয়।
নামাজে জানাজা শেষে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার কফিন এমন এক প্রমিনেন্ট মৌলভি কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন -যিনি নারী নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়নের ঘোরতর বিরোধী। এটাই নারীপ্রেরণা খালেদা ম্যাজিক যার সংস্কৃতি ও রুচিবোধকে পিতৃতন্ত্রের প্রতিভুরাও সমীহ করতে বাধ্য।
মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার কবরে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সতীর্থ বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও মাটি দিয়েছেন।
রাজশাহী বা দেশের অপরাপর এলাকা থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক খালেদা অনুরাগী মানুষ মানিক মিয়া এভিনিউতে এসে মাটিতে মাথা ঠুকে কেঁদে আকুল হয়েছেন।
ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টার আশেপাশে দাঁড়ানো তারেক রহমান ও অন্যান্য উপদেষ্টাদের সালাম ফেরানো হয়নি বলে বিভিন্ন পোস্টে জানানো হচ্ছে। তবে ওই সারিতে দাঁড়ানো একমাত্র নাহিদ ইসলামের সালাম নাকি পারফেক্ট হয়েছে বলা হচ্ছে।
এবং ওই একই রিলিজিয়াস পারফেকশনিস্টরা এই বলে আফসোস করছেন, আহারে তারেক রহমান কেন পাঞ্জাবি এবং টুপি পরলেন না! অথচ এই তারেক রহমানই শেষ বিদায়ের সময় মায়ের কফিনের পাশে বসে পবিত্র কোরআন পাঠ করেছেন। জানাজার ধর্মীয় রিচুয়াল অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করেছেন।
আমাদের বক্তব্য হলো কেবলমাত্র লেবাস ও নানামুখী নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাপলে ধর্মের উদারনৈতিক মৌল স্পিরিট ও আসল মর্মবাণী পেছনে পড়ে যায়।
তিন থেকে চার মিলিয়ন মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জানাজায় অংশ নিয়ে একজন দেশদরদী নারী নেত্রীর জন্য প্রার্থনা করেছেন। দেশ-বিদেশের কোটি মানুষ শোকে বিহ্বল হয়েছেন। রাষ্ট্র, সরকার ও সেনাবাহিনীর তরফে সর্বোচ্চ সম্মাননা অর্জন করে নিয়েছেন। খালেদার আলোকচ্ছটায় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিটি পাতা ও দিনব্যাপী চাঙ্ক দ্যুতিময় হয়ে উঠেছে। অনলাইনে হাজার লেখক খালেদা বন্দনায় মেতেছেন। এসব পরিসংখ্যান মিলে যাওয়ার পর তারেক রহমানের পাঞ্জাবি কিংবা সালাম ফেরানোর সমালোচনা ধোপে টেকে না ভাইলোগ।
এখন থেকে আরেকবার ভিন্নভাবে ভাবতে শিখুন;
আজকের জানাজায় যে লিবারেল সিনারিও দেখা গেল -এটাই আসল বাংলাদেশ। অন্যদিকে বাঁকবদলের সুযোগ একেবারেই থাকা উচিত না। এবং এমন liberal faith-based country'র স্বপ্নই আমরা সবাই মিলে দেখি। এটাই হলো সর্বজনের সুন্দর সহাবস্থান এবং শান্তির শেষ কথা।
১৯৪৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মকালে তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের পারিবারিক ডাক্তার ছিলেন অবনী গোস্বামী। তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে মজুমদার পরিবারের পারিবারিক চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে জন্ম বলে নবজাতকের নাম ‘শান্তি’ রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন ওই চিকিৎসক। কালক্রমে কর্মনিপুণা ওই নারী পুতুল তথা খালেদা খানম কিংবা কালান্তরে খালেদা জিয়া হয়ে উঠলেও আজ সত্যিকারের শান্তিবাড়িতেই চিরস্থায়ী অধিবাস গ্রহণ করলেন।
লেখক: সাংবাদিক
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