Posts

গল্প

নীরবতার ওপারে আলো

January 6, 2026

Rayhanul Karim

29
View

ভোরের আলো যখন নদীর গায়ে প্রথম ছায়া ফেলে, তখন গ্রামের নামটাই যেন বদলে যায়। দিনের বেলা যে গ্রামটাকে সবাই চিনে “চরকল্যানপুর” নামে, ভোরের সেই মুহূর্তে সে গ্রাম যেন নীরবতার রাজ্য। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কাশবনগুলো হালকা বাতাসে দুলে ওঠে, আর দূরে কোনো অদৃশ্য পাখির ডাক ভেসে আসে—ঠিক যেন কেউ কাউকে ডেকে বলছে, “জাগো, আজও বেঁচে আছো।”

এই গ্রামেরই এক প্রান্তে মাটির ঘর। টিনের চাল, সামনের উঠানে একটা পুরনো আমগাছ। আমগাছটার নিচে বসেই বড় হয়েছে রাশেদ। এখন তার বয়স পঁচিশ, কিন্তু চোখে মুখে এমন এক ক্লান্তি, যা সাধারণত অনেক বেশি বয়সে এসে মানুষ পায়।

রাশেদের বাবা ছিলেন নৌকার মাঝি। নদীই ছিল তার জীবন, আর নদীতেই এক বর্ষার রাতে তিনি হারিয়ে গেলেন। সেই রাতের কথা এখনো রাশেদের কানে বাজে—বৃষ্টি, ঝড়, আর মায়ের কান্না।

বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল রাশেদকেই। পড়াশোনা তখন সবে এসএসসি পর্যন্ত। কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্নটা নদীর স্রোতের মতোই ভেসে গেল।

গ্রামের মানুষ রাশেদকে ভালোই চেনে। কেউ বলে, “ভাল ছেলে, কিন্তু কপাল খারাপ।” আবার কেউ বলে, “এত চুপচাপ থাকলে জীবনে কী করবে?”

রাশেদ চুপচাপই থাকে। তার ভেতরে একটা নীরব জগত আছে, যেখানে সে নিজের কথা নিজেই শোনে। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, সে তখন আমগাছটার নিচে বসে আকাশের দিকে তাকায়। তার মনে হয়, তার বাবাও হয়তো কোথাও আকাশের ওই তারাগুলোর ভেতরেই আছে।

মা—আয়েশা বেগম—ছেলের এই নীরবতা বুঝতে পারেন। কিন্তু কিছু বলেন না। তিনি জানেন, কষ্টের ভাষা সব সময় শব্দে প্রকাশ পায় না।

একদিন গ্রামে নতুন একজন আসে। নাম মেহজাবিন। শহর থেকে আসা, কলেজে পড়ান। সরকারিভাবে পোস্টিং হয়েছে এই গ্রামে।

প্রথম দিনেই গ্রামের সবাই তাকে দেখতে আসে। শহুরে পোশাক, চোখে আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের আড়ালে এক ধরনের কোমলতা আছে, যা খুব কম মানুষই প্রথম দেখায় বুঝতে পারে।

মেহজাবিন প্রথম যেদিন স্কুলে ঢুকলেন, রাশেদ তখন স্কুলের পাশের দোকানে বসে চা খাচ্ছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে তাকে দেখে রাশেদের চোখ আটকে গেল। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই মনে হলো, এই মানুষটা আলাদা।

দিন যেতে লাগল। মেহজাবিন ধীরে ধীরে গ্রামের সঙ্গে মিশে গেলেন। তিনি শুধু ক্লাস নিতেন না, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের স্বপ্ন জানতে চাইতেন।

একদিন তিনি রাশেদের দোকানে এলেন।
—“চা পাবো?”
রাশেদ একটু থমকে বলল,
—“জি, বসুন।”

চা দিতে দিতে হাত কেঁপে উঠল রাশেদের। মেহজাবিন সেটা লক্ষ্য করলেন, কিন্তু কিছু বললেন না।

—“আপনি কি এখানে থাকেন?”
—“জি।”
—“পড়াশোনা করেছেন?”
রাশেদ একটু হেসে মাথা নিচু করল।
—“করতে চেয়েছিলাম।”

