
হৃত্বিক রোশন-যার অভিনয়ের সৌন্দর্য কেবল চোখে ধরা পড়ে না, ধীরে ধীরে দর্শকের ভেতরে কাজ করে। বলিউডের মূলধারার তারকাদের ভিড়ে তিনি বরাবরই একটু আলাদা। ক্যারিয়ারে অসংখ্য হিট-ফ্লপ, বাণিজ্যিক বিনোদন আর কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এক্সপেরিমেন্টাল চরিত্র-সব মিলিয়ে হৃত্বিক নিজেকে কখনোই একমাত্রিক তারকায় আটকে রাখেননি। যখন বলিউড পুরোদস্তুর কমার্শিয়াল ছিল তখনও তিনি এক্সপেরিমেন্ট করতে দ্বিধা করেন নি, বরং নতুনত্ব নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন নিজের কাঠামো প্রণালীতে। হৃতিক রোশনের ডেব্যু সিনেমা ‘কহো না পেয়ার হ্যায়’ রিলিজ হয় ২০০০ সালে। আজ থেকে ২৬ বছর আগে। নির্মাতা রাকেশ রোশন বানিয়েছিলেন রোমান্টিক সিনেমাটি। গল্পে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন হৃতিক। বলা যায়, এর মাধ্যমেই বলিউড পেয়ে যায় তাদের নতুন সূর্য। এ সময় কালো লেদার জ্যাকেট পরা হৃতিকের চুল পেছনে আঁচড়ানো, চোখে রিমলেস চশমা। সিগন্যাল সবুজ সংকেত দিলে তিনি দূরে চলে যান। বুঝতে বাকি থাকে না চুইংগাম চিবানো এই মোটরসাইকেল আরোহী পপ কালচারের সঙ্গে যুক্ত।

স্টারকিড বলে যে একটা ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয় সেটা দুহাজার সালের শুরুর দিকে অতোটা জনপ্রিয় ছিল না। থাকলেও রাকেশ রোশনকে জনপ্রিয় তারকার কাতারে কেউ ফেলার মতো পাওয়া যেত না তখন। সম্পত্তি বন্ধক রেখে নিজের ছেলেকে সিনেমায় সুযোগ দিয়েছিলেন, তবুও প্রথমে তো সুযোগ দিতেই চান নি। ভরসা করতে পারেন নি নিজের ছেলের ওপরই। ফ্লপ দিয়ে সময় নিয়েছেন সমসাময়িকদের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু যখনই এসেছেন বড় করে এসেছেন।কিন্তু প্রথম সিনেমায় চকলেট হিরো হয়ে পুরো দেশজয় করে পরের সিনেমায় জঙ্গি চরিত্র করার সাহস করে কেউ? যখনকার কথা বলছি তখন দাঙ্গা উপমহাদেশজুড়ে খুব নিয়মিত একটা বিষয়। কাশ্মীর তখন উত্তাল যখন মিশন কাশ্মীরে পথ হারিয়ে ফেলা যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেন হৃত্বিক।
আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিজা কেবল হৃত্বিক রোশনের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ছবি নয়; এটি এক ধরনের নীরব ঘোষণা—তিনি শুধু রোমান্টিক স্বপ্নবিক্রেতা হয়ে থাকতে চান না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাবলে অবাকই লাগে, এমন একটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, অস্বস্তিকর এবং ধীরগতির গল্পে একজন সদ্য-উদিত সুপারস্টার নিজেকে জড়াতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু নব্বই ও দুই হাজারের শুরুর দিকের হিন্দি সিনেমা ছিল ভিন্নরকম—সাহসী, প্রশ্নমুখর এবং সময়ের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী। ফিজা সেই সময়েরই সন্তান।

ছবিটির কেন্দ্রে অবশ্যই করিশ্মা কাপুরের ফিজা-একজন মুসলিম নারী, যিনি ১৯৯৩ সালের বোম্বে দাঙ্গার পর নিখোঁজ ভাইকে খুঁজে ফেরেন। কিন্তু আমার চোখে, এই অনুসন্ধান যতটা না একজন বোনের, ততটাই এক দেশের আত্মপরিচয়ের। সেই অনুসন্ধানের ভেতরেই ঢুকে পড়ে আমান-হৃত্বিক রোশনের চরিত্র। কাগজে-কলমে, কাহো না… প্যার হ্যায়-এর রোহিত আর ফিজা- এর আমান একেবারেই বিপরীত মেরুর। একজন আলো, প্রেম আর গান; অন্যজন অন্ধকার, বিচ্ছিন্নতা আর সহিংসতার প্রতীক। কিন্তু ভেতরের সুর একই-দু’জনেই ভাঙা পরিচয়ের মানুষ।এখানে হৃত্বিকের তথাকথিত ‘ডাবল রোল’ আসলে রূপক। আমান একসঙ্গে দুই মানুষ-একদিকে জিহাদের নামে গ্রাস হয়ে যাওয়া একজন সন্ত্রাসী, অন্যদিকে মা-বোনের জন্য হাহাকার করা এক নিঃশব্দ সন্তান। এই দ্বন্দ্বই চরিত্রটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আমার কাছে আমান কোনো স্লোগানধর্মী রাজনৈতিক চরিত্র নয়; সে একটি প্রশ্ন-কীভাবে একটি সমাজ, একটি সময়, একটি ক্ষত একজন সাধারণ ছেলেকে ধীরে ধীরে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়?
