Posts

প্রবন্ধ

“গানস এন্ড গুলাবস”(ওয়েব সিরিজ)- ৯০ দশকের গ্যাংওয়ার সিনেমাগুলোর প্রতিচ্ছবি

January 9, 2026

সুমন বৈদ্য

Original Author সুমন বৈদ্য

44
View
Guns & Gulaabs (TV Series 2023– ) - IMDb
‘গানস এন্ড গুলাবস’ ওয়েব সিরিজের পোস্টার

৯০ দশকের দাউদ ইব্রাহিম , হাজী মাস্তান, কারিম লালা, ছোটা শাকিল এইসব গ্যাংস্টারের সিনেমার কথা মনে আছে? “ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মুম্বাই”, “ব্ল্যাক ফ্রাইডে”, “শুট আউট লোখান্ডওয়ালা”, “শুট আউট ওয়াদলা”; "সত্য", এইসব সিনেমায় তখনকার দিনের রাজনৈতিক অবস্থা এবং গ্যাংস্টারদের একটা দাপট দেখা যেতো। কার থেকে কে সাহসী, কার থেকে কার দম বেশি,  কে কার থেকে বেশি এগোতে পারে এই অপরাধ জায়গায় এইসব নিয়ে আবর্তিত হতো এসব কাহিনী। আহামরি কোন গল্প বা কোন অ্যাকশন থ্রিলার থাকত না , মন কাড়া অভিনয় এবং গল্পের দারুঢ প্রেজেন্টেশনে সে সব গল্প মাতিয়ে রাখতো।তবে বর্তমান যুগের ইয়াং জেনারেশনরা বলা যায় নব্বই দশকের সেইসবগল্পের সাথে তেমন পরিচিত নয়। হয়তো গল্প শুনে থাকতে পারে সেসময়ের। কিন্তু সেইসময়কার গল্পের অনুভূতি কি রকম ছিল সেটি অনুভব করার সুযোগ হয়ে উঠেনি। তাই নব্বই দশকের সেই নস্টালজিয়া ফিরিয়ে আনতেই পরিচালক রাজ এন্ড ডিকে নিয়ে এলো ‘গানস অ্যান্ড গুলাবস’ এক ড্রাক কমেডি থ্রিলার ধাঁচের ওয়েব সিরিজ।

নব্বইয়ের দশকের গ্যাংস্টার সিনেমাগুলো আজও আমার মনে এক ধরনের ভারী আবেগ তৈরি করে। তখনকার সিনেমায় বন্দুক ছিল, রক্ত ছিল, ক্ষমতার দম্ভ ছিল-কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল মানুষ। চরিত্রগুলো কেবল অপরাধী ছিল না, তারা ছিল দ্বিধাগ্রস্ত, ভাঙা, কখনো প্রেমিক, কখনো সন্তান, কখনো সমাজেরই এক নির্মম ফল।আমি যখন তখনকার গ্যাংস্টার সিনেমা দেখি, একটা অদ্ভুত অনুভব কাজ করে—ভয় আর মায়া একসাথে। এই সিনেমাগুলো দেখার সময় মনে হতো, সহিংসতার মধ্যেও এক ধরনের নীরব কান্না আছে। আজকের অনেক স্টাইলাইজড ক্রাইম সিনেমার (যেমন: কেজিএফ, পুষ্পা, টক্সিক) মতো শুধু “কুল” হওয়ার চেষ্টা সেখানে ছিল না; ছিল বাস্তবের ভার, সমাজের চাপ, আর চরিত্রের ভিতরের টানাপোড়েন।

বিশেষ করে সায়েদ হোসেন জেহেদীর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাগুলো দেখার অভিজ্ঞতা ছিল আলাদা। কারণ সেগুলো নিছক কল্পনা নয়—বাস্তব অপরাধজগত, বাস্তব মানুষ, বাস্তব শহরের গল্প। সেই গল্পগুলোতে গ্যাংস্টার মানেই শুধু খলনায়ক নয়; বরং সে এক সময়ের উৎপাদন—রাজনীতি, দারিদ্র্য আর ক্ষমতার অন্ধকার সমঝোতার ফসল।

