
আমি যখন অভিনয়ের কথা ভাবি, তখন কিছু মুখ খুব স্বাভাবিকভাবেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই মুখগুলোর মধ্যে হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন একেবারে আলাদা একটি অধ্যায়। আমরা খুব সহজেই তাঁকে “অভিনয়ের বিশ্ববিদ্যালয়” বলে ফেলি, কিন্তু এই উপাধিটি আসলে খুব হালকা নয়। ফরীদি ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যাঁর অভিনয় আমাকে বারবার হাসিয়েছে, আবার ঠিক পরমুহূর্তেই অস্বস্তিতে ফেলেছে, ভয় দেখিয়েছে কিংবা নিঃশব্দে কাঁদিয়েছে।হুমায়ূন ফরীদিকে দেখলে আমার সব সময় মনে হতো-এই মানুষটা আর অভিনেতা নন, এই মানুষটাই চরিত্র। তিনি নিজের ব্যক্তিসত্তাকে এতটাই নিখুঁতভাবে সরিয়ে ফেলতে পারতেন যে চরিত্রটাই হয়ে উঠত তাঁর একমাত্র পরিচয়। বাংলাদেশে খুব কম অভিনেতাকেই দেখেছি যিনি পজিটিভ কিংবা নেগেটিভ—যে চরিত্রই পান না কেন, সেটাকে আপন করে নেন নিঃশর্তভাবে। ফরীদির অভিনয়ে কখনোই “অভিনয়ের চেষ্টা” চোখে পড়েনি; বরং মনে হতো, চরিত্রটাই ক্যামেরার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
ঠিক এই জায়গাতেই আমার মনে পড়ে বলিউডের আরেকজন অভিনেতার কথা-ইরফান খান। আমার কাছে ইরফান খান কখনোই কেবল একজন তারকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন চরিত্রের সাধক। বড় বাজেট, নামী পরিচালক কিংবা তারকাখ্যাতির মোহে কাজ করে যাওয়া অভিনেতাদের দলে তাঁকে আমি কখনোই ফেলতে পারি না। ইরফান খানের কাছে বরাবরই প্রাধান্য পেয়েছে চরিত্রের গভীরতা আর গল্পের মাধুর্য।আমি যখন মকবুল সিনেমায় “মিয়ান মকবুল”-কে দেখি, তখন তাকে অভিনেতা বলে মনে হয় না-মনে হয় সে সত্যিই এই অন্ধকার জগতের একজন মানুষ। পান সিং তোমার-এ তাঁর শরীরী ভাষা, ক্লান্ত চোখ, নিঃশ্বাসের ভেতরের ক্ষোভ—সবকিছু মিলিয়ে তিনি যেন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন চরিত্রের কাছে। আবার হাসিল-এর “রনবিজয় সিং”-এ ইরফান খান একেবারেই ভিন্ন-চতুর, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, রাজনৈতিক বাস্তবতায় গড়ে ওঠা এক মানুষ।
ইরফান খানের অভিনয়ে আমি সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা অনুভব করি, সেটা হলো সংযম। কখনো তিনি অভিনয় করতেন গোটা শরীর দিয়ে—হাঁটা, বসা, তাকানোর ভঙ্গিতে; আবার কখনো শুধুমাত্র চোখের ভেতর দিয়ে গল্প বলে দিতেন। সংলাপ কম, অথচ অনুভবের গভীরতা অসীম।হিন্দি থেকে শুরু করে ইংরেজি, মারাঠি এবং বাংলা-ক্যারিয়ারে বিভিন্ন ভাষার ভিন্ন ধরনের সিনেমায় নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি।ইরফান খান তারকা হওয়ার চেয়ে চরিত্রের ভেতর হারিয়ে যাওয়াকেই বড় করে দেখতেন।যিনি অভিনয়কে বাস্তব জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িয়ে ফেলছেন। যাকে বলা হয় সিনেমা জগতের নক্ষত্র।হুমায়ূন ফরীদি আর ইরফান খান—এই দু’জনকে আলাদা আলাদা ইন্ডাস্ট্রির অভিনেতা বললে হয়তো ভুল বলা হবে। আমার কাছে তাঁরা একই দর্শনের মানুষ। দু’জনেই বিশ্বাস করতেন, অভিনেতার আসল কাজ হলো নিজেকে নয়, চরিত্রকে সামনে আনা। তাঁরা দু’জনই আমাকে শিখিয়েছেন—ভালো অভিনয় মানে বড় হয়ে ওঠা নয়, বরং নিজেকে ছোট করে চরিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়া।একজন দর্শক হিসেবে, একজন গণমাধ্যমের ছাত্র হিসেবে এবং একজন সিনেমাপ্রেমী মানুষ হিসেবে আমি আজও এই দুই অভিনেতার কাজ দেখলে থমকে যাই। মনে হয়, অভিনয় আসলে একটি শিল্প নয়—এটি এক ধরনের আত্মত্যাগ। আর সেই আত্মত্যাগের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ ছিলেন হুমায়ূন ফরীদি ও ইরফান খান।
জীবনানন্দ দাশের মতো করে বলতে হয়, ‘নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’।এই পঙক্তি যেন সাহেবজাদে ইরফান আলী খানের জীবনকেই ছুঁয়ে যায়। ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি, নিজের জন্মদিনে কি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সময় খুব বেশি নেই? হয়তো বুঝেছিলেন। প্রথমবার যখন ক্যান্সার বিনা আমন্ত্রণে তাঁর শরীর দখল করে নিয়েছিল, তখন থেকেই হয়তো অমোঘ যাত্রার সত্যটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে।২০২০ সালের ২৯ শে এপ্রিল যদি অভিনয় জগতের নক্ষত্রতূল্য এই কিংবদন্তি অভিনেতাকে জীবন থেকে বিদায় বলতে না হতো, তাহলে বিশ্ববাসী পেতো আরও বৈচিত্র্যময় চরিত্র। তবে সেই নক্ষত্রের পতন হলেও জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো তাঁর জন্য মানুষের প্রেম মুছে যায়নি, যাবে না কখনোই।৭ জানুয়ারি ছিলো সেই শক্তিশালী অভিনেতা ইরফান খানের জন্মদিন। ১৯৬৭ সালের ৭ জানুয়ারি রাজস্থানের এক মুসলিম পাঠান পরিবারে জন্ম তার।বেঁচে থাকলে আজ ৫৯তম জন্মদিন পালন করতেন এ কিংবদন্তি অভিনেতা।
