লোকটির কথায় আরমান নামের মানুষটি পিঠ ঘুরিয়ে তাকালো, তার চোখের কুটিলতা এক লহমার জন্য চাপা পড়ল গভীর বিস্ময়ে। তার দিকে এগিয়ে আসা যুবকটি তখনই হাতে ধরা মোবাইল ফোনটি তার মুখের সামনে তুলে ধরল। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই আরমান তালুকদার যেন আকস্মিক এক বজ্রাহত হলেন। সেখানে এক স্পষ্ট ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ শিরোনাম ভেসে উঠেছে---
‘বিখ্যাত রাজনীতিবিদ আরমান তালুকদারের জ্যেষ্ঠ পুত্র আইজান শুভ্র-এর বিবাহ সম্পন্ন! সাধারণ ঘরের কন্যাকে বধূরূপে গ্রহণ করলো আইজান শুভ্র। কনে’র নাম- রুবাইয়া বিনতে শূন্যতা। জানা যায়, কনে’র বাবা কায়সার খান ছিলেন এক সময়ের জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ এবং আরমান তালুকদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শুরুতে তাকে সাধারণ ঘরের বলে উল্লেখ করলেও মিসেস শুভ্র খান আদোতে একজন প্রয়াত রাজনীতিবিদের একমাত্র কন্যা’
এই অপ্রত্যাশিত সংবাদ দেখে আরমান তালুকদার তো রীতিমতো শকড! তার চোখের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন অবিশ্বাস আর ক্রোধের তীব্র আগুন জ্বলতে শুরু করলো। তারই অতি-আদরের ছেলে শুভ্র, শেষে কিনা বিয়ে করলো তারই সেই বন্ধুর মুখোশ পরে থাকা কায়সার খানের কন্যাকে! যে মেয়েকে সে প্রতিশোধের গুটি বানাতে চেয়েছিল, সেই মেয়েই কিনা তার পুত্রবধূ!
নিউজফিড জুড়ে ছেয়ে আছে শুভ্র আর শূন্যতার বেশ কিছু ছবি। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, শুভ্র পরম ভালোবাসায় শূন্যতাকে কোলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কোনো এক নয়নাভিরাম বাংলোর দিকে তাদের আনন্দের মুহূর্তটি সেখানে চিরস্থায়ী হয়ে ধরা দিয়েছে। যদিও ক্যামেরায় দেখানো ছবিটির পেছনের সত্য তারা কেউ জানে না, আঁধারের মাঝে ঢেকে রাখা হয়েছে জনসম্মুখে ; যেন তাদের চোখে পড়ানো হয়ে কালো এক পট্টি। তার সাথেই প্রকাশিত হয়েছে তাদের সই করা রেজিস্ট্রি পেপারের ছবি, যা এই বিবাহের সত্যতা প্রমাণ করছে। নেটিজেনদের মাঝে এই খবর মিশেল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ এই অপ্রত্যাশিত পরিণয়ে উচ্ছ্বসিত ভালো লাগা প্রকাশ করছে, তাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। আবার অনেকের মধ্যে কাজ করছে হিংসাত্মক ও ঈর্ষান্বিত মনভাব। একদল এই জুটিকে প্রশংসায় ভাসালেও, অন্য দল রীতিমতো শূন্যতার পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সাধারণ পারিবারিক পটভূমি নিয়ে বাজে মন্তব্য ও কটু কথা শুরু করে দিয়েছে। যেন আরমানের ক্রোধের আগুন জনসাধারণের সমালোচনার আগুনে নতুন মাত্রা পেল।
*
*
*
তুমুল বর্ষণের শব্দে প্রকৃতি যখন মুখর, ঠিক তখনই 'হ্যাপিনেস' রেস্ট হাউজের বিলাসবহুল কামরায় চলেছে অন্য এক মুহূর্তের ঘনঘটা। ঘরের উষ্ণ পরিবেশে উষ্ণ দুধভর্তি বাথটবে অসহায়ত্বের প্রতিমূর্তি হয়ে বসে আছে শূন্যতা। পরিধানে কোনো বস্ত্র না থাকায়, সেই বিলাসী প্রকোষ্ঠ ছেড়ে বাইরে যাওয়ার সাহসটুকুও সে পাচ্ছে না।
—“এখন কী পরবো আমি? কিছুই তো নেই ওয়াশরুমে!”
আর্তনাদ করে সে আশেপাশে চোখ ঘোরালো। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি পড়ল বাথটবের পাশে রাখা সাদা তুলতুলে বাথরোবটির দিকে। সেটি দেখে শূন্যতার চোখে যেন আশার আলোকরেখা ঝলসে উঠল। দ্রুত বাথটব থেকে উঠে ঝর্ণা ছেড়ে সে তড়িঘড়ি স্নান সম্পন্ন করল এবং দেরি না করে বাথরোবটি নিজের শরীরে জড়িয়ে নিল। বাথরোব পরে, সে অতি সন্তর্পণে দরজার ছিটকিনি খুলে মাথাটি সামান্য উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করল শুভ্র আশেপাশে আছে কিনা। তাকে দেখতে না পেয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল শূন্যতা। সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
—“যাক, শয়তানটা তাহলে চলে গেছে!”
সে যেই না স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, অমনি বারান্দা থেকে ঘরে এসে হাজির হলো শুভ্র। শুভ্রকে দেখে শূন্যতা একেবারে থতমত খেয়ে গেল, তার মুখমণ্ডল ভয়ে সাদা হয়ে গেল। তার মনে ভয় যদি সে আবারও তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে!
