
শহরের একদম শেষ প্রান্তের ট্রাফিক সিগন্যালটি একটু অদ্ভুত। এরপরই হাইওয়ে, যেখানে যান্ত্রিক শহরটা হঠাৎ করে ফুরিয়ে গিয়ে দিগন্তজোড়া শূন্যতায় মিশে যায়। রাত তখন ১১টা ৪৫ মিনিট। বৃদ্ধ সিগন্যাল বাতিটা লাল হয়ে জ্বলে উঠল। রফিক সাহেব তার পুরনো ট্যাক্সিটা থামালেন। পেছনে বসে থাকা তরুণ যাত্রীটি অস্থির হয়ে বারবার ঘড়ি দেখছে।
রফিক সাহেব আয়নায় যাত্রীটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "এত তাড়াহুড়ো কিসের বাবা? এই সিগন্যালটা মাত্র ৯০ সেকেন্ডের। জীবনের চেয়ে বড় তো আর কিছু নয়।"
তরুণটি বিরক্ত হয়ে বলল, "আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইন্টারভিউয়ের রেজাল্ট দেবে অনলাইনে। আর আমার ল্যাপটপের চার্জ শেষ হতে চলেছে। বাসায় পৌঁছাতে দেরি হলে আমি হয়তো জানতেও পারব না আমি সফল হয়েছি কি না।"
রফিক সাহেব শান্ত গলায় বললেন, "আমিও এই সিগন্যালে একবার আটকেছিলাম আজ থেকে বিশ বছর আগে। সেদিন আমার হাতে কোনো ল্যাপটপ ছিল না, ছিল এক তোড়া রক্তিম গোলাপ। আমার স্ত্রীর প্রথম বিবাহবার্ষিকী ছিল। কিন্তু সেই সিগন্যালে আমি ট্রাফিক আইন ভেঙে চলে গিয়েছিলাম দ্রুত পৌঁছানোর লোভে।"
তরুণটি কৌতূহলী হয়ে থামল। রফিক সাহেব বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "সেই দ্রুত পৌঁছানোটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমি সময় বাঁচাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু জীবনের গতিপথ হারিয়ে ফেলেছিলাম এক ভয়ানক দুর্ঘটনায়। আমার স্ত্রী বেঁচে ফিরলেও তার দুই পা কেড়ে নিয়েছিল সেই মুহূর্তের অস্থিরতা।"
গাড়ির ভেতরটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। সিগন্যালের ডিজিটাল ঘড়িতে তখন ৩০ সেকেন্ড বাকি। রফিক সাহেব বললেন, "এই শেষ সিগন্যালটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে নিরাপদে পৌঁছানোটা বেশি জরুরি। একটু দেরি হওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়।"
সিগন্যাল সবুজ হলো। তরুণটি ল্যাপটপটা ব্যাগে ভরে সিটের পেছনে হেলান দিয়ে বসল। তার চোখে এখন আর অস্থিরতা নেই, বরং এক অদ্ভুত শান্তি। সে বুঝতে পারল, জীবনের সব হিসাব ল্যাপটপের স্ক্রিনে মেলে না; কিছু হিসাব মেলে এই ধীরগতির অভিজ্ঞতায়।
গাড়িটা যখন হাইওয়েতে পড়ল, তখন এক পশলা বৃষ্টি নামল। রফিক সাহেবের ট্যাক্সির মিটারে তখন কেবল টাকার অঙ্ক নয়, জীবনের এক গভীর সত্য উঠে আসছিল।