কিন্তু আমি এখন যে কাজটি করতে যাচ্ছি চরিত্রকেই আপন করে নিয়ে নিজের সন্তানের মতো লালন করা ইরফান খানের জন্মদিনকে ঘিরে আমি কিছু ভিন্নধর্মী মতবাক্য তুলে ধরবো। ইরফান খান যে বড়মাপের অভিনেতা, তা দু একটি লাইন; দু একটি শব্দ দিয়ে শেষ করার মতো নয় কিংবা যদি করতেও যায় তা হয়তো কোনো না কোনো অংশে কম হয়ে যায়। তাই দীর্ঘ সময় নিয়ে তার সম্বন্ধে নিজের ভিন্নধর্মী মতবাক্য তুলে ধরার সৎসাহস করেছি। জানিয়ে রাখি, এই দৃষ্টিকোণটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে পড়ার আগ্রহ নাও থাকতে পারে অনেকেরই। তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
ইরফান ও চরিত্র:
বলিপাড়ায় ইরফানের আগমন হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন অফট্র্যাক সিনেমা দেখাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। জেনেশুনেই তিনি সেই কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন। স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘যেদিন থেকে স্রোতে গা ভাসাব, সেদিন থেকেই আমার অভিনেতা সত্তার মৃত্যু হবে।’ সেই মৃত্যু তিনি হতে দেননি-জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
ইরফান খান সম্পর্কে কিছু লেখার গণ্ডগোল এই যে, ইরফানের জন্মদিনে আসলে ওঁর মৃত্যুর কথাই মনে পড়ে। আমাদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি আছে, যে যখন থাকে তখন তাকে শ্রদ্ধা-সম্মান করি বটে, উচ্চাসনে বসাই, কিন্তু সে চলে গেলে কতখানি অন্যরকম হয়ে যায় চারপাশটা, সেটা একমাত্র কেউ চলে গেলেই বুঝি। কে চলে গেলে কী হবে, এই কষ্টকল্পনা আমরা করতেও চাই না, এবং আমাদের পক্ষে করা সম্ভবও হয় না।এপ্রিল মাসে, প্যান্ডেমিকের মধ্যে, সকালে ঘুম থেকে উঠে বসে প্রথম খবর পেয়েছিলাম ইরফান খান আর নেই। ইরফান চলে গেছিলেন অদ্ভুত এক যুগ-সন্ধিক্ষণে। প্রথমত, তিনি এমন একটা সময়ে চলে গেছিলেন, যখন গোটা পৃথিবী একটা অদ্ভুত সময় কাটাচ্ছে। মানুষ মূলত নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। সেই সময়টাকে বলা যেতে পারে একুশ শতকের সবচেয়ে বড় সংকট। কিন্তু অতিমারী যখন চলে গেল, তখনও দেখা গেল মানুষ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। ইরফান চলে যাওয়ার পরে আমাদের কাছে এক যুগ-সন্ধিক্ষণ স্পষ্ট হল। একরকম করে একটা সমাপ্তি ঘটল বিনোদনে আধুনিক অভিনেতাদের যুগের।
উত্তর-অতিমারী কালে আমরা আবার দেখতে পেলাম যে, স্টারেরা ফিরে আসছে। ফিরে আসছে হাইস্পিড শট, ফিরে আসছে সোয়্যাগ, ফিরে আসছে ধুন্ধুমার অ্যাকশন, ফিরে আসছে গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ, ফিরে আসছে প্রেজেন্স, ফিরে আসছে শরীর। ইরফানদের মাধ্যমে, এখানে ইরফানের একার কথা বলা ঠিক হবে না, মনোজ বাজপেয়ী-জাকির হুসেন এবং তৎপরবর্তীকালে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী, পঙ্কজ ত্রিপাঠী, রাজকুমার রাও থেকে নতুন সময়ের অভিনেতা আদর্শ গৌরব— সবাই কীরকম যেন একটু ব্যাকফুটে চলে গেলেন। কারণ বিনোদন, স্নায়ু থেকে আবার যেন শরীরে ফিরে গেল। মস্তিষ্ক থেকে, হৃদয় থেকে, আবার যেন এইট প্যাকে ফিরে গেল। চিতল পেট, ভাল বাইসেপ, উঁচু কাঁধ এবং দাড়ির নীচে একটু হাত বুলিয়ে পৃথিবীকে হুংকার দেওয়া যে আমিই শ্রেষ্ঠ- দেশের বিনোদন ব্যবস্থাটাও ফিকে হয়ে গেল।
বহুদিন আগে মানুষের মনে যে আঙুল রাখা শুরু করেছিলেন অভিনেতারা, যাঁদেরকে আমারা অল্টারনেটিভ অভিনেতা বলি, আপামর মানুষেরা যাঁদেরকে আর্ট ফিল্মের সূত্র ধরে চিনেছে, নাসিরুদ্দিন শাহ, ওম পুরী- তাঁরা ফুরিয়ে গেলেন। তবে এও ঠিক, সিনেমার জগৎ এত বৃহৎ, এত বৈচিত্রময় ছিল, সেখান থেকে মোগ্যাম্বো ছাড়াও আমরা অসাধারণ-অদ্ভুত কিছু রোলে অমরিশ পুরীকে পেয়েছি। এমনকি সিনেমার মধ্যেই আমরা শশী কাপুরকে পেয়ে গেছিলাম গিরিশ কারনাডের ‘উৎসব’ ছবিতে, সম্পূর্ণ অন্যরকম এক রোলে। আরেক ভার্সেটাইল অভিনেতার জন্ম হয়েছিলো বড়পর্দাতে ১৯৮৪ সালে। ‘সারাংশ’ ছবিতেই অনুপম খের নামক এক অভিনেতার বিস্ফোরণ ঘটে। এইসব জাঁদরেল অভিনেতাদের নিখুঁতভাবে পর্দায় তুলে ধরতে মুনশিয়ানা দেখিয়েছিলেন শ্যাম বেনেগাল, গোবিন্দ নিহালনি; এঁরা নানারকম ছবির মাধ্যমে এই সমস্ত অভিনেতাদের তুলে ধরেন, এবং এই অভিনেতারা ইরফানের মতোই বিভিন্ন কমার্শিয়াল ছবিতে সফলতার সঙ্গে অভিনয় করলেও, আসলে কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে এঁরা উচ্চমানের অভিনেতা হয়ে থাকেন বেশ কিছু দুরন্ত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। যে-চলচ্চিত্রের মূল উদ্দেশ্যই ছিল প্রশ্ন করা, একটা আলোচনাকে তুলে আনা, এবং মানুষের মনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরে গিয়ে স্পর্শ করা।