কিন্তু শুভ্র তার এই অপ্রত্যাশিত আচরণে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। সে কেবল এক অন্য দৃষ্টিতে শূন্যতাকে পা থেকে মাথা অবধি একবার পরখ করে নিল। সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো আগ্রাসন, বরং এক ধরণের গভীর মনোযোগ ও কামুকি দৃষ্টি। যা শূন্যতার অভ্যন্তর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে।
ঘরের দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে শুভ্র শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে নির্দেশ দিল,
—“বেডে ড্রেস রাখা আছে, ওটা পরে নাও।”
শুভ্র কেবল কথাটুকু বলেই যেন হাওয়ায় মিশে গেল, দ্রুত প্রস্থান করল কামরাটি থেকে। তার অনুপস্থিতি উপলব্ধি করেই শূন্যতা যেন মুক্তির এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ধীরে ধীরে সে বিছানার সন্নিকটে গিয়ে সতর্ক হাতে প্যাকেটটি তুলে নিল। প্যাকেট থেকে বস্ত্রটি উন্মোচন করতেই শূন্যতা যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল। ভেতরে ছিল মনোমুগ্ধকর সূক্ষ্ম কারুকার্য করা এক গভীর নীল রেশমি সুতির ত্রিখণ্ড বস্ত্র বা থ্রিপিস। রূপালী জরির সুতো এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ডে খচিত নকশা যেন জামার শোভা শতগুণ বর্ধিত করেছে।
সেই মহার্ঘ পোশাকটির দিকে স্নিগ্ধ, অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে রইল শূন্যতা। এমন দামি ও বিলাসী বস্ত্র পরিধানের সৌভাগ্য তার জীবনে সর্বশেষ ঘটেছিল সেই সময়ে, যখন তার বাবা কায়সার খান জীবিত ছিলেন। তিনি নিজ হাতে যত্ন করে মা-মেয়ের জন্য এমন পোশাক আনতেন, যত্নে মুড়ে রাখতেন যাতে একটি আঁচড়ও না লাগে। কিন্তু মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই বিধির নির্মম পরিহাসে তার মাথার উপর থেকে সেই স্নেহময় আশ্রয়টুকু বাবা নামক ছায়া চিরতরে ছিনিয়ে নেওয়া হলো। এরপর থেকেই শুরু হলো মা-মেয়ের জীবনযুদ্ধ। কাছের মানুষ বলতে যাদের বোঝাত, সেই দাদাবাড়ির আত্মীয়-স্বজনও মুখ ফিরিয়ে নিল। বাবার কেনা পৈতৃক সম্পত্তিটুকুও হাতিয়ে নিয়ে তাদের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করল! জগতে তাদের আর কোনো অবলম্বন রইল না। তার মা তো ছিলেন এতিম, নিজের বাবার বাড়ি বলতেও তার কিছু ছিল না।
অতীতের বেদনাদায়ক স্মৃতিরাশি মনে ভিড় করতে করতেই শূন্যতা ড্রেসটি পরে ফেলল। পরিপাটি করে পোশাক পরে, কাঁধের উপর দিয়ে সিক্ত কেশরাশি আলগা করে দিতেই সে শুনতে পেল ভারী পদধ্বনির গমগম শব্দ। শব্দটি ক্রমশ তার দিকে নিকটবর্তী হচ্ছে। পরমুহূর্তেই, তার পিঠের উন্মুক্ত ত্বকে কারোর এক শীতল হাতের স্পর্শ অনুভব হতেই সর্বাঙ্গ শিহরিত হয়ে উঠল শূন্যতার। সে চমকে চট করে পেছন ফিরতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে সে অবলীলায় কারোর বলিষ্ঠ বাহুর বন্ধনে বন্দী।
—“কি... কী করছেন আপনি, সাহেব?”
ভয়ে তোতলামি করে কথাগুলো বলল শূন্যতা। তার হৃদস্পন্দন তখন চরম পর্যায়ে, কারণ তার মনে সেই পুরনো ভয়—যদি শুভ্র আবারও তার ওপর আক্রমণ করে বসে! শুভ্র তার কানে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, যার শব্দে ছিল তীব্র আকর্ষণ,
—“ইউ’আর লুকিং সো হট আফটার দা শাওয়ার!”
