Posts

গল্প

এটি পৃথিবীর ছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য বিষয়ক…………

January 6, 2026

মোঃ আনোয়ার পারভেজ

95
View

লোকটির বয়স ত্রিশ ছুঁই ছুঁই, কিন্তু তার চোখ, মুখ, চালচলন, হাঁটার ভঙ্গি খেয়াল করে দেখলে ‘যুবক’ অভিধা থেকে তাকে পুরোপুরি খারিজ করে দেওয়া যাবে না। কেউ যদি খুব সুক্ষ্মদৃষ্টিসম্পন্ন না হয়, তবে তাকে যুবক হিসেবে গণ্য পর্যন্ত করে ফেলতে পারে। সে একজন চাকরিজীবী, আড়াই বছর হয়েছে তার চাকরির বয়স- চাকরিজীবনের এই কালিক অল্পত্ব এবং নিজের প্রতি যথেষ্ট যত্ন তাকে এখনও সজীব রেখেছে, নুয়ে পড়ার চিহ্নগুলো এখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। বিধি অনুযায়ী অফিস পাঁচটায় ছুটি হলেও বের হতে হতে তার ছয়টা বেজে যায়। অফিসে উচ্চ স্তরের কর্মকর্তাদের দলে এখনও অন্তর্ভূক্ত হয়নি বলে ছয়টার মধ্যেই ছুটি মেলে তার। 

অফিস থেকে বাসায় ফেরার জন্য গত দেড় বছর ধরে সে মেট্রোরেল ব্যবহার করে । অফিস থেকে মেট্রোরেল স্টেশনের দূরত্বও বেশি নয়- বিশ মিনিটের হাঁটা-দূরত্ব। রিকসা ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নের কথা ভেবে সে এই পথটুকু হেঁটেই আসে। এসে স্টেশনের সীমানা-লাগোয়া প্রান্তে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খায়, একটু বিশ্রাম নেয়। চা খাওয়া শেষ হলে স্টেশনের সিঁড়িতে ওঠার আগের ইস্পাতের রেলিং দেওয়া ফাঁকা চত্বরটার এক পার্শ্বে দাঁড়িয়ে সে সিগারেট টানে। সিগারেট টানে আর দেখে। রেলিংয়ে হাত রেখে রাস্তার গাড়ি, বাস, সাইনবোর্ড ইত্যাদির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তার সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ার ভঙ্গীর মধ্যে বিলাসিতার হাল্কা ছোঁয়া থাকে- পথচারীদের কারো তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি বা ঔৎসুক্য থাকলে তা চোখে পড়ে, অন্যথায় তা দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার মতোই। তবে পথচারীরা কে কী দেখল বা বুঝল তা নিয়ে সে একটুও মাথা ঘামায় না।

কারণ তখন তার ভাবনা জুড়ে রাজত্ব করে চারপাশের সাদৃশ্য, সামঞ্জস্য, অনুকূলতা- শ্লথ গতিতে সুবেশী তরুণ-তরুণী নিয়ে ঝকঝকে গাড়িগুলো এগিয়ে যায় সংকেতের দিকে খেয়াল রেখে, অত্যাধুনিক শপিং কমপ্লেক্সের বেচাকেনা ঘিরে রাখা তীব্র বর্ণিল আলোর ঝলকানি সীমানা ছাড়িয়ে আছড়ে পড়ে রাস্তায়, অদূরে ওপরে বহুজাতিক কোম্পানি কর্তৃক লোকজ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার বিজ্ঞাপন দৃষ্টিতে ক্রমাগত প্রশান্তি লেপে যায় জনচোখে ও মনে- যুবকটির চোখ ও মনের জন্যও এসব দৃশ্য শান্তিদায়ক, সারাদিনের অফিসকাজের ক্লান্তিহ্রাসক। একটা মুঠোফোন কোম্পানির অজিনভিত্তিক লোগোসম্বলিত বিজ্ঞাপন অনেক,  অনেক বার তার ভাবনাকে উদ্দীপ্ত করেছে- অনেকদিন বাঘের চামড়ার এক কথার সংজ্ঞা জানার ইচ্ছা তার শৈশবের স্মৃতিতে হানা দিয়ে গেছে- নেশার কাছে সঁপে যাওয়া এক কবিবন্ধুর কাছে সেই সংজ্ঞা জানতে উদ্যত হয়েও সে নিরস্ত হতে বাধ্য হয়েছে অনেকবার- তার মুঠোফোনের নম্বর জানে না বলে।