সব দেশের সব অভিনেতা এটা পারেন না। সমস্ত প্রজন্ম পেরিয়ে এসে যাঁরা পেরেছেন, ইরফান তাঁদের মধ্যে অন্যতম। অগ্রগণ্য বলা চলে। এই মুহূর্তে যে-সমস্ত অভিনেতা জীবিত, তাঁরা প্রত্যেকেই এ-কথা স্বীকার করেন।ইরফান যে অভিনয় করেছেন, কিংবা ধরা যাক তাঁর পূর্বসূরি বা উত্তরসূরিরা-আমরা সবাই যে-জলের স্পর্শ পেতে চাইছিলাম এবং আমাদের দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইছিলাম, সেই মন এবং মাথা আমাদের থেকে প্রায় নিঃশেষিত হয়ে আসছে। আমি জানি রবি ঠাকুর বলেছেন, ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’, সেটা অনন্তকালের মানুষকে নিয়ে বলেছেন; কিন্তু আমাদের ‘দেহ পট সনে নট সকলই হারায়’। আমরা আমাদের সময়কালের মধ্যেই বাঁচি। আমাদের যা শিল্প, যা সৃষ্টি, সব আমাদের সময়ের মধ্যেই করে যেতে হয়।
ইরফান ও চলচ্চিত্র:
পুরো নাম, সাহেবজাদে ইরফান আলি খান। ছোটবেলায় দারুণ ক্রিকেট খেলতেন তিনি। তবে জাতীয় দল যখন প্রায় হাতছানি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘটে অন্য এক ঘটনা। ১৯৮৪ সালে যখন তিনি মাস্টার্সের ছাত্র, তখনই ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা, দিল্লিতে শিক্ষাবৃত্তি পান। সেখানে পড়াশুনা শেষে মুম্বাইয়ে এসে অভিনয় জীবন শুরু করেন ইরফান।ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে পাস করার পর ইরফান খান মুম্বাইয়ে চলে এলেন। এখানে এসে তিনি টেলিভিশন সিরিয়াল দিয়ে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করলেন, যদিও প্রথমদিকে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তিনি প্রথমদিকে টিউশনি করিয়ে এবং মানুষের বাসায় এসি ঠিক করে দিতেন। মুম্বাইয়ে আসার পর তিনি একে একে অভিনয় করলেন চাণৌক্য, ভারাত এক খোঁজ, সারা জাহা হামারা, বানেগী আপনে বাত, চন্দ্রকান্ত, শ্রীকান্ত, আনুগুঞ্জ, স্টার বেস্টসেলারস ও স্পার্স নামক টিভি সিরিয়ালে। এর অনেকগুলোই ছিল দূরদর্শন এবং স্টার প্লাসের মত বড় বড় টিভির সিরিয়াল। স্টারপ্লাসের ‘ডার’ নামক এক সিরিজের প্রধান ভিলেন ছিলেন ইরফান। এতে তিনি কে কে মেননের বিপরীতে এক সাইকো সিরিয়াল কিলারের ভূমিকায় অভিনয় করেন। এভাবে তিনি থিয়েটার আর টিভি সিরিয়ালের মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছিলেন।১৯৮৮ সালে এসে তার ক্যারিয়ার নতুন দিকে মোড় নেয়া শুরু করে। ডিরেক্টর মিরা নায়ের তাকে তার সিনেমা সালাম বোম্বেতে একটি অতিথি চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল তার চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত ফিল্মের এডিটিংয়ে বাদ চলে যায়। সালাম বোম্বে সিনেমাটি পরে ইন্ডিয়া থেকে অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। সিনেমাটি ইন্ডিয়ার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও জিতেছিল। তবে সিনেমার এডিটিংয়ে তার চরিত্র বাদ পড়লেও ইরফান খান থেমে থাকলেন না।১৯৯০-২০০০ এর মাঝে এমন কিছু সিনেমা তিনি আমাদের উপহার দিলেন যা সমালোচকদের মতে বেশ ভালোভাবেই উতরে গিয়েছিল। এর মাঝে ছিল এক ডক্টর কি মউত এবং সাচ আ লং জার্নি সিনেমা দুটি। এছাড়াও আরো কিছু সিনেমায় তিনি এ সময় অভিনয় করেন যা বক্স অফিসে একদমই মুখ থুবরে পড়েছিল।
ইরফান খান তার অভিনয় দক্ষতা দিয়ে ভিন্নধর্মী সিনেমা করার চেষ্টা করতে থাকলেও তার ঝুড়িতে একের পর এক ফ্লপ সিনেমা সংযুক্ত হতে থাকল। কিন্তু হঠাৎই দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়ে যায়। ব্রিটিশ ফিল্ম ডিরেক্টর আসিফ কাপাডিয়া তাকে তার “দ্য ওয়ারিয়র” সিনেমার জন্য প্রধান চরিত্রে মনোনীত করলেন। আসিফ কাপাডিয়া সে সময় ছিলেন কান ফিল্ম ফেস্টিভালে পুরস্কার পাওয়া পরিচালক।সিনেমাটির পুরো শ্যুটিং হয়েছিল ভারতের হিমাচল প্রদেশ ও রাজস্থানে।সিনেমাটি বানাতে ১১ সপ্তাহ সময় লেগেছিল। ২০০১ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে দ্য ওয়ারিয়র মুক্তি পায়। পরবর্তীতে তিনি বাফটা অ্যাওয়ার্ড, অস্কার বা একাডেমী অ্যাওয়ার্ড, এমনকি গ্র্যামী অ্যাওয়ার্ডও জয় করেন। অস্কারের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে যে সিনেমাটি পাঠানো হবে, তার সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও এই সিনেমাটি জায়গা পেয়েছিল। এরপরই ইরফান রাতারাতি এক পরিচিত মুখ হয়ে যান।