মন মাতানো, দেহ শিউরে ওঠার মতো করে শুভ্র কথাগুলো বলার পর, সে তার উষ্ণ শ্বাস ফেলে শূন্যতার কাঁধে মুখ ঘষতে ঘষতে এগিয়ে চলল। তার এই অপ্রত্যাশিত ঘনিষ্ঠতায় শূন্যতার সর্বাঙ্গ কেমন ঘিন ঘিন করে উঠল। যার প্রতি হৃদয়ে কোনো ভালোবাসা বা টান নেই, তার এমন আগ্রাসী স্পর্শে শরীর তো বিতৃষ্ণাই হবে। শুভ্র যেই না শূন্যতার কাঁধ থেকে পোশাকের ফিতাটি আলগা করতে যাবে, ঠিক তখনই উচ্চস্বরে বেজে উঠল তার পকেটের মোবাইল ফোনটি।
এমন সংবেদনশীল মুহূর্তে ফোন আসায় শুভ্রর মুখমণ্ডলে তীব্র বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে ফোন হাতে নিতেই দেখল কলটি তার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট তাশফি-এর। তাশফির নাম দেখে শুভ্রর কপাল আরও কুঁচকে গেল। বিরক্তি সত্ত্বেও সে ফোনটি রিসিভ করে কানে ধরল। শুভ্র কেবল কিছু শোনার অপেক্ষা করছিল। ওপাশ থেকে আসা কয়েকটি বাক্য শোনামাত্রই শুভ্রর চোখ কপালে উঠল, তার হাত থেকে ফোনটি ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে সশব্দে। কাঁচ ভাঙার শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে গেল। শুভ্রর মুখমণ্ডল তখন আতঙ্ক ও অস্থিরতায় সাদা অপ্রত্যাশিত কিছু শুনলে যেমন অবস্থায় পড়ে একজন মানুষ শুভ্রও যেন তাদের মাঝেরই একজন। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে শূন্যতার দিকে ফিরে তাকালো, কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা,
—“ফাস্ট রেডি হও। আমাদের এখনই বের হতে হবে!”
শুভ্রর এমন আচমকা পরিবর্তন দেখে শূন্যতা সামান্য বিস্মিত হলেও মুখে কিচ্ছুটি উচ্চারণ করল না। সে দ্রুততার সাথে চুপচাপ তৈরি হতে শুরু করল। অন্যদিকে শুভ্র অধৈর্য হয়ে উন্মত্তের মতো সারা ঘর জুড়ে পায়চারি করতে লাগল। তার এই অস্বাভাবিক অস্থিরতা শূন্যতার দৃষ্টি এড়ালো না।
—“কী হয়েছে লোকটার? এমন করছে কেন হঠাৎ?”
মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করলেও, শূন্যতা শুভ্রকে একটি প্রশ্নও করার সাহস দেখাল না। তৈরি হয়ে শুভ্রর সামনে আসতেই সে এক মুহূর্তও দেরি না করে শূন্যতার হাত চেপে ধরল এবং 'হ্যাপিনেস' রেস্ট হাউজ থেকে তড়িৎ বেগে বেরিয়ে গেল।
*
*
*
সুপরিচিত হাসপাতালের চত্বর দেখে শূন্যতা এক ঝলকে শুভ্রর দিকে তাকালো। তার চোখে তখন নির্বাক প্রশ্ন। সে দেখল, শুভ্র তখনো গাড়ির ড্রাইভিং সিটে এক্কেবারে নির্জীব, প্রাণহীন হয়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার চোখের কোণে জমে থাকা নিদারুণ হতাশা যেন এক অশুভ বার্তা দিচ্ছিল। একরাশ ভারী নিঃশ্বাস ফেলে শুভ্রর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো সেই ভয়াবহ সত্য,
—“ইউর মাদার ইজ নো মোর!"
শুভ্রর মুখ থেকে এই কয়েকটি বাক্য শোনামাত্রই শূন্যতা যেন পাথর হয়ে যায়। হাহাকার করে বলে ওঠে,
—“কি..কি বলছেন আপনি?”
শুভ্রর দিকে উত্তরের আশায় তাকাতেও কোনো উত্তর না আসায় পাগলিনীর মতো গাড়ির দরজা সশব্দে খুলে দিল। দিশেহারা অবস্থায় সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল, উদভ্রান্তের ন্যায় ছুটতে লাগল মায়ের কেবিনের দিকে। পায়ের স্যান্ডেল বা স্লিপার কখন কোথায় খুলে পড়ে গেল, সে খেয়ালও করল না; তার ভিজে চুলগুলো মুখের চারধারে উন্মত্তের মতো লেপটে আছে। এই অবস্থায় তাকে উন্মাদ লাগছিল।
ছুটতে ছুটতে ঠিক কেবিনের সামনেই তার ধাক্কা লাগল ডাক্তার আসিফ-এর সাথে। আসিফ তাকে সামলাতে ধরতেই, শূন্যতা ক্রোধে ও শোকে উন্মত্ত হয়ে তার শার্টের কলার নির্মমভাবে চেপে ধরল।
—“এই ডাক্তার! সত্যি করে বল,আমার মা বেঁচে আছে তাই না? মিথ্যে বলছিস তোরা? কেন আমার কথার উত্তর দিচ্ছিস না!”