হৃত্বিকের উপস্থিতি এখানে অদ্ভুতভাবে সংযত। ছবির বড় একটা অংশে তিনি নেই, তবু তাঁর অনুপস্থিতিই যেন এক ধরনের উপস্থিতি হয়ে থাকে। সদ্য সুপারস্টার হয়ে ওঠা একজন অভিনেতার ক্ষেত্রে এটি বিরল। কিন্তু এই অনুপস্থিতির ভেতরেই ছবির টান। দর্শক অপেক্ষা করে-ঠিক যেমন ফিজা অপেক্ষা করে তার ভাইয়ের জন্য। আমার মনে হয়, এই অপেক্ষাই ছবিটিকে আরও গভীর করে তোলে।অভিনয়ের দিক থেকে আমানে একটা নবাগতসুলভ চেষ্টা স্পষ্ট। কোথাও অতিনাটক নেই, নেই নিজেকে প্রমাণ করার তাড়াহুড়ো। বরং এক ধরনের অনিশ্চয়তা, এক ধরনের ভেতরের ক্ষয়। আমান এমন এক ছেলে, যার ভালোবাসা ঘৃণার মুখোশ পরে নিয়েছে; যার মুখে যেমন ভয়ের ছায়া, তেমনি মানবিকতার শেষ চিহ্নও।ক্যারিয়ারের এত শুরুর দিকেই হৃত্বিক এই ধরনের শিল্পীসত্তার অনুসন্ধানে নামবেন-এটা আমার কাছে দর্শক হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।পেছন ফিরে তাকালে ফিজা হয়তো চোখ ধাঁধানো কোনো অভিনয় নয়, কিন্তু এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ছবিই ইঙ্গিত দিয়েছিল-একজন তারকার আগমন ঘটছে, যে নিজের স্টার ইমেজের আড়ালে লুকিয়ে পড়তে চান না; বরং জাতি, রাজনীতি এবং সময়ের অস্বস্তিকর গল্পের ভেতরে নিজেকে আবিষ্কার করতে প্রস্তুত। সেই অর্থে ফিজা শুধু একটি ছবি নয়, এটি হৃত্বিক রোশনের ভবিষ্যৎ পথচলার পূর্বাভাস।

এরপর হৃতিককে নতুন করে আবার দেখা যায় অলস জীবন ত্যাগ করে একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হতে। লক্ষ্য এমন এক ছবি, যা দেখতে যুদ্ধের গল্প মনে হলেও আসলে এটি আত্মপরিচয়ের যুদ্ধ। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাবলে-একজন শহুরে, দায়িত্বহীন যুবক হঠাৎ সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে এবং কার্গিল যুদ্ধ জয় করবে-এই প্লট শুনে অনেকেই ভ্রু কুঁচকাত। কিন্তু ২০০৪ সাল ছিল একটু আলাদা সময়। তখন দেশপ্রেম ছিল অপেক্ষাকৃত নীরব, কম আক্রমণাত্মক। আর ফারহান আখতারের লক্ষ্য সেই সময়ের সুযোগ নিয়েই যুদ্ধের মোড়কে এক অনবদ্য coming-of-age গল্প বলে।
হৃত্বিক রোশনের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানে এই যে, তিনি দেশপ্রেমকে কখনোই চেঁচামেচি করা আবেগ বানাননি। করণ শেরগিলের রূপান্তর-একজন বিলাসী, দায়িত্বহীন কিশোর থেকে এক স্থির, সংযত প্রাপ্তবয়স্কে-কোথাও হঠাৎ বা কৃত্রিম মনে হয় না। এই পরিবর্তনটি ধাপে ধাপে আসে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুটি আলাদা চরিত্রের মতো নয়, বরং একই মানুষের জীবনের দুটি আলাদা পর্যায়ের মতো লাগে। এই বিশ্বাসযোগ্যতার বড় কৃতিত্ব হৃত্বিকের।আমার কাছে করণের যাত্রা আরও ব্যক্তিগত মনে হয়, কারণ এটি রিল আর রিয়েল জীবনের এক অদ্ভুত মিলনবিন্দুতে দাঁড়িয়ে। যেমন করণ বদলায়, তেমনই বদলাচ্ছিলেন ফারহান আখতার নিজেও-একজন মানুষ ও একজন নির্মাতা হিসেবে। দিল চাহতা হ্যায়-এর কলেজ-পরবর্তী প্রেম, বন্ধুত্ব থেকে বেরিয়ে এসে লক্ষ্য-এর মতো সিনেমার জন্য কঠোর দৃঢ়তায় পৌঁছনোর যাত্রা যেন পরিচালকের নিজের পরিণতির প্রতিচ্ছবি। একই সঙ্গে, লক্ষ্য হয়ে ওঠে হৃত্বিক রোশনেরও এক ধরনের মুক্তি। লক্ষ্য-এর আগের হৃত্বিক মানেই ছিল তারকাখ্যাতির আত্মতুষ্টি উচ্ছ্বাসে মগ্ন থাকা এক অভিনেতা। সেই সময়ের কিছু ছবিতে (আপ মুঝে আচ্ছা লাগনে লাগে, ইয়াদেঁ, না তুম জানো না হাম, মুঝসে দোস্তি করোগে!, এমনকি ম্যায় প্রেম কি দীওয়ানি হুঁ) সেই গ্ল্যামারই তাকে আটকে রেখেছিল। আমার চোখে, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগের করণ শেরগিল তথা সেই সময়কার হৃত্বিকের সিগনেচার ছিলো অতি জনপ্রিয় উজ্জ্বল তারকা কিন্তু সিনেমার ধারণা সম্পর্কে দিশাহীন।
