Posts

ফিকশন

চলমান মৃত্যুর কথা

January 1, 2026

Krishnendu Das

7
View

ডিসেম্বরের বেলা ফুরানো শীতের আবহ। ঝটপট করে দিনের আলো মুছে দিয়ে প্রকৃতির রাজ্যে সন্ধ্যা ঘনাবার সেই চিরাচরিত প্রস্তুতি চলছে। উত্তরের বাতাসে হাড় হিম করা ঠান্ডা। মাথায় আঁটোসাটো করে মাফলার পেচিয়ে উলের সোয়েটার পরা মধ্যবয়সী লোকটি হনহন করে হেঁটে চলেছেন। অফিসে কিছু হিসাবনিকাশ সংক্রান্ত ঝামেলার জন্য বেতনের টাকাটা হাতে পেতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে আজ, নয়তো সেই দুপুরের মধ্যে বেতন তুলে প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে নিয়ে এতক্ষণে ঘরের বারান্দায় বসে গায়ে চাদর মুড়ে চায়ের কাপে উষ্ণ চুমুক দেবার কথা ছিল তার। ছেলের প্রাইভেট টিউটরের টাকাটা আজকেও সময় মতো দেওয়া হলো না। বাসার সামনে থেকে যাবার রাস্তার মোড়ে রফিকের দোকানে বাকির খাতায় অনেক গুলো সংখ্যা বেড়ে গেছে। তিনি লক্ষ্য করেছেন শীতের সময়ে তার চা-সিগারেটের পরিমাণ সব সময় একটু বেড়ে যায়। যদিও শরীরের দিকে তাকিয়ে আর সংসারের টানাটানির কথা ভেবে এই বয়সে এসে এইসব অভ্যাসের মুখে লাগাম টেনে দেওয়া উচিৎ ছিল, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি এখান থেকে বের হতে পারছেন না। তিনি আজ বেতন তুলবেন জেনে সকালেই তার স্ত্রী বলেছিল, বিকেলে তাকে একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। বেশ কিছুদিন ধরে বউটার শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে। রাতে যখন স্ত্রীর হাঁপানির টান উঠে চোখমুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়, তখন স্ত্রীর সেই ব্যাথাতুর মুখ আর ঘোলাটে দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় তার। এই টানাটানির সংসারে এসে কী পেয়েছিল এই নিরীহ মেয়েটি! আজকে অফিসের এই হিসাবনিকাশের ঝামেলা তার নিজস্ব জীবনের বেশকিছু হিসাবনিকাশের মধ্যেও ঝামেলা সৃষ্টি করেছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সন্ধ্যার পরে হলেও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি অবশ্যই আজ ডাক্তারের কাছে যাবেন। তার এখন একটাই কাজ দ্রুত বাসায় পৌঁছানো। একটা রিক্সা নিলে বিষয় টা অনেক সহজ হয়ে যেতো, আজকাল ব্যাটারি চালিত রিক্সাগুলো বেশ দ্রুতই চলাচল করে, কিন্তু সেটা করতে গেলে উটকো অনেকগুলো টাকা বের হয়ে যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে তিনি যথেষ্ট ক্ষুধা অনুভব করলেন, ভুলে গিয়েছিলেন যে তাড়াহুড়ায় দুপুরে কিছুই খাওয়া হয়নি তার। বাসায় গিয়ে আগে দ্রুত কিছু খেতে হবে। মাফলার দিয়ে কান আরও একটু ঢেকে নিয়ে তিনি আরও জোরে পা চালালেন, কিন্তু নানান খুটিনাটি চিন্তায় অন্যমনস্ক হয়ে থাকবার কারণে কিছু একটা বিষয় তার দৃষ্টিগোচর হলো না। যখন লক্ষ্য করলেন ততক্ষণে খুব বেশি দেরি হয়ে গেছে। তিনি কানে তালা ধরানো একটি হর্নের আওয়াজ পেলেন এবং একটি প্রচণ্ড ধাক্কায় ছিটকে পড়লেন। এরপর হঠাৎ করে তিনি তার শরীরের ওপরে একটা প্রচণ্ড রকম চাপ অনুভব করলেন এবং অসহ্য যন্ত্রণায় তার সমস্ত চেতনা লুপ্তির দারপ্রান্তে গিয়ে ঠেকলো। তিনি চিৎকার করার মতো সময়ও পেলেন না। ভালো করে কিছু উপলব্ধি করার আগেই তার চারপাশে ডিসেম্বরের তীব্র কুয়াশার মতো নিকষ কালো অন্ধকার নেমে এলো।

Comments

    Please login to post comment. Login