কেমন এক অশরীরী, ভাঙা কণ্ঠে শূন্যতা প্রশ্নটি করল। শূন্যতার এমন উত্তেজিত রূপ এবং প্রশ্ন শুনে ডাক্তার আসিফ মুহূর্তের জন্য হতচকিত হয়ে গেল। সে কোনওমতে শূন্যতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে দৃঢ় কিন্তু শীতল কণ্ঠে বলল,
—“তোমার মা মারা গেছে, রুবাইয়া।”
আসিফের এই কথাগুলো শূন্যতার মস্তিষ্কে যেন শত সহস্র বজ্রপাতের রূপ নিল। তার মাথার উপর যেন সমগ্র মহাবিশ্ব মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ল! যে মায়ের জীবন বাঁচাতে তার এতদিনের এলোমেলো, তিল তিল করে গড়ে তোলা যুদ্ধ সেই মা-ই কিনা তাকে বেঈমানের মতো একাকী ফেলে চলে গেল! কার জন্য সে এতকিছু করলো? কিসের জন্য করলো এই আত্মত্যাগ? আর যেন কিছুই ভাবতে পারল না সে।
শরীরের ভারসাম্য আর ধরে রাখতে পারল না শূন্যতা, চেতনা লুপ্ত হয়ে সে যখন ভূমিতে লুটিয়ে পড়তে উদ্যত হলো, ঠিক তখনই আসিফ তাকে ধরতে গেল। কিন্তু আসিফের হাত স্পর্শ করার আগেই তার কানে বজ্রপাতের ন্যায় আছড়ে পড়ল একটি বাক্য, যা ছুঁটে এসেছে পেছনের দিক থেকে,আসিফের কানে সেই বজ্রপাতের ন্যায় বাক্যটি আছড়ে পড়ল।
—“ডোন্ট টাচ মাই ওয়াইফ। আই অ্যাম দ্য ওনলি ওয়ান হু হ্যাজ দ্য রাইট টু টাচ হার। নো ওয়ান এলস। সো স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হার।”
এমন অধিকারবোধক কথা শুনে আসিফ যখন সামনে তাকালো, তখন সে দেখল আইজান শুভ্র এক হাত পকেটে গুঁজে, নিখাদ ম্যানলি স্টাইলে তার দিকে হেঁটে আসছে। শুভ্রর প্রতিটি পদাচরণ যেন সশব্দে ঘোষণা করছে শূন্যতার উপর একমাত্র কতৃত্ব কেবল তারই, আর কারোর নয়! শুভ্র এগিয়ে এসে আসিফের একেবারে মুখোমুখি দাঁড়ালো। সে আসিফের দিকে তাকালো যেন জ্বলন্ত আগুনের শিখার মতো দৃষ্টিতে। অন্যদিকে ডাক্তার আসিফও শুভ্রর দিকে তাকালো ঈগলের তীক্ষ্ণ চাহনি নিয়ে। তাদের দু’জনকে দেখলে মনে হবে তারা যেন জন্ম-জন্মান্তরের চির শত্রু, যারা এই মুহূর্তে এক অদৃশ্য দ্বন্দ্বে লিপ্ত।শুভ্রর কণ্ঠস্বর ছিল হিসহিস করা শীতল, যেন সে আদেশ দিচ্ছে,
—“ ডোন্ট ক্রস ইয়োর লিমিটস, মিস্টার সাবাব! চেঞ্জ দ্যাট হ্যাবিট অভ ওয়ান্টিং টু লিভ ইয়োর টাচ এভরিহোয়্যার!”
শুভ্রর কথা শুনে ডাক্তারের অ্যাপ্রোন পরিহিত আসিফের মুখে ফুঁটে উঠল এক কুটিল হাসি। সেই হাসি যেন শয়তানের মতোই বিভীষিকাময়। সে হেসে উঠে শুভ্রর চোখের দিকে নিজের কৃষ্ণকালো চোখ তাক করে ধরল এবং প্রতিটি শব্দে তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
—“দিস ফ্লাওয়ার অফ ইয়োর্স উইল বি মাইন নো ম্যাটার হোয়াট! এভরি পার্ট অভ হার বডি উইল ক্যারি ওনলি মাই টাচ—মাই মার্ক অভ অ্যাফেকশন!”
ধারাপাত...
[গতকাল রাতে দেবো বলেও গল্প দিতে পারিনি কারণ আমি গল্প লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।]#মাই_ডেভিলিশ_লাভার
#পরিচ্ছেদ_০৩
#লেখনীতে_কথা_আলো
[ এখানে আমি আগেই এলার্ট করে দিচ্ছি যারা এসমস্ত গল্প পড়তে লাইক করেন না তারা পড়বেন নাহ। এটা আপনাদের জন্য উপযুক্ত নয়। এভোয়েড করবেন]
🚫 এই গল্পে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী কন্টেন্ট আছে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য উপযুক্ত নয়।🚫
❌ এই গল্পের সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত। লেখকের অনুমতি ছাড়া কপি, শেয়ার বা পুনঃপ্রকাশ নিষিদ্ধ❌
বাতাস তখন সবেগে বয়ে চলেছে, যার উন্মত্ত চিৎকারে জানালার পর্দাগুলো ছন্দহীন নাচের ভঙ্গিতে উড্ডীন। আকাশের বুক চিরে মুহুর্মুহু বিদ্যুৎ-এর তীক্ষ্ণ ঝিলিক দেখা যাচ্ছে, যা প্রতিবারই সমগ্র কক্ষকে এক লহমার জন্য আলোকিত করে দিচ্ছে। সেই ক্ষণস্থায়ী আলোতে স্পষ্ট দেখা যায় ঘরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লোক। তার দুই হাত পেছনে এমনভাবে বেষ্টনী করা, যেন সে কোনো কঠিন শপথের ভার বহন করছে। লোকটি অচঞ্চল দৃষ্টিতে চেয়ে আছে কক্ষের দেওয়ালে ঝোলানো প্রাচীন কোনো শৈল্পিক নিদর্শনের দিকে।
সহসা ঘরের ভেতরে ঝলসে ওঠে এক কৃত্রিম বৈদ্যুতিক দীপ্তি যা যেন কোনো আকস্মিক ঝলক। এই আলো ঘরটিকে সম্পূর্ণ উদ্ভাসিত করে তোলে; সেই উজ্জ্বলতা প্রতিফলিত হয় বিপরীত দিকের একটি সুদৃশ্য ছবির ক্যানভাসের উপর। সেখানে ফুটে ওঠে এক পুরুষের যৌবনকালের মধুময় প্রতিচ্ছবি। সেই শ্যামবর্ণের পুরুষের চেহারায় এক অসাধারণ মায়াবী আকর্ষণ এবং শান্ত দীপ্তি। স্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে লোকটি এক তীক্ষ্ণ, বিদ্রূপাত্মক হাসির রেখা টেনে ফিসফিসিয়ে উঠল,
—“তোর অতি-প্রেয়সী সম্রাজ্ঞীকে তোর কাছে চিরতরে পাঠিয়ে দিলাম, কায়সার খান। পরপারে তোরা একসাথে থাকবি!”