আর মেজর করণ শেরগিল? তিনি সেই হৃত্বিক, যিনি পরিমাণের চেয়ে গুণকে বেছে নিতে শুরু করেন। যিনি বোঝেন, অভিনয়ের শক্তি সবসময় উচ্চস্বরে নয়; কখনো কখনো সবচেয়ে নীরব মুহূর্তই ছবির শ্রেষ্ঠ দৃশ্য হয়ে ওঠে। বাবার সঙ্গে করণের ফোনালাপ—এই একটি দৃশ্যই প্রমাণ করে, কীভাবে হৃত্বিক ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো বদভ্যাস, মুখভঙ্গির অতিনাটক ঝেড়ে ফেলতে শুরু করেন।আমার কাছে তাই লক্ষ্য মানে শুধু একটি যুদ্ধজয় নয়। এটি হৃত্বিক রোশনের নিজের সঙ্গেই করা এক কঠিন যুদ্ধ-যেখানে বহু লড়াই হারতে হয়েছে, অনেক ভুল স্বীকার করতে হয়েছে, তবেই এই একটি যুদ্ধ জেতা সম্ভব হয়েছে। আর সেই জয়ই তাঁকে একজন তারকা থেকে ধীরে ধীরে একজন অভিনেতায় রূপান্তরিত করে।

হৃতিকই প্রথম কোনো অভিনেতা, যিনি সুপার হিরোকে অনন্যরূপে উপস্থাপন করেছেন। কোই মিল গ্যায়ার (২০০৩) মাধ্যমে শুরু হওয়া কৃষ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে তিনি এমন এক সুপার হিরোর ভূমিকায় অভিনয় করেন, যার জাদু নামে ভিনগ্রহের এক প্রাণীর সঙ্গে দেখা হয় এবং তার ছোঁয়ায় অতিমানবীয় ক্ষমতার বিকাশ ঘটে।কৃষ (২০০৬) সিনেমার শুরুতে হৃতিককে ঘোড়ার সঙ্গে দৌড়াতে দেখা যায়। এ সময় তার বাহু, খোলা বুক এবং প্রশস্ত পিঠের ক্লোজআপ পর্দায় ফুটে ওঠে। কিন্তু সিনেমাটি একই সঙ্গে তার দীর্ঘ চুল, বন-সবুজ চোখ, দৃঢ় সংকল্পের অভিব্যক্তির ওপর ফোকাস করে। কৃষ-৩ (২০১৩)-এর ক্লাইম্যাক্সে খলনায়ক কালকে আঘাত করেন হৃতিক। তখন ক্যামেরা আবারও তার চোখে স্থির থাকে। এ সময় অশ্রুতে জলজল করে কৃষের চোখ। এখানে একদিকে যেমন ট্র্যাডিশনাল ম্যাসকুলিনিটি প্রকাশ পেয়েছে ; অন্যদিকে ট্র্যাডিশনাল ম্যাসকুলিনিটি ভেঙ্গে বর্তমান সময়ের আধুনিক ম্যাসকুলিনিটিও(পুরুষ মানেই: কাঁদতে পারবে, আবেগ দেখাতে পারবে) প্রকাশ পেয়েছে।

ধুম ২-এ হৃত্বিক মূলত কোনো নায়ক নন, আবার প্রথাগত অর্থে খলনায়কও নন। ‘আরিয়ান/মিস্টার এ’ চরিত্রটি স্টাইলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ঠান্ডা মস্তিষ্ক। জন আব্রাহাম ধুম-এ যে ট্রেন্ড শুরু করেছিলেন স্টাইলিশ ভিলেনের-হৃত্বিক সেটাকে শুধু এগিয়ে নেননি, একেবারে নতুন স্তরে নিয়ে গেছেন। এখানে তাঁর অভিনয়ের শক্তি ডায়লগের চেয়ে বেশি কাজ করে শারীরিক ভাষায়। চোখের দৃষ্টিতে আত্মবিশ্বাস, ঠোঁটের কোণে হালকা বিদ্রূপ, চলাফেরায় নিখুঁত কন্ট্রোল-সব মিলিয়ে তিনি এমন এক চরিত্র দাঁড় করান, যাকে ক্যামেরা ভালোবাসতে বাধ্য হয়। ধুম ২-এ হৃত্বিক নায়ককে ছাপিয়ে যান কারণ তিনি চরিত্রকে “কুল” বানাতে যাননি; বরং চরিত্রের ভেতরের হিসেবি মানসিকতাকে স্টাইলের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এটাই বেঞ্চমার্ক। ধুম নিয়ে কথা হচ্ছে যখন তখন এখানে ফেমিনিজমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিয়ে কথা বলা যাক। হৃতিকের অ্যাকশন সিনেমায় নারী চরিত্রের যথাযথ গুরুত্ব থাকে। হৃতিককে তার মিশনের জন্য সিনেমায় তাকে রানী এলিজাবেথের ছদ্মবেশ ধারণ করতে দেখা যায়।অপরদিকে ঐশ্বরিয়া রাইয়ের চরিত্রটিও তার অপরাধজীবনের যোগ্য সঙ্গী। এখানে ঐশ্বরিয়ার চরিত্র সুনহেরির প্রতি মিস্টার এ-এর ভালোবাসা পরিত্রাণ হয়ে ওঠে। কারণ নিজের মুক্তিই তার উদ্দেশ্য নয়। একইভাবে সিদ্ধার্থ আনন্দ পরিচালিত ব্যাং ব্যাং (২০১৪) সিনেমাটির ক্ষেত্রেও তাই। সিনেমায় ক্যাটরিনা কাইফের চরিত্রটি একজন চুপচাপ স্বভাবের ব্যাংককর্মীর। সেই তিনিই একজন গুপ্তচরের রোমাঞ্চকর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