সিগারেট টানার সময়টিতে একেবারেই আলগোছে যুবকটির একটা হাত রেলিং ছুঁয়ে থাকে, আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ভাবে, দেখে। অদূরে একটা কুকুর রাত জাগার প্রস্তুতি হিসেবে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। আনমনে যুবকটির একটা পা রেলিংটার সবচেয়ে নিচের, আনুভূমিক দণ্ডটার ওপর আলগোছে উঠে যায়- শৈশবে পড়া জিম করবেটের বাঘশিকারের বইয়ের প্রচ্ছদ ঘিরে থাকা স্মৃতি বাস্তবায়নের চেষ্টার  কোনো বালাই থাকে না তাতে। অত্যন্ত সাবলীল ও স্বয়ংক্রিয় ভঙ্গীতে পা’টা যেন উঠে যায়। দৃষ্টি কখনো ওপরের বিজ্ঞাপনে চিত্রিত অপার্থিব সৌন্দর্যমণ্ডিত নারীকে, কখনো বা পথ দিয়ে এঁকে বেঁকে যাওয়া হাস্যরত লাস্যময়ী নানান বয়সী নারী কিংবা তাদের পুরুষ সঙ্গীকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়- ভাবনা তাদের নিয়েও খেলা করে। এদের ভেতরের কলকব্জা একেবারেই অবিদিত নয় তার। কোনো কোনো ছবি বা কারো কারো মুখ টিভি বিজ্ঞাপনের অত্যন্ত নাটুকে ভাবতারল্যে ভেসে যাওয়া আবেগমথিত সংলাপ, অভিব্যক্তি তার ভাবনার খেলায় এনে দেয়। এলোমেলো সব জিজ্ঞাসার উদয় হয় মনে, যেমন- নারীর হৃদয় জয় করতে এমন আবেগের ব্যবহার সত্যিই কি খুব প্রয়োজনীয়?-অনেক সময় নিজেকেই প্রশ্ন করে সে। উত্তরটা তার জানা- অনেক আগেই। তবুও এসব স্থিরচিত্র, চলচ্চিত্র ও বিক্ষিপ্ত চিন্তাস্রোত তার কর্মদিবসের নিয়ন্ত্রিত ধূমপানপর্বের সমাপ্তিকে বেশ উপভোগ্য করে দেয়।

তিনদিন হলো যুবকটির এমন ভাববিলাসের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটছে।

তিনদিন আগে সিঁড়িতে ওঠার আগে ফাঁকা চত্বরটিতে একজন মধ্যবয়সী ভিখারিনীকে এক দেড় বছর বয়সী একটি শিশুকে নিয়ে কাপড় পেতে বসে থাকতে দেখেছে সে। ভিখারিনীটি পায়ের কাছে শিশুটিকে রেখে পাগুলো সামনের দিকে বাড়িয়ে বসেছিল। তার ভঙ্গীতে ঠিক বিশ্রামের বিলাসিতা না থাকলেও এক ধরণের অলসতার মিশেল ছিল- কোনো জোর তাগিদ বা তাড়না নেই যেন। পেছন ফিরে না তাকিয়েও সিগারেট টানতে টানতে যুবকটি বুঝেছিল মহিলা আড়চোখে তাকে দেখছে- যেন যাচাই করছে বা মেপে দেখছে। সে সামান্য অস্বস্তিবোধ করেছে। তবে মুহূর্তের মধ্যেই সেই অস্বস্তিবোধ কাটিয়ে ও ভিখারিনীকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সে তার কাজ করে গেছে।

দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ গতকাল ভিখারিনীটি তার সিগারেট টানার স্বল্প মেয়াদের মধ্যেই উঠে দাঁড়িয়েছিল এবং খানিকটা দূরত্ব রেখে তার পাশে দাঁড়িয়ে রেলিংটা ধরে ওপাশে উঁকিঝুঁকি মেরেছিল। তার অস্বস্তি গভীরতর হয়েছিল, আর ধারণা করছিল ভিখারিনীটি হয়তো তার কাছে ভিক্ষা চাইবে। তার কাছে খুচরা টাকা আছে কি না এবং থাকলে তার পরিমাণ কত হবে তা জানতে মানিব্যাগটা প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে বের করতে গিয়েও সে নিরস্ত হয়। ভেবেছিল ভিখারিনীটি তো তার কাছে ভিক্ষা চাইছে না। একান্ত যদি চেয়েই বসে তখন দেখা যাবে ভেবে ব্যাপারটা ভবিষ্যতের জন্য তুলে রেখেছিল। 

আজ তৃতীয় দিন। যুবকটি যথারীতি চায়ের দোকানের সামনে বসে চা পান করেছিল এবং চা শেষে রোজকার সিগারেট-বিক্রেতার কাছ থেকে একটা সিগারেটও কিনেছিল। চা পান এবং চা শেষে মেট্রোরেলের চত্বরের সীমানার ঠিক আগের এই সিগারেটওয়ালার কাছ থেকে সিগারেট কেনা পর্যন্ত বিস্ময়করভাবে একবারের জন্যও ভিখারিনীর কথা তার মনে আসেনি। অফিসে একই বিভাগের একজন সহকর্মীর সাথে তার অনেকদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছিল এবং আজ ব্যাপারটা আরো খারাপের দিকে গিয়েছে। যুবকটি চা-পানের অব্যবহিত আগে ও পরে অফিসের ওই ঝামেলা নিয়েই চিন্তিত ছিল এবং এই কারণেই ভিখারিনীটিকে নিয়ে ভাবার মতো কোনো অবকাশ পায়নি। ভাবনাটা এলো এবং মুহূর্তের মধ্যেই জাকিয়ে বসল যখন সিগারেট কেনা শেষ করে সামনে ইস্পাতের রেলিংটার লাগোয়া নিত্যকার দাঁড়ানোর জায়গাটার দিকে তাকাল। 

কাপড় পেতে বাচ্চাটিকে সামনে রেখে ভিখারিনী যথারীতে পা মেলে বসে আছে। তবে সিঁড়ি আর পেতে দেওয়া কাপড়টির দূরত্ব খানিকটা বেড়ে গেছে। ভিখারিনী একই অলস ভঙ্গীতে বসে আছে, তবে তাকে দেখে আলস্য একটুখানি নাড়া খেল বলে যুবকটির মনে হয়েছে। পরমুহূর্তেই পুরো ব্যাপারটিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যুবকটি তার রোজকার জায়গা থেকে একটু সরে দাঁড়ায়, সিগারেট ধরায় এবং প্রথম ধোঁয়াটা রিং-এর মতো বানিয়ে ওপরের দিকে ছুঁড়ে মারার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হওয়ার সাথে সাথেই আর চেষ্টা করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয় সে। দ্বিতীর টানটা দিয়েছে কি দেয়নি ভিখারিনীটি উঠে হেঁটে সামান্য ফাঁক রেখে এসে যুবকটির কাছাকাছি দাঁড়ায়। ডানদিক থেকে কুকুরটাও এসে দাঁড়িয়ে যুবকের বিলাসিতা, ভাবনা আর স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গাটিকে একেবারেই সংকুচিত করে দেয়। প্রবল অস্বস্তি নিয়ে যুবকটি আরেকটা টান দেয়, ভিখারিনী কোনোরূপ সংকোচ ছাড়াই যুবকের সিগারেট-টানা, ধোঁয়ার লয় দেখে- দু’বার যুবকের দিকে চোখও ফেলে। যুবকের অস্বস্তির জায়গাটা কেমন একটা ক্রোধ এসে যেন দখল করে। ভিখারিনী কি আরেকটু কাছে ঘেঁষেছে? যুবকের মনে হয়, তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে না। ক্রোধটা চড়তেই থাকে। কিছু প্রশ্ন মনে খোঁচা দিতে শুরু করে- এ কি ভিক্ষা চাইবে? সাথে সাথেই খারিজ করে দেয়। মনে হয়, ভিক্ষা চাইবে না, উল্টো তার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিবে। যুবকটি একটু বিরক্তি বোধ করে, মনে মনে প্রশ্ন করে, ভিখারিনীটি সরছে না কেনো? অস্বস্তি নিয়ে আরেকটা টান দেয়, একটা জেদ চেপে বসে মনে। সে অনেকক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে, একটার পর একটা সিগারেট টানবে, ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় পুরো জায়গাটা ভরে দেবে। হঠাৎ ভিন্ন এক দিকে থেকে একটা চিন্তা উড়ে আসে। কোনো ভয়ঙ্কর মতলব নেই তো তাকে ঘিরে? সংবাদপত্র, টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউবে- যাদের নিগড়ে সে দৃঢ়ভাবে বাঁধা- তাদের সব জায়গায় যেসব কাহিনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে- সেরকম কিছু নয়তো? একটা অজানা শঙ্কা যুবকটির সমগ্র অস্তিত্বকে ঘিরে ধরে। বাতাসটা কেমন ভারী, চাপা আর ঠেসে-ধরা বলে মনে হয় তার কাছে। মুক্তভাবে শ্বাস নিতেই হোক আর অজানা শঙ্কাটা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলার জন্যই হোক সে তার অর্ধসমাপ্ত সিগারেটটা সজোরে রাস্তায় নিক্ষেপ করে। তারপর খানিকটা ত্রস্ত ও দ্রুত পায়ে চত্বরটা ছেড়ে চলন্ত সিঁড়ির গোড়ায় এসে দাঁড়ায়, সামনে পা বাড়ায়। পেছনে না তাকিয়েও যুবকটি বুঝতে পারে ভিখারিনীটি তার দিকেই চেয়ে আছে।