কথাগুলো শেষ হতেই তার মুখমণ্ডলে এক বিধঘুটে, বিকট হাসি ছড়িয়ে পড়ে; সেই হাসিতে যেন ভয়ংকরতার কালো ছায়া। হাসতে হাসতে লোকটি পুনর্বার তাকায় ছবির সেই মৃত ব্যক্তি অর্থাৎ কায়সার খানের মুখের দিকে। অবাক করা বিষয় হলো, মৃতের মুখের আদলের সাথে জীবিত লোকটির চেহারার এক অলৌকিক সাদৃশ্য বিদ্যমান!
—“তোর সম্রাজ্ঞীর মতোই আমি তোর কাছে পাঠিয়ে দেবো তোর অতি-আদরের পুতুল কন্যা রুবাইয়া বিনতে শূন্যতাকে। তোর মেয়েটি দেখতে সত্যিই বড়ই লাস্যময়ী ও অনবদ্য সুন্দরী!”
লোকটির চোখে ফুঁটে ওঠে এক নোংরা, ঘৃণ্য কামনার ঝলক, যা নিশ্চিত করে দেয় তার লিপ্সা এখন শূন্যতার দিকে ধাবিত। ঠিক সেই মুহূর্তেই, সেখানে এক আগন্তুক হন্তদন্ত ও শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় কক্ষে প্রবেশ করে।
—“আরমান ভাই, দেখুন, দেখুন! সংবাদমাধ্যমে কী দেখাচ্ছে!”
লোকটির কথায় আরমান নামের মানুষটি পিঠ ঘুরিয়ে তাকালো, তার চোখের কুটিলতা এক লহমার জন্য চাপা পড়ল গভীর বিস্ময়ে। তার দিকে এগিয়ে আসা যুবকটি তখনই হাতে ধরা মোবাইল ফোনটি তার মুখের সামনে তুলে ধরল। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই আরমান তালুকদার যেন আকস্মিক এক বজ্রাহত হলেন। সেখানে এক স্পষ্ট ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ শিরোনাম ভেসে উঠেছে---
‘বিখ্যাত রাজনীতিবিদ আরমান তালুকদারের জ্যেষ্ঠ পুত্র আইজান শুভ্র-এর বিবাহ সম্পন্ন! সাধারণ ঘরের কন্যাকে বধূরূপে গ্রহণ করলো আইজান শুভ্র। কনে’র নাম- রুবাইয়া বিনতে শূন্যতা। জানা যায়, কনে’র বাবা কায়সার খান ছিলেন এক সময়ের জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ এবং আরমান তালুকদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শুরুতে তাকে সাধারণ ঘরের বলে উল্লেখ করলেও মিসেস শুভ্র খান আদোতে একজন প্রয়াত রাজনীতিবিদের একমাত্র কন্যা’
এই অপ্রত্যাশিত সংবাদ দেখে আরমান তালুকদার তো রীতিমতো শকড! তার চোখের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন অবিশ্বাস আর ক্রোধের তীব্র আগুন জ্বলতে শুরু করলো। তারই অতি-আদরের ছেলে শুভ্র, শেষে কিনা বিয়ে করলো তারই সেই বন্ধুর মুখোশ পরে থাকা কায়সার খানের কন্যাকে! যে মেয়েকে সে প্রতিশোধের গুটি বানাতে চেয়েছিল, সেই মেয়েই কিনা তার পুত্রবধূ!
নিউজফিড জুড়ে ছেয়ে আছে শুভ্র আর শূন্যতার বেশ কিছু ছবি। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, শুভ্র পরম ভালোবাসায় শূন্যতাকে কোলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কোনো এক নয়নাভিরাম বাংলোর দিকে তাদের আনন্দের মুহূর্তটি সেখানে চিরস্থায়ী হয়ে ধরা দিয়েছে। যদিও ক্যামেরায় দেখানো ছবিটির পেছনের সত্য তারা কেউ জানে না, আঁধারের মাঝে ঢেকে রাখা হয়েছে জনসম্মুখে ; যেন তাদের চোখে পড়ানো হয়ে কালো এক পট্টি। তার সাথেই প্রকাশিত হয়েছে তাদের সই করা রেজিস্ট্রি পেপারের ছবি, যা এই বিবাহের সত্যতা প্রমাণ করছে। নেটিজেনদের মাঝে এই খবর মিশেল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ এই অপ্রত্যাশিত পরিণয়ে উচ্ছ্বসিত ভালো লাগা প্রকাশ করছে, তাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। আবার অনেকের মধ্যে কাজ করছে হিংসাত্মক ও ঈর্ষান্বিত মনভাব। একদল এই জুটিকে প্রশংসায় ভাসালেও, অন্য দল রীতিমতো শূন্যতার পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সাধারণ পারিবারিক পটভূমি নিয়ে বাজে মন্তব্য ও কটু কথা শুরু করে দিয়েছে। যেন আরমানের ক্রোধের আগুন জনসাধারণের সমালোচনার আগুনে নতুন মাত্রা পেল।
*
*
*
তুমুল বর্ষণের শব্দে প্রকৃতি যখন মুখর, ঠিক তখনই 'হ্যাপিনেস' রেস্ট হাউজের বিলাসবহুল কামরায় চলেছে অন্য এক মুহূর্তের ঘনঘটা। ঘরের উষ্ণ পরিবেশে উষ্ণ দুধভর্তি বাথটবে অসহায়ত্বের প্রতিমূর্তি হয়ে বসে আছে শূন্যতা। পরিধানে কোনো বস্ত্র না থাকায়, সেই বিলাসী প্রকোষ্ঠ ছেড়ে বাইরে যাওয়ার সাহসটুকুও সে পাচ্ছে না।
—“এখন কী পরবো আমি? কিছুই তো নেই ওয়াশরুমে!”
