দ্যা ফিজ
আহমেদ সাব্বির
মোস্তাফিজের শহর সাতক্ষীরায় শৈত্য প্রবাহ। তাপমাত্রা নেমে গেছে ১১ডিগ্রিতে। হাড় কাঁপানো শীত আর ঘণ কুয়াশায় ঝাপসা চারপাশ। শীতের দাপটে সবার যখন জবুথবু অবস্থা, তখন মোস্তাফিজ ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ক্রিকেট সম্পর্ক। ক্রিকেটের ময়দানে কেকেআরের ইত্রামি, রাজনৈতিক হট্টগোল শুনতে শুনতে মনে হলো মোস্তাফিজকে একটু অন্যভাবে উদযাপন করি।
মোস্তাফিজের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ২০১৬সালে। সাদিকের মাধ্যমে। চারুকলার মেধাবী চিত্রকর সাদিক আমার এলাকার ছোটভাই কাম ঘানিষ্ঠ বন্ধু। ছাবি আঁকার পাশাপাশি পেশা হিসাবে ইন্টরিয়র ডিজাইনে পরিপক্ক হয়ে উঠেছে। সেবার মোস্তাফিজ আইপিএল কাঁপিয়ে অষ্ট্রেলিয়া দাপিয়ে দেশে ফিরেছে। সাতক্ষীরায় এসেছে চুপিচুপি। কারণ ফিজ বাড়িতে এলেই ভক্তরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। তেঁতুলিয়ার বাড়িটা তখন হয়ে ওঠে ক্রিকেটের তীর্থস্থান। এক সকালে সাদিক হঠাৎ ঢাকা থেকে আমাার কালিগঞ্জের বাসায় এসে উপস্থিত হলো। বলল- ভাই, চলেন তো প্লেয়ারের বাড়িতে যেতে হবে। আমি বললাম- কেনো? সাদিক বলল- মোস্তাফিজের বাড়িতে ইন্টরিয়রের কাজ করছি। ওর মামা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে। কিছু বিষয়ে ফিজের সঙ্গে মিটিং করতে হবে।
সাদিকের প্রস্তাবে আমি নড়চড়ে উঠলাম। বাইক নিয়ে রওনা হলাম তেঁতুলিয়া। কালিগঞ্জ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। রোদসিকেও সঙ্গে নিলাম। আমরা পৌছলাম বেলা তিনটার দিকে। মোস্তাফিজের বাড়িতে আমি আগে কখনোই আসিনি। কারণ সে সময় দেখেছি মোস্তাফিজেকে একনজর দেখার জন্য সারা দেশ থেকে ভক্তরা আসছে। পাশ্ববর্তী দেশ থেকেও লোকজন আসছে। সে যতক্ষণ সাতক্ষীরার বাড়িতে থাকে, লোকজন গমগম করে। দুই দিনের জন্য বাড়িতে এলেও পরিবারের সঙ্গে সময় দিতে পারে না। ফটো সেশন আর সাক্ষাতকার দিতে দিতে সময় কেটে যায়। মোস্তাফিজ বাড়িতে আসছে শুনলে ঢাকা থেকে মিডিয়া কর্মীরা এসে জাড়ো হয়। স্থানীয় প্রশাসান ও ভক্তদের আবদার মেটাতে দুই একটা অনুষ্ঠানেও যেতে হয় । সারা সাতক্ষীরা যেন হামলে পড়ে ওদের বাড়িতে। এত ভিড় ঠেলে আমার কখনো ওদের বাসায় যাওয়ার সাহস হয়নি।
মোস্তাফিজের বাড়িতে ঢুকেই দেখলাম শুনশান নীরবতা। দর্শনার্থীদের ভিড়ভাট্টা নেই। উঠোনো হাঁস-মুরগি চরে বেড়াচ্ছে, ছাদের উপর মোস্তাফিজের কবুতর ফরফর করে উড়ে বেড়াচ্ছে। পুঁইশাকের ডগা হেমন্তের বাতাসে দুলছে। রান্নাঘর থেকে তরকারির ঘ্রাণ আসেছে। সাদিক গলা খাকারি দিয়ে সোজা বারান্দায় উঠে গেল। কারণ ওদের পরিবারের সঙ্গে সাদিকের ঘনিষ্ঠতা আগে থেকেই। কিছুক্ষণ পর মোস্তাফিজের বাবা বেরিয়ে এলেন। লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরিহিত বিনয়ী মুরুব্বি। সালাম বিনিময় শেষে সাদিক জানতে চাইল- আঙ্কেল, প্লেয়ার কোথায়? বাবা জানলো- ও তো বাড়ির পিছনের বিলে। এসো আমার সঙ্গে, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। আঙ্কেলের পিছু পিছু আমরা বাড়ির পেছন দিকের বাগানে ঢুকে পড়লাম। আমার কিছুটা লজ্জাবোধ করলেও রোদসীকে দেখলাম তুমুল উচ্ছ্বসিত। সাদিকের হাত ধরে ও লাফাতে লাফাতে এগিয়ে চলল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা একটা বিলের মধ্যে নেমে পড়লাম। শুকনো খটখটে মাটি। হেমন্তের ধানকাটা হয়ে যাওয়া ধূসর বিলপথ। বেশ কিছু দূর অগ্রসর হতেই একদল ছেলে-বৃদ্ধ-কিশোরকে দেখলাম হইচই করছে আর ভলিবল খেলছে। এবড়ো-খেবড়ো আলপথ মাড়িয়ে আমি-সাদিক-রোদসী ভলিবল খেলার খুব কাছে চলে এলাম। মোস্তাফিজ কোথায় খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু না দেখতে পেয়ে সাদিককে জিজ্ঞেস করলাম- কোথায় উনি? দেখছি না তো! সাদিক বলল- ওই তো ভাই। চেকের গেঞ্জি পরা। আমি অবাক বিষ্ময়ে দেখলাম একটা ঢ্যাঙা-লম্বা-শ্যামবর্ণের ছেলে ভালিবল খেলছে আর হাততালি দিচ্ছে। পরণে স্ট্রাইপের টি-শার্ট আর হাঁটু পর্যন্ত গোটানো কালো ট্রাউজার।
সাদিককে দেখেই সে খেলা ছেড়ে বেরিয়ে এল। জানতে পারলাম অট্রেলিয়া থেকে ফেরার সময় এলাকার ভাই-ব্রাদারদের জন্য একটা ভলিবল এনেছে। তুমুল আনন্দে সেই ভলিবল খেলা চলছে। সাদিক আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল- ইনি সাব্বির ভাই। সুলতানপুরে বাসা। কালিগঞ্জে চাকরি করেন। ভালো ছড়াকার। উনি তোমাকে নিয়েও ছড়া লিখেছেন। মোস্তাফিজ আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। আমরা হ্যান্ডশেক করলাম। ক্রিকেট দুনিয়ো কাঁপানো দ্য ফিজকে স্পর্শ করে রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। ক্রিকেট মাঠে যে এতটা ভয়ংকর মাঠের বাইরে সে ভিষণ ভদ্র আর লাজুক। খুব কম কথায় সে বুঝিয়ে দিল তার অনুভূতি। কেমন আছেন-ভালো আছি ছাড়া খুব একটা কথা হলো না। রোদসীকে কাছে ডেকে নিয়ে নিজেই ছবি তুলল। মোস্তাফিজকে প্রথমবার খুব কাছ থেকে দেখে আমার বিষ্ময়ের ঘোর মোটে কাটছিল না। অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে সকালেই ফিরেছে সে। অথচ তার কোনো উত্তাপ নেই। শান্ত সহজ-সরল ছেলেটা! ওকে দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে, এই ছেলে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইন্ডিয়াকে একাই শুইয়ে দিয়েছিল। তাও আবার দুই-দুই বার। আইপিএলে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ম্যচসেরা হয়েছে।
