১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত হয়ে আছে, এরমধ্যে তথাকথিত ঐকমত্যের ন্যারেটিভ মাথাচাড়া দিচ্ছে। এটা কারা করছে? এমন একটা গোষ্ঠী, রাজনীতিক, এলিট বা oligarch যারা বুঝে নিয়েছে -জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতার পাদপ্রদীপের আলোয় তাদের পদচিহ্ন রাখা হবে না। কিন্তু উদগ্র আকাঙ্ক্ষা ক্ষমতা তাদের লাগবেই! সেটা কীজন্য? জনসেবার জন্য? দেশকে বিশ্বসভায় এগিয়ে রাখবার জন্য? মোটেই না। স্রেফ নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তাদের এই উদ্ভট ও অদ্ভুতুড়ে বাহানা। এরা গণতন্ত্র পুছতে চাইছে না। অথচ বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত গণতন্ত্র হলো দেশ শাসনের সবচেয়ে যুৎসই পদ্ধতি।
তাই যদি না হতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকানরা এক থাকত, ব্রিটেনে কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টি আলাদা থাকত না এবং ভারতেও কংগ্রেস ও বিজেপিকে এক পাটাতনে দেখতাম আমরা।
জার্মানির ভাববাদী দার্শনিক G.W.F. Hegel-এর কাছে দ্বান্দ্বিকতা হলো: Thesis →Antithesis →Synthesis. তাঁর মতে, রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা কোনো স্থির বস্তু নয়; এটা বিরোধ ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই উন্নত রূপে রূপান্তরিত হয়। পরিশীলিত হয়। হেগেলের যুক্তি হলো: দ্বান্দ্বিকতা না থাকলে ইতিহাস থেমে যায়। বিরোধই নতুন নৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে 'ঐকমত্যের সরকার' প্রস্তাবটি শুনতে যতটা আশাব্যঞ্জক, বাস্তবে তা দেশের গণতন্ত্রের জন্য ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যা মূলত ঐকমত্যের অভাব নয়, বরং ক্ষমতার জবাবদিহির অভাব। এখানে দ্বান্দ্বিকতা দমিয়ে রেখে ঐকমত্য চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং সমস্যা আরও গভীরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
প্রথমত, ঐকমত্যের সরকার মানে কার্যত কার্যকর বিরোধী রাজনীতির অবসান। সরকারে সবাই থাকলে সংসদে প্রশ্ন তুলবে কে, ব্যর্থতার দায় নেবে কে? বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সংসদীয় বিরোধী দল এমনিতেই দুর্বল, সেখানে ঐকমত্যের সরকার বিরোধী কণ্ঠকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে দেবে। এতে সংসদ পরিণত হবে আনুষ্ঠানিকতার মঞ্চে, গণতান্ত্রিক নজরদারির কেন্দ্রে নয়।
দ্বিতীয়ত, ঐকমত্যের সরকার দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী করে। নীতি ব্যর্থ হলে, অর্থনীতি ভেঙে পড়লে বা রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ঘটলে সহজেই বলা যাবে- এটা তো সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এই 'collective responsibility'-র আড়ালে ব্যক্তিগত ও দলীয় জবাবদিহি বিলুপ্ত হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, ক্ষমতার ভাগাভাগি যত বেড়েছে, দুর্নীতির দায় তত বেশি অস্পষ্ট হয়েছে। আড়াল হয়েছে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঐকমত্যের সরকার প্রায়শই জনগণের ঐকমত্য নয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এলিটদের বোঝাপড়া হয়ে দাঁড়ায়। এতে ভোটার, নাগরিক সমাজ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ উপেক্ষিত থাকে। রাজনীতি তখন জনগণের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যম না হয়ে ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতার ক্লাবে পরিণত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজনৈতিক অনাগ্রহ ও গণতন্ত্রবিমুখতা বাড়ায়।
চতুর্থত, ঐকমত্যের সরকার দ্বান্দ্বিক রাজনীতির ওপর যে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি করে: সেটি রাষ্ট্র বা সরকারের নীতি সংশোধন, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করণের গতি একেবারে ভেঙে দেয়। নিজেদের ঘরের মধ্য থেকে একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মিলমিশের সরকার চালিয়েছে। ফলাফল সবাই দেখেছে।
বাংলাদেশে সমস্যা সমাধানের জন্য দরকার শক্তিশালী নির্বাচন ব্যবস্থা, স্বাধীন বিচার বিভাগ, মুক্ত গণমাধ্যম ও কার্যকর বিরোধী দল। ঐকমত্যের সরকার এসব সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে একটি সাময়িক রাজনৈতিক 'শান্তি' তৈরির কথা বললেও, আখেরে যা মূলত চরম স্থবিরতা ও মারাত্মক নৈরাজ্য।
মোদ্দাকথা ঐকমত্যের সরকার ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করতে পারে। একবার যদি বলা হয় 'সংকটকালে গণতন্ত্র স্থগিত রেখে ঐকমত্য দরকার' -তাহলে পরবর্তী সব সংকটেই সেই যুক্তি ব্যবহার করা হবে। এতে নির্বাচন, বিরোধিতা, ক্ষমতার পালাবদল ও গণতন্ত্রের মৌল উপাদান -ক্রমশ অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশের জন্য ঐকমত্যের সরকার তাই মোটেই কোনো কার্যকরি সমাধান নয়, বরং দরকার হলো ন্যায্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ও শক্তিশালী বিরোধী রাজনীতি। এবং সেই নির্বাচনকে পরাজিত পক্ষের মেনে নেয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিও ভীষণভাবে জরুরি।
রাষ্ট্রের মৌল প্রশ্নে ঐকমত্য থাকতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার প্রশ্নে দ্বান্দ্বিকতা দমন করা মানেই গণতন্ত্রকে দুর্বল করা। এই সত্য উপেক্ষা করলে কথিত 'ঐকমত্যের সরকার' শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং ঐকমত্যের পাটাতনে সবাই মিলেমিশে ক্ষমতা বিহার -রাজনীতি সচেতন আমরা এতটুকু সমর্থন করতে পারি না।
লেখক: সাংবাদিক
২ জানুয়ারি ২০২৬