২০০৪ এ খান রোড টু লাদাখ নামে একটি শর্টফিল্মে অভিনয় করেন তিনি। এই শর্টফিল্মটি আন্তর্জাতিকভাবে বেশ প্রশংসিত হয়। এর ফলে এই শর্টফিল্ম থেকেই পরিচালক একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণ করেন, যাতে ইরফান খান প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। একই বছরে তিনি মকবুল নামে আরেকটি সিনেমায় অভিনয় করেন। এটি ছিল শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথের অ্যাডাপ্টেশান। এতে তিনি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এই সিনেমাটিও সমালোচকদের কাছে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।সিনেমাটিতে তাকে এন্টি হিরো চরিত্রে দেখা যায়। সিনেমাটিতে তাঁর অনবদ্য অভিনয়ের জন্য দারুণ প্রশংসিত হন তিনি। যা পরবর্তীতে তাকে হিন্দি সিনেমায় শক্ত ভিত গড়ে দেয়। তাছাড়াও ২০০৪ সালে বলিউডের হাসিল নামের আরেকটি সিনেমায় তিনি ভিলেনের চরিত্রে অবতীর্ণ হলেন। সিনেমাটিতে তার অভিনয় সমালোচকদের বিস্ময়ে স্তব্ধ করে দেয়। এই সিনেমার জন্য ইরফান ফিল্মফেয়ার সেরা ভিলেনের পুরস্কার জিতে নেন।
সমালোচকদের পছন্দের সিনেমা বা আর্ট ফিল্মের বাইরে সত্যিকার অর্থেই বলিউডের কোন মুভিতে প্রধান চরিত্রে ইরফান প্রথম অভিনয় করেন ২০০৫ সালে। সিনেমাটির নাম ছিল “রগ”। এই সিনেমায়ও ইরফানের অভিনয় সমালোচকদের মন জয় করে নেয়। এক সমালোচকের মতে, “সিনেমাটিতে ইরফানের চোখ তার শব্দের চেয়েও বেশি কথা বলেছে।”২০০৭ সালে ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’ দিয়ে বলিউডে নিজের আসন পাকাপোক্ত করে নেন তিনি। একইসঙ্গে সিনেমাটির জন্য তিনি পেয়ে যান সেরা পার্শ্ব চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার, আইফা এবং স্টার স্ক্রিন পুরষ্কার জিতে নেন।২০০৮ সালে ইরফান খান স্লামডগ মিলিয়নিয়ারে এক পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অভিনয় করেন। সিনেমাটি বেস্ট পিকচার, বেস্ট ডিরেক্টরসহ ৮টি ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতে নেয়। এছাড়া ৭টি বাফটা অ্যাওয়ার্ড ও ৪টি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডও আছে এই সিনেমার ঝুড়িতে। এই সিনেমার জন্য তিনি এবং সিনেমার অভিনেতারা স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং পারফর্মেন্স বাই আ কাস্ট ইন আ মোশান পিকচার অ্যাওয়ার্ড জয় করেন।স্লামডগ মিলিয়নিয়ারের অস্কারজয়ী পরিচালক ড্যানি বয়েল ইরফান খান সম্বন্ধে বলেছেন, “ইরফান একই অভিনয় বারবার একইরকম নিখুঁতভাবে করতে পারেন। এটা দেখতে পারা সত্যিই অসাধারণ।”
২০০৯ সালে ইরফান খান অ্যাসিড ফ্যাক্টরি নামে একটি সিনেমায় অভিনয় করেন। এটি অ্যাকশনধর্মী সিনেমা ছিল। তিনি সিনেমাটি করার পর বলেছিলেন ভবিষ্যতে আরো এরকম অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় অভিনয় করতে চান।২০০৮ এবং ২০০৯ সালে তাকে তার নামের কারণে ২ বার আমেরিকার এয়ারপোর্টে সন্ত্রাসী সন্দেহে আটক করা হয়েছিল।২০১১ সালে ইরফান খানকে ভারত সরকার তার অসাধারণ অভিনয়ের জন্য পদ্মশ্রী পদকে ভূষিত করে। পদ্মশ্রী ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।২০১২ সালে ইরফান খান বলিউডে পান সিং তোমার নামে আরেকটি সিনেমায় অভিনয় করেন। সিনেমাটি সমালোচকদের কাছ থেকে অসাধারণ প্রশংসা পায়। সিনেমাটিতে ভারতের ন্যাশনাল গেমে স্বর্ণপদক পাওয়া একজন সৈনিকের খেলোয়াড় থেকে ডাকাতে পরিণত হওয়ার সত্য কাহিনীর উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয়েছিল। সাড়ে চার কোটি রুপিতে নির্মিত এই সিনেমাটি বক্স অফিসে প্রায় ৩৯ কোটি রুপির ব্যবসা করে। এই সিনেমার জন্য ইরফান খান ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জেতেন যা বলিউড কাঁপানো তিন খানের কেউই কখনও জেতেননি। এ থেকে আমরা তার অভিনয়ের গভীরতা সম্বন্ধে ধারণা করতে পারি। ফিল্মফেয়ারে তিনি সমালোচকদের মতে সেরা অভিনেতার পুরস্কারটিও জিতে নেন।
ইরফান খানের সিনেমা ক্যারিয়ারে প্রশংসিত সিনেমার মধ্যে একটি হলো 'দ্যা লাঞ্চবক্স’। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে অভিনয় করতে দেখা যায় বলিউডের আরেক ভার্সেটাইল অভিনেতা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকিকে। সিনেমাটি মর্যাদাপূর্ণ টরোন্টো ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড জেতে। দর্শক ও সমালোচক সবাই সার্বজনীনভাবে তার অভিনয়ের প্রশংসা করেন। যে রেকর্ড নেই আর কোনো ভারতীয় সিনেমার। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় হলো এই খবর অনেকেরই অজানা।কর্মাশিয়াল সিনেমাতেও তিনি ছিলেন বড্ড পাকাপোক্ত।২০০৮ সালের কমেডি থ্রিলার সানডে সিনেমা হোক,২০১১ সালের রোমান্টিক কমেডি থ্যাংক ইউ সিনেমা হোক, ২০১৪ সালের গুন্ডে সিনেমা হোক কিংবা একই বছর দ্য এক্সপোজ ও হাইদার সিনেমাতেয় হোক সবকিছুতেই তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন এবং শক্তিশালী অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বুঝিয়েছেন শুধু সুঠাম দেহী অধিকারী কিংবা সিক্স প্যাক অ্যাবস থাকলেই যে অভিনয়ে পারদর্শী তা নয়, চরিত্রকেই লালন করে এগিয়ে যেতে হয়।২০১৫ সালে ইরফান খান অমিতাভ বচ্চন ও দীপিকা পাড়ুকোনের সাথে পিকু সিনেমায় প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন। ৩৮ কোটি রুপির বাজেটে নির্মিত সিনেমাটি বক্স অফিসে ১৪১ কোটি রুপির ব্যবসা করে। এভাবেই ইরফান খান শুধু তার অভিনয় দিয়ে সমালোচকদের মন জয় করেননি, বক্স অফিসেও ছোট ছোট সিনেমা দিয়ে রাজত্ব করতে শুরু করলেন।
