আমাদের চিটাগাঙয়ে, তেলের মচমচা একধরনের খাস্তা পরোটা পাওয়া যায়। ঢাকাতেও যায়, পুরোনো মিষ্টির দোকানে পাবেন। ঝাল যেকোন কিছু দিয়ে খেতে অমৃত। আমার শহরের মানুষ, এমন পরোটা চা'তে ডুবিয়ে খায়। শীতের সকালে আমার নানী, কালেভাদ্রে গোমড়া মুখে আমাকে ১০টাকা দিতেন। এমন একটা পরোটার দাম ৩টাকা। আমার ছোট জীবনের বড় একটা অংশ জুড়ে থাকা ওমন সকালে, আমি জ্যাকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে খাস্তা পরোটা কিনতে বের হতাম।
আমার জীবনটাই ছোট -চাইলের দুটো স্যুটকেসে পুরে ফেলা যায়। আমি, আমার নিঃশব্দের হাউ-কাউ আর আমাকে নিয়ে চিন্তাগ্রস্থ আমার নানী ...
সকাল বেলা এই পরোটা ছাড়া, খোলাজালের পিঠা বলে আরেক জিনিস কপালে জুটতো একসময়। আমার আম্মু রান্না-বান্না দুচক্ষে দেখতে পারেন না। কিন্তু আমি পছন্দ করি বলে, গরুর নলীর সাথে, হাসের ডিম দিয়ে খোলাজালি পিঠা বানিয়ে খুব খাওয়াতেন। মায়ের সাথে আমার দূরত্ব সমুদ্রের মতন, এই সময়টায় আমরা শেষ বিকেলের সাগরতীরে এসে দাড়াতাম দুজন। বয়সের ভারে ক্লান্ত হওয়াতে মনে হয়, এবার আর খাওয়া হল না আমার।
ফুলকপি কিংবা টমেটো আর শীমের বিচি দিয়ে রুই মাছ, অনেকগুলা পেয়াজ, টমেটো আর একটা লম্বা করে মাঝে কাটা মরিচ দিয়ে মাখো মাখো করে চিংড়ি ভুনা, আমের স্বাদের মুগ ডাল, পাটায় পেষা নারিকেল-চিংড়ির ঝাল ভর্তা তারপর টক-মিস্টি-ঝালের আচার ... প্রিয় সব খাবারের লিস্টি লম্বা হয়। আর খাওয়া হয় না।
মাঝেমাঝে ছেলেবেলার মজার, প্রিয় সব খাবারের কথা যতটা মনে পড়ে, তারচেয়ে বেশি মনে পড়ে এসবের সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষের কথা। আমাকে খাওয়াতে পেরে নানীর চোখেমুখে আনন্দ, হাত মোছার জন্যে গামছা হাতে হুইলচেয়ারে তার বসে থাকা, আমার যে মা সারাজীবন চিল্লাফাল্লা করে জীবন পার করলো অথচ খুব নরম স্বরে আমাকে তার জিজ্ঞেস করা, ' আরেকটা পিঠা নিবা আব্বু ? ডিময়ালা দেখে আরেকটা নাও ...' কিংবা ঐযে ঢাকার খুব মামুলী হোটেলে তেলঝোলে খেতে ভালবাসতাম; সেটার যে ওয়েটার মামা হাসিমুখে হাত কচলিয়ে বলতেন, 'ম্যালাদিন পড়ে আসলেন মামা ...'
সব জায়গাতেই পয়সা দিয়ে খাওয়া লাগে। কিন্তু এইসব সাধারণ হোটেলে মানুষে মানুষের মধ্যে একটা টান গড়ে ওঠে। প্লেট খালি হলে পয়সার তোয়াক্কা না করে মামারা থোরা এনে দেয়। মাংসের পিস না চাইতেই পাল্টে দেয়। এরবেশি কিছু কখনো তো চায়নি বালক !
সিয়্যাটলে কিচ্ছু পাওয়া যায় না কিন্তু ক্যালফোর্নিয়াতে দেখি দেশের সব কিছু পাওয়া যায়। মোয়ার প্যাকেট হাতে নিয়ে দাম পড়তে পারলাম না, চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো। একটা মানুষের সাথে, আমরা আমাদের জীবনেরও কিছু অংশ হারাই।
আমার মনে হয় না আর কখনো দেশে ফেরা হবে। একদিন হুট করে একটা ফোন আসবে, 'আচ্ছা' বলে আমি হয়তো চুপ করে কোন জানালার পাশে বসে থাকবো। দেশের সাথে আমার যে সুতো, সেটা ছিড়ে যাবে।
মানুষ হয়ে জন্মালে, অদৃশ্য খাতায় খালি আফসোস আর অপেক্ষার লিস্টি লম্বা হয়। যেমনে নাচায় তেমনি নেচে দিনশেষে শুন্য হাতে আবিষ্কার করা লাগে, 'পুতুলের কি দোষ ...?!'
-রাকীবামানিবাস
৮ই জানুয়ারী,২০২৬
