শ্মশান বড় পবিত্র ও পুণ্যক্ষেত্র। এখানেই মানব অন্তিমশয্যায় শায়িত হয়ে পাপপূণ্য বিচারের দ্বারা পরলোকের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান।
বৈশাখের রৌদ্রজ্জ্বল দিন, সামিয়ানার নিচে বাঁশের মাছায় শুয়ে আছেন বড়কর্তা। শ্মশানবন্ধুগণ এদিকওদিক ইতস্ততবিক্ষিপ্ত, চোখেমুখে আতঙ্ক উদ্বেগের ছাপ। উত্তরমুখী করে কাঠের চিতা সাজানো হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। দীনবন্ধু ভট্টাচার্য অর্থাৎ বড়কর্তার বড়ছেলে সমর মুখাগ্নি আরম্ভ করবে, এমনসময় ঘটলো বিপত্তি, নড়েচড়ে উঠলো লাশটি।
দীনবন্ধুর চৈতন্য ফিরে পাওয়া সুযোগ লুফে নিলেন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা বিনয় বাবু। দীর্ঘদিন যাবত কন্যা শশীর জন্য সুপাত্রের সন্ধান করে যাচ্ছিলেন তিনি, কিন্তু পাত্র পাওয়া গেলেও জাতধর্ম বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়; তাই বিনয় বাবু এসুযোগ হাত করতে চাইলেন না। রূগ্ন মৃতপ্রায় দীনবন্ধুকে শাস্ত্রের অন্তর্জাল প্রয়োগ করে বলা হল, বিবাহযোগ্যা কুমারীকে উদ্ধার করা বড়ই পূণ্যের কাজ। অক্ষমতার নিদর্শনস্বরূপ জরাগ্রস্ত বিপত্নীক বৃদ্ধ কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু মুখফুটে একটা কথাও বের হল না।
শ্মশানবন্ধুগণের মধ্যে যারা প্রৌঢ় সকলে একত্রে বড়কর্তার ছেলেদের কাছে বিবাহের অনুমতি চাইলেন। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে দায়মুক্ত না করা অপেক্ষা গুরুতর পাপ আরকিছুতে নাই, ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। ছেলেদের অনুমতি নিয়ে মুহুর্তের মাঝেই যেন শ্মশানের পিনপতন নির্জনতা ভেঙে ঢাকঢোলসানাই ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের সুরেলা সম্মিলিত ধ্বনি আনন্দের বার্তা নিয়ে এল।
অল্পবয়স্কা যুবতী কুমারী, পরনে লাল বেনারসি, ধীরমন্থর পায়ে একা হেঁটে যাচ্ছে সামিয়ানার দিকে; বিনয় বাবু কন্যার পাশেপাশে হাঁটছেন। একইসঙ্গে চরম সুখ আর শোক শশীকে নিষ্প্রতিভ করে তুলেছে। সামিয়ানার নিচে পুরোহিত যজ্ঞের আয়োজন শেষে বিবাহকন্যার অপেক্ষায় বসে আছেন। দায়গ্রস্ত পিতাকে দায়মুক্ত করে বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল।
মৃত্যুপথযাত্রী প্রৌঢ় স্বামীকে সসম্ভ্রমে ভিজে গামছার একপ্রান্ত দিয়ে মুখ মুছে দিচ্ছে শশী। বিবাহ সুসম্পন্ন করে শ্মশানে যারা ছিলেন, সকলে দুপুরের খাওয়ার জন্য বাড়ি ফিরে গেছেন, ওইবেলা আবার আসবেন। শশীর মনে তিলমাত্র সংশয় নাই যে, ইহলোকে বিবাহপূর্বে পিতা এবং পরে স্বামীই পূজনীয় দেবতা। আর তাই দেবপূজায় এতটুক সুযোগ শশী হাতছাড়া করতে ইচ্ছা করেনা।
দীনবন্ধু নীরব চাহনিতে লক্ষ্য করছিলেন পতিব্রতা স্ত্রীর কার্যক্রম, আচমকা পরস্পরের চোখাচোখি হলে একইসাথে লজ্জা ও সুখানুভূতি খেলা করে যায় প্রৌঢ়ের মনে। কামনালালসার আধার পদ্মফুলের মতো উদ্ভাসিত স্ত্রীর যৌবনসুধা সম্ভোগ করে কামতৃপ্ত করে নিচ্ছিলেন দীনবন্ধু ভট্টাচার্য। একসময় তার নিশ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুতবেগে পড়তে থাকে; শশী উদ্বিগ্ন ভাবে ডানহাত দিয়ে স্বামীর প্রশস্তবক্ষে আদরলেপন করতে লাগল।
সূর্যদেব পশ্চিমাকাশে আপনরথে যতই এগিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট; রৌদ্রজ্বল দিনের সাদা মেঘেদের জায়গায় এখন নিকষকালো মেঘেরা স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। আসন্ন ঝড়ের বার্তা নিয়ে অন্ধকার চাদরের মাঝে পৃথিবীকে আড়াল করে ফেলেছে কালো মেঘেরদল। কালবৈশাখীঝড়ের প্রভাবে দীনবন্ধুদের শরীর এখন কুচকুচে কালো; শশীদের আত্মত্যাগের জন্যে শশীরা স্বকীয়, উজ্জ্বল।