আর্তনাদ করে সে আশেপাশে চোখ ঘোরালো। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি পড়ল বাথটবের পাশে রাখা সাদা তুলতুলে বাথরোবটির দিকে। সেটি দেখে শূন্যতার চোখে যেন আশার আলোকরেখা ঝলসে উঠল। দ্রুত বাথটব থেকে উঠে ঝর্ণা ছেড়ে সে তড়িঘড়ি স্নান সম্পন্ন করল এবং দেরি না করে বাথরোবটি নিজের শরীরে জড়িয়ে নিল। বাথরোব পরে, সে অতি সন্তর্পণে দরজার ছিটকিনি খুলে মাথাটি সামান্য উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করল শুভ্র আশেপাশে আছে কিনা। তাকে দেখতে না পেয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল শূন্যতা। সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
—“যাক, শয়তানটা তাহলে চলে গেছে!”
সে যেই না স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, অমনি বারান্দা থেকে ঘরে এসে হাজির হলো শুভ্র। শুভ্রকে দেখে শূন্যতা একেবারে থতমত খেয়ে গেল, তার মুখমণ্ডল ভয়ে সাদা হয়ে গেল। তার মনে ভয় যদি সে আবারও তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে!
কিন্তু শুভ্র তার এই অপ্রত্যাশিত আচরণে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। সে কেবল এক অন্য দৃষ্টিতে শূন্যতাকে পা থেকে মাথা অবধি একবার পরখ করে নিল। সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো আগ্রাসন, বরং এক ধরণের গভীর মনোযোগ ও কামুকি দৃষ্টি। যা শূন্যতার অভ্যন্তর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে।
ঘরের দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে শুভ্র শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে নির্দেশ দিল,
—“বেডে ড্রেস রাখা আছে, ওটা পরে নাও।”
শুভ্র কেবল কথাটুকু বলেই যেন হাওয়ায় মিশে গেল, দ্রুত প্রস্থান করল কামরাটি থেকে। তার অনুপস্থিতি উপলব্ধি করেই শূন্যতা যেন মুক্তির এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ধীরে ধীরে সে বিছানার সন্নিকটে গিয়ে সতর্ক হাতে প্যাকেটটি তুলে নিল। প্যাকেট থেকে বস্ত্রটি উন্মোচন করতেই শূন্যতা যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল। ভেতরে ছিল মনোমুগ্ধকর সূক্ষ্ম কারুকার্য করা এক গভীর নীল রেশমি সুতির ত্রিখণ্ড বস্ত্র বা থ্রিপিস। রূপালী জরির সুতো এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ডে খচিত নকশা যেন জামার শোভা শতগুণ বর্ধিত করেছে।
সেই মহার্ঘ পোশাকটির দিকে স্নিগ্ধ, অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে রইল শূন্যতা। এমন দামি ও বিলাসী বস্ত্র পরিধানের সৌভাগ্য তার জীবনে সর্বশেষ ঘটেছিল সেই সময়ে, যখন তার বাবা কায়সার খান জীবিত ছিলেন। তিনি নিজ হাতে যত্ন করে মা-মেয়ের জন্য এমন পোশাক আনতেন, যত্নে মুড়ে রাখতেন যাতে একটি আঁচড়ও না লাগে। কিন্তু মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই বিধির নির্মম পরিহাসে তার মাথার উপর থেকে সেই স্নেহময় আশ্রয়টুকু বাবা নামক ছায়া চিরতরে ছিনিয়ে নেওয়া হলো। এরপর থেকেই শুরু হলো মা-মেয়ের জীবনযুদ্ধ। কাছের মানুষ বলতে যাদের বোঝাত, সেই দাদাবাড়ির আত্মীয়-স্বজনও মুখ ফিরিয়ে নিল। বাবার কেনা পৈতৃক সম্পত্তিটুকুও হাতিয়ে নিয়ে তাদের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করল! জগতে তাদের আর কোনো অবলম্বন রইল না। তার মা তো ছিলেন এতিম, নিজের বাবার বাড়ি বলতেও তার কিছু ছিল না।
অতীতের বেদনাদায়ক স্মৃতিরাশি মনে ভিড় করতে করতেই শূন্যতা ড্রেসটি পরে ফেলল। পরিপাটি করে পোশাক পরে, কাঁধের উপর দিয়ে সিক্ত কেশরাশি আলগা করে দিতেই সে শুনতে পেল ভারী পদধ্বনির গমগম শব্দ। শব্দটি ক্রমশ তার দিকে নিকটবর্তী হচ্ছে। পরমুহূর্তেই, তার পিঠের উন্মুক্ত ত্বকে কারোর এক শীতল হাতের স্পর্শ অনুভব হতেই সর্বাঙ্গ শিহরিত হয়ে উঠল শূন্যতার। সে চমকে চট করে পেছন ফিরতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে সে অবলীলায় কারোর বলিষ্ঠ বাহুর বন্ধনে বন্দী।
—“কি... কী করছেন আপনি, সাহেব?”
