Posts

ভ্রমণ

জিঞ্জিরা প্রাসাদে ইতিহাসের খোঁজে একদিন

January 7, 2026

রবিউন নাহার তমা

29
View

কড়া রোদ আর গরমের দিন।উদ্দেশ্য কেরানীগঞ্জ যাব ঢাকাকে জানতে।প্রথমে ‘ক্যাফে চারুলতা’য় যাব। কেরানীগঞ্জের এই জায়গাটার বেশ সুনাম। দেখতে নাকি সুন্দর।হঠাৎ করেই এক সকালে বেরিয়ে পড়লাম। সূর্যের আলোর জ্বলন্ত ভিটামিন ডি গায়ে লাগিয়ে মিরপুর থেকে যখন ক্যাফেতে পৌঁছালাম,তখন বেলা ১টা বেজে ২৫ মিনিট। লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে।খাবার অর্ডার দিয়ে ক্যাফের পুরোটা ঘুরে যা বুঝলাম,তা হলো হুটহাট ট্রাভেলার কিংবা খানিকটা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষদের জন্য জায়গাটা মানানসই না।এখানে বরং বিকেলে পরিবার–পরিজন কিংবা প্রিয়জন নিয়ে বেড়াতে আসা যায়।সে হিসেবে খুবই ভালো।

খাওয়ার ফাঁকেই হিসাব কষে দেখলাম,আমাদের আরও দুটি জায়গায় ঘোরার কথা, কিন্তু সময়ে কুলাবে না।সেইমতো পরবর্তী গন্তব্য জিঞ্জিরা প্রাসাদ।

কেরানীগঞ্জ থেকে রিজার্ভ অটোতে জিঞ্জিরা প্রাসাদে যেতে ৩০ মিনিটের মতো সময় লাগবে। ভাড়া পড়বে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। সোয়ারীঘাট হয়ে গেলে ১০ টাকা ট্রলারভাড়ায় বুড়িগঙ্গার ওপারে জিঞ্জিরা ঘাট।সেখান থেকে হাঁটাপথেই পাওয়া যাবে জিঞ্জিরা প্রাসাদ।

অটোতে যাওয়ার পথে বিশাল বিশাল গরু চোখে পড়ল।কোরবানি ঈদের হাট বলে কথা!এসব গরুর মধ্যে কয়েকটা গরু এত বিরাট যে বাচ্চা হাতি বললেও ভুল হবে না!কাছাকাছি আসার পর অটোওয়ালা ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে বললেন গাড়ি আর যাবে না।এখান থেকে দুই মিনিট হাঁটলেই জিঞ্জিরা প্রাসাদ।সঙ্গী এখন গুগল ম্যাপ!

দুই মিনিটের জায়গায় পাঁচ মিনিট হাঁটার পর গুগল যেখানে ফিনিশড দেখাল,সেখানে প্রাসাদের চিহ্নমাত্র নেই।আছে একটা বাকরখানির দোকান! আশপাশে জরাজীর্ণ ভবন ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না।হতাশ হলাম।অপরিচিত এলাকা, সুনসান পরিবেশ।ভাবলাম ফিরে যাই।এরপরেই ভাবলাম এসেই যখন পড়েছি,দেখি না কী হয়! গলিগুপচি পেরিয়ে আড্ডারত একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই জিঞ্জিরা প্রাসাদটা কোথায়?’

হাসলেন তিনি।মানুষ কী যে পাইছে এখানে!

অবাক হলাম তাঁর কথায়।সামনে এসে আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলাম।তাঁর উত্তর- আবার সেই জিঞ্জিরা প্রাসাদ! 

পরে বাসায় ফিরে জেনেছিলাম একজন ইউটিউবার জিঞ্জিরা প্রাসাদ নিয়ে প্রতিবেদন করার পর অনেকেই এই প্রাসাদ দেখতে এসেছিলেন।

আরও দু-একজনকে জিজ্ঞেস করার পর যখন আশানুরূপ উত্তর পেলাম না,তখন ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এল সোহান নামের ১২-১৩ বছরের এক কিশোর।গলিগুপচি, মানুষের বাড়ির উঠান আর জানালার পাশ হয়ে অবশেষে একটা বাড়ির কাছে এলাম।এল প্যাটার্নের বাড়িটার পূর্ব পাশে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দোতলা সমান একটা ভবন।এটাই জিঞ্জিরা প্রাসাদ।হতবাক হলাম। ‘সংরক্ষিত’ (যদিও সংরক্ষণটা কোন দিক দিয়ে হচ্ছে, তা বুঝলাম না) লেখা সরকারি সাইনবোর্ড দেখে নিশ্চিত হলাম,এটাই জিঞ্জিরা প্রাসাদ। ভেতরে ঢুকলাম।প্রাসাদের দেয়ালগুলো দেখে থমকে উঠলাম।দেয়ালের ক্ষয়ে পড়া পলেস্তারাগুলো যেন কয়েক'শ বছর আগে নিয়ে গেল।সেখানে আছে রাজরাজড়া, সৈন্যসামন্ত, হাতিঘোড়া,মানুষের হাসিকান্না আরও কত কী।