এই ছোট্ট কথোপকথনেই শুরু হলো এমন এক সম্পর্ক, যা দুজনের জীবন বদলে দেবে—যদিও তখনো কেউ জানে না।

মেহজাবিন রাশেদের ভেতরের মানুষটাকে দেখতে পেলেন। তিনি বুঝলেন, এই ছেলেটার ভেতরে শুধু কষ্ট নয়, সম্ভাবনাও আছে।

একদিন তিনি বললেন,
—“আপনি আবার পড়াশোনা শুরু করতে পারেন।”
রাশেদ হেসে বলল,
—“স্বপ্ন দেখতে টাকা লাগে, আপা।”

মেহজাবিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
—“কিছু স্বপ্ন আছে, যেগুলো দেখলে মানুষ বাঁচে।”

এই কথাটা রাশেদের মাথায় ঘুরতে লাগল।

গ্রামে তখন একটা বড় সমস্যা। নদী ভাঙন। প্রতি বছরই কয়েকটা পরিবার সব হারায়। এবারও ভাঙন শুরু হয়েছে।

রাশেদের ঘরও ঝুঁকির মধ্যে। মা রাতদিন দোয়া করেন। রাশেদ চেষ্টা করে শক্ত থাকতে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে পড়ে।

এক রাতে সে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্ধকার পানিতে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, নদী তাকে ডাকছে—যেমন করে বাবাকে ডেকেছিল।

ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা কণ্ঠ,
—“এখানে কী করছেন?”

মেহজাবিন।

সেই রাতে অনেক কথা হলো। রাশেদ প্রথমবারের মতো কাউকে নিজের ভেতরের ভয়গুলো বলল। বাবার মৃত্যু, অসমাপ্ত স্বপ্ন, দারিদ্র্য, ভবিষ্যতের অন্ধকার।

মেহজাবিন মন দিয়ে শুনলেন। কোনো উপদেশ দিলেন না, শুধু বললেন,
—“আপনি একা নন।”

এই তিনটা শব্দ রাশেদের বুকের ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দিল।

পরের দিন থেকেই রাশেদের জীবনে পরিবর্তন শুরু হলো। সে আবার বই কিনল। রাতে পড়াশোনা শুরু করল। মেহজাবিন তাকে সাহায্য করতেন—কখনো নোট দিয়ে, কখনো শুধু সাহস দিয়ে।

গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে দেখল, যে ছেলেটা সারাদিন চুপচাপ থাকত, সে এখন চোখে অন্যরকম আগুন নিয়ে হাঁটে।

কিন্তু জীবন কখনো সহজ পথে চলে না। হঠাৎ খবর এলো—মেহজাবিনের বদলি হয়েছে। শহরে।

খবরটা শোনার পর রাশেদের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে গেল। সে বুঝতে পারছিল না, এই কষ্টটা কিসের। ভালোবাসা? কৃতজ্ঞতা? না কি দুটোরই মিশ্রণ?

বিদায়ের দিন স্কুলের মাঠে সবাই জড়ো হলো। মেহজাবিন হাসছিলেন, কিন্তু চোখের কোণে জল।

রাশেদ সামনে গিয়ে বলল,
—“আপা, আমি পড়াশোনা শেষ করব।”
মেহজাবিন বললেন,
—“আমি জানি।”

মেহজাবিন চলে গেলেন। গ্রাম আবার আগের মতো নীরব। কিন্তু রাশেদের ভেতরের নীরবতা বদলে গেছে।

বছর যায়। রাশেদ এইচএসসি পাশ করে। পরে শহরে গিয়ে ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কষ্ট হয়, অভাব হয়, কিন্তু সে থামে না।

মা একদিন ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—“তোর বাবা বেঁচে থাকলে গর্ব করত।”

পাঁচ বছর পর রাশেদ আবার চরকল্যানপুরে ফেরে—এইবার শিক্ষক হয়ে। স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়ে তার বুক কেঁপে ওঠে।

হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ,
—“স্বপ্ন দেখতে টাকা লাগে না, সাহস লাগে।”

রাশেদ ঘুরে দাঁড়ায়।

মেহজাবিন।

দুজনের চোখে জল। নদী তখন শান্ত। আকাশে আলো।

নীরবতার ওপারে সত্যিই আলো ছিল।

Comments

    Please login to post comment. Login