ভয়ে তোতলামি করে কথাগুলো বলল শূন্যতা। তার হৃদস্পন্দন তখন চরম পর্যায়ে, কারণ তার মনে সেই পুরনো ভয়—যদি শুভ্র আবারও তার ওপর আক্রমণ করে বসে! শুভ্র তার কানে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, যার শব্দে ছিল তীব্র আকর্ষণ,
—“ইউ’আর লুকিং সো হট আফটার দা শাওয়ার!”
মন মাতানো, দেহ শিউরে ওঠার মতো করে শুভ্র কথাগুলো বলার পর, সে তার উষ্ণ শ্বাস ফেলে শূন্যতার কাঁধে মুখ ঘষতে ঘষতে এগিয়ে চলল। তার এই অপ্রত্যাশিত ঘনিষ্ঠতায় শূন্যতার সর্বাঙ্গ কেমন ঘিন ঘিন করে উঠল। যার প্রতি হৃদয়ে কোনো ভালোবাসা বা টান নেই, তার এমন আগ্রাসী স্পর্শে শরীর তো বিতৃষ্ণাই হবে। শুভ্র যেই না শূন্যতার কাঁধ থেকে পোশাকের ফিতাটি আলগা করতে যাবে, ঠিক তখনই উচ্চস্বরে বেজে উঠল তার পকেটের মোবাইল ফোনটি।
এমন সংবেদনশীল মুহূর্তে ফোন আসায় শুভ্রর মুখমণ্ডলে তীব্র বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে ফোন হাতে নিতেই দেখল কলটি তার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট তাশফি-এর। তাশফির নাম দেখে শুভ্রর কপাল আরও কুঁচকে গেল। বিরক্তি সত্ত্বেও সে ফোনটি রিসিভ করে কানে ধরল। শুভ্র কেবল কিছু শোনার অপেক্ষা করছিল। ওপাশ থেকে আসা কয়েকটি বাক্য শোনামাত্রই শুভ্রর চোখ কপালে উঠল, তার হাত থেকে ফোনটি ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে সশব্দে। কাঁচ ভাঙার শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে গেল। শুভ্রর মুখমণ্ডল তখন আতঙ্ক ও অস্থিরতায় সাদা অপ্রত্যাশিত কিছু শুনলে যেমন অবস্থায় পড়ে একজন মানুষ শুভ্রও যেন তাদের মাঝেরই একজন। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে শূন্যতার দিকে ফিরে তাকালো, কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা,
—“ফাস্ট রেডি হও। আমাদের এখনই বের হতে হবে!”
শুভ্রর এমন আচমকা পরিবর্তন দেখে শূন্যতা সামান্য বিস্মিত হলেও মুখে কিচ্ছুটি উচ্চারণ করল না। সে দ্রুততার সাথে চুপচাপ তৈরি হতে শুরু করল। অন্যদিকে শুভ্র অধৈর্য হয়ে উন্মত্তের মতো সারা ঘর জুড়ে পায়চারি করতে লাগল। তার এই অস্বাভাবিক অস্থিরতা শূন্যতার দৃষ্টি এড়ালো না।
—“কী হয়েছে লোকটার? এমন করছে কেন হঠাৎ?”
মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করলেও, শূন্যতা শুভ্রকে একটি প্রশ্নও করার সাহস দেখাল না। তৈরি হয়ে শুভ্রর সামনে আসতেই সে এক মুহূর্তও দেরি না করে শূন্যতার হাত চেপে ধরল এবং 'হ্যাপিনেস' রেস্ট হাউজ থেকে তড়িৎ বেগে বেরিয়ে গেল।
*
*
*
সুপরিচিত হাসপাতালের চত্বর দেখে শূন্যতা এক ঝলকে শুভ্রর দিকে তাকালো। তার চোখে তখন নির্বাক প্রশ্ন। সে দেখল, শুভ্র তখনো গাড়ির ড্রাইভিং সিটে এক্কেবারে নির্জীব, প্রাণহীন হয়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার চোখের কোণে জমে থাকা নিদারুণ হতাশা যেন এক অশুভ বার্তা দিচ্ছিল। একরাশ ভারী নিঃশ্বাস ফেলে শুভ্রর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো সেই ভয়াবহ সত্য,
—“ইউর মাদার ইজ নো মোর!"
শুভ্রর মুখ থেকে এই কয়েকটি বাক্য শোনামাত্রই শূন্যতা যেন পাথর হয়ে যায়। হাহাকার করে বলে ওঠে,
—“কি..কি বলছেন আপনি?”