মোস্তাফিজ আমাদের ড্রইংরুমে বসতে দিল। নতুন ইন্টেরিয়র করা বিশাল ড্রইংরুম। একপাশে কাচের শোকোসে সাজানো বল, উউকেট। আইপিএলের জার্সি, একটা ব্যাটে বিশ্বাবিখ্যত সব ক্রিকেটারদের অটোগ্রাফ। একপাশে বিশাল টিভি। সাদিক জানালো এই সুসজ্জিত অভিজাত ড্রইংরুমটি আসলে গ্রামবাসীদের। সারাদিন সারারাত হাট করে খোলা থাকে রুমের দরোজা। এলাকার ছেলে-বুড়ো সকলে বসে-শুয়ে গড়িয়ে খেলো দেখে। রুমের সাজ-সজ্জা নিয়ে ফিজ ওর পরিকল্পনা জানালো। কিন্তু খুবই কম বাক্য বিনিময়ে। সাদিকের কাছ থেকে কয়েকটি প্রশ্ন করে চুপচাপ শুনতে লাগল। ফিজকে দেখে আমার একটা বিষয় পরিস্কার হলো যে, ওর চোখের ভাষা অত্যন্ত প্রখর। ভীষন চুপচাপ হলেও ব্যাক্তিত্বে বর্ণাঢ্য। সাদিকের অনুরোধে আমি ফোন বের করে দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত ওকে নিয়ে লেখা ছড়াটা পড়ে শোনালাম। মনোযোগ দিয়ে ছড়াটা শুনে বেশ খুশি হলো। শীতের দিন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে দেখে আমরা বিদায় নিলাম।
প্রায় পনের দিন পর আমি আর সাদিক আবার গেলাম তেঁতুলিয়ার বাড়িতে। মোস্তাফিজ দেশের বাইরে যাচ্ছে সিরিজ খেলতে। একদিনের ঝটিকা ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। সাদিকের ডিজাইন ওর খুব পছন্দ হয়েছে। আরো কয়েকটি কাজ করতে হবে। এজন্য জরুরী মিটিং। আমারা পৌঁছলাম দুপুর বারটার দিকে। সেদিনও গিয়ে দেখি বাড়িতে নেই। উজিরপুর মাঠে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলছে। দলবল নিয়ে সেখানে গেছে। উঠোনে রেড ওয়াইন কালারের একটা নতুন প্রাইভেটকার দেখলাম। সাদিক জানাল এটা কিনেছে পরিবারের জন্য। বাবা-মা ভাই-বোন ব্যবহার করতে পারবে।
উজিরপুর খেলার মাঠে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলছে। চারপাশে শতশত দর্শক। তিল ঠাঁই নেই। তেঁতুলিয়া একাদশ বনাম ঘুষুড়ি একাদশের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচ। তেঁতুলিয়া দলে খেলছে ফিজের মেজো ভাই পল্টু। যার হাত ধরে অজপাড়াগাঁ থেকে মোস্তাফিজের বিশ্ব ক্রিকেট মঞ্চে উত্থান। মাইকে ম্যাচের ধারা বিবরনী চলছে। মুহুর্মুহু করতালি আর উল্লাসে ফেটে পড়ছে এলাকা। ভিড়ের মধ্যে একটা চেয়ারে দলবলবেষ্টিত মোস্তাফিজকে পাওয়া গেলা অবশেষে। আমদের দেখে ও নিজেই উঠে এলো। হ্যান্ডশেক পর্ব শেষে বলল- মামা চলেন বাড়িতে যাই।
সাদিকের সঙ্গে মোস্তাফিজ ওর মায়ের ঘরের ডিজাইন নিয়ে মিটিং করল। ওর পরিকল্পনা মতো কাজ বুঝিয়ে দিল। মিটিং শেষে আমরা উঠে পড়তেই মোস্তাফিজ বাধা দিল। মামা দুপুরবেলা না খেয়ে যেতে পারবেন না। আমি ইতস্তত করলাম। বললাম- আরেকদিন হবে। বাসায় অনেক কাজ ফেলে এসেছি। সাদিকও বলল- সাতক্ষীরায় ফিরতে হবে। তোমার নতুন কাজের এস্টিমেট করতে হবে। আজ থাক। কিন্তু মোস্তাফজ নাছোড়। বলল- হাতমুখ ধুয়ে দেন। মা ভাত খুলে বসে আছে। আমরা নিচতলায় নেমে দেখি সত্যি সত্যি ডাইনিংএ খাবার সাজানো হয়েছে। লম্বা ঘোমটায় মোড়া রত্নগর্ভা মা দাঁড়িয়ে আছেন। তার আদদের ছোট ছেলে আজ বিশ্ব