আমি তখন সিনেমা দেখতাম গল্পের ভেতরে ঢুকে। কোন অভিনেতা কতটা জনপ্রিয়—সেটা আমার কাছে মুখ্য ছিল না। আমি খুঁজতাম চরিত্রে সত্যতা আছে কি না। অভিনয়ের চোখে চোখে দ্বন্দ্ব আছে কি না। সংলাপে জীবন আছে কি না। তাই হয়তো আমার চলচ্চিত্র দেখার দৃষ্টিভঙ্গি একটু আলাদা।

আজও আমি বিশ্বাস করি—ভালো সিনেমার মূল শক্তি গল্প আর অভিনয়। অভিনেতা তারকা হোক বা না হোক, যদি চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকে, তাহলে সিনেমা আমাকে টানে না। এই জায়গা থেকেই পুরোনো সিনেমার প্রতি আমার এক ধরনের টান। সেখানে প্রযুক্তির জাঁকজমক কম ছিল, কিন্তু অভিনয়ের ক্ষুধা ছিল প্রবল।আমার বরাবরই পুরোনো সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ খতিয়ে দেখার শখ বেশি। সেইসাথে সিনেমা বা ওয়েব সিরিজের নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রের আইকনিক দৃশ্যগুলো আলাদা করে দেখতে ইচ্ছে করে।গানস অফ গুলাবস মুক্তি পেয়েছিল ২০২৩ সালে কিন্তু অনেকদিন পর যখন আবার “গানস অ্যান্ড গুলাবস” দেখতে বসলাম, তখন আসলে আমি শুধু একটি ওয়েব সিরিজ দেখতে বসিনি-আমি নিজের পুরোনো ভালোবাসাকে রোমন্থন করতে বসেছিলাম। নব্বইয়ের দশকের সেই গন্ধ, সেই শহুরে অপরাধের আবহ, সেই মানুষ-ভাঙার গল্প—সবকিছু যেন আবার ফিরে এলো। সিরিজটি আমাকে মনে করিয়ে দিল কেন আমি আজও গল্পনির্ভর সিনেমার প্রেমে পড়ি।

“গানস অ্যান্ড গুলাবস” দেখার সময় বারবার মনে হয়েছে-এটা বন্দুকের গল্প নয়, এটা মানুষের গল্প। আর এই মানুষ খোঁজার অভ্যাসটাই হয়তো আমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। আমি সিনেমায় গ্ল্যামার খুঁজি না, আমি খুঁজি সময়ের দলিল, সমাজের আয়না, চরিত্রের নিঃশ্বাস।নব্বইয়ের দশকের গ্যাংস্টার সিনেমাগুলো তাই আজও আমাকে টানে। কারণ সেখানে আমি শুধু সিনেমা/ওয়েব সিরিজ দেখি না-আমি নিজেকে দেখি, আমার সময়কে দেখি, আর সেই সমাজকে দেখি, যেখান থেকে এই গল্পগুলো জন্ম নিয়েছিল।

Guns & Gulaabs Season 1 Web Series (2023) | Release Date, Review, Cast,  Trailer, Watch Online at Netflix - Gadgets 360
‘গানস এন্ড গুলাবস’ ওয়েব সিরিজের পোস্টার

