Posts

চিন্তা

জোহরান মামদানির শপথ ও আমাদের উচ্ছ্বাস!

January 2, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

114
View

নিউইয়র্কে পূর্বসূরী মেয়রদের প্রায় সবাই পবিত্র বাইবেল হাতে শপথ নিয়েছেন। এবারই প্রথম জোহরান মামদানি পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিলেন। যদিও স্টেট, ফেডারেল বা সিটির সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় শপথের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। তবু আমরা দেখে থাকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও বাইবেল ছুঁয়ে শপথ নেন। মামদানি যেহেতু প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন এবং মামদানির ধর্ম পরিচয় ভোটাররা জেনেবুঝেই তাঁকে সমর্থন করেছেন -সেখানে বহুজাতিক ভোটারেরা নিশ্চয়ই মামদানির ধর্মীয় আবেগকে সম্মান জানাবেন।

ধরি আমাদের ঢাকা সিটির মেয়র হয়েছেন একজন চাকমা নারী। তিনি যদি তাদের ধর্মীয় প্রাচীনগ্রন্থ তালপাতায় লেখা 'আগরতারা' হাতে শপথ নেন -আমরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করব তো? মনে হয় না। ঔদার্যের দিক দিয়ে এতটা শক্তিধর আমরা হয়ে উঠতে পারিনি। নিজের জ্ঞাতি গোষ্ঠী ছাড়া আমরা অন্যদেরকে মর্যাদা দিতে শিখিইনি।

নিউইয়র্ক ওল্ড সিটি হলের কাছে পরিত্যক্ত সাবওয়ে (পাতাল রেল) স্টেশনে মামদানির প্রথম শপথের সময় স্ত্রী রামা দুওয়াজি পবিত্র কোরআন হাতে ধরে রাখেন। সিরিয়ান বংশোদ্ভূত মিজ রামা মুসলিম হলেও আমাদের দেশের ধর্মগুরুরা যেভাবে নারীর পোশাক পরতে বলেন -তেমন পোশাক পরিহিত তিনি ছিলেন না। উপরন্তু যিনি শপথ পড়িয়েছেন -মামদানির 'রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা' এবং নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লিটিসিয়া জেমস বাপ্তিস্ট (প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান)। শপথ শেষে মামদানি এই অ্যাটর্নি জেনারেলের সাথে অসঙ্কোচে হাগ করেছেন। এসময় জোহরান মামদানি স্যুটেড বুটেড ও টাই পরিহিত ছিলেন। মুখের দাড়িটুকু ছাড়া লেবাসে অন্য কোনো ধর্মীয় চিহ্নও ছিল না।

প্রথম এই শপথকালে অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জোহরানের মা ভারতীয় চলচ্চিত্রকার মিরা নায়ার ও বাবা কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি। মিরা নায়ারের ব্যক্তিগত জীবন ও দাম্পত্য পরিবেশটি বহু সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের মিশ্রণ -তাঁর স্বামী অধ্যাপক মাহমুদ মামদানির পটভূমি মুসলিম। কিন্তু মিরা নায়ারের ধর্মীয় পরিচয় সাধারণভাবে হিন্দু। তাহলে আমরা সংশয়হীনভাবে ধরে নিতে পারি জোহরান মামদানি হলেন বহুত্ববাদ ও বহু সংস্কৃতির উৎকৃষ্ট ধারক ও বাহক।

তাহলে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেয়ার তাৎপর্যটা কী? নিউইয়র্কে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে থাকবার প্রচ্ছন্ন মেসেজ এটা। ভারতীয় বংশোদ্ভূত দম্পতির ঘরে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় জন্ম নেয়া জোহরান নিউইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের ধর্মীয় আবেগের সাথে সহমর্মিতা দেখিয়েছেন। বস্তুত দায়িত্ববান আধিকারিকদের মানবিক কর্তব্যবোধ এটাই। এটা মনে রাখলে ভালো হবে -জোহরান মামদানি নিউইয়র্কে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে নামেননি। এবং তিনি কোনো খ্রিস্টান বা ইহুদিকে মনের ভুলেও বলবেন না যে, আসেন ভাই আমার ধর্মে আপনার নামাঙ্কিত করেন -এটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম।

জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির (এনওয়াইপিএল) শমবার্গ সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ব্ল্যাক কালচারের সংগ্রহ করা একটি ক্ষুদ্রাকৃতির পবিত্র কোরআনের কপি ও তাঁর দাদার আরেকটি পবিত্র কোরআন হাত রেখে শপথ গ্রহণ করেন।

এনওয়াইপিএলের ক্ষুদ্রাকৃতির কোরআন শরিফটি ২০০ বছরের পুরোনো। এটি কৃষ্ণাঙ্গ লেখক ও ইতিহাসবিদ আর্তুরো শোমবার্গের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। তাঁর পরিবার পকেট কোরআনটি এনওয়াইপিএলে দান করেছিল। স্বামী জোহরানের শপথের জন্য পবিত্র কোরআনের এই কপিটি নির্বাচনে রমা দুওয়াজিকে সহায়তা করেছেন একজন গবেষক। এর মধ্য দিয়ে জোহরান তাঁর শপথে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন।

বহুধর্মীয় সমাজে রাষ্ট্র নাগরিকের বিশ্বাসকে অস্বীকার করে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে বাইবেল, তোরাহ, কোরআন -সব ধর্মগ্রন্থেই শপথ নেওয়ার নজির আছে। এখানে রাষ্ট্র ধর্ম চাপায়নি, বরং নাগরিকের বিশ্বাসকে সম্মান করেছে।

দ্বিতীয়ত, সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে -শপথের মূল বিষয় ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং সংবিধানের প্রতি আনুগত্য। মেয়র জোহরান মামদানি যদি সংবিধান মানেন, আইন রক্ষা করেন, নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করেন -তাহলেই শপথের সারবস্তু পূর্ণতা পাবে। ধর্মগ্রন্থ কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক প্রতিজ্ঞার বাহন ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা প্রত্যাশা করি মেয়র জোহরান তাঁর ভোটার ও নাগরিকদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রক্ষা করবেন। তাহলেই তাঁর ব্যক্তিগত নৈতিক প্রতিজ্ঞা আরো বেশি মহিমান্বিত হবে।

লেখক: সাংবাদিক 
০২ জানুয়ারি ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login