Posts

উপন্যাস

অন্ধকারে আড়ালে: ফিরে আসা অতীত

January 7, 2026

Ms Karima

24
View

উপন্যাসের নাম: নীল খামের রহস্য (অপ্রকাশিত অতীত)

প্রথম পর্ব: অভিশপ্ত উত্তরাধিকার

পুরো ঢাকা শহর যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আরিয়ানের চোখে তখন একবিন্দু ঘুম নেই। ঘড়ির কাঁটা রাত দুইটা বেজে পনেরো মিনিট ছুঁইছুঁই করছে। তার স্টাডি রুমের টেবিল ল্যাম্পটা একটা ম্লান হলুদ আলো ছড়াচ্ছে, যা রুমের কোণার অন্ধকারগুলোকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। আরিয়ান একজন ফ্রিল্যান্স ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট। গত এক সপ্তাহ ধরে সে পুরনো ঢাকার একটা পরিত্যক্ত বাড়ি নিয়ে গবেষণা করছে, কিন্তু প্রতিবারই কোনো এক অদৃশ্য বাধার মুখে পড়ে তাকে থেমে যেতে হচ্ছে।

বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের কান্নার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ একটা খসখসে শব্দে আরিয়ানের চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। মনে হলো দরজার নিচ দিয়ে কেউ কিছু একটা ভেতরে ঠেলে দিয়েছে। আরিয়ান দ্রুত দরজার কাছে গিয়ে হ্যান্ডেল ঘুরালো। করিডোরে নীলচে আলো জ্বলছে, কিন্তু কোথাও কেউ নেই। সিঁড়ির শেষ মাথায় যেন একটা ছায়া মিলিয়ে গেল বলে মনে হলো তার।

মেঝেতে পড়ে আছে একটা গাঢ় নীল রঙের খাম। একদম রাজকীয় নীল, কিন্তু খামটা ধরতেই আরিয়ানের নাকে একটা ভ্যাপসা গন্ধ এল—ঠিক যেন অনেক বছর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা কোনো জিনিসের গন্ধ। খামের ওপর কোনো স্ট্যাম্প নেই, কোনো ঠিকানা নেই। শুধু লাল কালিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা— "থামো, নাহলে হারাবে।"

আরিয়ানের বুকটা ধক করে উঠল। এটা কি কোনো হুমকি? নাকি সতর্কতা?

সে ধীরপায়ে টেবিলের কাছে ফিরে এসে খামটা খুলল। ভেতরে কোনো চিঠি নেই। তার বদলে বেরিয়ে এল একটা ঝাপসা সাদা-কালো ছবি। ছবিতে জরাজীর্ণ এক বিশাল জমিদার বাড়ি দেখা যাচ্ছে, যার থামগুলোতে শ্যাওলা জমেছে। কিন্তু আরিয়ানের দৃষ্টি আটকে গেল বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছোট বাচ্চার দিকে। বাচ্চাটার মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার গলায় একটা অদ্ভুত লকেট ঝুলে আছে—অর্ধচন্দ্রাকৃতির একটি রূপালি লকেট, যার মাঝখানে একটা রক্তবর্ণ পাথর।

আরিয়ান তার ড্রয়ার খুলে ছোট একটা মখমলের বাক্স বের করল। সেখানে ঠিক একই রকম একটা লকেট পড়ে আছে। এটা তার বাবার শেষ স্মৃতি। তার বাবা মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন, "এই লকেটটা কোনোদিন হাতছাড়া করিস না আরিয়ান, এটা আমাদের অস্তিত্বের অংশ।" অথচ তার বাবা সবসময় বলতেন তারা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার, তাদের কোনো পৈত্রিক ভিটা বা জমিদারি নেই। তবে এই ছবিতে তার পরিবারের লকেটওয়ালা বাচ্চাটা কে? আর এই বাড়িটাই বা কোথায়?

ঠিক তখনই রুমের তাপমাত্রা যেন কয়েক ডিগ্রি কমে গেল। আরিয়ান অনুভব করল তার ঘাড়ের কাছে কেউ একজন তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। সে জানালার কাঁচের প্রতিবিম্বে দেখতে পেল—তার পেছনে একটা লম্বা কালো অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পেছনে ঘুরতেই দেখল সেখানে কেউ নেই। শুধু জানালাটা নিজে নিজেই খুলে গেছে এবং বাইরের হিমশীতল বাতাস পর্দাগুলোকে আছাড় মারছে।

হঠাৎ আরিয়ানের ফোনটা সাইলেন্ট মোডে থাকা সত্ত্বেও তীব্র শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আরিয়ানের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। কলার আইডিতে নাম উঠছে— "বাবা"

তার বাবা মারা গেছেন আজ থেকে তিন বছর আগে। যে ফোনটা এখন বাজছে, সেই সিম কার্ডটি আরিয়ান নিজেই ভেঙে ফেলেছিল বাবার দাফনের দিন। কাঁপাকাঁপা হাতে সে কলটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে কোনো মানুষের কণ্ঠ নয়, বরং পুরনো গ্রামোফোন রেকর্ড বাজার মতো একটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ এল। তারপর খুব নিচু স্বরে একটা নারীকণ্ঠ বলে উঠল—

"সে আসছে আরিয়ান... লকেটটা ফিরিয়ে দাও, নাহলে আজ রাত তোমার শেষ রাত।"

ফোনটা কেটে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের বাতিটা দপ করে নিভে গেল। অন্ধকারে আরিয়ান শুনতে পেল, তার খাটের নিচে কেউ একজন খুব ধীরে ধীরে নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে।

  • * পরের পর্বে যা থাকছে: আরিয়ান কি পারবে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সেই সত্তার হাত থেকে বাঁচতে? তার বাবার মৃত নম্বর থেকে কে ফোন করেছিল? আর ওই নীল খামের ছবিতে থাকা বাড়িটি আসলে কোথায়? রহস্য জানতে পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব!

Comments

    Please login to post comment. Login