২০১৫ সালে ইরফান খান জুরাসিক ওয়ার্ল্ড নামের হলিউডের সিনেমাটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। সিনেমাটি বক্স অফিসে বিশাল সাফল্য পায়। সেই বছরই ঐশ্বরিয়া রায়ের সাথে জাজবা নামের একটি সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন যা সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা কুড়াতে সমর্থ হয়।অনেকের ধারণা ইরফান খান শুধু বাংলা ভাষায় অভিনয় করেছিলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সাথে 'ডুব' সিনেমায় । কিন্তু তিনি এর আগেও বাংলা ভাষায় অভিনয় করেছিলেন তা হয়তো অনেকেরই অজানা। ২০০৪ সালে ইরফান প্রথম বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেন। জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা ফ্লোরিয়ান গ্যালেনবার্গারের ‘শ্যাডোজ অব টাইম’ এই সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন। কলকাতায় শুটিং হওয়া সিনেমাটিতে ইরফান ছাড়াও ছিলেন প্রশান্ত নারায়াণ, তন্নিষ্ঠা চ্যাটার্জি, তিলোত্তমা সোম।বাংলাদেশেও তাঁর অভিনয়ের ছোঁয়া লেগেছে। ‘ডুব’ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ইরফান তার বাংলা ভাষার সংলাপ দিয়ে তার বাংলা কন্ঠের প্রেমে পড়তে দর্শকদের বাধ্য করেছেন। আমাদের ফিল্মপাড়াও পেয়েছে তাঁর অভিনয় মুন্সিয়ানার সুবাস।

২০০৮ সালে ‘মার্ডার অ্যাট তিসরি মঞ্চিল ৩০২’ নামের একটি সিনেমায় অভিনয় করেন ইরফান। ছবিটির কাজ শেষ হয় পরের বছরই। কিন্তু দূর্ভাগ্য এখানেও বাগড়া দেয়। মুক্তি পেতে পেতে লেগে যায় এক দশকেরও বেশি। শেষ পর্যন্ত ইরফানের মৃত্যুর পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জি ফাইভে সিনেমাটি মুক্তি পায়।ইরফান রাত ৩টা পর্যন্ত জেগে থেকে অভিনয় চর্চা করেন এবং নিয়মিত তার সিনেমার স্ক্রিপ্ট পড়েন। ২০১২ সালে ইরফান খান তার নামের বানান “Irfan” থেকে পরিবর্তন করে “Irrfan” রাখেন। এ সম্বন্ধে তিনি বলেন তার নামের অতিরিক্ত “r” এর শব্দ তার ভালো লাগে।
অভিনয় ও চরিত্রের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ইরফান খান:
ইরফান খানের মৃত্যুর আগে মুক্তি পাওয়া শেষ ছবি ছিল ‘আংরেজি মিডিয়াম’। এক সাক্ষাৎকারে ছবিটির পোশাক শিল্পী স্মৃতি চৌহান শেয়ার করেছেন শ্যুটিং চলাকালীন ইরফানের শারীরিক অবস্থার হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা।স্মৃতি চৌহান বলেন, ‘আংরেজি মিডিয়াম’-এর শ্যুটিংয়ের সময় ইরফানের শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। তীব্র যন্ত্রণা নিয়েও তিনি নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ধীরে ধীরে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছিল, এমনকি চোখে পড়ার মতোভাবে ওজনও কমে যাচ্ছিল।তিনি আরও বলেন, অসুস্থতার কারণে অনেক সময় ইরফান শ্যুটিং সেটে আসতে পারতেন না। বেশ কয়েকবার শ্যুটিং বাতিল করতেও বাধ্য হন নির্মাতারা।স্মৃতির ভাষ্যে, ইরফান প্রায়ই আমাকে বলতেন ‘স্মৃতি, আমার খুব ঠান্ডা লাগে।’ তিনি লন্ডনের একটি ব্র্যান্ডের কথা বলেছিলেন শীতের কাপড়ের জন্য। পরে আমি সেখান থেকে তার জন্য উষ্ণ পোশাক এনে দিই।”ইরফানের শারীরিক অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে শ্যুটিং চলাকালীন তার পরিবারের সদস্যরা সবসময় তার পাশে থাকতেন। তীব্র কষ্টের মধ্যেও তিনি কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। বরং প্রতিটি দৃশ্যে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।স্মৃতি চৌহান বলেন, অভিনয়ই ছিল ইরফানের বেঁচে থাকার শক্তি। তিনি অভিনয়ের মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পেতেন।শেষ ছবি ‘আংরেজি মিডিয়াম’-এ তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় জীবনের দর্শন — ‘জীবন যখন হাতে লেবু ধরিয়ে দেয়, তা চেপে শরবত বানাও।’ কিন্তু দুরন্ত ইরফান ক্যান্সারকে চেপেই তো তিনি ফিরেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাই যেন তার জীবনের শেষ অধ্যায় হয়ে উঠল।
সিনেমা এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা মানুষকে জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটা উল্টোও ঘটতে পারে। কেমন সেটা? এই যেমন সিনেমা বাস্তব জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নেয়, অনেক সময় সিনেমার গল্প থেকেই আমরা অনুপ্রাণিত হই। কিন্তু কিছু মানুষের জীবনের গল্প এতই অসাধারণ যে তা বড় পর্দাকে করে তোলে অনন্য।এমনই এক জীবন ছিল পান সিং তোমারের। ভারতের সাতবারের জাতীয় স্টিপলচেজ চ্যাম্পিয়ন পান সিং তোমার ছিলেন সেনাবাহিনীর সুবেদার। ঘটনাচক্রে যিনি পরে হয়ে ওঠেন ভয়ংকর দস্যু। তাঁর জীবনের গল্পই ভারতের প্রয়াত অভিনেতা ইরফান খান ফুটিয়ে তুলেছিলেন অনন্যভাবে। এই ক্রীড়াবিদের নামেই সিনেমার নাম ‘পান সিং তোমার’ রাখা হয়। যে চরিত্র ইরফানকে এনে দিয়েছে একমাত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।চলুন পান সিং তোমারকে খুঁজে পাওয়ার গল্প জেনে আসি।