আর তৎকালীন সময়ে গ্যাংস্টারদের জীবনী পড়ে বা সিনেমা দেখে ধুলোখেলা বন্দুকবাজির খেলা দেখে ব‍্যথাতুর হয়েছিলাম। তাদের জীবনে প্রেম নীরবে আসেনি, একবারও নয়। কিন্তু যতবার এসেছে, এসেছে গোপনে। এখানে প্রেম মানেই যে তাদের কাছে শুধু রোমান্স ছিলো না; তা ছিলো সামাজিক ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা।তা প্রকাশ করার ধক যাদের ছিল, তারাই হতো আমাদের সুপারহিরো। আভিধানিক অর্থে উল্টো করে ঝোলা স্পাইডারম্যানের চুম্বনের মতো দুঃসাহসী। আর আমরা দর্শক বা ব্যক্তি হিসেবে যা পারিনি আমরা ছিলাম আমরা ছিলাম জমায়েতের কাতারে অর্থাৎ অপরাগতা। যে জমায়েত ব‍্যর্থতাটুকু গিলে নিত, প্রত‍্যাখ‍্যানে মুখ চুন ক‍রত কয়েক লহমা, তারপরেই মেতে উঠত আলগা খিস্তি অথবা বন্ধু-সমভিব‍্যহারে পাড়াবাজিতে। এই ছিল তাদের বন্দুকজীবন, হাপিত‍্যেশ, আদতে অহিংস, শুধু খানিক হিংসার ছলাকলা, বিজ্ঞাপনের ভাষায়, ‘আম জিন্দেগি’।তাদের উল্টোস্রোতে ছিল কঠিনজীবন। যা আদতে আমাদের সাধারণ দর্শকদের মতো নিরীহ নয়, আসল বন্দুক তাদেরই হাতে মানাতো, ভালবাসার দিব‍্যি খেয়ে, রাজ্য দখল করার তাগিদে অপরপক্ষের সাথে পাল্লা তারা দুনিয়া কাঁপাতে পারে, বেপরোয়া।

নেটফ্লিক্সে রাজ এবং ডিকে-র ‘গানস অ্যান্ড গুলাবস’-এর রঙে আমাদের সেইসব পুরোনো সিনেমা নতুন করে আসলো। আমাদের সময়ে গল্পের গাঁথুনি হতো শহরের রাজা হওয়াকে কেন্দ্র করে একে অপরের টেক্কা। তখন নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল বা শহরের আফিমখেত ছিল না, তবে নেশা ছিল। কিন্তু পরিচালক এইবার অন্যরকম আফিমখেতকে কেন্দ্র করে একটি শহরের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য দখল করার গল্প বুনলেন। মূলত এই ব্যবসার প্রধান কাজ কি এবং যে‌ বিষয়টি নিয়ে সমস্যা শুরু হয়েছে সেটাকে এখানে দেখিয়েছেন।সেখানে দাউদ-করিম লালা-মানিয়া সুরভের চরিত্র মতো শক্তিদর কেউ ছিলো কিন্তু তাদের চরিত্রের ছায়া অবলম্বনে লোকাল গাঞ্চি,নাবিদ, আত্মারাম চরিত্রের সৃষ্টি দেখা যায় এই ওয়েবসিরিজে। কিন্তু বলে রাখি, দাউদ-করিম লালা-মানিয়া সুরভের চরিত্র চেয়ে একটু কম খতরনাক এই চরিত্রগুলো, এটুকুই।

আমাদের সমাজে স্বার্থবাদী 'ছোটু জুগনু' মতো চরিত্র অবশ্যই আছে। আশ্চর্য্য বিষয় হলো ‘অর্জুন’, এর মতো দুঁদে পুলিশ তেমন ছিল না, তবে অমন অনেক ঘরোয়া বা সরকারি মাস্টারমশায় ছিল। আর নিশ্চয়ই ছিল কোনও দিলদার প্রেমী ‘টিপু’, ছিলো কোনও ‘বন্ধুর প্রেম মানে আমাদের প্রেম’ কসম খাওয়া সুনীলের মতো হরিহর আত্মা বন্ধু, ‘নান্নু-গঙ্গারামের’, মতো ধূর্ত-চতুর ফার্স্ট বয় এবং ফেল মারার জুটিও যেমন ছিলো ঠিক তেমনি মেয়েদের নিয়ে ফ্যাসিনেশনে বুধ থাকার উপক্রম ও ছিলো। এবং সময়ের তাগিদে সেই ভ্রম কেটে যাওয়ার উপস্থিতিও ছিলো। সেইসাথে ছিলো জো-এর মতো ভিনদেশি তারা, বান্টির মতো জীবন বাজি রাখা নতুন বন্ধু, এবং আমাদের স্বপ্নের মতো প্রেমিকা চন্দ্রলেখা, যার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া ছিলো দুষ্কর। যাদের জন্য আমরা কেঁদেছি, কিন্তু মনে হয়েছে, তাদের সামনেই কাঁদলে বুঝি মনের ভার নামত অনেকটা।

