শহরের এক নীরব গলিতে ছিল একটি পুরোনো ঘড়ির দোকান।
দোকানটা যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে—
ধুলো জমা তাক, ম্লান আলো, আর দেয়ালজুড়ে টিকটিক করা অসংখ্য ঘড়ি।
সব ঘড়ি ঠিক সময় বলত—একটি ঘড়ি ছাড়া।
ওই ঘড়িটার কাঁটা কখনো থেমে যেত, কখনো হঠাৎ ছুটে চলত।
ঘড়িটা কেউ কিনত না।
একদিন এক যুবক দোকানে ঢুকল। তার চোখ পড়ল সেই ঘড়িটায়।
সে জিজ্ঞেস করল,
“চাচা, এই ঘড়িটা এখনও রেখেছেন কেন? এটা তো নষ্ট। সময় ঠিক নাই।”
দোকানি ধীরে হাসলেন। এক রহস্যময় হাসি। হাসিটা যেন অনেক কিছু জানে।
তিনি বললেন,
“কারণ এই ঘড়ি মানুষকে সময় নয়—নিজেকে দেখতে শেখায়।
এই ঘড়িটাতে আজানের শব্দগুলো সংযোজন করা আছে।”
যুবক বুঝল না, কিন্তু সে উৎসাহী হয়ে ঘড়িটা অল্প দামে কিনে নিল।
প্রথম দিন রাতে ঘড়িতে ফজরের আজান শুনে ঘুম ভাঙ্গল ।
দেখে ঘড়িতে ০৩:৪৯ বাজছে।
সে ঘড়ির ভুল সময় দেখে সে বিরক্ত হলো এবং ঘুমিয়ে পড়লো।
পরে যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন সকাল। সে আফসোস করল।
দ্বিতীয় দিন রাতে আবারও ফজরের আজান শুনে যুবকের ঘুম ভাঙ্গল
এবং ঘড়িতে সময় ০২:৫৫ দেখতে পেল।
ঘড়ির এমন অসময়ে আজান ও সময় দেখে বিরক্ত হলো এবং পুনরায় ঘুমিয়ে পড়লো।
এবারও তার সকালে ঘুম ভাঙ্গল এবং খুবই ব্যথিত হল।
দৃঢ় সংকল্প করলো ঘড়ির সময় না দেখেই মসজিদের আজান শুনে সে নামাজে যাবে।
তৃতীয় দিন ঘড়িটি হতে আজান ধ্বনি শুনা গেলনা।
মসজিদে মুয়াজ্জিনের ফজরের আজান শুনে তার ঘুম ভাঙ্গল—
ঘড়ির সময় না দেখেই সে অজু করল, নামাজে গেল।
এভাবে দিন যেতে যেতে সে বুঝতে শুরু করল—
ঘড়ি নীরব হলেও, আকাশ নীরব নয়।
সময় থেমে থাকে না, সূর্য উঠতে ভুল করে না।
আজান দেরি করে না।
একদিন হঠাৎ ঘড়িটা পুরোপুরি থেমে গেল।
যুবক সেটাকে ছুড়ে ফেলল না।
বরং আলমারির ওপর তুলে রাখল—
একটা স্মৃতির মতো।
অনেক বছর কেটে গেল।
এক সন্ধ্যায় তার ছেলে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আব্বা, এটা তো অনেক দিন থেকে দেখি চলে না, বন্ধ —তবুও রেখেছ কেন?”
যুবক কিছুক্ষণ চুপ থাকল।
তারপর বলল, “এই ঘড়িটা আমাকে শিখিয়েছে—
** সময় আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে না,
** আমি সময়ের মালিক নই,
** আর যিনি সময় সৃষ্টি করেছেন—
তাঁর ডাক কখনো ভুল হয় না।”
ঘরের ভেতর তখন মাগরিবের আজান ভেসে এলো।
ঘড়িটা নীরব রইল।
কিন্তু হৃদয় সাড়া দিল।
নীরব শিক্ষাঃ
ইবাদত সময়ের কাঁটার ওপর নয়, আল্লাহর ডাকে;
যা অচল মনে হয়, তা-ই কখনো পথ দেখায়;
মানুষ ঘড়ির দিকে তাকায়, মুমিন তাকায় আসমানের দিকে।