হৃত্বিক রোশনের ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়; অশুতোষ গোয়ারিকারের যোধা আকবর-এ সম্রাট আকবর হয়ে হৃত্বিক রোশন যেন অজান্তেই বিদায় জানান তাঁর রোমান্টিক নায়ক-যুগকে-ঘোষণা ছাড়াই শেষ হয় এক অধ্যায়।প্রথম সাত বছরে ১৪টি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে হৃত্বিক তার স্টারডম কেবল প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং নিজেকে প্রমাণ করেছেন এক বহুমুখী অভিনেতা হিসেবে। কোই…মিল গায়া, লক্ষ্য, কৃশ, ধুম ২-এই হিটগুলোর মধ্যে তার আবির্ভাব ছিল চমকপ্রদ।
কিন্তু যোধা আকবরের জন্য ধীরগতি গ্রহণ করা যা সাহসী পদক্ষেপ ছিলো তখনকার ইয়াং এইজে দাঁড়িয়ে। কারণ তখনকার সময়ে অফ ট্র্যাক সিনেমার প্রতি আকর্ষণ অল্প সময়ে সিনেমায় যারা এসেছে তাদের আগ্রহ খুব কমই পাওয়া যেতো। কিন্তু সেই প্রথা ভেঙ্গেছিলেন জন আব্রাহাম(যেমন: নো স্মোকিং, ওয়াটার, কাবুল এক্সপ্রেস)। তাই কাকতালীয়ভাবে বলা যেতেই পারে হৃত্বিকও যেনো জনের দেখানো পথেই যেনো হেঁটেছেন।
ধুম ২-এর পর দুই বছরের বিরতির পর এই ছবিটি আসে, যা দেখায়, হৃত্বিক শুধু দ্রুত কাজ করার ছেলেটি নয়, বরং চিন্তাশীল ও গভীর চরিত্রে আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত। আকবরের ভূমিকায় তার উপস্থিতি যেন রাজকীয় মূর্তিকে প্রাণ দেয়—চোখ, মুখমণ্ডল, কথা বলার ভঙ্গি সবকিছু মিলিয়ে তিনি এক জীবন্ত সম্রাট হিসেবে পর্দায় অবতীর্ণ হন।

অথচ ২০০১ সালে হৃতিকের বয়সে থাকাকালীন অশোকা ছবিতে শাহরুখ খানকে অনেকের কাছে “স্টার শাহরুখ” হিসেবেই বেশি দেখা গেছে, “সম্রাট অশোক” হিসেবে নয়। ফলে চরিত্রটি সম্পূর্ণভাবে পর্দায় জীবন্ত হয়ে ওঠেনি-মনে হয়েছে অসম্পূর্ণ।
হৃত্বিকের আকবর শুধুমাত্র রাজা হিসেবে নয়, মানুষের মতো মানুষ-প্রেম, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং নৈতিকতার মাধ্যমে-এভাবে উপস্থাপন করা হয়। এই চরিত্র তাকে কেবল স্টার হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক বার্তা বহন করতে সক্ষম অভিনেতা হিসেবে তুলে ধরে। যোধা আকবর দেখায় বড় ইতিহাসকে ছোট মানবিক গল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করার শক্তি-কথা বলার ছাড়াই, দর্শককে ভাবিয়ে তোলা।এই চরিত্র হৃত্বিক রোশনের সবচেয়ে পরিপক্ক অভিনয়ের প্রমাণ। এখানে তার রাজকীয় উপস্থিতি, দর্শককে আকর্ষণ করার ক্ষমতা এবং চরিত্রের গভীরতা একসাথে আসে। এছাড়া, এই ছবিটি অশুতোষ গোয়ারিকারের তৃতীয় ও শেষ সফল সিনেমা বলা চলে, যা লাগান ও স্বদেশ সিনেমার পর মুক্তি পেয়েছিলো। এটি শুধু হৃত্বিকের ক্যারিয়ারের নয়, পুরো ঐ সময়ের বলিউডের ইতিহাসে একটি বিশেষ মুহূর্ত।

গুজারিশ-এর ইথান মাসকারেনহাস হৃত্বিক রোশনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সাহসী চরিত্রগুলোর একটি। এটি এমন এক অভিনয়, যা বক্স অফিস নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবান হয়ে ওঠে।গুজারিশ-এ হৃত্বিক রোশনের অভিনীত ইথান মাসকারেনহাস চরিত্রটির গুরুত্ব কেবল গল্পের কেন্দ্রে থাকার কারণে নয়, বরং বলিউডের নায়ক-কেন্দ্রিক ধারণাকে নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে প্রশ্ন করার জন্য। ইথান এমন এক চরিত্র, যার কোনো শারীরিক ক্ষমতা নেই, নেই প্রচলিত বীরত্ব, নেই কোনো দৃষ্টিনন্দিত নাচের হুকস্টেপ, নেই চটকদার সাফল্য। তবু পুরো ছবির আবেগ, দর্শনের ভার আর নৈতিক দ্বন্দ্বটি তাঁর কাঁধেই টিকে থাকে। এই চরিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-মানুষের অস্তিত্বের মূল্য শুধু কর্মক্ষমতায় নয়, আত্মসম্মান, স্মৃতি আর বেছে নেওয়ার অধিকারে নিহিত।