এই সিরিজ দমবন্ধ থ্রিলের মধ্যেও হাসির ছররা, ভালবাসার টোটা জমায় ‘গানস অ্যান্ড গুলাবস’, হত‍্যা এবং প্রতিহিংসাও এখানে রঙিন হয়, পুরুষ চরিত্রে ভরা সিরিজে পিতৃতন্ত্র পিছলে যায় অন‍্য দ্রোহে। আলো এবং রঙের ব‍্যবহার থেকে সংগীত-ভাবনা, চিত্রনাট‍্য থেকে সম্পাদনা, টাইটেল কার্ডের অবিশ্বাস্য প্রয়োগ– জমজমাট নির্মাণে এই সিরিজ যা দিল, তা অনেকটা শিল্পের তৃপ্তি, বাকিটা ব‍্যক্তিগত। আমাদের এই সিরিজ ফিরিয়ে দিল পুরোনো সেই গ্যাংস্টার ফিল্মের ছায়া যা প্রচলিত সো কলড গ্যাংস্টার ফিল্ম(স্লো মোশন নিয়ে হাঁটা, কালো কালারের মিশ্রণ, নেই কোনো রাজনৈতিক অবস্থার প্রোপার ট্রিটমেন্ট, অযাচিতভাবে নায়কের ডায়লগ এবং নায়ককেই ফোকাস) প্রভাবের সাথে আমাদের বয়সের সঙ্গেই হারিয়ে গেছে। ফিরিয়ে দিয়েছে আমাদের নিজস্ব ‘গানস অ্যান্ড গুলাবস’।

গল্পতে দেখা যায় গুলাবগঞ্জ নামক একটা শহর আছে যেখানকার মানুষজনদের একটা প্রধান অংশ আফিম চাষ করে। এখন সেই চাষ করা আফিমের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে যায় একজন গ্যাংস্টার , দুইটা বড় বড় রাজনৈতিক গ্ৰুপ , একজন পুলিশ অফিসার, একজন সদ্য প্রয়াত গ্যাংস্টারের ছেলে আর কিছু স্কুল ছেলে মেয়ে এবং স্কুল শিক্ষিকা। এখন কে আগে পরে এই গুলাবগঞ্জের দখল নিবে! এই আফিম ব্যবসাকে কে কন্ট্রোল করবে! সেইসব প্রশ্নের জবাব পেতে হলে এই সিরিজ দেখতে হবে।এখন গল্পের ধরণ অনুযায়ী অনেকটা আন্দাজ করা যায় এইটা নব্বই দশকের ক্রাইম থ্রিলারের মতো। আহামরি কোনো কিছুই না, তবে আহামরি না হলেও এই সিরিজটি দর্শকদের হৃদয়ে দাগ কাটতে বাধ্য কারণ পরিচালকের গল্প বলার প্রেজেন্টেশন। যেমন, ৯০ দশকের ক্রাইম থ্রিলার সিনেমায় গল্পটা অনেকটা ধরে নেওয়া যেতো কি হতে চলেছে কিন্তু তারপরেও দর্শক আর্কষন করে রাখতো গল্প বলার প্রেজেন্টেশনের জন্য। এখানেও সেই কাজটি দেখা গিয়েছে। পরিচালক যেহেতু রাজ এন্ড ডিকে তাই আলাদা ভরসা করা যায়।