যুবকটির ধারণা ঠিক ছিল। ভিখারিনীটি ঠিকই যুবকটির গমনপথের দিকে চেয়েছিল- অনেকক্ষণ- যতক্ষণ না শহরের সব প্রান্ত থেকে একই পথের পথিকেরা এসে একে একে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে যুবকটিকে আড়াল করে ফেলেছিল। সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যাওয়ার পর মহিলার দৃষ্টি ফিরে এসে বাচ্চাটির ওপর নিবদ্ধ হয়- ঘুমন্ত, নিশ্চিন্ত মুখটির অবলোকন শেষ করে ফাঁকা চত্বরটিতে বেশ সাবলীলভাবে ধীর পায়ে হাঁটা শুরু করে। কুকুরটিও পেছন পেছন লেগে থাকে। মহিলা তার ঘূর্ণির শেষ প্রান্তটিতে সিগারেটওয়ালার কাছাকাছি এসে গতি কমিয়ে ফেলে, দেখে যে, সিগারেটওয়ালা বাক্সের আকারের দোকানটার ওপরের তাক থেকে একটা প্যাকেটে মোড়া বাটারবন নিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। মহিলা প্যাকেটটা হাতে নিয়ে সিগারেট-বিক্রেতাকে পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষভাবে নিরীক্ষণ করতে উদ্যত হলে বিক্রেতা দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেয়, বলে, ‘যাহ্‌! পয়সা লাগব না!’ মহিলার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়, ‘কছ কি তুই! পয়সা লাগব না!’

সিগারেট-বিক্রেতা কিছু বলে না, মহিলার দিকে তাকায়ও না। মহিলা বলে ওঠে, ‘বাব্বা!’ তারপর হো হো করে হেসে ওঠে।

হাসির শব্দ বাতাসে ভাসমান ধূলিকনা, ধূলিকনাকে আশ্রয় করে ভাসতে থাকা হেমন্তের শুরুর কালের হাল্কা কুয়াশাকণার সাথে একেবারে লেপ্টে, মিশে যেতে থাকে। মিশে যাওয়ার পর হাসি, ধূলি ও কুয়াশা সবাই মিলে বাতাসে ভেসে বেড়ায়- অনেকক্ষণ।

…………………………*…………………………

৩১.১২.২৫

Comments

    Please login to post comment. Login