ইথান আসলে এক জীবন্ত রূপক। তিনি সেই মানুষ, যিনি একসময় জীবনের ভেতর জাদু ঢেলে দিতেন, অথচ আজ নিজেই দৈনন্দিন জীবনের কাছে পরাজিত। তাঁর যন্ত্রণার উৎস শারীরিক অক্ষমতা নয়, বরং আত্মপরিচয়ের ক্ষয়। ছবির প্রতিটি ফ্রেমে তাঁর মুখ, কণ্ঠ, চোখ আর নীরবতার ব্যবহার আমাদের বোঝায়-এই মানুষটি মরতে চায় বলে নয়, তিনি বাঁচার যে অর্থ একসময় জানতেন, তা আর খুঁজে পান না বলেই মৃত্যুকে মুক্তি হিসেবে ভাবেন। এই জায়গাটাই চরিত্রটিকে গভীরভাবে মানবিক করে তোলে।এই চরিত্র প্রমাণ করে-হৃত্বিকের স্টারডম কখনোই তাঁর শিল্পীসত্তার সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি। বরং তিনি যখন সবচেয়ে উঁচুতে ছিলেন, তখনই নিজের পরিচিত গণ্ডি ভেঙে এমন এক চরিত্রের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন, যা আজও বলিউডের মূলধারায় বিরল।
গুজারিশ-এ হৃত্বিক রোশনের ইথান মাসকারেনহাস চরিত্রটি অনেকটাই যেন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির দিকেই নীরব, অথচ তীক্ষ্ণ এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে, ইথান কেবল একজন কোয়াড্রিপ্লেজিক জাদুকর নন; তিনি সেই সব মানুষের প্রতীক, যাদের এই চাকচিক্যের শহর তখনই ভুলে যায়, যখন তারা আর “ব্যবহারযোগ্য” থাকে না।একটি দুর্ঘটনা-একটি অপ্রত্যাশিত বিরতি—সবকিছু থামিয়ে দেয়। এরপর ইথানের জীবনে আর কোনো দর্শক নেই, নেই ক্যামেরা, নেই করতালি। রয়ে যায় শুধু স্মৃতি। এই বদলে যাওয়া অবস্থানটাই আসলে ইন্ডাস্ট্রির নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে সামনে আনে—যেখানে মানুষ নয়, বরং তার সক্ষমতা, তার গ্ল্যামার আর বাজারমূল্যই শেষ কথা।
আমার কাছে ইথানের বাড়িটি যেন ইন্ডাস্ট্রিরই এক প্রতিচ্ছবি। বাইরে থেকে সুন্দর, অভিজাত; ভেতরে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো ঠিক সেইসব পুরোনো পোস্টার আর অ্যাওয়ার্ডের মতো, যেগুলো একসময় কারও গর্ব ছিল, কিন্তু আজ কেবল অতীত। আর আয়নাগুলো-সেগুলো সবচেয়ে নির্মম। তারা বারবার মনে করিয়ে দেয়, বর্তমান কতটা অসহায়, আর অতীত কতটা উজ্জ্বল ছিল। ইন্ডাস্ট্রিও ঠিক এমনই-সে অতীতকে উদ্যাপন করে, কিন্তু বর্তমানের দুর্বলতাকে ক্ষমা করে না।গুজারিশ নীরবে বলে-এই ইন্ডাস্ট্রি কাউকে হত্যা করে না, কিন্তু প্রয়োজনে খুব নিখুঁতভাবে ভুলে যেতে জানে। আর ইথানের ট্র্যাজেডি এখানেই-তিনি মরতে চান কারণ এই ভুলে যাওয়ার শহরে বেঁচে থাকার মানে কেবল ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।হৃত্বিক রোশনের উপস্থিতি আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। কারণ তিনি নিজেই সেই ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে ঝলমলে মুখগুলোর একটি। তাঁর শরীর, নাচ, স্টাইল-সবই মূলধারার সিনেমার পুঁজি। অথচ গুজারিশ-এ তিনি সেই সব পুঁজিকে প্রায় বাতিল করে দেন। আমার চোখে, এটা আত্মসমালোচনার মতো-একজন সুপারস্টার নিজেই প্রশ্ন করছেন, “যদি এই শরীরটা আর কাজ না করে, তাহলে আমি কে?” ধুম-২, কৃশ, যোধা আকবর-এর মতো ছবির পর তিনি চাইলে অনায়াসেই নিরাপদ স্টারডমে ভেসে যেতে পারতেন। কিন্তু গুজারিশ প্রমাণ করে, হৃত্বিক নিজেকে কেবল তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; তিনি অভিনেতা হিসেবে নিজেকে যাচাই করতে চেয়েছেন। এখানে তিনি নিজের শরীরী সৌন্দর্য, নাচ, অ্যাকশন-সবকিছুকেই প্রায় অকার্যকর করে দিয়েছেন। একজন সুপারস্টার হয়েও নিজেকে হুইলচেয়ারে বেঁধে ফেলা, কণ্ঠস্বর আর অভিব্যক্তিকে একমাত্র অস্ত্র বানানো-এটা কেবল আত্মবিশ্বাসী অভিনেতার পক্ষেই সম্ভব। জানিয়ে রাখি, জীবনের অর্থবহ তৈরি করা এই ক্লাট ক্লাসিক সিনেমাটি ছিলো বক্স অফিসে ফ্লপ।