আমাদের গাইড কিশোর ছেলেটি জানাল প্রাসাদের আরেকটা অংশ আছে।ওর পিছু পিছু গেলাম সেখানে।একটা বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই রুক্ষ আওয়াজ ভেসে উঠল।যেন আমরা বাড়ির দলিল দেখতে এসেছি।ওই বাড়ির গোসলখানার পাশের সিঁড়ি বেয়ে উঁচু একতলা ভবনের ছাদের উঠলাম।ল্যান্টানাগাছের ঝোপঝাড় একপাশে, আরেক পাশে সংরক্ষিত লেখা সরকারি সাইনবোর্ডের বাঁশে কয়েকটা ছাগল দড়ি দিয়ে বাঁধা।আশপাশে গাঁ ঘেঁষে বানানো হয়েছে দালানকোঠা।শুধু ‘সংরক্ষিত’ সাইনবোর্ড আছে বিধায় যেন জিঞ্জিরা প্রাসাদের শেষ চিহ্নটুকু অবশিষ্ট আছে।দখলদারির মাত্রা আর রাজনৈতিক প্রভাব কী পরিমাণ, তা টের পেলাম।

অথচ এই জিঞ্জিরা প্রাসাদ আমাদের অতীত ইতিহাসের সাক্ষী। সে এক কলঙ্কিত ইতিহাস...

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদদৌলার পরাজয়ের পর মির জাফরের পুত্র মির সাদেক আলী ওরফে মিরন-এর নির্দেশে ঢাকার এই জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয় নবাবের নানি শরফুন্নেছা, স্ত্রী লুৎফুন্নেছা ও তাঁর শিশুকন্যা কুদসিয়া বেগম ওরফে জোহরা বেগমকে। বন্দী করা হয় নবাবের মা আমেনা বেগমকেও। শুধু তা–ই নয়, ষড়যন্ত্রকারীরা ঘসেটি বেগমকে ব্যবহার করলেও সিরাজের পতনের পর তাঁকেও বন্দী করা হয়।

কিছুদিন বন্দী রাখার পর মিরনের নির্দেশে ঘসেটি বেগম ও আমেনা বেগমকে বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়।তবে লর্ড ক্লাইভের হস্তক্ষেপে রক্ষা পান নবাবের নানি আলীবর্দি খানের স্ত্রী শরফুন্নেছা, মা আমেনা বেগম এবং কন্যা কুদসিয়া বেগম।পরে তাঁদের মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারের সামান্য বৃত্তির ওপর নির্ভর করে তাঁদের জীবন যাপন করতে হয়।

বাংলার ইতিহাসের আরও অনেক বেদনাবিধুর ঘটনার সাক্ষী এই জিঞ্জিরা প্রাসাদ। নবাব সরফরাজ খান ১৭৪০ সালে আলীবর্দি খানের নিকট গিরিয়ার যুদ্ধের পরে মা, বোন, স্ত্রীসহ আরও কয়েকজন নারীকে এ প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয়।ইতিহাসবিদ নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তি ঢাকা’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়,নবাব সিরাজ উদদৌলার পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ আট বছর এ প্রাসাদে বন্দী রাখা ছাড়াও মোগল শাসকদের অনেককেও এখানে বন্দী রাখা হয়।

জিঞ্জিরা প্রাসাদ কিন্তু আসলে কোনো বন্দিশালা ছিল না।বরং প্রথমে প্রমোদকেন্দ্র হিসেবে নির্মিত হয়েছিল এটি।এখানে বাস করতেন মোগল সুবেদার মুর্শিদকুলি খান।প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ জেমস টেইলর তাঁর ‘Topography of Dhaka’ গ্রন্থে ইব্রাহিম খাঁকে জিঞ্জিরা প্রাসাদের নির্মাতা হিসেবে উল্লেখ করেন।তাঁর মতে, ১৬৮৯-১৬৯৭ সালে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর জিঞ্জিরা দ্বীপে ‘নওঘরা’ নির্মাণ করেন তৎকালীন সুবেদার নওয়াব ইব্রাহীম খাঁ ওরফে দ্বিতীয় ইব্রাহিম।তাঁর ভালো নাম ছিল ইব্রাহিম খান ফতেহ জং।তিনি ছিলেন সুবহে বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা) একজন প্রখ্যাত শাসক।উদারমনা এই শাসক ছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী নূরজাহানের ভাই।ইব্রাহিম খানের নির্মিত এই ‘নওঘরা’ কালের ব্যবধানে জিঞ্জিরা প্রাসাদ নামে পরিচিত হয়। মোগল আমলের আরেক নিদর্শন ছোট কাটরার আদলে নির্মিত হয় এটি। একসময় জিঞ্জিরার বিশাল এলাকাজুড়ে ছিল এই প্রাসাদের অস্তিত্ব।এখন দুটি দালান বাদে পুরো জায়গাতেই  মানববসতি।

২০১৮ সালে সরকার এই প্রাসাদ সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও বর্তমানে তা শুধু সংরক্ষিত লেখা সাইনবোর্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আঠারো শতকের বিষাদময় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এ প্রাসাদ আজ অবহেলা আর দখলদারদের দৌরাত্ম্যে সব জৌলুশ হারিয়ে ধ্বংসস্তূপ।একসময় হয়তো শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়ে যাবে। আমাদের মতো গুগল ম্যাপ খুঁজলেও হয়তো আর পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অজানা থেকে যাবে এই অন্ধকার প্রাসাদের ইতিহাস।

Comments

    Please login to post comment. Login