পরিচালক তিগমাংশু ধুলিয়া শেখর কাপুরের ‘ব্যান্ডিট কুইন’-এর জন্য গবেষণা করার সময় পান সিং তোমারের গল্প আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি এক প্রবন্ধে পান সিংয়ের সম্পর্কে পড়ে সিদ্ধান্ত নেন, এই গল্পকে চলচ্চিত্রে রূপ দেবেন। কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। কারণ, একজন সুবেদার হলেও পরবর্তী জীবনে পান সিং দস্যু হয়ে যাওয়ায় সরকারি দপ্তরে তাঁর কোনো নথিই ছিল না।শারীরিকভাবে বেশ কঠিন ছিল ‘পান সিং তোমার’ সিনেমার শুটিং। এ সময় ইরফান খান বারবার আঘাত পান। জাতীয় কোচ সৎপল সিংয়ের কাছে স্টিপলচেজের প্রশিক্ষণও নেন।সিনেমাটি নিয়ে বলতে গিয়ে ইরফান খান ফিল্ম কম্প্যানিয়নকে জানান, ‘শুটিং চলাকালে আমি এতবার আঘাত পেয়েছি, আপনি বিশ্বাস করবেন না। হঠাৎ হাঁটতে গিয়ে পিঠে টান, ক্রিকেট খেলতে গিয়ে টেনিস বল চোখে লেগে যায়, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়...সিনেমাটা যেন ভিন্নভাবে আমার পরীক্ষা নিচ্ছিল।’ ইরফানের মতে, এই কষ্ট আসলে পান সিংয়ের জীবনের প্রতিফলন। একটা মানুষ যিনি পরিশ্রম করে খ্যাতি পান কিন্তু স্বীকৃতি পান না, যতক্ষণ না তিনি বিদ্রোহের পথ বেছে নেন।ইরফান একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘পান সিংয়ের জীবনে ঠিক যেমনটা ঘটেছিল, তেমনটাই ঘটেছিল সিনেমাটির কপালে। তিনি জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁর নাম জানত না। সিনেমাটি বানানো থেকে শুরু করে মুক্তি পাওয়া পর্যন্তও একই ঘটনা ঘটে। সিনেমাটি বানানো শেষ হয়েছে, সবাই ভালো বলছে, কিন্তু মুক্তি পাচ্ছে না। এটা নিয়ে এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম যে ৮-৯ মাস পর কেউ ওই সিনেমার কথা তুললে বলতাম, আমি পান সিংকে ভুলে গেছি, ওর কথা বোলো না।’

ইরফান ও হলিউড:
হলিউডে অভিনয়ের সুযোগ মিস দিতে চায় এমন অভিনেতা খুব কমই পাওয়া যায়। হালের জনপ্রিয় অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, দীপিকা পাড়ুকোন সবারই যাওয়া হয়েছে হলিউডে। কিন্তু এইদিকে ব্যাতিক্রম ছিল এই গুণী অভিনেতা। ক্রিস্টোফার নোলান, যার সাথে অভিনয়ের জন্য মুখিয়ে থাকে সবাই। কিন্তু তার অফার করা সিনেমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ইরফান। নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’ সিনেমাটিতে একটি মাঝারি রোলের অফার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ সেই সময় ‘লাঞ্চ বক্স’ এবং ‘ডি ডে’ সিনেমায় অভিনয়ের কথা ছিল তাঁর। নিজের কথার হেরফের কখনো করেননি এই অভিনেতা।ক্রিস্টোফার নোলানের অফার ফিরিয়ে দিলেও এই না যে তিনি হলিউডে অভিনয় করেননি। মীরা নায়ারের পরিচালিত ‘দ্য নেশমেক’ সিনেমার মধ্যে দিয়ে হলিউডে পা রাখেন এই নক্ষত্র। এক অস্কার অনুষ্ঠানের সময় প্রখ্যাত হলিউড অভিনেত্রী জুলিয়া রবার্টস ইরফানের কাছে গিয়ে ‘দ্য নেমশেক’-এ তাঁর পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন।পরে মীরা নায়ারের সঙ্গে আরেকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমায় অভিনয় করেন ইরফান। যে সিনেমাটির কথা অনেকেরই জানা নেই। ‘কোশার ভেজিটেরিয়ান’ নামের ছবিটি ছিল ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নিউইয়র্ক, আই লাভ ইউ’-তে। সিনেমাটিতে ইরফানের সঙ্গে অভিনয় করেন অস্কারজয়ী তারকা নাটালি পোর্টম্যান।
এছাড়াও প্রায় ৮০টি সিনেমায় অভিনয় করা অভিজ্ঞ ইরফান খানের বয়স যখন ত্রিশের কোঠায়, সেসময় প্রায় এক দশক টেলিভিশন ইণ্ডাস্ট্রিতে সাফল্য না পেয়ে ভেবেছিলেন অভিনয়ই ছেড়ে দেবেন।বলিউডের প্রথাগত রোমান্টিক সিনেমার নায়ক হওয়ার মত মুখশ্রী ইরফান খানের না থাকলেও হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি লাইফ অব পাই, স্লামডগ মিলিয়নিয়ার ও জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের মত হলিউড ফিল্মে অভিনয়ের মাধ্যমে অভিনেতা হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি।চরিত্রগতভাবে অন্তর্মুখী ও দার্শনিক ধাঁচের ইরফান মাঝে মাঝেই তার কাজ করা সিনেমা ও সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিগুলো নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করতেন।এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "আমি সবসময় বলিউড নামটার বিরুদ্ধে। এই ইন্ডাস্ট্রির নিজস্ব স্টাইল আছে, হলিউডের অনুকরণে এর নামকরণ করার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। এর উৎপত্তি পার্সি থিয়েটার থেকে।"