গল্প নিয়ে যদি আরো বলতে হয় তাহলে দেখা যায়, এখানকার গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্র, তারা যতই ভয়ানক, হিংস্র, নীতিবান কিংবা সহজ সরল হোক না কেন, সকলেই স্বাভাবিক ভাবে এমন ঘটনার সামনে পড়ে বা তৈরি করে যেটা আপাত ভাবে হাস্যরসের উদ্রেক করে। এটাই পরিচালক রাজ এন্ড ডিকের ড্রাক কমেডির বিশেষত্ব। আপনারা রাজ এন্ড ডিকের পূর্বের ওয়েব সিরিজ বা সিনেমা দেখলেন এমন অনেক সিরিয়াস অবস্থায় তিনি ড্রাক কমেডি এনেছেন যা সত্যিই আপনাকে হাসাতে বাধ্য। নব্বই দশকের গল্প হলেও রাজ এন্ড ডিকে এখানে বর্তমান যুগের টুইস্ট এন্ড ট্রান যে পদ্ধতিটা এনেছেন ওইটা ও খুব দারুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। কারণ এই সিরিজে পরক্ষণেই হয়তো এমন কিছু ঘটবে যেটা কল্পনাও করা যায় না এমন সাংঘাতিক। যেহেতু আফিম চাষ নিয়ে কাহিনী তাই এর চাষের পিছনে কেউ পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলেও সবাই একই গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছায়। কাউকেই কোনও নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে আটকে রাখা যায় না।এখন এই পৌঁছানোর পিছনে প্রধান চরিত্রগুলোকে কি কি সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তা দেখতে হলে এই সিরিজ দেখতে হবে। নব্বই দশকের কথা উঠছে আর নব্বই দশকের গান থাকবে না তা কি হয়! ওটিটি প্লাটর্ফম নেটফ্লিক্স  কিন্তু এই জায়গায় বাজিমাত করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরনো হিন্দি ও ইংলিশ গানগুলোর ব্যবহার যথাযথ।

এইবার কথা বলা যাক অভিনেতাদের অভিনয় নিয়ে। একটা জিনিস খেয়াল করুন, একটা মৌলিক গল্প। যেটি কারো থেকে অনুপ্রাণিত নয় ;এখন সেই গল্পের চরিত্রটাকে কিভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে , কিভাবে ধারণ করতে হবে নিজের মধ্যে, আলাদা কিভাবে চিন্তা করতে হবে সবদিক থেকে এইসব দিক ভাবনা চিন্তা করা কিন্তু একজন পরিচালক, গল্পের লেখকের জন্য খুবই কষ্টকর। আর সবচেয়ে বড় কথা এখানে অভিনয়ের জন্য অভিনেতা নির্বাচন করা ; যা একটি গল্পের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক যেমনটা এখানে অভিনয় করানো হয়েছে, দুলকার সালমান, রাজকুমার রাও, গুলশন দেভাইয়া , সতীশ কৌশিক , আর্দশ গৌরব, রজতাভ দত্ত।এদের অভিনয়টা শুধু খেয়াল করে দেখুন। হয়তো কিচ্ছুক্ষণের জন্য ভুলে যাবেন এইসব তো ফেইক, এইরকম কি বাস্তবে হয় , এইরকম চিন্তা ধারা আদৌ কি ৯০ দশকে কি হতো!কিন্তু অভিনয় গুণে তা সবকিছুকেই উতরিয়ে গিয়েছে।

Guns and Gulaabs trailer: Raj and DK put a retro spin on crime dramas with Rajkummar  Rao, Dulquer Salmaan, Adarsh Gourav | Web-series News - The Indian Express
'গানস এন্ড গুলাবস' ওয়েব সিরিজে রাজকুমার রাও

অভিনয়ের কথা বিশ্লেষণ করতে গেলে আসবে রাজকুমার রাওয়ের কথা। সবারই একটা অভিনয়ের বিশেষত্ব থাকে। রাজকুমার রাওয়ের সেই ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম নয়। কোনো একটা সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় সেই সমস্যা কিভাবে সামাল দিচ্ছে ,আবার কিভাবে নিজের ভালোবাসার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে, তা রাজকুমার রাওয়ের থেকে আর ভালো করতে পারে না। ঠিক যেমনটা আগে “লুডু” সিনেমায় দেখা গিয়েছিল। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত পার করছেন দুলকার সালমান। একের পর এক সিনেমায় দক্ষ অভিনেতার পরিচয় দেওয়ার পর এই ওয়েব সিরিজেও ভালো পারফরমেন্স দেখিয়েছেন এই অভিনেতা। রোমান্টিক হোক কিংবা অ্যাকশন সবকিছুতেই ঠান্ডা মেজাজে অভিনয়টা উপভোগ করেন দুলকার সালমান।

