ক্যামপাস-প্রেম,পর্ব১৮
হুমায়ূন কবীর
রাশমিন মুখের বোরকা সরিয়ে ফেলেছে। একটা লাজুক হাসি তার স্বপ্নময় মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। স্যার হা করে তাকিয়ে আছে চশমার ফাঁকে। আমি যেন নতুন করে জন্ম লাভ করেছি পৃথিবীতে।
কি অপরূপ রূপ আমি দেখছি। শুধু দেখছি। এত সুন্দর মুখ এর আগে কখনো দেখিনি, তাই তুলনাও খুঁজে পাচ্ছিনা। শুধু একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছে, একে তো আমি চিনি। জন্মের পূর্ব থেকেই চিনি। সে তো আমার আপন। একে খুঁজে বের করার জন্যই তো আমার পৃথিবীতে আসা। এইতো আমার জীবন, এইতো আমার মরণ। এইতো জন্মের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছি। আর কোন লুকোচুরি নয়। হৃদয়ের সমস্ত কথা আজ উজাড় করে দিতে হবে। বলতে হবে, রাশমিন, তুমি আমার, শুধুই আমার। শুধু আমার জন্যেই তুমি পৃথিবীতে এসেছ , আর আমি তোমার জন্যেই জন্মেছি। আমার হাতে হাত রাখো। জন্ম আমার সার্থক কর।
চশমার ভেতর থেকে চিকন করে স্যার তাকালেন।বললেন,এই ছবি যে তোমার তার কোন প্রমাণ আছে?
স্যারের প্রশ্ন শুনে আমি থ হয়ে গেলাম। স্যার বলে কী? রাশমিনের ছবি স্যারের হাতে, রাশমিন স্যারের সামনে।এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী আছে? একজন অন্ধও তো বলে দিতে পারবে, এ ছবি কার ।আর।আর এ ৪ চোখ দিয়ে দেখেও বলতে পারছে না এ ছবি কার।এর কী উত্তর দেব? উত্তর আমাকে দিতে হলো না, উত্তর দিলো রাশমিন।
- এই ছবি যে আমার না তার কোন প্রমাণ আছে?
বাহ! রাশমিন কিন্তু বেশ কথা জানে।আমার মাথায় তো একথা আসেনি।
স্যার কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। একটা ঢোক চিপলেন।স্যার কম ঘড়িয়াল না। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বললেন,অন্য যেকারোর ছবিও তো হতে পারে?
আমার মেজাজ বিগড়ে গেল। মেজাজ বিগড়ে গেলে আমার স্থান-কাল পাত্র জ্ঞান থাকে না। আর এ এখন পা পাড়িয়ে গ্যাঞ্জাম বাধাতেই চাচ্ছে, একে আর ছাড়া যায় না। মাথাটা গরম হয়ে গেল। দুম করে মুখের উপর বলে বসলাম, স্যার, ওটা অন্য কারোর ছবি নয়। আপনি চিনতে পারছেন না? ওটা আপনার বাপের ছবি।
স্যার মনে হয় বুঝলেন যে, আমি কোন দিকে যাচ্ছি। আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে, কিছুটা নরম হয়ে- বললেন, মেয়ে মানুষ কখনো বাপ হয়?
- ও, তাহলে বুঝতে পেরেছেন যে, ওটা মেয়ে মানুষের ছবি? চার চোখ দিয়ে দেখছেন তো, তাই অসুবিধা হচ্ছে । চশমাটা খোলেন দেখবেন ঠিকই বুঝতে পারছেন ওই ছবি রাশমিনের। নেন সই করেন।
- তোমাদের মত ছাত্র নেতাদের জন্যই চাকরি করা কষ্টকর।
আমি এতক্ষন এই আশঙ্কায় করছিলাম।রাশমিনের সামনে আমার পরিচয় ফাঁস হয়ে গেল। আমি ফ্যাকাসে মুখে রাসমিনের দিকে তাকালাম। রাশমিন আমার দিকে তাকিয়ে শুধু একবার চোখের পলক ফেলল। কী এর অর্থ? কিছুই বুঝলাম না। পরিচয় প্রকাশ যখন হয়েই গেছে লুকানোর চেষ্টা করে আর লাভ নেই। স্যারকে ধমকের সুরে বললাম, কষ্ট হলে চেয়ার ছেড়ে দেন। বয়সতো বেশ হয়েছে। খালি জায়গা পূরণ করার জন্য অনেক যোগ্য লোক অপেক্ষায় আছে। খামোখা জঞ্জাল বাড়াচ্ছেন কেন?
স্যার মিনমিন করে বললেন, আমি সই করব না।
- সই আপনাকে করতেই হবে
- না আমি সই করব না।
আমার রুদ্র মূর্তি দেখে কথা বলতে বলতে আস্তে করে উঠে ভয়ে ভয়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন।
রাসমিন একটু শুকনো হাসি হেসে বলল, স্যার ইচ্ছা করে এই শয়তানিটা করলো।
রাগে আমার সমস্ত শরীর তখনও দপদপ করে জ্বলছে। বললাম, তুমি কিভাবে বুঝলে?
কাগজ পাতি গুলো টেবিল থেকে গোছাতে গোছাতে রাশমিন বলল, স্যারকে আমি চিনি। স্যারও আমাকে চেনে।
আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে?
- আমি তো পজিট্রন কোচিং সেন্টারে মেডিকেলের জন্য কোচিং করতাম। সেখানে জিল্লুল বারী স্যার কেমিস্ট্রি ক্লাস নেয়। রহমান স্যার জিল্লুল বারী স্যারের বন্ধু। সেখানে যায়।
আমি বললাম, জিল্লুল বারি স্যার তো আমাদের অপজিট পার্টি করে।
-রহমান স্যারও তাই।
- তাই?
- হ্যা।
আমি যেন গাছ থেকে পড়লাম। যেসে পড়া নয়, দাঁত মুখ ভেঙে পড়া। এর পেছনে দুটো কারণ আছে।
১। রাসমিন মেডিকেলে কোচিং করতো, অথচ জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য দৌড়ঝাপ করছে।
২।রহমান স্যার যে দল করে তা আজ জানলাম।
আসলে জানবো কী করে? সরকারি কলেজের স্যাররা তো সরাসরি দল করে না। করে মনে মনে। এ তো আর স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়।পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যারেরা সরাসরি মিছিল মিটিং করে। সেও ভালো। কিন্তু এখানে তো চেনার উপায় নেই ।
আজ বুঝলাম, রহমান স্যার কেন আমার সাথে খারাপ আচরণ করে? আমি তার বিপরীত দল করি।এটাই কি আমার দোষ? এই কি ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক?
কথা বলতে বলতে আমরা তিন তলায় চলে এলাম।
রাশমিন বলল, থাক চলেন। সত্যায়িত দরকার নেই।
-কেন?
- আরে আপনাদের এই সমস্ত ফাস্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার স্যারদের ফুটপাতে ২০-২৫ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়।
- কিরকম?
-কেন, ২০-২৫ টাকা দিলে দিব্বি এদের সিল তৈরি হয়ে যাবে। আর সই নিজে নিজে করে ইচ্ছেমতো সিল মারো।কে দেখতে আসছে?
রাশমিনের চোখে মুখে এখন বুদ্ধিদীপ্ত হাসি ছড়িয়ে আছে। সে শব্দ করে হেসে উঠলো। হাসিতে তার সমস্ত শরীরে একটা দোলা খেলা করে গেলো।কি চমৎকার করে রাশনিন হাসতে পারে।