হলিউড অত্যন্ত পরিকল্পনামাফিক। বলিউডের কোনো পরিকল্পনাই নেই। এটি অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত এবং ঘরোয়া। বলিউড আরেকটু আনুষ্ঠানিক এবং হলিউডের মতো আরেকটু স্বতঃস্ফূর্ত হলে ভাল হত।"বাস্তব জীবনে, ইরফান খানের মত দুই ঘরানাতেই সাফল্য অর্জন করতে খুব কম অভিনেতাই পেরেছেন।২০০৭ সালে ইরফান খান নিউ ইয়র্কে যান তার অভিনিত মাইকেল উইন্টারবটমের 'এ মাইটি হার্ট' সিনেমার প্রচারে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি ড্যানিয়েল পার্লের অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ও তদন্ত নিয়ে তৈরি করা ঐ সিনমোয় তার সহ অভিনেতা ছিলেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি।নিউ ইয়র্কের সিনেমা হলগুলোতে ঐ সময় ইরফান খানের দু'টি সিনেমা চলছিল। নতুন রিলিজ হওয়া 'এ মাইটি হার্ট'এর পাশাপাশি ২০০৬ এ বের হওয়া মিরা নায়ারের 'দ্য নেমসেক'ও চলছিল কয়েকটি হলে।
এর পরের বছর বের হওয়া ড্যানি বয়েলের 'স্লামডগ মিলিয়নিয়ার' ছিল তার সবচেয়ে সফল সিনেমাগুলোর একটি। ঐ সিনেমোর সাফল্য ইরফান খানকে হলিউডে প্রতিষ্ঠিত করতে বড় ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি একজন ম্যানেজার ও একজন এজেন্ট নিয়োগ দেন।
এরপর কিছুদিনের মধ্যেই 'দ্য অ্যামেজিং স্পাইডারম্যান (২০১২)', 'ইনফার্নো (২০১৬)' এবং 'জুরাসিক ওয়ার্ল্ড (২০১৫)'-এর মত সিনেমায় অভিনয় করেন ইরফান খান।জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের প্রচারণার সময় সাংবাদিকদের একটি ঘটনা বলেছিলেন ইরফান খান।১৯৯৩ সালে জুরাসিক পার্ক সিরিজের প্রথম সিনেমাটি যখন বের হয়, তখন তিনি বোম্বের (বর্তমান মুম্বাই) টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতেন। সেসময় টিকিট কেটে ঐ সিনেমা দেখতে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না তার। ২২ বছর পর তিনি ঐ সিরিজেরই এক সিনেমায় অভিনয় করেন, যেটি বিশ্বব্যাপী ১৭০ কোটি ডলারের ব্যবসা করে।আর এভাবেই হঠাৎ করেই ইরফান খান হলিউডে অভিনয় করা সবচেয়ে জনপ্রিয় ভারতীয় অভিনেতা হয়ে যান।তাছাড়াও তিনি একটি জাপানিজ টিভি সিরিজ "টোকিও ট্রায়াল" অভিনয় করেছিলেন।
তবে অ্যাং লি'র 'লাইফ অব পাই (২০১২)' - এর মত বিখ্যাত সিনেমায় অভিনয় করলেও ইরফান খানকে বেশ কয়েকবার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে যে তিনি হলিউডের সিনেমায় ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করবেন নাকি বলিউডের সিনেমায় মূল চরিত্রে অভিনয় করবেন।মূলত স্লামডগ মিলিয়নিয়ার সিনেমার পর এই সমস্যা শুরু হয় ইরফানের।২০১২ সালের কথা আলাদা করে না বললেও নয়, হলিউড মুভি দ্য অ্যামাজিং স্পাইডারম্যানে ইরফান খান ড. রাজিত রাথা চরিত্রে অভিনয় করেন। তিনি হলিউডের সিনেমা লাইফ অব পাইয়ের পাই চরিত্রটির পূর্ণবয়স্ক চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। লাইফ অব পাই অ্যাকাডেমী অ্যাওয়ার্ড বা অস্কারে ১১টি ক্যাটাগরীতে মনোনয়ন লাভ করেছিল, যা ২০১২ সালে অন্য যেকোনো সিনেমার চেয়ে বেশি ছিল। চারটি ক্যাটাগরীতে অস্কার পুরস্কারও জিতে নিয়েছিল ছবিটি। তিনটি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পেয়ে বেস্ট অরিজিনাল স্কোরের জন্য একটি গোল্ডেন গ্লোব জেতে সিনেমাটি। এছাড়াও এই সিনেমা ২টি ব্রিটিশ অ্যাকাডেমী ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডও জিতেছে।তবে শুধু শীর্ষ পর্যায়ে নয়, হলিউডে ছোটোখাটো সিনেমাও করেছেন ইরফান। ২০১৮ সালে অ্যামেরিকান ইন্ডি সিনেমা 'পাজল'-এ কেলি ম্যাকডোনাল্ডের সাথে অভিনয় করেন তিনি।

তিগমানশুর ধুলিয়ার চোখে ইরফান খান:
অভিনয়ের নেশায় রাজস্থান ছেড়ে ইরফান খান যখন ছুটে এসেছিলেন দিল্লীতে তখন সেই নেশায় আসক্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায়, যেটিকে ধরা হয় অভিনেতার আঁতুড়ঘর হিসেবে। সেই স্কুলেরই তার এক ব্যাচ জুনিয়র ছিলেন এলাহবাদের এক তরুণ, নাম তার তিগমানশু ধুলিয়া যাকে আমরা সবাই গ্যাংস অফ ওয়াসেপুরের ঠান্ডা মাথার ভিলেন রামাধীর সিং হিসেবে চিনি। এনএসডিতে ইরফানের সাথে তিগমানশুর পরিচয়টা জুনিয়রদেরকে সিনিয়রদের দেয়া র্যাগের মাধ্যমে। তবে কে জানতো, কাছাকাছি মানসিকতার এই দুটো মানুষ পরবর্তী বছরগুলোতে হরিহর আত্মা হয়ে উঠবেন, একে অন্যের পরিপূরক হবেন, হবেন পথচলার সাথী?কিন্তু ক্যারিয়ারের একটা পর্যায়ে টেলিভিশনে কাজ করে মন ভরছিল না ইরফানের। দমবদ্ধ লাগছিল তার, সব ছেড়েছুড়ে রাজস্থান ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন। ততোদিনে নিজের একটা জায়গা করেছিলেন বন্ধু তিগমানশু ধুলিয়া। তিগমানশু তখন কাস্টিং ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন। তিনি থামালেন বন্ধুকে; ভরসা দিলেন। নিজে যখন সিনেমা বানানোর দায়িত্ব পেলেন, তখন বন্ধুকে দিয়ে করালেন সবচেয়ে কঠিনতম কাজ। খলনায়ক হিসেবে কাস্ট করলেন বন্ধুকেই। স্বজনপ্রীতি থেকে নয়; এনএসডিতে ইরফানদের ব্যাচ, তিগমানশুদের ব্যাচ- এই দুই ব্যাচ মিলিয়ে সেরা অভিনেতাটির নাম তো ইরফান খানই ছিল। ওই সময়টাতেই তিগমানশু জানতেন, ক্যামেরার সামনে তার বন্ধুটি কী করতে পারে।