Guns & Gulaabs, Starring Dulquer Salmaan and Rajkummar Rao, Out Today on  Netflix | Entertainment News
'গানস এন্ড গুলাবস' ওয়েব সিরিজে দুলকার সালমান

দুলকার সালমান এবং রাজকুমার রাও এই দুই অভিনেতাকে আমার নিজের আলাদা দৃষ্টিকোণ মতবাক্য রয়েছে। সাউথের যেসব অভিনেতা রয়েছে তাদের মধ্যে খুবই কম বেশি বলিউডে অভিনয় করেছেন এবং তাদের অভিনয়ের বৈচিত্র্যময় ছাপ রেখেছেন কিন্তু দুলকার সালমানের ক্ষেত্রে কোথাও গিয়ে যেনো সেইরকম দৃষ্টিনন্দন চরিত্র-সিনেমা তৈরি হয়নি। যদিও 'চুপ' এবং 'কারওয়ান' সিনেমাতে তার অভিনয় পারদর্শী দেখালেও বাকি পরিচালকদের কেনো তা চোখে পড়েনি তা আসলেই প্রশ্নবিদ্ধ।অন্যদিকে এই সিরিজে রাজকুমার রাওকে দেখার সময় আগেও বলেছি অনেকটা লুডু সিনেমায় অভিনীত রাজকুমার রাও (আলোক কুমার) চরিত্রের উপস্থিতি টের পেয়েছি। ভাবছি, কমেডির বাইরে যে তিনি অ্যাকশনেও যে সমান দক্ষ তা তিনি আবার প্রমাণ করলেন‌। গৎবাঁধা অভিনয় একজন অভিনেতাকে ভালো কিছু এনে দিতে পারে না। রাজকুমার রাও এর অভিনয় নিয়ে আমার দ্বিমত নেই কিন্তু কমেডির পাশাপাশি তার বাকিসব চরিত্রেও এক্সপেরিমেন্টাল করা উচিত এবং সেইসব চরিত্রে কাজের পরিধি বাড়ানো উচিত।  এতে দর্শক হিসেবে আমরাও উপভোগ্য এবং রোমন্থনযোগ্য চরিত্র ও সিনেমা উপহার হিসেবে পাবো।

Omkara | Watch Saif Ali Khan is the New Baahubali Now | Eros Now
'ওমকারা' সিনেমায় সাইফ আলী খান

এই বিষয়টি তার বয়সে থাকাকালীন সাইফ আলী খান সম্ভবত টের পেয়েছিলেন অনেক আগেই টের পেয়েছিলেন। ২০০৩ সালে কাল হো না হোতে রোমান্টিক বয় হিসেবে অভিনয় করা সাইফ আলী খান এর ঠিক ৩ বছর পর ওমকারা সিনেমাতে ভিলেন হিসেবে নিজেকে এমনভাবে প্রকাশ করলেন তা আসলেই একজন সিনেমাপ্রেমী হিসেবে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। ঝোঁকের বসে যখন সাইফ আলী খানের আইকনিক চরিত্রগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে যায় তখন তার ওমকারায় অভিনীত লংদা ত্যাগী চরিত্রটি এখনো অবাক করিয়ে দেয়।

Guns & Gulaabs (TV Series 2023– ) - IMDb
'গানস এন্ড গুলাবস' ওয়েব সিরিজে গুলশান দেভাইয়া