উল্লেখ্য, গুজারিশ সিনেমায় হৃতিকের জীবন উপলব্ধিমূলক বেশকিছু আইকনিক সংলাপ ছিলো। তার মধ্যে Life bahut choti hai doston ... par dil se jiyo toh bahut hai ... so go on break the rules, forgive quickly, love truly and never regret anything that made you smile (জীবন খুবই ছোট, বন্ধুরা…কিন্তু মন দিয়ে বাঁচতে পারলে সেটাই অনেক।তাই এগিয়ে চলো-নিয়মের তোয়াক্কা করো না, দ্রুত ক্ষমা করো, সত্যিকারের ভালোবাসো,আর যে জিনিসগুলো তোমাকে হাসিয়েছে, সেগুলোর জন্য কখনোই অনুতাপ কোরো না। এই সংলাপটি বেশ জনপ্রিয়।
প্রচলিত হিরোইজম থেকে বেরিয়ে অনুরাগ বসু তাকে নিয়ে নির্মাণ করলেন ফেক-ট্যানড রোমান্টিক ট্র্যাজেডি সিনেমা; অর্থাৎ কাইটস।
বলিউডে ‘মার খাওয়া’ সাধারণত হিরোইজমেরই অংশ-রক্তাক্ত মুখ, ফুলে যাওয়া চোখ, তারপরও অদম্য শক্তি। কিন্তু কাইটস-এ হৃত্বিকের চরিত্রের মার খাওয়াটা আলাদা। এখানে তা কোনো বীরত্বের ঘোষণা নয়, বরং পরাজয়ের চিহ্ন। চরিত্রটি প্রেমে, জীবনে, পরিস্থিতিতে বারবার বিপর্যস্ত হয়। তবু আশ্চর্যভাবে, এই ভাঙাচোরার মধ্যেও হৃত্বিক এক ধরনের নান্দনিকতা ধরে রাখেন। এটি কেবল শারীরিক সৌন্দর্যের ব্যাপার নয়—এটি তাঁর শরীরী অভিনয়ের নিয়ন্ত্রণ।আমার কাছে হৃত্বিকের বড় শক্তি এখানেই-তিনি আঘাতকে গ্ল্যামারাইজ করেন না, আবার কুৎসিতও বানান না। মার খাওয়ার দৃশ্যগুলোতে তাঁর চোখে থাকে অসহায়ত্ব, শরীরে থাকে ক্লান্তি, অথচ মুখে এক ধরনের নীরব গ্রহণযোগ্যতা। এই ভারসাম্যই তাঁকে আলাদা করে। খুব কম অভিনেতাই পারেন এমনভাবে যন্ত্রণা প্রকাশ করতে, যেখানে দর্শক করুণা আর আকর্ষণ—দুটোই একসঙ্গে অনুভব করে। তার এই অবস্থা প্রমাণ করে যে, ভালোবাসার কাছে সবকিছুই মূল্যহীন।
অনুরাগ বসুর ছবির ‘ফেক-ট্যানড’ সৌন্দর্য, বিদেশি লোকেশন আর ট্র্যাজিক প্রেম-সব মিলিয়ে কাইটস অনেক সময় স্টাইলের ভারে নুয়ে পড়ে। কিন্তু হৃত্বিকের উপস্থিতি সেখানে শরীরের ভাষায় গল্প বলে। তিনি যেন এমন এক নায়ক, যে জানে—সব লড়াই জেতা যায় না, আর সব মার খাওয়াই বীরত্বের পদক নয়। এই উপলব্ধিটাই চরিত্রটিকে মানবিক করে তোলে।আমার চোখে, এই ধরনের চরিত্রে হৃত্বিকের প্রতি আলাদা একটা মায়া তৈরি হয়। কারণ তিনি এখানে সুপারহিরো নন, বিজয়ীও নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যে মার খায়, ভুল করে, ভেঙে পড়ে-তবু দেখতে “ভালো” লাগে, কারণ সেই ভাঙনটা সৎ। আর এই সৎ ভাঙনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হৃত্বিক রোশনের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড অভিনয় দক্ষতা-পরাজয়কে নান্দনিকভাবে বহন করার ক্ষমতা।ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, প্রথাগত হিরোইজম-অতিরঞ্জিত শক্তি, অকারণ বাহাদুরি বা নিখুঁত নৈতিকতা-আমার খুব একটা পছন্দ নয়। গল্প আর চরিত্রের গভীরতাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই হৃত্বিক আলাদা হয়ে যান। কারণ তিনি স্টার হয়েও চরিত্রকে প্রাধান্য দেন। তাঁর অভিনয় আজকের মডার্ন ডে যুগেও স্টাইলিশ লাগে কারণ সেই স্টাইল বাহ্যিক নয়, ভেতর থেকে আসে। তিনি শরীরী সৌন্দর্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন না, বরং সেটাকে ভাঙেন, বদলান।
তাঁর সময়কালীন অনেক অভিনেতাই জনপ্রিয়, সফল এবং দক্ষ-কিন্তু হৃত্বিকের জায়গাটা আলাদা কারণ তিনি নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্রভাবে জায়গা তৈরি করেছেন। তিনি একদিকে মাস এন্টারটেইনারের মুখ, অন্যদিকে চরিত্রনির্ভর অভিনয়ের ক্ষেত্রেও বিশ্বাসযোগ্য। এই ভারসাম্যটা খুব কম অভিনেতাই ধরে রাখতে পারেন। তাই হয়তো আজও, এত বছর পরেও, তাঁকে প্রতিস্থাপন করা যায় না। হৃত্বিক রোশন কোনো ট্রেন্ডের অংশ নন-তিনি নিজেই একটি ট্রেন্ড, যা সময়ের সঙ্গে বদলায়, কিন্তু পুরোনো হয় না।
)
