Posts

চিন্তা

ছাত্র সংসদে শিবির- কার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল?

January 8, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

76
View

ঢাকসু, চাকসু, জাকসু, রাকসু এবং সর্বশেষ জকসু -সর্বত্রই শিবিরের জয়জয়কার। গেল দেড় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হঠাৎ শিবিরের উদয় হয়েছে? ওরা উল্কাপিণ্ডের মতো আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে। না এর কোনোটাই হয়নি। আপনি মানেন আর না মানেন বাংলাদেশে মাত্র দুইটা দল কাঠামোবদ্ধ রাজনীতি করে। এক বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টি। দুই জামায়াত-শিবির। জাশি কেন কম্যুনিস্ট পার্টি থেকে আলাদা? কম্যুনিস্ট পার্টি ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে নিজেদেরকে ভাঙবার সুযোগ দেয়। পক্ষান্তরে দুনিয়া উল্টে গেলেও একজন জাত জাশিকে ভাঙা দূরের কথা মচকানোও যাবে না। এতটাই কনক্রিট পলিটিক্স চর্চা করে ওরা।

বাংলাদেশে জামায়াত এত শক্তি সঞ্চয় করল কেমনে? সোজা কথায় উত্তর হলো তথাকথিত সেক্যুলার আ.লীগ ও মধ্যপন্থী বিএনপির ছত্রছায়া, সোহবত এবং কোণঠাসা করে রাখবার ত্রিমাত্রিক বাহানায়। তো জামায়াত-শিবিরকে আপনি কোলে কাখে করে মানুষ করেছেন আবার ত্যাগ করেছেন -ওরা ক্ষমতা পেলে আপনার জ্বলবে কেন?

বাংলাদেশের ক্যাম্পাসে সেক্যুলার রাজনীতির বড় দুর্বলতা হলো -তারা বহু ক্ষেত্রে নিজেদের রাজনীতিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতা অনেক সময় ‘নেতিবাচক পরিচয়’ (anti-religion বলে ভুল ব্যাখ্যা) হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা সাধারণ ছাত্রসমাজকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্বের আঁতুড়ঘর। এখানে ডানপন্থী ছাত্রসংগঠনের একচেটিয়া প্রাধান্য দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় রাজনীতিতেও সেক্যুলার নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি করতে পারে।

ক্যাম্পাস থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব যদি ধর্মীয় বা রক্ষণশীল বয়ানে অভ্যস্ত হয়, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজের নীতি-আলোচনাতেও ধর্মীয় আবরণ বাড়বে। সংখ্যালঘু অধিকার, নারীর স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা -এই বিষয়গুলো ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

তবে এটি একই সঙ্গে একটি সতর্ক সংকেতও বটে। যদি সেক্যুলার ছাত্ররাজনীতি এই ফলাফল থেকে শিক্ষা নেয় -নিজেদের সংগঠন সংস্কার করে, গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরিয়ে আনে, ধর্মবিরোধিতা নয় বরং ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক রাজনীতির ভাষা তৈরি করে, দখল, চাঁদাবাজি আর ক্যাডারগিরির তকমা ঘোচায় -তাহলে তারা পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।

ডানপন্থী আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী হলে ছাত্ররাজনীতি আদর্শভিত্তিক বিতর্কের বদলে ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে, যা বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে শিবির যদি এই ব্যাপারটি ধরে ফেলে নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক প্যারামিটারে উর্ধ্বে তুলে ধরে, ধর্মচর্চাকে ব্যক্তিগত আচারিক জায়গায় রেখে ওরাও সেক্যুলারিজমের বৈশ্বিক নর্মস রপ্ত করে -তবে ওদেরকে দোষ দেয়ার আর লোক পাওয়া যাবে না।

মোদ্দাকথা, ছাত্র সংসদে ডানপন্থীদের জয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সেক্যুলার রাজনীতির দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার আয়না। প্রশ্ন হলো -সেক্যুলার শক্তিগুলো কি এই আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখে বদলাতে প্রস্তুত, নাকি দায় চাপিয়ে সময় পার করবে? এই সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ ক্যাম্পাস রাজনীতির যথার্থ দিক নির্ধারণ করবে। আপাতত ছাত্র শিবিরকে অভিনন্দন জানান -তারাই আপনাদেরকে ব্যর্থতার ডালি হাতে ধরিয়ে দিয়ে দেশান্তরী করে ছেড়েছে। নিজেদের কাঙ্ক্ষিত জায়গাও পোক্ত করে নিয়েছে। ক্ষমতা সবাই চায় বামপন্থী, ডানপন্থী, মধ্যপন্থী কিংবা উগ্রপন্থী। তবে উপযুক্ত জায়গার নিশ্চয়তা যোগ্যরাই পায়।

লেখক: সাংবাদিক 
৮ জানুয়ারি ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login