তিগমানশুর ডেব্যু ফিল্ম 'হাসিল' ছিল ইরফানের ক্যারিয়ারেরই অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স সমৃদ্ধ সিনেমা। সেই পারফরম্যান্সকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন তিনি আরেক সিনেমা 'পান সিং টোমার'- এ, সেটাও তিগমানশুরই পরিচালিত! ইরফান বলতেন, 'দুনিয়াতে যদি আমার একটা মাত্র বন্ধু থাকে, সেটা হচ্ছে তিগমানশু। বাজার থেকে টাকা দিয়ে বন্ধু কেনা গেলে আমি বারবার ওকেই কিনতাম!' তিগমানশুর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ইরফান। আর তিগমানশু? যখনই তাকে ইরফান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তিনি অকপটে বলে গেছেন, ভারতের মাটিতে জন্ম নেয়া এযাবতকালের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার নাম ইরফান।
ইরফান খানের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে আলোড়ন তুলেছিলো ২০১৬ সালে। প্রয়াত পরিচালক নিশিকান্ত কামাত তাকে নিয়ে মাদারি সিনেমা নির্মাণ করেছিলেন। ইরফান খানের এই সিনেমা সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো সমাজ ব্যবস্থাকে। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজের ছেলে বলি হওয়ার পর ইরফান প্রতিশোধ নিতে অপহরণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলেকে। রাজনীতি আর দুর্নীতির বিষয়টিও ছবির কাহিনিতে ফুটে উঠেছে।রাগ, ক্ষোভ, বিদ্রোহ - ইরফানের অভিনয়ে সত্যতা পেয়েছে বাস্তবতার প্রেক্ষাপট। এবং এই সিনেমার সংলাপ এখনো জনসম্মুখে আলোচিত; যা আজও গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। “ব্যবস্থাকে বদলাতে হবে, নইলে ব্যবস্থা তোমাকেই বদলে দেবে।”তার এই সিনেমা রাজনৈতিক মহলেও বেশ সমাদৃত হয়েছিল। ভারতের দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের কাছে ছবিটি খুব ভালো লেগেছিলো। তৎকালীন সময়ে একটি টুইট বার্তার মাধ্যমে তিনি তাঁর এই মুগ্ধতার কথা জানান। টুইটারে তিনি লিখেছিলেন, ‘ইরফান খান...মাদারি অসাধারণ একটি ছবি। ছবিটি সবার দেখা উচিত।’
তিনি ছিলেন কম কথা বলা এক জাদুকর। নীরবতা দিয়েই গল্প বলতেন। চোখে থাকত সম্পূর্ণ একটি আখ্যান। ‘লাইফ অব পাই’-এ তাঁর বলা সংলাপ- ‘সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় প্রিয়জনকে শেষবার বিদায় বলার সুযোগ না পাওয়া’-আজ আরও গভীর হয়ে বাজে। ‘পিকু’-তে হাসির আড়ালে ছুড়ে দেওয়া সত্য- ‘পটি আর মৃত্যু, যেকোন সময় যেকোন জায়গায় আসতে পারে।’ ‘লাইফ ইন আ মেট্টো’-য় যিনি দুঃখ উড়িয়ে দিতে শিখিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুতেই শহরের সব উঁচু দালান নীরব হয়ে গেল।তবু তিনি রেখে গেছেন সুবিশাল এক জীবন। তিনি স্টারডমের পেছনে ছোটেননি, ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। নীরবতাকে ভাষা বানিয়েছেন, চোখে বহন করেছেন গল্প। একটুখানি থামা, একফোঁটা হাসি দিয়েই ভেঙেছেন হৃদয়, আবার সেলাইও করেছেন।
ইরফানের বিশাল কোনো ফ্যানবেজ ছিল না, আবার তাঁর সমালোচকও সেই অর্থে কোনো কালে পাওয়া যায়নি। তাই তো, মস্তিষ্কের বিরল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে যখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে ছিলেন, তখন তাঁর জন্য প্রার্থনা করে গোটা উপমহাদেশ। খানদের সাথে তাঁকে কেউ মেলাতে যায় না, কারণ সবাই জানে নিজের জায়গাটায় ইরফানই অনন্য, ইরফানই সেরা।বাকি খানদের জন্য লড়াইটা ২০২০ সালে এসে সহজ হয়ে গেল। সবচেয়ে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বীটাই যে সবার আগে চলে গেলেন জীবন নদীর ওপারে। এভাবে লড়াইয়ের ইতি হবে, সেটা নিশ্চয়ই বাকি খানরাও চাননি।
রাজেশ খান্নার সেই সংলাপ মনে পড়ে—‘জিন্দেগি বাড়ি নেহি, লাম্বি হোনি চাহিয়ে।’ মেথড অ্যাক্টিংটাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়া ইরফান খানকে ক্যান্সার অকালে কেড়ে না নিলে আরও কত কিছু পাবার ছিল তার কাছ থেকে, সেই হিসেবটা আজ নাহয় তোলা থাক। জন্মদিনের শুভেচ্ছা ইরফান, যেখানে আছেন, সেখানে খুব ভালো থাকুন- এটাই প্রার্থনা!
লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি।পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।