শুভ্রর দিকে উত্তরের আশায় তাকাতেও কোনো উত্তর না আসায় পাগলিনীর মতো গাড়ির দরজা সশব্দে খুলে দিল। দিশেহারা অবস্থায় সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল, উদভ্রান্তের ন্যায় ছুটতে লাগল মায়ের কেবিনের দিকে। পায়ের স্যান্ডেল বা স্লিপার কখন কোথায় খুলে পড়ে গেল, সে খেয়ালও করল না; তার ভিজে চুলগুলো মুখের চারধারে উন্মত্তের মতো লেপটে আছে। এই অবস্থায় তাকে উন্মাদ লাগছিল।
ছুটতে ছুটতে ঠিক কেবিনের সামনেই তার ধাক্কা লাগল ডাক্তার আসিফ-এর সাথে। আসিফ তাকে সামলাতে ধরতেই, শূন্যতা ক্রোধে ও শোকে উন্মত্ত হয়ে তার শার্টের কলার নির্মমভাবে চেপে ধরল।
—“এই ডাক্তার! সত্যি করে বল,আমার মা বেঁচে আছে তাই না? মিথ্যে বলছিস তোরা? কেন আমার কথার উত্তর দিচ্ছিস না!”
কেমন এক অশরীরী, ভাঙা কণ্ঠে শূন্যতা প্রশ্নটি করল। শূন্যতার এমন উত্তেজিত রূপ এবং প্রশ্ন শুনে ডাক্তার আসিফ মুহূর্তের জন্য হতচকিত হয়ে গেল। সে কোনওমতে শূন্যতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে দৃঢ় কিন্তু শীতল কণ্ঠে বলল,
—“তোমার মা মারা গেছে, রুবাইয়া।”
আসিফের এই কথাগুলো শূন্যতার মস্তিষ্কে যেন শত সহস্র বজ্রপাতের রূপ নিল। তার মাথার উপর যেন সমগ্র মহাবিশ্ব মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ল! যে মায়ের জীবন বাঁচাতে তার এতদিনের এলোমেলো, তিল তিল করে গড়ে তোলা যুদ্ধ সেই মা-ই কিনা তাকে বেঈমানের মতো একাকী ফেলে চলে গেল! কার জন্য সে এতকিছু করলো? কিসের জন্য করলো এই আত্মত্যাগ? আর যেন কিছুই ভাবতে পারল না সে।
শরীরের ভারসাম্য আর ধরে রাখতে পারল না শূন্যতা, চেতনা লুপ্ত হয়ে সে যখন ভূমিতে লুটিয়ে পড়তে উদ্যত হলো, ঠিক তখনই আসিফ তাকে ধরতে গেল। কিন্তু আসিফের হাত স্পর্শ করার আগেই তার কানে বজ্রপাতের ন্যায় আছড়ে পড়ল একটি বাক্য, যা ছুঁটে এসেছে পেছনের দিক থেকে,আসিফের কানে সেই বজ্রপাতের ন্যায় বাক্যটি আছড়ে পড়ল।
—“ডোন্ট টাচ মাই ওয়াইফ। আই অ্যাম দ্য ওনলি ওয়ান হু হ্যাজ দ্য রাইট টু টাচ হার। নো ওয়ান এলস। সো স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হার।”
এমন অধিকারবোধক কথা শুনে আসিফ যখন সামনে তাকালো, তখন সে দেখল আইজান শুভ্র এক হাত পকেটে গুঁজে, নিখাদ ম্যানলি স্টাইলে তার দিকে হেঁটে আসছে। শুভ্রর প্রতিটি পদাচরণ যেন সশব্দে ঘোষণা করছে শূন্যতার উপর একমাত্র কতৃত্ব কেবল তারই, আর কারোর নয়! শুভ্র এগিয়ে এসে আসিফের একেবারে মুখোমুখি দাঁড়ালো। সে আসিফের দিকে তাকালো যেন জ্বলন্ত আগুনের শিখার মতো দৃষ্টিতে। অন্যদিকে ডাক্তার আসিফও শুভ্রর দিকে তাকালো ঈগলের তীক্ষ্ণ চাহনি নিয়ে। তাদের দু’জনকে দেখলে মনে হবে তারা যেন জন্ম-জন্মান্তরের চির শত্রু, যারা এই মুহূর্তে এক অদৃশ্য দ্বন্দ্বে লিপ্ত।শুভ্রর কণ্ঠস্বর ছিল হিসহিস করা শীতল, যেন সে আদেশ দিচ্ছে,
—“ ডোন্ট ক্রস ইয়োর লিমিটস, মিস্টার সাবাব! চেঞ্জ দ্যাট হ্যাবিট অভ ওয়ান্টিং টু লিভ ইয়োর টাচ এভরিহোয়্যার!”
শুভ্রর কথা শুনে ডাক্তারের অ্যাপ্রোন পরিহিত আসিফের মুখে ফুঁটে উঠল এক কুটিল হাসি। সেই হাসি যেন শয়তানের মতোই বিভীষিকাময়। সে হেসে উঠে শুভ্রর চোখের দিকে নিজের কৃষ্ণকালো চোখ তাক করে ধরল এবং প্রতিটি শব্দে তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
—“দিস ফ্লাওয়ার অফ ইয়োর্স উইল বি মাইন নো ম্যাটার হোয়াট! এভরি পার্ট অভ হার বডি উইল ক্যারি ওনলি মাই টাচ—মাই মার্ক অভ অ্যাফেকশন!”
ধারাপাত...