এইবার আসবো বলিউডের আন্ডাররেটেড অভিনেতা গুলশন দেভাইয়ার প্রসঙ্গ নিয়ে। বলিউডের যেকজন প্রতিভাবান আন্ডাররেটেড অভিনেতা আছেন তাদের মধ্যে গুলশান দেভাইয়ার অন্যতম‌। পজিটিভ চরিত্রের পাশাপাশি থেকেও যখনই নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। তাই গুলশন দেভাইয়া এই অভিনেতা বলিউডের আশীর্বাদ বললেও কম বলা হবে। নিজের ভার্সেটাইল অভিনয়গুণে নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছেন।“আত্মারাম” এই রোলে অভিনয় ছিল তার ক্যারিয়ার সেরা পারফর্মেন্স। ডাইলগ ডেলিভারি, চরিত্র অনুযায়ী মুভমেন্ট সবকিছুই মিলিয়ে ব্যাপক ছিলো। বিশেষ করে তার যে চরিত্র ছিল “ পরপর ৭ বার মৃত্যুর সামনে গেলেও সে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসবে”। বর্তমান যুগে এসেও এখনো যে পৌরাণিক মাইথোলজির দারুণ ব্যবহার করেছে তার জন্য রাজ এন্ড ডিকে আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে। পরিচালক চাইলে এই ক্যারেক্টার নিয়ে একটা স্পিন অফ সিরিজ চাইলে বানাতে পারে। আর গুলশন দেভাইয়ার কথা যখন বলে রাখা ভালো, এই অভিনেতার এই পর্যন্ত অনেক ভালো কাজে অভিনয় রয়েছে। কিন্তু বরাবরের মতো খুবই আন্ডারেটেড, তাই বলিউডের এই অভিনেতার প্রতি আরেকটু জোর দেওয়া দরকার।

The Rainbow Shades of 'Guns and Gulaabs' - Gaysi
'গানস এন্ড গুলাবস' ওয়েব সিরিজে আর্দশ গৌরব

আর পাশাপাশি আর্দশ গৌরব ছিলেন এই সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।একজন গ্যাংস্টারের ছেলে হয়ে কিভাবে নিজেকে ব্যবসায় নিজেকে ফিট করতে হয় সেই গুণাবলী দেখা গিয়েছিল, বাঘা অভিনেতাদের মাঝে থেকেও অতিরঞ্জিত কিছু না করে সমানতালে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন তবে সবশেষে তিনি যা দেখালেন তা এককথায় স্তব্দ করে দেওয়ার মতো। অল্প সময়েই পজিটিভ এবং নেগেটিভ চরিত্রতে নিজেকে ভালোয় মানানসই অভিনেতা হিসেবে তৈরি করেছে। ৯ বছরের ক্যারিয়ারে তথাকথিত রোমান্টিক হিরোর পথ বেছে না নিয়ে একের পর এক বৈচিত্র্য সিনেমায় বা ওয়েব সিরিজে ভিন্ন চরিত্রে হাজির হওয়া এই অভিনেতা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।অন্যদিকে সতীশ কৌশিক ও রজতাভ দত্ত এই দুই গুণী অভিনেতা বরাবরই তাদের নরমাল অভিনয়গুণে দর্শকদের আনন্দিত করেছে। স্বল্প স্ক্রিন পেয়েও দাপটের সাথে অভিনয় করেছে।

তাছাড়া শেষের দিকে যে শেষ এপিসোডটি ছিল এককথায় প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখার মতো। টুইস্ট এন্ড ট্রানের যে ফিল , তা এই সিরিজের শেষভাগে এসে সবাইকে অনুভব করাবে। আর সিরিজের যে সমাপ্তি রেখেছে পরিচালক তা এক প্রকার মাইন্ড গেম খেলছে দর্শকদের সাথে। এমনভাবে শেষ করেছে চাইলে যাতে গল্পের শেষ ধরে নেওয়া যায় আবার নতুন গল্পের শুরু বলা যায়।‘রাজ এন্ড ডিকে ‘ এই পরিচালক নরমাল ধাঁচের গল্পগুলো থেকে বের হয়ে ড্রাক কমেডিধর্মী গল্প বানাতে ওস্তাদ। প্রশ্ন আসতে পারে এই গানস এন্ড গুলাবস রাজ এন্ড ডিকের বাকি ওয়েব সিরিজের মতো হলো কি! যদি এই প্রশ্নের উত্তর চাওয়া হয় তাহলে বলা যায়, এই পর্যন্ত রাজ এন্ড ডিকে যতোগুলো কাজ করেছেন যেমন, ‘গো গোয়া গান’, ‘শোর ইন দ্য সিটি’, ‘এ জেন্টেলম্যান ‘, ‘স্ত্রী’, (ওয়েব সিরিজ ‘দ্যা ফ্যামিলি ম্যান’ , ‘ফর্জি’) এইসব কিছুতেই চরিত্রগুলোর একটা ইমোশন , প্রধান অভিনেতার ভূমিকা, বিরোধী অভিনেতার আসল উদ্দেশ্য কি ! তাছাড়া ড্রাক কমেডিধর্মী তো আছেই। এইসব কিছুর একটা মিশ্রণ থাকতো। 

