শহরের এক কোণায় ছোট্ট একটি ভাতের হোটেল। নাম— মায়ের হাতের ভাত। নামটা যেমন সহজ, দোকানটাও তেমনই। টিনের চাল, কাঠের বেঞ্চ, আর দুপুর হলেই ভেসে আসে গরম ভাত আর ডালের গন্ধ। এই হোটেলের মালিক হানিফ মিয়া—পঞ্চাশ পেরোনো এক সাধারণ মানুষ।
হানিফ মিয়ার জীবন সহজ ছিল না। গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলেন কাজের খোঁজে। প্রথমে রিকশা চালিয়েছেন, তারপর হোটেলের বয় হিসেবে কাজ। বছরের পর বছর মানুষের প্লেট ধুতে ধুতে একদিন নিজের একটা হোটেলের স্বপ্ন দেখেছিলেন। অনেক কষ্টে, ধারদেনা করে এই ছোট্ট দোকানটা দাঁড় করান।
হানিফ মিয়ার একটা নিয়ম ছিল—কেউ যদি সত্যিই ক্ষুধার্ত হয়, কিন্তু টাকা না থাকে, তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন না।
একদিন দুপুরে হোটেলে ভিড়। এমন সময় দরজার কাছে এসে দাঁড়াল একটি ছেলে। বয়স বড়জোর বারো-তেরো। জামা ছেঁড়া, চোখে ভয় আর ক্ষুধা।
ছেলেটা কাঁপা গলায় বলল,
—“কাকা… একটু ভাত পাবো?”হানিফ মিয়া এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন। আশেপাশের কিছু খদ্দের বিরক্ত চোখে তাকাল। কেউ কেউ ফিসফিস করে বলল,
—“এরা আসলে দোকানের পরিবেশ নষ্ট করে।”হানিফ মিয়া কিছু বললেন না। তিনি রান্নাঘরের দিকে গিয়ে এক প্লেট ভাত নিলেন। ভাত, ডাল, আর একটু আলুভাজি। ছেলেটার সামনে প্লেটটা রেখে বললেন,
—“বসে খা।”ছেলেটার চোখে পানি এসে গেল। সে দ্রুত খেতে লাগল, যেন ভাতটা হারিয়ে যাবে।
খাওয়া শেষে ছেলেটা বলল,
—“কাকা, আমার কাছে টাকা নেই।”
হানিফ মিয়া হালকা হেসে বললেন,
—“আজ তোর কাছ থেকে ভাতের দাম নিলাম হাসি দিয়ে।”দোকানে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো।
পরের দিন, তার পরের দিন—ছেলেটা আবার আসতে লাগল। নাম তার রাব্বি। বাবা নেই, মা অসুস্থ। সে ফুটপাতে ফুল বিক্রি করে।
একদিন হানিফ মিয়া বললেন,
—“ভাত খাস, কিন্তু শুধু বসে বসে নয়। দোকানে একটু সাহায্য করবি?”
রাব্বির চোখ জ্বলে উঠল।
—“করব কাকা!”ধীরে ধীরে রাব্বি দোকানেরই একজন হয়ে গেল। প্লেট তুলে দেয়, পানি দেয়, সন্ধ্যায় দোকান গুছিয়ে দেয়।
বছর ঘুরল। রাব্বি বড় হলো। হানিফ মিয়া তাকে স্কুলে ভর্তি করালেন। অনেকেই বলেছিল,
—“অপরের বাচ্চার দায় কেন নিচ্ছেন?”
হানিফ মিয়া শুধু বলেছিলেন,
—“এক প্লেট ভাত কাউকে মানুষ বানাতে পারে।”অনেক বছর পর, হোটেলের সামনে বড় গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল এক তরুণ। পরিপাটি পোশাক, চোখে আত্মবিশ্বাস।
সে এসে হানিফ মিয়ার হাত ধরে বলল,
—“কাকা, আমি রাব্বি। আজ আমি চাকরি করি। এই দোকানটা এখন আমি চালাব।”হানিফ মিয়ার চোখ ভিজে গেল।
এক প্লেট ভাত সত্যিই অনেক কিছু বদলে দিতে পারে—যদি তার সঙ্গে থাকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা।
25
View