অন্যদিকে জিন্দেগি না মিলেগি দোবারার অর্জুন চরিত্রটি হৃত্বিক রোশনের অভিনয় জীবনের নীরব কিন্তু গভীর বাঁকবদলের প্রতীক।এই ছবিতে তাঁকে দেখে প্রথমে মনে হতেই পারে- হৃত্বিক যেন নিজেকেই অভিনয় করছেন। অর্জুন, সেই সুদর্শন, কর্মপাগল কর্পোরেট মানুষটি, যে স্পেন সফরে গিয়ে কলেজ জীবনের বন্ধুদের সঙ্গে আবার নিজের মুখোমুখি হয়-তার কথা বলার ভঙ্গি, শরীরী ভাষা, হাঁটা, এমনকি রাগের প্রকাশও যেন হৃত্বিকের চেনা ছায়া। এমনকি কেউ কেউ বলতেই পারেন, “এই তো হৃত্বিক নিজেই।” কিন্তু আমার কাছে এখানেই অভিনয়ের সূক্ষ্মতা। কারণ নিজেকে ‘খেলানো’ সবচেয়ে কঠিন কাজ, আর অর্জুন আসলে এক ধরনের রিফ্লেক্সিভ পারফরম্যান্স-নিজের ইমেজকে সচেতনভাবে ব্যবহার করার শিল্প।
অর্জুনের মাধ্যমে হৃত্বিক যেন বুঝে যান-সব সময় অভিনয় দেখাতে হয় না। কতটা অভিনয় করতে হবে, সেটাও একধরনের অভিনয়। ক্যারিয়ারের প্রথম দশকে তিনি প্রায়ই নিশ্চিত করতেন, দর্শক যেন তাঁর অভিনয় “দেখতে পায়”। শরীর, চোখ, সংলাপ-সবই একটু বেশি করে উপস্থিত থাকত, চরিত্র যাই হোক না কেন। কিন্তু এই সিনেমাতে এসে সেই ব্যাকরণটাই বদলে যায়। অর্জুন শুরুতে এক প্রেশার কুকার—রাগ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ভেতরের শূন্যতা জমে থাকা এক মানুষ।ছবির প্রথম ভাগেই সে ফেটে পড়ে। তারপর ধীরে ধীরে সে নিজেকে পরিবেশের ভেতর মিশিয়ে দেয়—চটক না দেখিয়ে, শান্তিকে প্রদর্শন না করে।
আমার কাছে অর্জুনের স্কুবা-ডাইভিং দৃশ্যটি এই রূপান্তরের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কোনো বড় ডায়লগ নেই, নেই আবেগের প্রদর্শনী। পানির নিচে প্রথম ডাইভের পর নীরবে ঝরে পড়া কয়েক ফোঁটা চোখের জলই যথেষ্ট। এখানেই বোঝা যায়—লিড অভিনেতার চাপ থেকে মুক্ত হলে হৃত্বিক কতটা তরল, কতটা স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেন। এই দৃশ্য প্রমাণ করে, তিনি আর নিজের উপস্থিতি জাহির করতে চান না; বরং ফ্রেমের ভেতরে শান্তভাবে ‘থাকতে’ চান।এখানেই আসে মাল্টি-স্টারার সিনেমায় তাঁর পরিণত বোধ। এই সিনেমাতে প্রথমবারের মতো তিনি সীমিত ভূমিকা থেকে ফায়দা তোলার চেষ্টা করেন না। বরং ফ্রেম দখল না করেও ফ্রেমে টিকে থাকার ক্ষমতার ওপর ভরসা রাখেন। এই কারণে, আমার দৃষ্টিতে তাঁকে লিড অ্যাক্টর ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া একটু অস্বস্তিকর লাগে-কারণ তার শক্তি তার সমবায়ে, একক নায়কত্বে নয়। পুরস্কারের শ্রেণিবিন্যাস যখন খ্যাতির ওপর নির্ভর করে, তখন সেটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ছবিতে হৃত্বিকের রসায়ন। ফারহান আখতার ও অভয় দেওলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনোই একরকম নয়। দু’জনের সঙ্গেই তাঁর সমীকরণ আলাদা, ব্যক্তিগত, নিভৃত। এই ভিন্ন ভিন্ন বন্ধুত্বের স্তরই ছবিটিকে স্রেফ একটি ‘বাডি মুভি’ না রেখে তিনটি আলাদা ব্যক্তিগত যাত্রার মিলনস্থল বানিয়ে তোলে। আর অর্জুন সেই মিলনের মধ্যবিন্দুতে দাঁড়িয়ে, চুপচাপ নিজের মতো করে বদলে যেতে থাকে।
আমার কাছে তাই অর্জুন মানে হৃত্বিক রোশনের সেই মুহূর্ত, যখন তিনি বুঝে যান-অভিনয় মানে সব সময় সামনে আসা নয়; কখনো কখনো সরে দাঁড়িয়েই নিজের গভীর উপস্থিতি জানান দেওয়া।

আবার অগ্নিপথ একেবারেই ভিন্ন হৃত্বিক। এখানে কোনো গ্ল্যামার নেই, নেই নাচ-গান বা চেনা স্টার ইমেজ। বিজয় দিনানাথ চৌহান চরিত্রটি যেন রাগ, ক্ষুধা আর ক্ষতের সমষ্টি। ছোটবেলা থেকে বড় হওয়ার পুরো জার্নিটা লক্ষ্যকেন্দ্রিক—বাঁচা নয়, জেতাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য। হৃত্বিক এখানে সংলাপ কম বলে, কিন্তু চোখে চোখে গল্প বলে। তাঁর ভারী কণ্ঠস্বর, ধীর উচ্চারণ, এবং স্থির অথচ বিস্ফোরক উপস্থিতি চরিত্রটাকে বাস্তবের চেয়েও বেশি বাস্তব করে তোলে। ছোটবেলার অপমান, বাবার মৃত্যু, গ্রাম হারানোর যন্ত্রণা, পুরোনো অপমানের বদলা সব মিলিয়ে তার জীবন একমুখী করে তোলে তাকে। এই আক্রোশ যেনো কোথাও গিয়ে মেলোড্রামা হয় না, বরং একধরনের নীরব সহিংসতায় রূপ নেয়। এখানেই হৃত্বিকের বড় জয়।এখানে হৃত্বিক কোনো ‘হিরো’ নন, তিনি এক ট্র্যাজিক অ্যান্টি-হিরো।