কিন্তু পরিচালক রাজ এন্ড ডিকে এইবার সবকিছুকে পিছনে ফেলে অন্যরকম গল্প আনতে চেয়েছেন , তাও নব্বই দশকের পুরোনো আমলের। কিন্তু পুরোনো আমলের গ্যাংস্টারের রোলগুলোতেও প্রোটাগনিস্ট কে থাকে, এন্টাগনিস্ট কে থাকছে তা সহজে বুঝা যায়। এইবার রাজ এন্ড ডিকে এত বাঘা বাঘা অভিনেতা নিয়েও আসল প্রোটাগনিস্ট, আসল এন্টাগনিস্টকে তা সামনে আনতে পারেনি। তাই দর্শকদের এই জায়গায় কনফিউজড হতেই পারে। তাছাড়া রাজ এন্ড ডিকের পূর্বের কাজগুলোতে যে ইমোশন ড্রামা আর যে ভালোবাসার প্লটের যে জায়গাটা থাকে তা এখানে অনেকটায় মিসিং। যা অনুভব করা যায় না।

আর ব্যক্তিগত মতামত অনুসারে আমার কাছে স্কুল মাস্টার (টিজে ভানু পার্বতীমূর্তি অভিনীত) চন্দ্রলেখার চরিত্রটির গুরুত্ব এবং তার আসল উদ্দেশ্য কি ছিলো তা আরেকটু স্পষ্টগত এবং যৌক্তিকজায়গা থেকে সাজানো যেতো। কারণ একজন দর্শক হিসেবে দেখার সময় আমার মনে হচ্ছিল এই চরিত্রটা কেনো রাখা হয়েছে! পরে সবার শেষ দৃশ্যে গিয়ে এই চরিত্রের তাৎপর্য দেখা যায়। কিন্তু সব চরিত্রের আলাদাভাবে একটা ভূমিকা থাকে। সেটা চরিত্র পরিচয় করানোর জন্য হোক অথবা চরিত্রটি যে লক্ষ্যে কাজ করছে সেই লক্ষ্য অর্জনের ভূমিকা পরিচয় হিসেবে হোক। যা এখানে স্কুল চরিত্রর মাঝে খামতি ছিল।তার সাথে রাজকুমার রাও(টিপুর)চরিত্রের সাথে সংযোগ স্থাপনটা ছিলো পুরোটিই বিছিন্ন, ইমোশন নেই বললেই চলে এক প্রকার। তবুও শেষ কয়েক মিনিটের অভিনয়ে পুরো সিরিজে তার চরিত্রের উপস্থিতিতে যে খামখেয়ালি তা পার পেয়ে যায়।

তাছাড়া শেষ দৃশ্যকে একটু বেশি ফোকাস করতে গিয়ে পরিচালক পূর্বের এপিসোডগুলো খুবই স্লোমোশনে দেখিয়েছে, যা আরেকটু গতি বাড়াতে পারতো। সর্বোপরি বলা যায় রাজ এন্ড ডিকে মানেই যে নতুন কিছু মশলাদার কাজ তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর এইবারও তার ব্যতিক্রম দেয়নি। নিজের কমফোর্টজোনের মধ্যে ভিন্নতা আনার প্রক্রিয়ার জন্য এবং আমাদের সোনালী অতীত ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য রাজ এন্ড ডিকে কে ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে। যাঁরা এখনো এই সিরিজটির স্বাদ নেননি, তাঁদের জন্য এটি এখনো অপেক্ষায়-সময় করে তাঁরা নিশ্চিন্তে দেখে নিতে পারেন।

লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি। পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।

Comments

    Please login to post comment. Login