Posts

নন ফিকশন

১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই সেরা ২৩ বাঙালি পাইলটদের হত্যা করে পাকিস্তান

January 3, 2026

মো; আহসান-উজ-জামান

Original Author লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক

Translated by Ahsan's Archive

14
View

PIA—পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স ছিল পাকিস্তান সরকারের মালিকানাধীন বিমানসংস্থা।

যারা PIA-তে যোগ দিতে চাইতেন—বিশেষ করে বাঙালিরা—তাদের ক্ষেত্রে পাকিস্তানিরা নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত। পাকিস্তানিদের নেতিবাচক ও বৈষম্যমূলক মনোভাব অনেক বাঙালিকেই PIA-তে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করে। মাত্র অল্পসংখ্যক বাঙালি এই বিমানসংস্থায় যোগদানের সুযোগ পেয়েছিলেন, বিশেষত পাইলট হিসেবে। যেসব পদ তুলনামূলকভাবে গুরুত্বহীন ছিল এবং যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানিরা কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন না, সেসব পদই সাধারণত বাঙালিদের দেওয়া হতো। বাঙালি পাইলটদের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হতো, যাতে তারা সংগঠিত হতে না পারেন। তাদের কোনো সংবেদনশীল পদেও নিয়োগ দেওয়া হতো না।


 

বাঙালি পাইলটরা বহু বছর ধরে ‘PIA পাইলটস অ্যাসোসিয়েশন’ এর মাধ্যমে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাবি উত্থাপনের চেষ্টা করেন। কিন্তু সংখ্যায় কম হওয়া এবং অ্যাসোসিয়েশনে কার্যকর পদে না থাকায় তাদের দাবিগুলো গ্রহণ করা হয়নি। অন্য কোনো বিকল্প না পেয়ে বাঙালি পাইলটরা নিজেদের একটি আলাদা সংগঠন গঠনের সিদ্ধান্ত নেন, তবে শুরুতে সেটি গোপন রাখা হয়। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে PIA-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর শাহকুর উল্লাহ দুররানি ঢাকায় সফরে আসেন। অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন বাঙালি পাইলট ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে তার সঙ্গে দেখা করে তাদের সমস্যার কথা জানান। দুররানি তাদের অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং লিখিতভাবে দাবিগুলো জমা দিতে বলেন, যা সঙ্গে সঙ্গেই করা হয়। কিন্তু দাবিগুলো জমা দেওয়ার পর আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং দুররানি এ সুযোগে বুঝে নিতে সক্ষম হন কারা তাদের অধিকারের দাবিতে আওয়াজ তুলছেন, এবং তিনি এই তথ্য সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেন। দুররানি তার যৌবনে তিন বছর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একজন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখতেন। ফলে তিনি বাঙালি পাইলটদের কার্যক্রম—বিশেষ করে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেন, যা পরবর্তীতে PIA-এর বাঙালি পাইলট ও কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার ও হত্যার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে।


 

বাঙালি পাইলটরা ইস্ট পাকিস্তান এয়ারলাইন্স পাইলট অ্যাসোসিয়েশন (EPALPA) নামে একটি সংগঠন গঠন করেন। এর প্রথম কয়েকটি বৈঠক গোপনে অনুষ্ঠিত হয় ক্যাপ্টেন আলমগীরের বাসায়—মোহাম্মদপুর, ব্লক এ, ৯/৬ ইকবাল রোড, ঢাকা। কিন্তু পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বিষয়টি টের পেয়ে যায়। বৈঠকের সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ওই বাড়ির আশপাশে নজরদারিও করতে দেখা যায়।


 

EPALPA-কে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য দ্রুত নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন—ক্যাপ্টেন ডব্লিউ আর চৌধুরী, ক্যাপ্টেন আব্দুল খালেক, ক্যাপ্টেন এ টি এম আলমগীর, ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার, ক্যাপ্টেন জহির, ক্যাপ্টেন রফি, ক্যাপ্টেন আবু সালেম, ক্যাপ্টেন মনোয়ার, ক্যাপ্টেন খন্দকার, ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ এবং ক্যাপ্টেন জামান। এই কমিটি সব বাঙালি পাইলটের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। ক্যাপ্টেন ডব্লিউ আর চৌধুরী চেয়ারম্যান এবং ক্যাপ্টেন আলমগীর EPALPA-এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নবগঠিত কমিটি ওল্ড এয়ারপোর্ট রোডের আওলাদ হোসেন মার্কেটের একটি কক্ষ থেকে কার্যক্রম শুরু করে। ‘বিহঙ্গ বার্তা’ নামে একটি নিউজ বুলেটিন প্রকাশিত হতে থাকে, যার সম্পাদক ছিলেন ক্যাপ্টেন আলমগীর।


 

কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন খালেক করাচিতে পোস্টেড ছিলেন। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তিনি করাচি থেকে ঢাকায় এসে কমিটিকে জানান যে ব্যাপক হারে সেনা সমাবেশ শুরু হয়েছে এবং করাচি থেকে বিপুল সংখ্যক সেনাকে বেসামরিক পোশাকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডি থেকেও বিশেষ PIA ফ্লাইটের মাধ্যমে—চীন ও বার্মা হয়ে—ঢাকায় সেনা পাঠানো হচ্ছে। তিনি আরও জানান যে তার ফ্লাইটে প্রত্যেক যাত্রীকেই তার সেনাবাহিনীর সদস্য বলে মনে হয়েছে এবং তাকে জাম্প সিটে বসে আসতে হয়েছে। অধিকাংশ ফ্লাইট ই ঢাকায় অবতরণ করছিল গভীর রাতে। তিনি এই তথ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ জানান। দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন সাত্তার বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে সেনা চলাচলসংক্রান্ত এসব তথ্য তুলে ধরেন। EPALPA সদস্যরা সেনা আগমনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন এবং মার্চের প্রথম সপ্তাহে ক্যাপ্টেন শাহাব ও ক্যাপ্টেন সাত্তার বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে সর্বশেষ সেনা চলাচলের বিস্তারিত তথ্য তাকে জানান।


 

১ মার্চ থেকে PIA-এর সব বাঙালি পাইলট ও কর্মীদের জন্য বিমানবন্দরে প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়—এয়ারপোর্ট ম্যানেজমেন্টের নির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। বিমানবন্দরের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানি এবং পূর্ব পাকিস্তানের অবাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারা। এই আদেশের প্রতিবাদে EPALPA সিদ্ধান্ত নেয়—কোনো বাঙালি পাইলট আর কোনো বিমান চালাবেন না। কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানি পাইলট আনা হলেও তারা ফ্লাইট শিডিউল বজায় রাখতে ব্যর্থ হন। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী অ্যাসোসিয়েশন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করতে শুরু করে। EPALPA কর্মকর্তারা একটি নতুন বিমানসংস্থা গঠনের লক্ষ্যে ৪৪ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন, যা ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর কাছে জমা দেওয়া হয়। অ্যাসোসিয়েশন পরিকল্পনা করে কয়েকটি ছোট বিমান সরিয়ে নিয়ে পরিত্যক্ত রানওয়েতে গোপনে লুকিয়ে রাখার, যাতে নিকট ভবিষ্যতে সেগুলো প্রতিরোধ বাহিনীর কাজে লাগানো যায়।


 

২৫ মার্চ বিকেল আনুমানিক ৪টা ৩০ মিনিটে কয়েকজন পাইলট গোপনে ইয়াহিয়া খানের ঢাকা বিমানবন্দর ত্যাগ করতে দেখেন এবং তা সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানান। ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু করে এবং একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সব বাঙালির বাড়িতে—বাঙালি পাইলটদের বাড়িসহ—হানা দিতে থাকে। তারা ক্যাপ্টেন সিকান্দারকে গ্রেপ্তার করে এবং সঙ্গে সঙ্গেই তাকে হত্যা করে। পরে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্যাপ্টেন আমিরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন আলমগীর, ক্যাপ্টেন এন এস হায়দার এবং PIA-এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (DMD) ফজলুল হক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই চারজন পাইলট ছিলেন মোট পাঁচজন বাঙালি ইনস্ট্রাক্টর পাইলটের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য। একমাত্র ইনস্ট্রাক্টর পাইলট ক্যাপ্টেন নাজরুল, যিনি তখন নিজ গ্রামে অবস্থান করছিলেন, প্রাণে বেঁচে যান। পাইলট ও DMD ছাড়াও PIA-এর আরও ২৩ জন বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যা করে। EPALPA-এর সদস্যদের মধ্যে ক্যাপ্টেন খালেক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ‘বীর প্রতীক’, ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার ‘বীর প্রতীক’ এবং ক্যাপ্টেন শাহাব ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন।


 

পাকিস্তানিরা একটি সুপরিকল্পিত নকশা অনুযায়ী সেই সব সেরা ও মেধাবী বাঙালিকে হত্যা করে, যারা একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। এসব কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করার পর তাদের পরিবারের কাছে কোনো তথ্যই পৌঁছায়নি। পরিবারগুলো প্রিয়জনের ফেরার আশায় অকল্পনীয় কষ্ট ভোগ করে গেছে—কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন আর ঘটেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি DMD ও চারজন সেরা ইনস্ট্রাক্টর পাইলটকে হত্যা করে, যাতে তারা আর কোনো বাঙালি পাইলটকে প্রশিক্ষণ দিতে না পারেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস ও রক্তপিপাসু সদস্যরা নিরস্ত্র বন্দিদের তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তাদের মরদেহ কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি—এই লেখকের বহু বছরের প্রচেষ্টা, এমনকি সম্ভাব্য স্থানে খনন পরিচালনার পরও, সবই ব্যর্থ হয়েছে। মাটির এই মহান সন্তানরা স্বাধীনতার বাতাস কখনো অনুভব করতে পারেননি, আর আজও তাদের আত্মা ন্যায়বিচারের বাতাস স্পর্শ করতে পারেনি।

লেখক একজন মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

তথ্যসূত্রের জন্য এখানে ক্লিক করুন
 

Comments

    Please login to post comment. Login