বিখ্যাত। ক্রিকেট বোর্ডের অনুমতি নিয়ে যখনই যেটুকু সময় নিয়ে বাড়িতে আসে পাড়া-প্রতিবেশী আর দর্শনার্থীদের ভিড়ে মিশে থাকে। সন্তানকে কাছে পাওয়া তথন দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। মা জানাল- আমার মোস্তাফিজ পায়রা মাছ পছন্দ করে। প্রত্যেকবার বাড়িতে আসলে ওর জন্য কত পদের খাবার রান্না করি। কিন্তু খাবার সময় পায় না। আমি আর সাদিক খেতে বসলাম। টেবিলে ছোট-বড় নানান ধরনের মাছ, মাংস, পিঠা-পায়েশ সাজানো। মা যত্ন করে খাবার পরিবেশন করতে লাগলেন আর ওর ছোটবেলার গল্প শোনাতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর দোতলা থেকে মোস্তাফিজ নেমে এলো। পরণে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি। মা বলল তোর ভাত বেড়েছি। প্রথমে বলল পরে খাব। তারপর কি মনে করে আমাদের সঙ্গে খেতে বসে গেল। আমরা গল্প করছি আর খাচ্ছি। কিন্তু মোস্তাফিজের মুখে তেমন কথা নেই। আমি কথার বের করার জন্য ক্রিকেট প্রসঙ্গ তুললাম। বললাম আপনার গত ম্যাচের বল ১৪০ কিমি: অতিক্রম করেছিল। উত্তরে বলল- ওরকম হয়ে যায় মাঝে মধ্যে। আমি বুঝলাম ক্রিকেট নিয়ে ও কথা বলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অল্প করে সব খাবারের স্বাদ নিল। হঠাৎ আমাকে বলল- বিকালের দিকে আমি সাতক্ষীরায় যাব। আপনারা কোথায়া থাকবেন। আমি বললাম শহরের মধ্যেই থাকব। তখন সে বলল- তাহলে মামা আমাকে একটু সময় দিয়েন পারলে। আমার কিছু পর্দা কিনতে হবে। পানারা পছন্দ করে দিলে ভাল হয়। সাদিক বলল- ঠিক আছে তুমি ফোন দিও।
আমরা মোস্তাফিজের বাসা থেকে বিদায় নিলাম। সন্ধ্যার পর শহরে আবার দেখা হলো পর্দার দোকানে। সেখানে পর্দা পছন্দ করতে করতে ভিড় লেগে গেল। দোকান মালিক কফি, কোল্ড ড্রিংস আনালো। কিছুক্ষনের মধ্যে মোস্তাফিজের কোচ তপুভাই দলবল নিয়ে হাজির হল। আমি আর সাদিক মোস্তাফিজের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
মোস্তাফিজ কেনো বিশ্বমানের সেদিন তার শান্তশিষ্ট সংযত আচরণ দেখেই বুঝেছিলাম। এতবড় মাপের ক্রিকেটার যে বিশ্বসেরা, বছর ঘুরতেই যে কোটিপতি হয়ে গেছে, তার মধ্যে তার কোন উত্তাপ নেই। সহজ-সরল-বিনয়ী তার জীবনযাপন। মাঠে যে মোস্তফিজ বাঘ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, মাঠের বাইরে সে চঞ্চল হরিণের মতো। পাতার আড়ালে যেন নিজেকে লুকিয়ে রেখে বিষ্ময় ছড়ায়। আইপিএলে তাকে নিয়ে যে নোংরামিটা করা হলো, বিসিবিসহ সারা বাংলাদেশ যে তার পক্ষে অবস্থান নিল। তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালো, আমার মনে হয় তার বিন্দুমাত্র আঁচ তাকে স্পর্শ করতে পেরেছে। হয়তো একটু মনখারাপ হতে পারে। কারণ খেলাটাই যে তার আরাধ্য। গোটা বিশ্ব যখন মোস্তাফিজকে নিয়ে ব্যস্ত, তখন সে মাঠের খেলায় আত্মমগ্ন, সুন্দর-ভয়ংকর।