![Trailer [OV]](https://m.media-amazon.com/images/M/MV5BZjIzZGMzNDEtYmVjMy00NWJlLTlmODQtZmE3OGZlNWRmYWJmXkEyXkFqcGdeQXZ3ZXNsZXk@._V1_.jpg)
‘বিক্রম বেধা’ নিঃসন্দেহে তামিল অরিজিনালের রিমেক। গল্পের কাঠামো, নৈতিক ধাঁধা, পুলিশ–গ্যাংস্টারের ক্যাট-অ্যান্ড-মাউস খেলাটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু তবুও হিন্দি সংস্করণে ছবিটা আলাদা হয়ে ওঠে মূলত এক জায়গায়—ঋত্বিক রোশনের বেধা। বরাবরের মতো এইবারও হৃতিকের ভিন্নধর্মী চরিত্রের চেষ্টার প্রয়াসে যুক্ত হলো বক্স অফিস ব্যর্থতা।
তামিল ভার্সনে যেখানে বেধা ছিল ঠান্ডা মাথার বুদ্ধিবাজ শয়তান, ঋত্বিক সেখানে ঢুকিয়েছেন এক ধরনের অস্থিরতা। এই বেধা শুধু হিসেবি ক্রিমিনাল নয়; সে যেন নিজের মধ্যেই একটানা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মানুষ। চোখে-মুখে সেই ম্যাডনেস-যেন সে নিজেই জানে, সে ঠিক না ভুল, নায়ক না খলনায়ক।ঋত্বিকের অ্যান্টি-হিরোটা তাই স্টাইলের চেয়েও বেশি মনের অবস্থা হয়ে ওঠে। তার হাঁটার ভঙ্গি, কথার ছন্দ, হঠাৎ চুপ করে যাওয়া বা অপ্রত্যাশিত হাসি-সব মিলিয়ে বেধা এখানে এক ধরনের দর্শন বহন করে। সে প্রশ্ন তোলে, কিন্তু উত্তর দেয় না। সে খেলায় জেতে না, হারেও না-শুধু প্রতিপক্ষকে নিজের মতো করে ভাবতে বাধ্য করে।সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা এখানেই। এই বেধা আমাদের সহানুভূতি চায় না, আবার ঘৃণাও দাবি করে না। ঋত্বিক চরিত্রটাকে এমনভাবে খেলেছেন যে দর্শক বুঝতে পারে-এটা একজন স্টারের অভিনয় নয়, বরং নিজের ইমেজ ভেঙে ফেলা এক অভিনেতার ঝুঁকি। হিট-ফ্লপের হিসাবের বাইরে গিয়ে, তিনি বেছে নিয়েছেন এক অস্বস্তিকর, ধূসর চরিত্র-যাকে ভালোবাসাও যায়, আবার বিশ্বাসও করা যায় না। সেই অর্থে, ‘বিক্রম বেধা’ রিমেক হলেও ঋত্বিকের বেধা কপি নয়। এটা তার নিজের তৈরি করা এক ম্যাড, অস্থির অ্যান্টি-হিরো-যে প্রমাণ করে, রিমেকের মধ্যেও অভিনেতা চাইলে নতুন পাঠ তৈরি করতে পারেন।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, অ্যাকশনের প্রতি দুর্বলতা আছে হৃতিকের। একই সঙ্গে তার চোখে রয়েছে আন্তরিক কোমলতা, যা অ্যাকশন দৃশ্যের শারীরিক ভাষাও। সাধারণ নায়কের শারীরিক শক্তি এবং সাহসিকতাই অ্যাকশন সিনেমার অবলম্বন। যেমন অজয় দেবগন সিংহাম (২০১১) সিনেমায় একটি ল্যাম্পপোস্ট তুলে ফেলেন বা সালমান খান এক থা টাইগারে (২০১২) মোটরসাইকেল থেকে লাফিয়ে উড়ন্ত প্লেনে চড়েন।
একজন অভিনেতার প্রধান গুণ মুহূর্তের মধ্যে মুখভঙ্গি পরিবর্তন করা। হৃতিক তা প্রায়ই করে দেখান। ফলে তার অ্যাকশনে একটা সৌন্দর্য থাকে, যা তাকে বাকি অভিনেতাদের চেয়ে আলাদা করে তোলে। ‘ব্যাং ব্যাং’ থেকে শুরু করে ‘ওয়ার’ (২০১৯) দুটি সিনেমাতেই তিনি নান্দনিকতার সঙ্গে অ্যাকশন করেছেন। তার সিনেমায় অ্যাকশনের বিশেষ কারণ থাকে এবং এসব দৃশ্য অকারণে সহিংসতা দেখায় না। তারই একটি প্রমাণ কাবিল (২০১৭)। সিনেমায় অন্ধ রোহানের ভূমিকায় অভিনয় করেন হৃতিক। গল্পে রোহানের স্ত্রীর ওপর হামলা হয় এবং ইন্দ্রিয় ও প্রবৃত্তি ব্যবহার করে এই হত্যার প্রতিশোধ নেন রোহান।আরও নিয়মিত সিনেমা আসুক তাঁর, নতুন রুপে-নতুন ধাঁচে বারবার দেখা মিলুক এই গ্রিক গডের। শুভ জন্মদিন হৃত্বিক রোশন।
লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি।পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।